ভবঘুরে কথা
আত্মজ্ঞান

-ড. হাসান রাজা

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জ্ঞান। সময় এর বাহন। একজন মানুষ যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে সেই পরিবেশ থেকে সে যেসব জীবনাচার শিখে থাকে; সেগুলি নানা পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। ব্যতিক্রম চিন্তার মানুষগুলো এই সাধারণ পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে মাত্র। কেউ আপোষ করেন কেউ হয়তো পারেন না। এইভাবে সমাজের মধ্যে যেমনভাবে খারাপ চরিত্রের মানুষরা বেড়ে ওঠে, ঠিক তেমনভাবেই সমাজ সংস্কারক বিপ্লবী মানুষরাও বের হয়ে আসেন।

অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে হাঁপিয়ে উঠে আমরা অতি সাধারণ মানুষরা আমাদের আত্মচেতনার সামগ্রিক সত্ত্বাকে নানাভাবেই আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হই। কারণ, আমাদের চলমান সমাজব্যবস্থা মানসিক কৃত্রিম চাপে আমাদের ক্রমশ মানবিক জীবনাদর্শ বিমুখ করে গড়ে তুলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তা হলে আমাদের ভবিষ্যৎ কি? স্রষ্টার এতো সাধের মানুষ সৃষ্টির কী প্রতিফল পাচ্ছেন তিনি? মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার যে অধিকার, যে সৌভাগ্য, সেইটি আমরা কয়জন মানুষ সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে পারছি? এইটিই আজ বড় গবেষণার বিষয়।

বর্তমানে মানবসভ্যতার ধারাবাহিকতায় মানুষ যেভাবে অপ্রতিরোধ্যভাবে প্রকৃতিকে শাসন করে চলেছে তার তুলনা হয় না। প্রযুক্তি আজ আমাদের সামগ্রিক মানবসভ্যতার অগ্রগতির নেতৃত্ব হাতে অসীম সম্ভাবনার পথে লাগামহীনভাবে এগিয়ে চলেছে। পক্ষান্তরে আমাদের মানবিক জীবনকে শৃঙ্খলাময় করতে যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা আমরা করেছি তার সফলতা অনেকটা স্থূল, স্থবির প্রায়।

মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার সহায়তায় আমাদের সাধারণ শিক্ষা উদাসীন থেকে কোন প্রকার দায়মুক্তভাবে বণিজ্যিক আধিপত্যে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। বিশ্বে উন্নত দেশসমূহ তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সূক্ষ্ম সাম্প্রদায়িক নীতি-আদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে সবকিছুকেই বাণিজ্যিকীকরণের পথে চালিত হতে বাধ্য করছে। নিতান্ত উন্নত মস্তিষ্কের একধরনের সামাজিক পশু হিসেবে আজ আমরা মহাকালের গর্ভে আশ্রয়হীন প্রাণীর মত কালক্ষেপণ ছাড়া, আমাদের নিজস্ব বিশেষ কোন পরিচয় দেবার মতো তেমন কিছু আর অবশিষ্ট আছে কি?

বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীজুড়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই অস্থিরতা ক্রমশ আমাদের মনোজাগতিক সুস্থতাকে হরণ করে মানবিক অবক্ষয়ের নিদারুণ অধঃপতনের পথে নিমজ্জিত করে চলেছে। এই মানসিক তথা মানবিক অবক্ষয় থেকে আমরা কীভাবে উদ্ধার পেতে পারি ?

মানবজীবনের সামগ্রিক সফলতার উৎস অনুসন্ধানে হাজার বছর ধরে চলে আসছে মানুষের গবেষণা। আত্মমুক্তির উৎসমূলে আজও মানুষ খুঁজে ফিরছে আপন অস্তিত্বের অনুসন্ধান। আজও যাঁরা এই আকাঙ্খাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন তাদের মানবপ্রেম, সাম্য আর ভালবাসার নিরপেক্ষ মানবসমাজ আদৌ কি গড়ে উঠবে কখনও? অমোঘ প্রকৃতির কোলে আপন সীমাবব্ধতাকে আবিষ্কারের সাথে সাথে এই অন্ধকার অসহায়ত্ব থেকে মুক্তিপাগল আত্মানুসন্ধানী ধ্যানী সত্ত্বা আজও আমাদের একমাত্র নির্ভরতার আশ্রয়স্থল। বেঁচে থাকার প্রেরণা।

বর্তমান পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮ শত কোটি। এই বিপুল জনসংখ্যার অধিকাংশ মানুষ কোন না কোন ধর্মাদর্শে আশ্রিত। আর এই ধর্মবোধ প্রথমে তৈরি করে দেয় আমাদের পরিবার, সমাজ আর রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধ। যা সব সময় ব্যক্তি নিরপেক্ষ মানব জীবনের সর্বজনীন আত্মমুক্তির পথে প্রধান অন্তরায়। এই সকল ধর্মাদর্শ ক্রমশ সাম্রাজ্যবাদীদের হাতের পণ্য হয়ে মানুষের আত্মমর্যাদা আর আত্মিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রকে রুখে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

‘ধৃ’ ধাতু থেকে ধর্মের উৎপত্তি। যে ব্যক্তি বা বস্তু যা ধারণ করে তাই তার ধর্ম। মানুষ সৃষ্টির পর থেকে অদ্যাবধি মানবসমাজে নানারকম বিশৃঙ্খলা অবক্ষয় আর মানবিক অধঃপতনের সূত্রপাত ঘটলে এই অধঃপতিত মানব সমাজকে সুশৃঙ্খলিত করতে যুগে যুগে যে সকল মহামানবের আগমন ঘটেছে তাদের জীবনাদর্শই ক্রমাগত কালে কালে তাদের অনুসারীদের কাছে ধর্মীয় বিধি-নিষেধে পরিণত হয়েছে।

এই মহামানবগণের প্রজ্ঞাময় আত্মদর্শী জীবনাচারের লিখিত রূপই হচ্ছে প্রচলিত ধর্মগ্রন্থ। প্রায় চার হাজার ভাষাভাষীর প্রসিদ্ধ ১০৪ খানা ধর্মগ্রন্থের মধ্যে চারখানা বহুল জনপ্রিয়। এর মধ্যে যবুর, তাওরাত, ইঞ্জিল ও পরিশেষে আল কোরানই মহান স্রষ্টার মনোনীত জীবনাদর্শ হিসেবে মানবজাতির আত্মিক আশ্রয়ের স্থল। তবে পৃথিবীর সকল মানুষ আজও এই সমস্ত ধর্মাদর্শের নিরপেক্ষ সুফল লাভ করতে পারেন নি।

‘নূর মুহাম্মদ’ সকল সৃষ্টির আদিশক্তি-স্রষ্টা পরম আল্লাহ। ধর্মগ্রন্থ মতে পরম শূন্যতার মধ্যে একক অথৎ নিরাকার সত্তারূপে তিনি আদিতে গোপন ছিলেন। অতঃপর তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে চাইলেন। প্রথমে ডিম্বাকারে পানিতে ভাসমান ছিলেন। এরপর ৬ দিনে তিনি সকল মূর্তিমান বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করলেন। এই অশেষ সৃষ্টির মাঝে ‘রব’ রূপে মহান সৃষ্টিকর্তা সকল বস্তুতে বর্তমান। তবে সৃষ্টিজগৎ জুড়ে শতকোটি প্রাণের উপস্থিতি থাকলেও তিনি কেবল মাত্র মানুষের মাঝেই নিজেকে প্রকাশিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

তাই নিজেকে প্রকাশ-বিকাশের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে মানুষকেই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে তথা আশরাফুল মাখলুকাত রূপে তিনি সৃষ্টি করেছেন। এবং পবিত্র কোরানে মহান সৃষ্টিকর্তা পরম আল্লাহরূপে বলেছেন, মানুষকেই তিনি তার প্রতিনিধি হিসেবে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। এই মানুষই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাই এই মানুষ সম্পকে তিনি আরও ঘোষণা করেছেন যে, মানুষ তার রহস্য এবং তিনি মানুষের রহস্য। সুতরাং সকল সৃষ্টির মাঝে তিনিই পরমসত্তা রব রূপে প্রচ্ছন্ন থাকলেও একমাত্র মানুষের মনোজগতেই তিনি নিরন্তরভাবে নিজেকে প্রকাশিত করতে চান।

সুতরাং রহস্যময় মানবদেহে তিনি রবরূপে গোপন ও বন্দী অবস্থায় দেহমনের জ্যোতি রূপে ঘুমন্ত রয়েছেন। এখন মানুষ কিভাবে তার এই ঘুমন্ত বন্দী অবস্থা থেকে সাধনাবলে নিজের চিরমুক্ত রবরূপী আত্মপরিচয় লাভ করে আপন সত্তাকে জাগ্রত করে সৃষ্টির এই বন্দীদশা থেকে মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হবে এই সত্যের অনুসরণই মূলত মানুষের সাধনা-আরাধনা আর ব্যক্তি নিরপেক্ষ ধর্মদেশনা। যা অর্জনের জন্য তার আপন অস্তিত্বের পরম প্রজ্ঞা আত্মজ্ঞান থাকাটা প্রাথমিক শর্ত।

একজন ব্যক্তি মানুষ পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে যে কোন সময় যে কোন পরিবারে বা প্রতিবেশে জন্মলাভ করলেও এবং পৃথিবীতে প্রচলিত কোন মহামানবের মহাবাণী ধর্মাদর্শকে অনুসরণ না করেও তিনি জগৎ স্রষ্টার নৈকট্য পেতে পারেন। সাধারণ দৃষ্টিতে এই কাজটি কখনই একা একা সম্ভবপর নয়।

তা হলে কী সেই পথ, যা নিজে নিজেই নিজেকে তার পরমাশ্রয়ের দিকে আহ্বান করে, সুপথ দেখায়? এই স্বরূপ সত্যকে বলা হয় আত্মজ্ঞান বা পরমজ্ঞান। যা প্রতিটি সৃষ্টি জীবের অভ্যন্তরীণ আত্মশক্তি। এই আত্মশক্তি বা আতজ্ঞানকে জানাটায় হচ্ছে পরমকে জানা।

পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টিকণা মহান স্রষ্টার আলোকিত প্রকাশ। মানুষ নামের শ্রেষ্ঠ জীব তার প্রেমময় সত্ত্বার রহস্যলোকের বাসিন্দা। একজন মানুষ তার অস্তিত্ত্বের তথা আত্ম-অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে এই পবিত্র স্রষ্টার রহস্যালোকে প্রবেশ করতে পারে। এর জন্য যে কাজটি সর্বকালের সকল মহামানব, নবী, রসুল-পীর, পয়গম্বর, সাধু-দরবেশ, অলি-আল্লাহগণকে করতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও করতে হবে সেই কাজটিই হচ্ছে আত্মজ্ঞান লাভ করা।

আত্মজ্ঞান লাভ না করলে আত্মদর্শন হয় না। আর আত্মদর্শন না হলে মানুষ তার পরম আত্মপরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞই থেকে যায়। তবে এই আত্মজ্ঞান কখনই একা একা অর্জন করা যায় না। এই পরমতত্ত্ব অর্জনের পেছনে মহান স্রষ্টার অশেষ দয়া আর স্নেহের উপরই নির্ভর করতে হয় আমাদের। সেই দয়া অর্জনের পেছনে থাকে জন্ম-জন্মান্তরের সুকর্মময় জীবনাচার।

যদি কেউ অসীমভাবে এই পরমাকাঙ্খায় ঋদ্ধ হতে পারেন তবে পথই তাকে গন্তব্য পৌঁছে দেয়। সেই ক্ষেত্রে তিনিই পথ, তিনিই রথ। তবে সন্দেহাতীতভাবে বর্তমান সম্যক একজন পথপ্রদর্শকই আমাদের আত্মজ্ঞান, আত্মদর্শন ও আত্মপরিচয় লাভের একমাত্র অবলম্বন।

পৃথিবীর সকল কালের সকল মহামানবই মূলত তাঁদের অনুসারীদের এই পরম নিত্য বিষয়ে গভীরভাবে মনোযোগী থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। শিখিয়েছেন কীভাবে জীবনের প্রতিটি চিন্তা ও কর্মে শুদ্ধ হয়ে নিজেকে খুঁটে-খুঁটে তন্ন্-তন্ন করে দেখার মাধ্যমে আপন অস্তিত্বের মূলাধার পরম সত্য-নিত্য মহান রবের রহস্যকে জানা যায়।

তবে মানবসভ্যতার অন্যতম মহাগুরু গ্রীসের মহামতি সক্রেটিস (আ) তার ব্যক্তি নিরপেক্ষ আত্মদর্শী মহামানবিক জীবনাদর্শে এই অভিধায় উচ্চারণ করেছিলেন চির উন্নত সেই বাণী- ‘KNOW THYSELF’। এখন পর্যন্ত মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন ব্যক্তি নিরপেক্ষ সর্বকালজয়ী ধ্রুবসত্য মহাবাণী আর দ্বিতীয়টি নেই।

সৃষ্টির কেন্দ্রে যিঁনি অবস্থান করেন তিঁনি ‘নূর মুহাম্মদ’। জগতে আগত অনাগত প্রতিটি সৃষ্টিই তাঁর প্রেমময় প্রকাশ। জাগতিক সকল অজ্ঞতার মূলে যে মহাপাপ আমাদের ক্রমশ পাশবিক করে তোলে তা হলো অজ্ঞতা আর ঘৃণা। নিজেকে না জানলে এই মহাপাপ থেকে নিস্তার নেই কারও। তাই নিজেকে জানতে হলে প্রথমে থাকতে হয় আত্মজ্ঞান।

নিজেকে জানার এই আহ্বান আমরা মহাগ্রন্থ উপনিষদেও দেখতে পাই। সেখানে বলা হচ্ছে ‘আত্মা নং বিদ্ধি’ বা নিজেকে জানো। এই মহান সত্যেকে আরও গভীর আর জীবনমূখী করে পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মাওলানা মুহাম্মদ (স) ঘোষণা করেছেন- ‘মান আরাফা নাফসাহু ওয়া ফাক্বদ আরাফা রব্বাহু।’ অর্থাৎ ‘যে তার নফসকে জেনেছে বা চিনেছে, সে তার রবকে জেনেছে বা চিনেছে।’

এখন কথা হচ্ছে এই নফস কি? তাকে কীভাবে জানা যায় বা চেনা যায়? নফস হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বের মূলাধার ধ্রুবসত্য, পরম সত্ত্বার বাহন। যা আমাদের চিন্তা-দেহ-মনের বাড়তি অবস্থা। সত্য হচ্ছে বর্তমান আর বাড়তি অবস্থা হচ্ছে অতীত বা ভবিষ্যৎ। এইগুলো পরজন্মের বীজ উপাদান, শিরিকরূপে আমাদের ক্রমাগত সংস্কারে আচ্ছন্ন করে রাখতে চায়।

মানুষের দেহমনে রয়েছে সাতটি ইন্দ্রিয় দ্বার। চোখ, কান, নাক, মুখ, জিহ্বা, চামড়া ও মনরূপে সাতটি ইন্দ্রিয় দিয়ে বিষয়রাশী হয়ে যা কিছু দৃশ্য, শব্দ, ঘ্রাণ, কথা, স্বাদ, স্পর্শ ও অনুভূতিরূপে আমাদের মানব অস্তিত্ত্বে প্রবেশ করে এগুলিকেই মূলত বলা হয় ধর্মরাশী।

এগুলোর সামগ্রিক রসায়নের ফলে আমাদের অস্তিত্ত্বের সামগ্রিক যে কর্মকাণ্ড প্রকাশ পায় তাকেই বলা হয় ধর্ম। সুতরাং, যে বস্তু বা ব্যক্তি যে আচরণ ধারণ করে তাই তার ধর্ম। এই ধর্মরাশীসমূহকে নিরপেক্ষরূপে খুঁটে খুঁটে জানার মাধ্যমে একজন মানবসত্ত্বা তার আপন অস্তিত্বের প্রকৃত স্বরূপকে জানতে পারেন।

মানবগুরু মহামতি লালন শাহ্ (আ) তাই তার আত্মদর্শী বাণীতে প্রকাশ করেছেন-

‘…হায়রে খাঁজা তিলে খাঁজা
খেয়ে দেখলি নে মন কেমন মজা
লালন ফকির বেজাতের রাজা
হয়ে আছে কালে কালে…।’

আত্মজ্ঞান থেকে আত্মদর্শনলাভের এই প্রক্রিয়া সর্বকালীন ও সর্বজনীন। আর এই আত্মদর্শন থেকেই সম্যক পরিচয় ঘটে আপন আত্মার। ‘আত্মা’ মানে নিজ বা বর্তমান। আত্মপরিচয় তাই মানবসত্ত্বার পরম আরাধ্য বিষয়। নিজেকে খুঁটে খুঁটে দেখার মাধ্যমে মানুষের পরিচয় ঘটে অনাত্মার সাথে। আর অনাত্মাকে জানলেই জানা যায় আত্মাকে। আত্মার মুক্ত স্বরূপকে জানার মধ্য দিয়েই ঘটে আত্মপরিচয়।

এই আত্মপরিচয় লাভকারী মানবসত্ত্বা সকল বন্ধনমুক্ত শাশ্বত সত্তা। তাঁর কাছে অতীত, ভবিষৎ বলে আসলে আর কিছুই থাকে না। সকল সময় এক কালে মিলে তিঁনি বর্তমানে বিরাজ করেন। তিনি ত্রিকালদর্শী। সম্যক সময়ে সম্যক কাজ করার মধ্য দিয়ে আত্মদর্শী মুক্ত প্রাণের আত্মপরিচিত মানুষ সকল সংস্কারের উর্ধ্বে বিরাজমান থাকেন।

তিঁনি কালোত্তীর্ণ পরম শূন্যতায় স্থিত থেকে ত্রিকালদর্শী হয়ে মোক্ষ লাভের মাধ্যমে চিরন্তন মানসিক শূন্যতা বা লা মোকামে বিরাজ করেন। এই মানসিক মহা শূন্যতার মধ্যে মহাসত্যের আবির্ভাব ঘটে। পুরুষোত্তম মুক্ত সত্তা কাজী নজরুল ইসলাম (আ) এঁর ভাষায়-

‘যথায় শূন্য, তথায় পূণ্য
সেথায় দেবতাও নগণ্য
আকাশ-পাতাল সব জঘন্য-জঘন্য
স্বাধীনতা করে তারা ক্ষুন্ন।’

সাধক মনের পরম শূন্যতার নাম ‘ক্বদর রাত্রী’ বা শক্তিশালী রাত্রী। এই রাতে তথা মানসিক শূন্যতায় সম্যক গুরুর কাছে তার অনুসারীদের তথা বিশ্বমানুষের জীবনাদর্শরূপে কোরান নাজিল হয়। সাধকগণ এই কোরানকে বলে ‘দিল কোরান’। যা সর্বকালেই বর্তমান আত্মদর্শী মুক্তসত্ত্বার প্রজ্ঞার মর্মস্থল থেকে প্রকাশিত হয়। এটি সর্বকালীন।

আত্মপরিচয় লাভকারী যে কোন মহাত্মার সান্নিধ্য তাই মানব জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন। একজন আত্মপরিচিত, প্রজ্ঞাবান আত্মদর্শী মহাত্মার নামই মুমিন। একজন মুমিন তাই ত্রিকালদর্শী। হযরত মুহাম্মাদুর রাসুলাল্লাহ (স) তাই বলেছেন- ‘ক্বুলুবুল মুমেনিনা আরশে আল্লাহ।’ অর্থাৎ, মুমিনের ক্বলবই আাল্লাহর আরশ।

জীবনের সকল পর্যায়ে সকল কর্মের মোহকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে খুঁটে খুঁটে দেখার অপর নাম সালাত। যার মাধ্যমে আপন অস্তিত্বের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা রবের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়। তাই সালাতের অপর নাম সংযোগ প্রচেষ্টা। তেমনিভাবে ‘সিয়াম’ অর্থ বর্জন করা।

অনবরত মানব অস্তিত্বে প্রবেশকারী বিষয়রাশীর মোহকে পরিত্যাগ বা বর্র্জন করার মধ্য দিয়ে সাধকের জীবনচক্রের বিস্তৃতি বা দুঃখ কমতে থাকে, যা পরিণতিতে রবের সঙ্গে মোলাকাত ঘটিয়ে দেয়। তাই ‘সিয়াম’ সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন- ‘যে ব্যক্তি সিয়াম পার করে আমি আল্লাহ স্বয়ং তার ইফতার।’

একইভাবে ‘হজ্জ্ব’ শব্দের অর্থও ‘ভ্রমণ’ করা। এই ভ্রমণ আপন দেহমনের মধ্যে ভ্রমণ। এক কথায় আত্মভ্রমণ বা আত্মদর্শন। ‘জাকাত’ অর্থ মানবদেহে প্রতিনিয়ত আগত বিষয়রাশীর কু-প্রভাবে মানব মনের মধ্যে বস্তুলোভী যে শয়তানরূপী আমিত্ব বাসা বাঁধে তাকে ত্যাগ করা। মোট কথা আমিত্ব ত্যাগ করায় জাকাত।

আবার ফার্সী শব্দ ‘কুরবানী’ অর্থ উৎসর্গ করা। সৃষ্টি জগতের কল্যাণে, জীবনে সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় আপন জীবনসহ সকল কিছু মহান রবের সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গের নাম ‘কুরবানী’। আরবী শব্দ ‘ক্বুরবা’ মানেও নিকটবর্তী হওয়া। এখানেও বলা যায় আত্মজ্ঞানে, আত্মদর্শী হয়ে আপন আত্মপরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কুরবানী দাতা শহীদে আকবর মাওলা হুসাইন (আ) এর পথে তাঁর মত সর্বস্ব উৎসর্গে এগিয়ে যাওয়া সম্ভবপর নয়।

কারবালা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষণ। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন করলেই কারবালা আমাদের সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়। পৃথিবীর সকল মহামানবকে তাই সকল যুগেই পশুপ্রবৃত্তিতে আচ্ছন্ন, সামাজিক অনাচারে লিপ্ত, কুসংস্কারে অধঃপতিত, আত্মপ্রতারক, জীবন ও জগতের হুমকি স্বরূপ শয়তানরূপী মানুষদের রুখে দিতে জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করতে হয়েছে।

এ যুদ্ধ চলমান। নিজেকে জানার মধ্য দিয়ে যখনই আপনি আত্মজ্ঞানী, আত্মদর্শী মহামানুষের দলে যোগ দিবেন তখনই আপনার সামনে জগতের দায় এসে দ-ায়মান হবে ‘কারবালা’ রুপে। আর এই দায় পৃথিবীর কোন মহামানবই অস্বীকার করতে পারেন নি। আপনিও পারবেন না। তাই আত্মদর্শী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিদ্রোহী কবিতায় নিজেকে চেনার চির আহ্বান জানিয়ে একদিকে গেয়ে উঠেছেন- ‘আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ /আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ’, আবার সেই দায় থেকেই অন্যদিকে চিৎকার করে বলেছেন-

‘মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।’

তাই নিজেকে জানার মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধির সাধনাই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সাধনা। এই সাধনার অশেষ প্রাপ্তিই আত্মদর্শন। আর আত্মদর্শনের মাধ্যমে আপন আত্মপরিচয় দ্বারাই মানুষ কেবল জীবন-মৃত্যু আর অনিত্যময় এই জৈবিক অস্থিরতা কাটিয়ে মহান রবের রঙে রঞ্জিত হয়ে ‘চিরঞ্জীব’ ‘চিরশাশ্বত’ পরমগুণাবলী অর্জন করে সকল কিছুর উপর চির বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হন। সর্বকালে সকলের জন্য আত্মমুক্তির এই একটিই পথ। আত্মদর্শনের পথ, আত্মপরিচয়ের পথ।

সুতরাং, আত্মজ্ঞান থেকে আত্মদর্শন, পরিশেষে আত্মপরিচয় অর্জনের এই মহাজাগতিক জীবন অভীপ্সা আমাদের সকল মানবাত্মার পরম আরাধ্য বিষয়। যুগে যুগে কালে কালে এই আত্মভ্রমণের পথ পরিক্রমায় আমাদের মধ্যে বেড়িয়ে, আলো ছড়িয়ে যান ইব্রাহীম, মুসা, বুদ্ধ, ঈশা, মুহম্মদ, আলী, লালন, নজরুলের মত আত্মদর্শী মহাকাল পরিব্রাজকগণ। তাঁদেরই দেখানো পথেই সকল মানবাত্মার মুক্তি। তাঁদের চরণে ভক্তি। জয় হোক চির নিত্য, পরম সত্য-সুন্দর, অনন্ত শূন্যাশ্রয়ী, চির-শিশু, চির-কিশোরের।

……………………………………………
ড. হাসান রাজা
লেখক ও গবেষক
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
৬ অক্টোবর ২০১৯

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!