ভবঘুরেকথা

ক্রমে ক্রমে গ্রাম ছাড়ি তাঁরা তিনজন।
দীর্ঘ পথ হাঁটি তাঁরা করেন গমন।।
শহর নগর গ্রাম পার হয়ে যায়।
নদ-নদী-বন কত ছাড়ি অগ্রসর হয়।।
মহাতীর্থ পীটস্থান কালীঘাটে এসে।
ভগবান গাঙ্গুলী সেখা থামলেন শেষে।।
ঘন জঙ্গলেতে ভরা ছিল পীটস্থান।
চালা ঘরে ছিল মাতৃমূর্তি অধিষ্ঠান।।
খরস্রোতা আদিগঙ্গা বেগে বয়ে যায়।
চারিদিকে বন সেথা নাহি লোকালয়।।
শক্তি সাধনার দেখি উপযুক্ত স্থান।
গাঙ্গুল করেন সেথা কুটির নির্মাণ।।
এক বৃক্ষতলে গুরু আসনে করিয়া।
বসালেন শিষ্যদ্বয়ে যতন করিয়া।।
বিভিন্ন সাধনা গুরু শেখান যতনে।
শিষ্যদ্বয় গুরু আজ্ঞা পেলে সযতনে।।
কালীঘাটে কিছুদিন সাধনা করিয়ে।
প্রস্থান করেন গুরু শিষ্যদের নিয়ে।।
গঙ্গা পার হয়ে গুরু লয়ে শিষ্য দ্বয়।
গভীর জঙ্গলে আসি উপস্থিত হয়।।
জঙ্গলের মাঝে এক মনোরম স্থানে।
শিষ্যদের লয়ে গুরু আসল সেখানে।।
লতা পাতা দিয়ে এক কুটির রচিয়ে।
অবস্থান করে গুরু শিষ্যদের নিয়ে।।
একদিন গুরুদেব শিষ্যদের কন।
এবার নক্তব্রত করহ পালন।।
শুনি শিষ্যদ্বয় কহে অবাক হয়ে।
নক্তব্রত কিবা গুরু দিন বুঝায়ে।।
নক্ত অর্থে রাত্রি ব্রত অর্থে উপবাস।
আহার সংযম হয় করলে অভ্যাস।।
শুরু হয় নক্তব্রত গুরুর আদেশে।
রাত্রিতে আহার দিনে থাকে উপবাসে।।
ভিক্ষা করি গুরুদেব তিল দুগ্ধ আনে।
সিদ্ধ করি শিষ্যদের খাওয়ান যতনে।।
শিষ্যদ্বয় সদা থাকে সাধনায় ব্রত।
শিষ্যদের সেবা গুরু করেন নিয়ত।।
নক্তব্রত একদিন সমাপ্ত হলো।
একান্তরা ব্রত গুরু করতে বলল।।
একদিন একরাত্রি পূর্ণ অনশন।
পরদিন একবেলা আহার গ্রহণ।।
একান্তরা ব্রত পূর্ণ হলো যখন।
করতে ত্রিরাত্রি ব্রত গুরুদেব কন।।
তিনদিন তিনরাত্রি পূর্ণ অনশন।
তারপর একদিন আহার গ্রহণ।।
ত্রিরাতের ব্রত শেষ যেদিন হলো।
পঞ্চাহের ব্রত গুরু করতে বলল।।
পাঁচদিন করে তাঁরা পূর্ণ অনশন।
একদিন একবেলা আহার গ্রহণ।।
পঞ্চাহের ব্রত শেষ যেদিন হলো।
নবরাত্র ব্রত গুরু আদেশ করল।।
নয়দিন উপবাসে থাকে শিষ্যদ্বয়।
একদিন খায় শুধু গুরু যা দেয়।।
এরূপে নবরাত ব্রত করি শেষে।
দ্বাদশাহ ব্রত করে গুরুর আদেশে।।
উপবাস করি তাঁরা থাকে বারোদিন।
আহার করেন পরে মাত্র একদিন।।
পঞ্চাহের ব্রত করে গুরুর আদেশে।
এক পক্ষ পর একদিন খায় শেষে।।
এই ব্রত শেষে মাসাহের ব্রত নেয়।
একমাস পরে একদিন মাত্র খায়।।
এরূপে ব্রত আর সাধনা করতে।
চল্লিশ বছর কাটে দেখতে দেখতে।।
গুরুর বয়স হলো শতেক বছর।
শিষ্যদের বয়:ক্রম পঞ্চাশ বছর।।
গুরুবাক্য শিষ্যদ্বয় করেন পালন।
গুরুর নির্দেশ মতো করেন সাধন।।
অত:পর লোকনাথ গুরুর আদেশে।
দ্বিতীয় মাসাহ ব্রত করে অবশেষে।।
একমাস পরে মাত্র একদিন খায়।
পূর্বজন্ম স্মৃতি তাহে লোকনাথ পায়।।
জাতিস্মর হন তিনি গুরুর কৃপাতে।
শিষ্যদের লয়ে গুরু থাকে আনন্দেতে।।
তারপর গুরুদেব শিষ্যদের লয়ে।
সাধনার জন্য তিনি আসেন হিমালয়ে।।
পর্বত বাহিয়ে গুরু লয়ে শিষ্যদ্বয়।
ক্রমে ক্রমে উঠলেন পর্বত চূড়ায়।।
শিষ্যদ্বয় দেখলেন হয়ে বিস্মিত।
গাছপালা কিছু নেই বরফে আবৃত।।
হিমের প্রবাহ শুধু চারদিকে বয়।
নাহি কল-কোলাহল গম্ভীরতাময়।।
সেখানে দেখলেন গুরু ভগবান।
রয়েছে সাধনার উপযুক্ত স্থান।।
মনোরম গুহা মধ্যে গুরু প্রবেশিয়া।
আসন করে দেন যতন করিয়া।।
সে আসনে শিষ্যদ্বয়ে গুরু বসাল।
তারপর তাঁদের আদেশ করল।।
এখানে তপস্যা কর বসি দু’জনায়।
যতদিন ব্রহ্মজ্ঞান লাভ নাহি হয়।।
যাহা কিছু শিখঅয়েছি আমি একদিন।
যা কিছু করেছ ব্রত আচরণ এতদিন।।
তপস্যায় সেসব সাহায্য করবে।
নিস্তরঙ্গ ব্রহ্মজ্ঞান ইথে লাভ হবে।।
ইন্দ্রিয় রবে বশে বিক্ষিপ্ত হবে না।
ক্ষুধাতৃষ্ণা তোমাদের কিছু থাকবে না।।
ভয় নেই আমি আছি তোমাদের পাশে।
জেগে রব তোমাদের সিদ্ধিলাভ আশে।।
আমার লেগে বৎস নাহি কোনো ভয়।
সুস্থ দেহে রব আমি ঈশ্বর কৃপায়।।
গুরুকে প্রণাম করি শিষ্য দু’জনে।
তপস্যা করতে তাঁরা বসল দু’জনে।।
গুরু আর শিষ্যদ্বয় মিলি তিনজন।
একাগ্র মনেতে তাঁরা করেন সাধন।।
দিবা-রাত্রি, শীত-গ্রীষ্ম কিছু নাই মনে।
সমাধি যোগেতে স্থির রহে শিষ্যগণে।।
দিবা রাত্র পক্ষ করি কাটে কত মাস।
একে একে কেটে গেল বছর পঞ্চাশ।।

আরো পড়ুন…
লোকনাথ বাবার মঙ্গলাচরণ পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার আবির্ভাব পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার বাল্যজীবন পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার যোগ-সাধনা পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার ব্রহ্মজ্ঞান লাভ পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার দেশ ভ্রমণ পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার পুনরায় দেশ ভ্রমণ পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার সুমেরু যাত্রা পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার চন্দ্রনাথ পর্বতে আগমন পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার দাউদকান্দি গমন পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার বারদীতে আগমন পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার আশ্রম স্থাপন পাঁচালী…
লোকনাথ বাবার মহাপ্রয়াণ পাঁচালী…

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!