রাজযোগ-বিজ্ঞানের লক্ষ্য

রাজযোগ-বিজ্ঞানের লক্ষ্য

-স্বামী বিবেকানন্দ

যীশুখ্রীষ্ট বলছেন, ‘আমি ঈশ্বর দর্শন করেছি।’ তাঁর শিষ্যেরাও বলছেন,’আমরা ঈশ্বরকে অনুভব করেছি।’ এইরূপ আরও অনেকের কথা শোনা যায়। বৌদ্ধধর্মেও এইরূপ; বুদ্ধদেবের প্রত্যক্ষানুভূতির উপর এই ধর্ম স্থাপিত। তিনি কতকগুলো সত্য অনুভব করেছিলেন, সেগুলি দর্শন করেছিলেন, সেই-সকল সত্যের সংস্পর্শে এসেছিলেন এবং সেগুলিই জগতে প্রচার করে গেছিলেন। হিন্দুদের সম্বন্ধেও এইরূপ; তাঁদের শাস্ত্রে ঋষি-নামধেয় গ্রন্থ কর্তাগণ বলেগেছেন, ‘আমরা কতকগুলো সত্য অনুভব করেছি।’

তাঁরা সেইগুলিই জগতে প্রচার করে গেছেন। অতএব স্পষ্ট বোঝা গেল যে, জগতে সকল ধর্মই জ্ঞানের সার্বভৌম ও সুদৃঢ় ভিত্তি-প্রত্যক্ষানুভূতির উপর স্থাপিত। সকল ধর্মাচার্যই ঈশ্বরকে দর্শন করেছিলেন। তারা সকলেই আত্মদর্শন করেছিলেন; সকলেই নিজ নিজ ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন- অনন্ত-স্বরূপ অবগত হয়েছিলেন।

তাঁরা যা দেখেছিলেন, তাই প্রচার করে গিয়েছেন। তবে প্রভেদ এইটুকু যে, প্রায় সকল ধর্মেই বিশেষতঃ ইদানীং – একটি অদ্ভুত দাবি আমাদের সামনে উপস্থিত করা হয়, তা হলো এই, বর্তমানে এই-সকল অনুভূতি অসম্ভব! যাঁরা ধর্মের প্রথম স্থাপয়িতা, পরে যাঁদের নামে সেই ধর্ম প্রচলিত হয়, শুধু এইরূপ কয়েকজন ব্যক্তির প্রত্যক্ষানুভূতি সম্ভব ছিল। আজকাল এরূপ অনুভূতি কারো হয় না, অতএব ধর্ম এখন বিশ্বাস করে নিতে হবে- একথা আমি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করি।

যদি জগতে জ্ঞানের কোন বিশেষ বিষয়ে কেউ কখনো কোন একটি অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকেন, তাহলে আমরা এই সার্বভৌম সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, “পূর্বেও কোটি কোটিবার ঐরূপ অভিজ্ঞতা লাভ করবার সম্ভাবনা ছিল, পরেও অনন্তকাল ধরে বারবার ঐরূপ সম্ভাবনা থাকবেই।

একরূপতাই প্রকৃতির কঠোর নিয়ম; একবার যা ঘটেছে তা পুনঃ পুনঃ পুনরায় ঘটতে পারে।

যোগ-বিদ্যার আচার্যগণ বলেন, “ধর্ম কেবল অনুভূতির উপর স্থাপিত নয়, পরন্তু স্বয়ং এই-সকল অনুভূতিসম্পন্ন না হলে কেউই ধার্মিক হতে পারে না। যে বিজ্ঞানের দ্বারা এই-সকল অনুভূতি লাভ হয়, তার নাম ‘যোগ’।” ধর্ম যতদিন না অনুভূত হচ্ছে, ততদিন ধর্মের কথা বলাই বৃথা।

ভগবানের নামে এত গণ্ডগোল, যুদ্ধ ও বাদানুবাদ কেন?

ভগবানের নামে যত রক্তপাত হচ্ছে, অন্য কোন বিষয়ের জন্য এত রক্তপাত হয় নি; কারণ সাধারণ মানুষ ধর্মের মূল উৎসে যায় নি। সকলেই পূর্বপুরুষগণের কতকগুলো আচার অনুমোদন করেই সন্তুষ্ট আছে। তারা চায় অপরেও তাই করুক। “আত্মা অনুভূতি না করে, আত্মা অথবা ঈশ্বর দর্শন না করে ‘ঈশ্বর আছেন’ বলবার কী অধিকার মানুষের আছে?”

যদি ঈশ্বর থাকেন, তাঁকে দর্শন করতে হবে; যদি আত্মা বলে কিছু থাকে, তাকে উপলব্ধি করতে হবে। নতুবা বিশ্বাস না করাই ভাল।

“ভণ্ড অপেক্ষা স্পষ্টবাদী নাস্তিক ভাল।”

এক দিকে আজকালকার ‘বিদ্বান’ বলে পরিচিত ব্যক্তিদের মনোভাব এই যে, ধর্ম, দর্শন ও পরমপুরুষের অনুসন্ধান – সবই নিষ্ফল।

অপর দিকে যারা অর্ধশিক্ষিত, তাদের মনের ভাব এইরূপ বোধ হয় যে, ধর্ম-দর্শনাদির বাস্তবিক কোন ভিত্তি নাই, তবে ঐগুলির এই মাত্র উপযোগিতা যে, এইগুলি জগতের মঙ্গল-সাধনের বলিষ্ঠ প্রেরণাশক্তি- যদি মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস করে, সে সৎ নীতিপরায়ণ হতে পারে এবং কর্তব্যনিষ্ঠ নাগরিক হয়।

যাদের এইরূপভাব, তাদেরকে দোষ দিতে পারি না; কারণ তারা ধর্মসম্বন্ধে যা কিছু শিক্ষা পায়, তা অসংলগ্ন অন্তঃসারশূন্য প্রলাপবাক্যের মতো অনন্ত শব্দসমষ্টিতে বিশ্বাস মাত্র। তাদেরকে শব্দের উপরে বিশ্বাস করে থাকতে বলা হয়। তারা কি এরূপ বিশ্বাস করতে পারে? যদি পারত, তাহলে মানব-প্রকৃতির প্রতি আমার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা থাকত না।

মানুষ সত্য চায়, স্বয়ং সত্য অনুভব করতে চায়; সত্যকে ধারণা করতে, সত্যকে সাক্ষাৎ করতে, অন্তরের অন্তরে অনুভব করতে চায়।

“কেবল তখনই সকল সন্দেহ চলে যায়
সব তমোজাল ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়,
সকল বক্রতা সরল হয়ে যায়’
বেদ এইরূপ ঘোষণা করেন”

“হে অমৃতের পুত্রগণ! হে দিব্যধাম-নিবাসিগণ, শ্রবণ কর – আমি এই অজ্ঞানান্ধকার হতে আলোকে যাবার পথ পেয়েছি, যিনি সকল তমসার পারে, তাঁকে জানতে পারলে সেখানে যাওয়া যায় – মুক্তির আর কোন উপায় নেই। রাজযোগ-বিজ্ঞানের লক্ষ্য – এই সত্য লাভ করবার প্রকৃত কার্যকর ও সাধনোপযোগী বৈজ্ঞানিক-প্রণালী মানব-সমক্ষে স্থাপন করা।

প্রথমতঃ প্রত্যেক বিজ্ঞানেরই নিজস্ব পর্যবেক্ষণ-প্রণালী আছে। তুমি যদি জ্যোতির্বিদ হতে ইচ্ছা কর, আর বসে বসে কেবল ‘জ্যোতিষ’, জ্যোতিষ’ বলে চিৎকার কর, কখনই তুমি জ্যোতিষশাস্ত্রে অধিকারী হবে না। রসায়নশাস্ত্র সম্বন্ধেও ঐরূপ।

এখানেও একটি নির্দিষ্ট প্রণালী অনুসরণ করতে হবে, পরীক্ষাগারে (Laboratory) গিয়ে বিভিন্ন দ্রব্যাদি নিয়ে নিতে হবে, ঐগুলি মিশিয়ে যৌগিক পদার্থে পরিণত করতে হবে, পরে ঐগুলি নিয়ে পরীক্ষা করলে তবে তুমি রসায়নবিদ্ হতে পারবে।

যদি তুমি জ্যোতির্বিদ হতে চাও, তাহলে তোমাকে মানমন্দিরে গিয়ে দূরবীক্ষণ-যন্ত্রের সাহায্যে গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করতে হবে, তবে তুমি জ্যোতির্বিৎ হতে পারবে। প্রত্যেক বিদ্যারই এক একটি নির্দিষ্ট প্রণালী থাকা উচিত।

আমি তোমাদেরকে শত সহস্র উপদেশ দিতে পারি, কিন্তু তোমরা যদি সাধনা না কর, তোমরা কখনই ধার্মিক হতে পারবে না; সকল যুগে সকল দেশেই নিষ্কাম শুদ্ধভাবে জ্ঞানিগণ এই সত্য প্রচার করে গেছেন। জগতের হিতসাধন ব্যতীত তাঁদের আর কোন কামনা ছিল না।

তাঁরা সকলেই বলেছেন, ‘ইন্দ্রিয়গণ আমাদেরকে যে সত্য অনুভব করাতে পারে, আমরা তা অপেক্ষা উচ্চতর সত্য লাভ করেছি।’ তাঁরা সকলকে সেই সত্য পরীক্ষা করতে আহ্বান করেন। তাঁরা আমাদেরকে একটি নির্দিষ্ট সাধনপ্রণালী নিয়ে আন্তরিক সাধন করতে বলেন।

এইভাবে সাধনা করে যদি আমরা এই উচ্চতর সত্য লাভ না করি, তখন আমরা বলতে পারি, এই উচ্চতর সত্য সম্বন্ধে যা বলা হয়, তা যথার্থ নয়। কিন্তু তার আগে কখনই এই-সকল উক্তির সত্যতা একেবারে অস্বীকার করা কোনমতেই যুক্তিযুক্ত নয়। অতএব আমাদের নির্দিষ্ট সাধনপ্রণালী নিয়ে নিষ্ঠাপূর্বক সাধনা করতে হবেই, আলো নিশ্চয়ই আসবে।

…………………………
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে : ভারতের সাধক-সাধিকা

পুণঃপ্রচারে বিনীত প্রণয় সেন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।