সতীমাতা ভবেরগীত কর্তাভজা

রামশরণ ও সতীমার দীক্ষাগ্রহণ

রামশরণপাল আনুমানিক ১৭২৪-২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। রামশরণ সিদ্ধ মহাপুরুষ ফকির ঠাকুরের দর্শন পেয়ে সংসারের শত কাজের মাঝেও অধিকাংশ সময় ঠাকুরের সাথে ধর্মীয় আলাপ আলোচনা করে সময় কাটাতেন। রামশরণের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, তারপর ফকির ঠাকুরের সঙ্গ পেয়ে সংসারের কাজকর্মে ঠিকমত মনযোগ না দেওয়ায় সংসারে অভাব অনটন দেখা দিল।

একদিন রামশরণ ফকির ঠাকুরের সঙ্গে বসে কথোপকথন করছেন এমন সময় স্বরসতী (সতীমা) সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন ঠাকুর এমনিতেই সংসারে অভাব অনটন, তারপরেও যদি ঠিকমত সংসারের কাজকর্ম না করা হয় তা হলে সংসার চলবে কি করে।

ফকির ঠাকুর স্বরসতীর কথা শুনে বললেন, রামশরণের আমার কাছে আসতে হয়তো ভাল লাগে, এ জন্য তুই ওকে কিছু বলিসনে মা। সতীমা পুনরায় সংসারের অসচ্ছলতার কথা বললে ফকির ঠাকুর একটা গাছ দেখিয়ে বললেন ঐ গাছের গোড়ায় কতগুলি পাতা সরিয়ে দেখ ওখানে সংসারের প্রয়োজন মেটানো মত কিছু অর্থ আছে ওগুলো নিয়ে যা, সংসারের অভাব ঘুঁচে যাবে।

ফকির ঠাকুরের কথামত সতীমা সেই গাছের গোড়ায় গিয়ে কিছু পাতা সরিয়ে দেখতে পেলেন সোনা রূপাসহ বহুঅর্থ, যে অর্থ দিয়ে সারা জীবন নিশ্চিন্তায় সংসার চলবে, স্বরসতী ঠাকুরের অলৌকিক ক্ষমতায় হতবাক হয়ে গেলেন, তারপর কাপড়ের আঁচলে যথাসাধ্য সোনা-রূপা, অর্থ নিয়ে গৃহের দিকে রওনা হলেন।

কিছুদূর যাওয়ার পর স্বরসতীর মনে হল এত অর্থ ফকির ঠাকুর কোথায় পেলেন? এটা তো তাঁর রোজগার করা নয়, নিশ্চয় এটা ঠাকুরের ঐশ্বরিক ক্ষমতা, যে ক্ষমতায় পায়ে হেঁটে গঙ্গানদী পার হওয়া যায়, সদানন্দের দুরারোগ্য ব্যধি মুহুর্তের মধ্যেই ভাল হয়, এই কথা চিন্তা করতে করতে স্বরসতীর মনে এক ভাবাবেশ সৃষ্টি হল এবং ফিরে গিয়ে ফকির ঠাকুরের চরণে ঐ সোনা-রূপা, অর্থ সম্পদ ফেলে দিয়ে বললেন এই অর্থ সম্পদ, রত্নালঙ্কার দিয়ে এ অধমকে ভুলালে হবে না।

যে ধন পেয়ে এই রত্নালঙ্কার ত্যাগ করেছ, আমাকে সেই ধনরত্ন দাও, আমি এই রত্নালঙ্কার চাই না ঠাকুর, আমাকে ক্ষমা কর ঠাকুর, আমাকে দয়া কর ঠাকুর, এই বলতে বলতে স্বরসতী ফকির ঠাকুরের চরণ ধরে কাঁদতে লাগলেন।

ফকির ঠাকুর বললেন এই রত্ন নিতে হলে ঐ রত্নালঙ্কার অর্থ সম্পদের মোহ যে ত্যাগ করতে হবে মা কারণ আলো-আঁধার, দিন-রাত একসাথে পাওয়া যায় না মা। স্বরসতী তৎক্ষনাৎ ঐ সোনা-রূপা, রত্নালঙ্কার কুড়িয়ে নিয়ে দূরে নিক্ষেপ করে বললেন ওগো ঠাকুর যে রত্ন পেলে মানবজীবনের উদ্দেশ্য সফল হয় আমাকে সেই রত্ন দাও ঠাকুর। ফকির ঠাকুর বললেন এই সত্যরত্ন গ্রহণ করতে হলে এর নিতি-আদর্শ, বিধি-নিষেধ পালনের জন্য বহুত্যাগ স্বীকার করতে হবে তা পারবি তো মা?

স্বরসতী বললেন সে তো ঠাকুরের কৃপা মাত্র, ঠাকুরের কৃপা হলে সবই সম্ভব। স্বরসতীর অটল বিশ্বাস ও ঐকান্তিক ভক্তি দেখে ঠাকুর ভাবলেন আমি সংসারাবদ্ধ জীবের জন্য যে সত্যরত্ন এনেছি এবং এই সত্যরত্ন দেওয়ার জন্য যে গ্রাহক খুঁজে বেড়াচ্ছি, এতদিনে বুঝি সেই গ্রাহক পেয়েছি।

ঠাকুর বললেন, মা তোর মনে যে ভাবের উদয় হয়েছে আমার বিশ্বাস তুই পারবি গুরুবাক্য রক্ষা করতে, তবে আবেগের বশবর্তী হয়ে কিছু করিসনে, আজকের মত গৃহে ফিরে যা, মনে যদি সত্যিই পারমার্থিক জগতের মহাভাবের উদয় হয় তাহলে আগামীকাল প্রত্যুষে তোরা স্বামী-স্ত্রী দুজনে একাত্ম মনে শারিরীক ও মানষিকভাবে পবিত্র হয়ে আমার কাছে আসবি, আমি তোদের সেই সত্যরত্ন দান করব, যে ধন পেলে ইহজগতে পাবি শান্তি আর পরজগতে পাবি পারমার্থিক মুক্তি মালিকের চরণ কমলে ঠাঁই।

পরদিন প্রত্যুষে স্নানাদি করতঃ পবিত্র হয়ে পিতার অনুমতিক্রমে সত্যরত্ন গ্রহণের জন্য ফকির ঠাকুরের কাছে উপস্থিত হলেন তারা। ফকির ঠাকুর প্রথমে স্বরসতীকে ও পরে রামশরণকে কর্তাভজা সত্যধর্মের বিধিমত সত্যনামে দীক্ষিত করলেন।

জয় গুরু সত্য জয় গুরু সত্য।
এক সত্য কর সার, ভব নদী হবে পার।
একটা শব্দ শুনে জবানে শূন্যে শূন্যেতে,
কি হলো সেই ধ্বণিটি ভালো লাগলো কানেতে।
(ভাবেরগীত নং-৮৬, কলি-১)

ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভু সতীমা ও রামশরণকে সত্যনামে দীক্ষা দেওয়ার পর বললেন, এই সত্যনাম মহামন্ত্র সদাসর্বদা স্মরণ রাখবি এবং প্রত্যেকদিন ব্রহ্মমুহুর্ত, মধ্যাহ্ন, স্বায়ং ও মধ্যরাত্রি এই চারবার নিয়মিত শুদ্ধাসনে, শুদ্ধমনে, সংযত চিত্তে, পবিত্রভাবে নাম স্মরণ করবি,

এই নাম স্মরণ করতে করতে এই সত্যনামেই সকল পূর্ণ হবে, নামরস পরশ হলে সমস্ত পৃথিবী তোর বশীভূত হবে, ঘরে বসেই আগম নিগম জানতে পারবে, সদা সর্বক্ষণ এই সত্যনাম স্মরণ, মনন, নিরীক্ষণ করলে সর্বাঙ্গীন মঙ্গল হবে, ধন-সম্পদ- ঐশ্বর্য্য সব কিছুই আপনা আপনিই আসবে, তবে সাবধান-মনে রাখবি ভোগে দুঃখ, ত্যাগে শান্তি।

সদাসর্বদা আমিত্বভাব বর্জন করে চলবি মনে বিন্দুমাত্র অহংকার না আসে, দেহ-মন-বাক্য সর্বদা অহংকার থেকে দূরে রাখবি কারণ অহংকার পতনের মূল, কোন অবস্থাতেই কর্তা সাজবি না, মনে রাখবি-গোলামীর কোন হিসাব নেই।

ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভু তার ভক্তদের বহু মূল্যবান উপদেশ দিয়েছিলেন এগুলোকে বলা হয় ট্যাকশালী, তবে এই ট্যাকশালী সম্পূর্ণ বাজারের জন্য নয় অর্থাৎ সাধারণের জন্য নয়, যারা দেল ফকিরি করণী করবে অর্থাৎ যারা সাধন মার্গ অবলম্বন করবে শুধু তাদের জন্য। ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভু সতীমা ও রামশরণকে আরও বললেন এই সত্যরত্ন সত্যনাম সযত্নে লালন করলে অসাধ্য সাধন হবে, তবে এজন্য কয়েকটি বিধি-নিষেধ অবশ্যই পালন করতে হবে, এ গুলো কর্তাভজা সত্যধর্মের- মূল নীতি।

…………………………………..
সূত্র ও কৃতজ্ঞতা:
১. ভবের গীত
২. কর্তাভজা সত্যধর্ম

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

…………………..
আরও পড়ুন-
কর্তাভজা সত্যধর্মের ৩০ ধারা
রামশরণ ও সতীমার দীক্ষাগ্রহণ
সতী মা
কর্তাভজা সত্যধর্ম
কর্তাভজার দশ আজ্ঞা
গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর আবির্ভাব
ডালিম তলার মাহাত্ম্য
বাইশ ফকিরের নাম
কর্তা
দুলালচাঁদ
কর্তাভজা সত্যধর্মের পাঁচ স্তম্ভ
সাধন-ভজন ও তার রীতি নীতি
ভাবেরগীত এর মাহাত্ম্য
কর্তাভজা সত্যধর্মের আদর্শ ও উদ্দেশ্য

প্রাসঙ্গিক লেখা

2 Comments

  • লিমন , মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০১৯ @ ৪:৪৬ অপরাহ্ন

    “যে ধন পেয় এই রত্নালংকার ত্যাগ করেছ, আমাকে সেই ধনত্ন দাও ” প্রত্যেক ভক্তের গুরুর কাছের এটাই চাওয়া হওয়া উচিৎ।

    • ভবঘুরে , বুধবার ১৭ জুলাই ২০১৯ @ ৮:০১ অপরাহ্ন

      জয়গুরু সাধু…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!