লালন ফকিরের নববিধান : দুই

লালন ফকিরের নববিধান : দুই

-মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ

ফকির লালন সাঁইজির নাম স্মরণে আসলে কোনো জাকজমকময় শান-শওকত আলো ঝলমলে দরবারে বিশাল কারুকার্যময় সিংহাসনে বসে থাকা কারো ছবি মূর্ত হয়ে উঠে না। লালন ফকির মানেই যেন শ্বেত-শুভ্রবস্ত্রের সাদাসিধে একতারা হাতে এক সাধু।

সহজ জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে যিনি জীবনকে দেখেছেন গভীর থেকে গভীরতম উপলব্ধিতে তিনিই ফকির লালন। যিনি স্বপ্ন দেখেছেন এমন এক সমাজের যে সমাজে থাকবে না জাতি-ধর্ম-গোত্রের বারাবারি। ইতর আতরাফ বলে কেউ কাউকে দূরে ঠেলে দেবে না। প্রেমই হবে যে সমাজের মূল তত্ত্ব।

মানুষই হবে মানুষের একমাত্র পরিচয়। মানুষ হয়ে মানুষ, মানুষকেই নিবেদন করবে ভক্তি-প্রেম। মানবপ্রেম মনে ধারণ করে সকলে আপন আপন বিশ্বাসে পাশাপাশি বাস করবে স্বগৌরবে। কামাসক্ত মনন-মানুষিকতায় নয় বরঞ্চ প্রেমময় হবে সকল ভাবনা-বিশ্বাস-ভক্তি।

এই প্রাচ্যের দর্শনে, বিশেষ করে বলতে গেলে বাংলার দর্শনে মানুষকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এই বিশ্বকে-এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে বুঝতে গেলে প্রথমে মানুষকে বুঝতে হবে; আর মানুষকে বুঝতে পারলেই উন্মুক্ত হবে ব্রহ্মাণ্ডের রহস্যের গোলকধাঁধা। আর যে মানুষকে ভজনা করলে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য ভেদ করা যাবে; সেই মানুষকে অবহেলা করলে চলবে কেনো?

এক লালন সাধক একবার বলেছিল- “তোমার উপার্জন সৎ না হলে ব্যয় সৎ হবে না বাপু। সেই উপার্জন কেবল অর্থ-বৃত্ত না। জ্ঞান-বুদ্ধি-অহঙ্কারও। যা কিছু তুমি নিজের ভেতরে জমা রাখো সবই উপার্জন। যদি সুখি হইতে চাও-আনন্দে থাকবার চাও তাহলে যা কিছু উপার্জন করবা তা সৎ চিন্তা নিয়া করবা। মানে যা কিছু গ্রহণ করবা তা যাতে সৎ হয়। নইলে যা কিছু বলবা-করবা-ভাববা কোনোটাই সৎ হইবো না। আর অসৎ নিয়ে বসবাস করলে সুখি হইবা কেমনে? তুমিই ভাইবা বিচার করো বাপু।”

ফকির লালন সাঁইজির পদের অন্তর্নিহিত অর্থ অনুসন্ধান করা এই ধারাবাহিক লেখার কর্ম নয়। তা উপযুক্ত গুরুর কাছে সমর্পিত হয়ে ভক্তি-শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে আত্মোপোলব্ধির মধ্যে দিয়েই জানতে হয়। তা জনসম্মুখে প্রচার-প্রসার করার বিধান নেই। সে চেষ্টা না করাই উত্তম। এই লেখার উদ্দেশ্য কেবল ফকির লালন সাঁইজির পদের শাব্দিক অর্থের ভেতর দিয়ে তিনি কি জ্ঞান দিয়ে গেছেন একেবারে সাধারণের জন্য তা ব্যক্ত করা।

সাধন-ভজনের পূর্বে-গুরুর কাছে দীক্ষা নেয়ার পূর্বে। যে কাজগুলো সাধারণে করতে পারে ভাববাদকে বোঝার জন্য-অনুধাবন করার জন্য সেই ক্ষুদ্র চেষ্টা মাত্র। সাঁইজির এমন অনেক পদ আছে যার সাধারণ শাব্দিক ব্যাখ্যায় পাওয়া যায় ফকির লালন সাঁইজির নববিধান। যা সকল মানুষের জন্য সহজ জীবনের জন্য-সহজ পথের সন্ধানের দিশা দেখায়।

পৃথিবীতে বেশিভাগ মানুষ বর্তমানে প্রচলিত যে সকল ধর্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী। তার প্রায় সবগুলোতেই উল্লেখ আছে বর্তমান সময়ে অর্থাৎ এই কলিকালে আর কোনো নবী-রাসুল-অবতার ধারিত্রীতে আসবে না মানবজাতিকে মুক্তির পথ দেখাতে। সাধন-ভজন শেখাতে।

এই কলিকালে মানুষই মানুষের সহায়। এই মানুষকে বলা হয় ‘আশরাফুল মাকলুকাত’ অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব। আর এই সেরা জীব প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’ চন্ডীদাস বলেছেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ শ্রী শ্রী ঠাকুর অনকুলচন্দ্র বলেছেন, ‘মানুষ আপন টাকা পর, যত পারিস মানুষ ধর।’ কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘মানুষ করিবে মানুষের সেবা আর সব কিছু বাজে।’

অর্থাৎ সকলেই একবাক্যে এই জীবকে ভালোবাসার কথাই ব্যক্ত করেছেন। সৃষ্টিকে সেবা মধ্য দিয়ে তার ভেতরের স্রষ্টাকে অনুভব করার এই যজ্ঞই হলো ভাববাদে প্রবেশের পথ। এই দৃশ্য-অদৃশ্য, গুপ্ত-ব্যক্ত মানুষকে সাধন-ভজন করার কথা-ভালোবাসার কথা বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে ভাববাদে।

ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সুফিবাদের মূল তত্ত্ব হলো ‘প্রেম’। আর প্রেমের প্রেমিক হয়ে উঠতে গেলে জীবে প্রেম অনিবার্য। যে জীবে প্রেম করতে পারে তার জন্য সকল দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে যায়। ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

ভজ মানুষের চরণ দুটি
নিত্য বস্তু হবে খাঁটি,
(ভবে) মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার।।

নদী কিংবা বিল-বাঁওড়-খাল
সর্বস্থলে একই এক জল,
একা মেরে সাঁই হেরে সর্ব ঠাঁই
মানুষে মিশিয়া হয় বিধান তার।।

নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে
আকার সাকার হইল সে,
দিব্যজ্ঞানী হয় তবে জানতে পায়
কলি যুগে হলেন মানুষ-অবতার।।

বহু তর্কে দিন বয়ে যায়
বিশ্বাসের ধন নিকটে পায়,
সিরাজ সাঁই ডেকে বলে লালনকে
কুতর্কের দোকান সে করে না আর।।

ফকির লালনের সাধারণের জন্য নববিধান-

  • নিজের যা কিছু উপার্জন (মানুষিক-শারীরিক-জাগতিক) তা শুদ্ধ করতে গেলে মানুষ হয়ে মানুষের সেবায় নিবেদিত হওয়াই সাধকের কর্ম।
  • মানুষকে যে গুরুজ্ঞান করে সমর্পণ ভাব মনে জাগ্রত করতে পারে, তারই সকল সাধন সিদ্ধ হয়।
  • সাধন সিদ্ধ হতে হলে মানুষকে ভালোবাসার বিকল্প নেই।
  • সকল সাধনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে আদৌতে এক সত্যেই পৌঁছানো। অর্থাৎ যে যেই সাধন-ভজন করুক বা যে যাঁর সাধন-ভজনই করুক না কেনো। সকল সাধনার মূল্য লক্ষ্য একই। একই সত্যে সকলে পৌঁছাতে চায়। পদ্ধতি ভিন্ন কিন্তু লক্ষ্য এক।
  • তাই যে মতেই সাধন-ভজন করুক না কেনো এই কলিতে মানুষকে বুঝতে না পারলে স্রষ্টাকে পাওয়া সহজ নয়।
  • মানুষের মাঝেই স্রষ্টা মিশে আছে। অর্থাৎ সৃষ্টির মাঝেই স্রষ্টার বাস। তাই সৃষ্টিকে বুঝতে পারলে তার স্রষ্টাকে বোঝা সহজ হবে।
  • যে মানুষ দিব্যজ্ঞান অর্জন করার পথে অগ্রসর হয় সেই জানতে পারে এই জামানায় অর্থাৎ কলিকালে মানুষই অবতার অর্থাৎ যারা শুদ্ধতার চর্চা করে তারাই সেই অসীমের জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার সক্ষমতা রাখে।
  • আর যেজন এই সত্য অনুধাবনের পথে অগ্রগামী তিনিই মানুষের কাছে আবির্ভূত হয় গুরু-মুর্শিদ রূপে।
  • তর্কে কেবল সময় ক্ষেপনই হবে। আখেরে কিছুই মিলবে না। জ্ঞান উপার্জন করতে হবে কিন্তু তা তর্কে জয়ী হবার জন্য না। অসীমের জ্ঞানকে গ্রহণ করার জন্য জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যাতে নিজেকে জানা যাবে। জগতকে জানা যাবে।
  • যে জন তর্কে জয়ী হওয়ার জন্য নয় নিজে সৎ-শুদ্ধ থেকে বিশ্বাস-ভক্তি-শ্রদ্ধায় এগিয়ে যায় সেই তাঁর সন্ধান পায়।
  • মানুষ যা খোঁজে তা দূরে কোথাও নেই তা নিকটেই আছে। অর্থাৎ নিজের ভেতরেই আছে। অন্যত্র খোঁজা বৃথা সময় নষ্ট মাত্র।
  • কুতর্ক করা যেমন যাবে না; তেমনি কুতর্ক গ্রহণও করা যাবে না। অর্থাৎ যেখানে কুতর্ক কেনাবেচা হয় সেটা সাধকের স্থান নয়।
  • অপরে আঘাত পায় এমন কোনো কিছু কেবল কর্মে না মননেও আনা যাবে না।
  • ঋষি পতাঞ্জলির যোগসূত্র শাস্ত্রে অষ্টাঙ্গ মার্গের প্রথম মার্গ ‘যম’-এর যে পঞ্চবিধি আছে। তার প্রথম বিধি হলো অহিংসা। মানে সাধন পথে অগ্রসরের প্রথম বাক্যই হলো অহিংসা।
  • ফকির লালন সাঁইজি সেই কথাই বলেছেন এখানে, আগে নিজেকে তৈরি করতে হবে। যাতে কুতর্ক/হিংসা মনে স্থান না পায়।
  • মনে যাতে জাগে ভক্তি-বিনয় ভাব।
  • মানুষের কাছে ভক্তি-বিনয় ভরে নত হতে পারলেই-নিজেকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করতে পারলে তবেই চিত্তস্থির হয়।
  • আর স্থিরচিত্তেই করা যায় মূল সাধন।
  • সবার আগে প্রয়োজন চিত্তস্থির। তাই অহিংসা থেকে মুক্ত হয়ে মানুষগুরুর কাছে সমর্পণ ভাবই হলো ভাববাদকে বোঝার প্রাথমিক যাত্রা।

ফকির লালন সাঁইজি সকল জ্ঞানের মানুষের জন্যই তার জ্ঞানের ধারা অবারিত রেখেছেন। যে গুরুবাদী ভাবধারাতে সমর্পিত হয়ে গুরুমুখি হবে তার জন্য যেমন পথ বাতলে দিয়েছেন। তেমনি সাধারণ মানুষ যারা চার দেয়ালকেই জগৎ মনে করে তার জন্যও পথের দিশা দিয়েছেন।

যে যার জ্ঞান মতো সেই জ্ঞান বুঝে নিবে। কাউকেই তিনি নিরাশ করেন নি। তাই গুরু সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত সাধনার জগৎ থেমে থাকবে এমন কথা নেই। লালন সকল সময়ই সকল মানুষের জন্যই সমকালীন। শুধু এটুকু মনে রাখতে হবে লালন সাঁইজি মানুষের জন্য জ্ঞান দিয়ে গেছেন।

তাই সেই জ্ঞান তা সে যে স্থারেরই হোক না কেনো, তা গ্রহণ করতে গেলে আগে ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে হবে। মানুষের ঘরে জন্মে নিজেকে মানুষ দাবী করলেই হবে না। জীবে ভালোবাসা দিয়ে-সেবা দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে।

জয়গুরু
।।আলেকসাঁই।।

………………………..
আরো পড়ুন:
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: এক
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: দুই
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি: তিন


লালন ফকিরের নববিধান: এক
লালন ফকিরের নববিধান: দুই

লালন ফকিরের নববিধান: তিন

লালন সাঁইজির খোঁজে: এক
লালন সাঁইজির খোঁজে: দুই


মহাত্মা লালন সাঁইজির দোলপূর্ণিমা
মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজির স্মরণে বিশ্ব লালন দিবস
লালন গানের বাজার বেড়েছে গুরুবাদ গুরুত্ব পায়নি
লালন আখড়ায় মেলা নয় হোক সাধুসঙ্গ
কে বলে রে আমি আমি
ফকির লালন সাঁই
ফকির লালনের ফকিরি
ফকির লালন সাঁই


বিশ্ববাঙালি লালন শাহ্
ফকির লালন সাঁইজির শ্রীরূপ
গুরুপূর্ণিমা ও ফকির লালন
বিকৃত হচ্ছে লালনের বাণী?

লালন অক্ষ কিংবা দ্রাঘিমা বিচ্ছিন্ন এক নক্ষত্র

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!