ভবঘুরে কথা
লালন বলে কুল পাবি না

-মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ

-আপনি কবিতার কথা বলছেন! জানেন প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রে কবিদের কোনো স্থানই রাখে নি। আপনি প্লেটোর নাম শুনেছেন জীবন দা’?

-বাপ! আমার ধারণা প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রে কবিদের স্থান এই জন্য রাখে নাই যে, কাব্য বা শিল্পের মধ্যে যে ভাবনা থাকে তা প্রকাশ পায় ভাবের মধ্য দিয়ে। আর এই ভাব বোঝার জন্য চাই গভীর জ্ঞান। সাধারণ জ্ঞানে এর প্রকৃত অর্থ ধরা দেয় না। এতে সাধারণ জ্ঞানের মানুষ অর্থ না বুঝে ভাবের সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে কল্পনার জ্বাল বুনতে থাকে। কাব্য-গীত অনেক শক্তিশালী মাধ্যমরে বাপ। এগুলো মানুষকে অনেকবেশি প্রভাবিত করে। এতে সাধারণ কথা-শব্দগুলোও অর্থ পাল্টে যায়। যেমন ধরেন ফুলকে ফুল, চাঁদকে চাঁদ, গাছকে গাছ এ হিসেবে মানুষ আর সেই পরিচিত শব্দগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে না।

মানুষ ভাবুক হয়ে যায়। চাঁদকে দেখে আর চাঁদ খোঁজার চেষ্টা না করে প্রেমিকার কথা স্মরণে চলে যায়। আর অভাবে থাকলে সেই চাঁদ হয়ে যায় ঝলসানো রুটি। এতে হয় কি বাপ! চাঁদ মাঝখান থেকে হারিয়ে যায়; মানে মূল যে বিষয়ে আপনি দৃষ্টি দিয়েছিলেন সেখানে স্থির না হয়ে অন্যত্র চলে যান চিন্তায়। স্থিরতা আসে না। প্রজ্ঞাজ্ঞান শূন্য কবিতা আসলেই ভয়াবহ বাপ। তবে যে কাব্যে প্রজ্ঞাজ্ঞান থাকে এবং সেটা বোঝার ক্ষমতা যে মানুষ রাখে তা মানুষকে অনেক উর্ধ্বে নিয়ে যায়। তার তাকে প্রতিটা রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র চিন্তকই ভয় পায়। যে ভাবের সাগরে ডুব দেয় তাকে দিয়ে নয়টা-পাঁচটা জীবনের ছক কষা দুষ্কর।

-হুমম। আপনার কথাটায় যুক্তি আছে কিন্তু আমি তা মানতে পারলাম না। কবিতা তো কবিতাই, তাতে আবার প্রজ্ঞাজ্ঞান বলে কি কিছু হয় নাকি? রাবিশ কথাবার্তা। কবিতা হল নদীর মতো, তার গতিপথ সে পাল্টাবে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে। কবিতা আজ আর কোনো ব্যকরণের মাপকাঠিতে আটকে নেই জীবন দা’।

-প্রত্যেকের নিজস্ব একটা মতামত থাকবে। সেটা থাকাও উচিত। সেটা খারাপ না। তবে সেটাকে আকড়ে থাকাই গোঁড়ামি। একসময় মানুষ জানত না পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। বা ভবিষ্যতে এর আরো গভীর তত্ত্ব আবিষ্কার হতে পারে। এসব কি করে আবিষ্কার হল? এর পেছনে কি কি কারণ তা বিশ্লেষণ না করে আমরা তর্ক জুড়ে দিতে পছন্দ করি। ধরেন একপক্ষ বললো পৃথিবীর সূর্যের চারিদিকে ঘোরে তৎক্ষনাৎ আরেকপক্ষ তার বিপক্ষে যেয়ে তর্ক জুড়ে দেবে। আর তর্ক যখন জমে উঠবে তখন দুইপক্ষ যার জন্য তর্ক করছে তা পুরোপুরি বিশ্বাস না করেও তর্কে জেতার জন্য সর্বপ্রকার চেষ্টা চালিয়ে যাবে; প্রয়োজনে গায়ের জোর মানে পেশী শক্তিও খাটাবে। এটা কোন শুদ্ধ মানুষের আচরণ হতে পারে কি? আপনিই বলেন?

আপনি যা জানেন তাই যে ঠিক তা কে বলেছে? আমি যা জানি তাই কি শেষ কথা বাপ? সবকিছুতেই আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়া কি ঠিক?

-মানে? কি বলতে চান আপনি?

-বেশিভাগ মানুষ আসলে শুনতেই চায় না; কথা বলার আগেই নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। নিজেই প্রশ্ন করে, নিজেই উত্তর দিয়ে দেয়। সবকিছুতে জাজমেন্টাল হওয়াটা কি ঠিক?

-জাজমেন্টাল’ পুরাপুরি বিলাতী শব্দ? বাহ্! তা জাজমেন্টাল হওয়া মন্দের কি?

-বাপ! যারা জাজমেন্টাল স্বভাবের হয় তারা জীবনে যা কিছু দেখে-শিখে-বুঝে সবকিছুর একটা পছন্দ মতো উত্তর নিজে সাজিয়ে মনের মধ্যে রেখে দেয়। এতো বেশি জিনিস মনের মধ্যে রেখে দেয় যে কারো কথা তারা গভীর থেকে শুনতেই পারে না। কিছু একটা শোনার আগেই তারা নিজের মন্তব্য দিয়ে কথা শেষ করে দিতে চায়। এতে তারা আর নতুন কিছু শিখতে পারে না। সবসময় সামনের মানুষটারে শত্রু মনে করে চলে। এটা খারাপ কি ভালো সেটা যার যার নিজের বিবেচনা। কিন্তু জ্ঞানের পথ হইল শুদ্ধতার পথ; এখানে কিছু বলার আগে দশবার ভাবতে হয়।

-আপনি কি শুদ্ধ মানুষ জীবন দা?

-হা হা হা… বাপ হাসাইলেন। শুদ্ধ মানুষ হওয়া কি এতোই সহজ। সে অনেক দীর্ঘ যাত্রা। আমরা কেবল চেষ্টা করতে পারি মাত্র।

-তা আপনি কতটা এগিয়েছেন?

-বেশিদূর না বাপ; এতো পুণ্য করি নাই যে একজনমে এই পথ পারি দিব।

-বলেন কি একজনমে হবে না? তাহলে উপায়?

-সাঁইজি বলছেন,

রাখিলেন সাঁই কূপজল করে
আন্দেলা পুকুরে।।

কবে হবে সজল বরষা
চেয়ে আছি সেই ভরসা।
আমার এই ভগ্নদশা যাবে কতদিন পরে।
এবার যদি না পাই চরণ
আবার কি পরি ফ্যারে।।

নদীর জল কূপজল হয় বিল বাওরে পরে রয়
সাধ্য কি সে গঙ্গাতে যায় গঙ্গা না এলে পরে।
জীবের তেমনি ভজন বৃথা
তোমার দয়া নাই যারে।।

যন্তর পড়িয়ে অন্তর রয় যদি লক্ষ বছর
যন্ত্র কভূ বাজতে না পারে যন্ত্রীক বিহনে।
আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী
সুবোল ধরাও আমারে।।

পতিত পাবন নামটি, শাস্ত্রে শুনেছি খাঁটি
পতিত না ত্বরাও যদি কে ডাকবে ঐ নাম ধরে।
ফকির লালন বলে ত্বরাও গো সাঁই
এই ভব কারাগারে।।

-সাঁইজির গানের অর্থ বোঝা আমার পক্ষে একেবারেই সহজ না জীবন দা। তাই এই গানের বিশ্লেষণে যাচ্ছি না। যদি অনুমতি দেন একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করবো জীবন দা’?

-বলেন বাপ।

-আপনি কি সংসার করেছেন? থাক এই প্রশ্নটা না করি, প্রশ্ন হলো সান্ন্যাসীরা সংসার করে না, ঘর বাঁধে না, ব্রহ্মচারী হয় এর কারণ কি বলবেন? সংসারি হয়ে কি সাধন-ভজন করা যায় না?

-বাপ! যে পারে সে সবই পারে। তয় সকলে কি আর সব পারে বাপ। যাদের উদ্দেশ্য অনেক উপরে উঠার সে তার ওজন এমন রাখতে চায় যাতে উপরে উঠতে কষ্ট না হয়। তাই না? তেমনি যারা সাধনার ঊর্ধ্বে উঠতে চায় তারা পিছুটান রাখতে চায় না তাতে সাধনায় ব্যাঘাত ঘটে।

দলবল নিয়ে গেলে অনেক দূরের পথ যাওয়া যায় কথা সত্য; কিন্তু একা গেলে উদ্দেশ্যে দ্রুত পৌঁছানো যায়। সাধনায় দ্রুততা বা শর্টকাটের কোনো পথ নাই এই কথা যেমন সত্য; তেমনই সাধনায় সাধক যখন ভেতর থেকে ডাক পায় আনন্দে চিত্ত নেচে উঠে তখন কারো জন্য আর অপেক্ষা করতে পারে না। বেড়িয়ে পরে একাকী পথে। তাই সংসার করা হয় না।

তবে পরিবার যদি সাধন পথ মেনে নেয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। সাধন অনেক সহজ হয়ে যায়। কিন্তু সকলে তা মানে না, তখনি মানুষিক যন্ত্রণা শুরু হয়। সংসারেও অশান্তি হয়। তাই অনেক সাধকরা সংসার করে না। তবে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বাবা তো সংসার করেও সাধন করে গেছেন। গেছেন না বাপ? তবে যা বললাম, এগুলি সবই উপরি উপরি কথা। সাধনার ভেদ তো গুরুর কাছে সমর্পন না হইলে বলা যায় না। তাই বাইরে থেকে উপরি উপরিই বুঝতে হয়।

-আচ্ছা আপনারা সবকিছুও এতো আড়াল করে রাখেন কেন? আমি আগেও শুনেছি কোন কিছু জিজ্ঞাসা করলেই বলেন দীক্ষা না নিলে আর বলা যাবে না। এটা আপনারা করেন কেন? সিনেমার ট্রেলারের মতো কিছুটা বলে আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়ে বলেন বাকিটা রুপালি পর্দায়। মানে পকেটের টাকা খরচ করে এবার দেখো। এটাই কি তবে সাধকদের ব্যবসা জীবন দা?

-ভালো বলছেন বাপ। ব্যবসা। হ বাপ ব্যবসাই তো। ব্যবসাই তো।

-আপনি কি রাগ করলেন নাকি?

-না বাপ রাগ করি নাই। আপনার কথাটা ভাবতেছি, আসলেই তো তাই। আপনি ভুল বলেন নাই। সিনেমাতো বানানোই হয় সিনেমা হলে যায়া দেখার জন্য, তার সকল কারিগরি হইল সিনেমা হলে গিয়া বাত্তি বন্ধ করে কথাবার্তা না বলে চুপচাপ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে দেখা। সেটাই উদ্দেশ্য। আর সেভাবে দেখলেই তার পূর্ণ স্বাদ আস্বাধন করা সম্ভব।

টিভি বা মোবাইলে সিনেমা দেখা যায় সত্য; তবে সেটা আর সিনেমা থাকে না বাপ। সেটা হইয়া যায় নাটক। আপনার যখন খুশি দেখলেন, দেখতে দেখতে কাজ করলেন-আড্ডা দিলেন-খাত খাইলেন। সেটাতে মজা পাওয়া যায় না, তা না। কিন্তু সিনেমার স্বাদ নিতে হইলে হলে যেয়েই দেখতে হয় বাপ। তেমনি গুরুর বাণী নিতে হইলে আগে সমর্পণভাব মনে আনতে হয়।

সিনেমার মার্কেটিং-এর জন্য নানা বিজ্ঞাপন করা হয় যাতে লোক দলে দলে যেয়ে সিনেমা দেখে। তবে বাপ সাধুরা কিন্তু তা করে না। বরং আগ্রহীরা নিজেরাই আসে-জানতে চায়। সাধুরাও বলে যতটা প্রকাশ্যে বলা যায়। বাকিটা বলা যায় না এই কারণে যে; সাধনা বোঝার ক্ষমতা সকলের সমান না। একেকজনের জ্ঞান একের রকম। তাই সরল করে বলা যায় না।

সাধককে প্রথমে শিষ্যের জ্ঞানকে একটা নির্দিষ্ট স্থিতিতে আনতে হয়। তারপর সেখান থেকে যাত্রা শুরু করতে হয়। কিন্তু আগেই আপনাকে ভেদের কথা বলে দিলে আপনি যে বুঝতে পারবেন না তা নয়, কিন্তু শ্রদ্ধা-ভক্তি তৈরি হবে না, তাতে আপনার যেমন সেই বিদ্যা কাজে দিবে না; তেমনি আপনি যে জনে জনে বলে বেড়াবেন তাদেরও কাজে দিবে না। মাঝখান থেকে একটা সত্য জ্ঞান বিভ্রান্তের জ্ঞান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এতে জ্ঞানের অমর্যাদা হয়গো বাপ। আর সত্যকে অমর্যাদা করতে নাই। যারা করছে তারা টিকে না রে বাপ।

-মানে আপনি বলতে চান অভিশাপ লাগে? যত্তসব কু-সংস্কার। রাবিশ। স্বীকার করছি আপনি বেশকিছু ভালো ভালো কথা বলছেন কিন্তু মাঝে মধ্যে এমন সব কু-সংস্কার আচ্ছন্ন কথা বলছেন তা আধুনিক মানুষের কাছে হাস্যকর মনে হবে এতে কোনো সন্দেহ নাই। আপনি আমার মনে যে জায়গাটা তৈরি করছেন তা সব সময় এক জায়গায় থাকছেন না জীবন দা’ মাঝেমধ্যেই তার পতন হচ্ছে।

-হা হা হা। বাপ আপনি চটছেন কেন? সংস্কার আর কু-সংস্কার কি বাপ আপনি আলাদা করতে পারেন?

-মানে কি? আপনি বলতে চাচ্ছেন আমি সংস্কারকে কু-সংস্কার মনে করি? আমি এতোটাই বোকা?

-বাপ আপনি কতটা বোকা বা কতটা চালাক সে বিবেচনা আপনার। সে কথা বলার আমি কেউ না। তবে আধুনিকতার নামে অনেক সংস্কারকে আমরা কু-সংস্কার বানিয়েছি। এটা আপনি বিশ্বাস না করলেও আমি বলবো। আসলে এটা আমাদের দোষও না। দোষ আমাদের না জানতে চাওয়ার প্রবণতা। বা ঘটনার পেছনের কারণকে না জানতে চাওয়ার চেষ্টা। আমি কখনোই বলছি না সকল কু-সংস্কারই সংস্কার। কিন্তু অনেক সংস্কারকেও আমরা কু-সংস্কার বানিয়েছি।

-মানে কি? বলেন তো দুই/একটা। আমার মা সন্ধ্যার সময় ঘর ঝাড়ু দিয়ে বাইরে ময়লা ফেলতে দিত না, বলত রাতে নখ কাটলে এই হবে সেই হবে, হোঁচট খেলে বসে থাকতে হবে আগডুম বগডুম আরো কত কি। এসবের যে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই তা আমরা সকলেই জানি। এসবই সেকেলে ভাবনা মাত্র।

-বাপ! এই বৃত্তাকার পৃথিবীর সবকিছুই চলে চক্রাকার। কোনো কিছুই নতুন বা পুরাতন না। নতুনরা একসময় পুরাতন হয় আর পুরাতনরা হয় নতুন। চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে সবই ফিরে ফিরে আসে। সেকেলে বলে কিছু নাই।

-কিন্তু কু-সংস্কার?

-বাপ! প্রত্যেকটা সংস্কার গড়ে ওঠার পেছনে একটা ঘটনা-উদ্দেশ্য ছিল সেটা সৎ না অসৎ তা ভিন্ন কথা। কিন্তু কি কারণে সংস্কারটা প্রচলিত হয়েছিল সে কারণটা বুঝতে হয় একটু গভীরে প্রবেশ করে। যদি তা করা যায় তাহলে আপনি নিজেই পাবেন এর সমাধান। সব সংস্কারই যে ভালো তা বলছি না। তবে বেশিভাগের পেছনের গল্পটা আমরা জানি না বলে সেগুলোকে কু-বানিয়ে দিয়েছি।

আসলে বাপ ব্রিটিশরা আমাদের শিখিয়েছে যে ভারতবর্ষের যা কিছু শিক্ষা সবই বাতিল মাল। আমাদেরকে হাতে ধরে শিখিয়েছে নিজেদের নিজস্বতাকে ঘৃণা করতে। আমরা পরবর্তীতে তাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেই এ অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছি যা আজো চলছে। তাই আমরা এখনো আমাদের নিজস্বতাকে পূর্ণরূপে জানতে শিখিনি। প্রথমবার আর্যরা যা করেছিল পরে তা করেছে ব্রিটিশরা।

-তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা খারাপ? আপনি জানেন ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার কারণেই আজ আমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছি? তা না হলে আজও আমরা কমসে কম দুইশ বছর পেছনে থাকতাম।

-বাপ! আমাদের প্রাচীন জ্ঞান সম্পর্কে আপনার ধারণা নাই তাই সহজে এই কথা বলতেছেন। আমাদের মুণি-ঋষি-আচার্য-বুদ্ধ-সাধক-বাউলরা যে জ্ঞান রেখে গেছে তা দিয়ে পৃথিবীর তামাম জ্ঞান হাজারবার কেনা বেচা যাইব।

-হা হা হা। জীবন দা আপনি যা বলেন না, সত্যিই হাস্যকর। আপনি ভারতে একজন সক্রেটিস দেখান তো পারলে বা একজন মাইকেল এ্যাঞ্জেলো বা ভিঞ্চি। মার্ক্স-লেনিন-গ্যালেলিও-আইনিস্টাইন-নিউটন আছে কেউ?

-বাপ! এতো গভীরে যাইতে হইব না; এক লালন ফকিরের ভেদ পরিষ্কার করেন তাইলেই বুঝবেন, কতটা গভীরে কতটা দিব্য জ্ঞান থেকে তিনি কথা বলে গেছে। আপনি ধারণাও করতে পারবেন না, আমাদের মুণি ঋষিরা কি সব জ্ঞান রেখে গেছেন। ইউরোপীয়রা নিজেদের মার্কেটিং করছে, আমাদের মুণি ঋষি শিল্পীরা তা করে নাই।

আপনি শালবন বিহারের বজ্রযোগীনি মূর্তিটা দেখেছেন? বা সূর্য মূর্তি? সারা ভারতবর্ষ লাগবে না, বাংলা অঞ্চলের প্রাচীন বৌদ্ধমূর্তিগুলোও যদি আপনি ভালোভাবে দেখেন তাহলেও আপনার ইউরোপীয় আর্টিস্টদের যে তালিকা দিলেন তাদের চেয়ে এই সব নাম না জানা অজ্ঞাত শিল্পীদের কোনো অংশ কম মনে হবে না। আমাদের শিল্পীরা নিজেরে প্রচার করে নাই-প্রকাশ করে নাই; কেবল শিল্প করে গেছে। আমাদের মুণি ঋষিরাও তেমনি জ্ঞান অর্জন করেছে আর তা দিয়ে গেছে সকলের জন্য।

সাধক বাউল সাধুগুরুরা জ্ঞান অর্জন করে যোগ্য পাত্রকে তা দিয়ে যাবে বলে। কেউ লোক ডেকে ডেকে বলে নাই আসো জ্ঞান নিয়া যাও। আসো আমার ভক্ত হও। আসো আমার সেবা করো। আপনি বলতে পারেন জ্ঞান তো সকলরে বিলায়ে দেয়া উচিত; তা ধরে রাখার জিনিস না। তবে তারা তা কুক্ষিগত করে রাখে কেনো?

আসলে ব্যাপারটা কিন্তু তা না। তারা এই জ্ঞান অর্জনই করে বিলায়া দিবে বলে কিন্তু যোগ্য পাত্র পায় না বলে দিতে পারে না। এই জ্ঞানগ্রহণ করতে হলে যে মানুষিক প্রস্তুতি লাগে তা সকলের থাকে না। তাই সকলে এটা চায়ও না। আর যাদের ভেতরে জানার ইচ্ছা নাই, অনুসন্ধিৎসু মন নাই তারা এই জ্ঞান দিয়া করব কি?

এই যেমন আপনার হাতে আজ সময় আছে বলে শুনছেন; অথচ এখান থেকে চলে যাওয়ার পরই হয়ত এসব আর ভালো লাগবে না; আর হয়তো কোন আগ্রহও থাকবে না। তাহলে আপনাকে এই ভেদের কথা বলা কি ঠিক হবে? আপনিই বলেন? আপনি শ্রদ্ধা-ভক্তি দিয়ে তা করতে পারবেন? পারবেন জগতের সকল মানুষরে ভালোবাসতে? পারবেন নিষ্কাম কর্ম করতে? কোনো কিছুর প্রাপ্তির আশা না করে কাজ করে যেতে? পারবেন পূর্ণ ভক্তি দিয়ে সেবা করতে? বলা সহজ বাপ, করার জন্য ইচ্ছা লাগে-চূড়ান্ত ইচ্ছা; তা সকলের থাকে না। সাঁইজি বলছে-

দেল দরিয়ায় ডুবে দেখ না
অতি অজান খবর যাবে জানা।।

আলখানার শহর ভারি
তাহে আজব কারিগরি
বোবায় কথা কয়, কালায় শুনতে পায়,
আঁধেলাতে পরখ করছে সোনা।।

ত্রিবেনীর ঐ পিছল ঘাটে, বিনা হাওয়ায় মৌজা ছোটে
ডওরায় পানি নাই, ভিটা ডোবে তাই
শুনলে কি পাবি এ কারখানা।।

কবার যোগ্য নয় সে কথা
সাগরে ভাসে জগৎ মাতা
লালন বলে মার উদরে,
পিতা জন্মে, পত্নীর দুদ্ধ খেল না।।

-আপনি কি বলতে চাইছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি কি সূক্ষ্মভাবে ইঙ্গিত করছেন আপনার কাছ থেকে দীক্ষা নিতে? সেসব আমি করব না আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। তাই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে টোপ দিয়ে লাভ হবে না জীবন দা।

-আমি এখনো এতোটা উপযুক্ত হই নাই বাপ যে কাউরে দীক্ষা দিব। আমি তো ছাত্র মাত্র। শিখতেছি বলতে পারেন। আপনি জানতে চাইলেন তাই আমি যতটা জানি তা দিয়া বুঝাবার চেষ্টা করলাম মাত্র। আমি মূর্খ মানুষ আমার ভুত-ত্রুটি হইলে ক্ষমা করবেন-মনে কষ্ট নিবেন না বাপ।

-জীবন দা’ আমি যাই বলি না কেন আপনাকে ঠিক মূর্খ বলতে পারছি না। তবে আপনি নিজেকে অনেক বেশি আড়াল করে রাখতে পেরেছেন এটাও স্বীকার করতে আপত্তি নাই। আচ্ছা এসব কি অন্যকে আকর্ষণ করার জন্য সচেতনভাবে করা নাকি ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে? নাকি এটাও সাধনার অংশ?

-চোখের সামনে বই খোলা থাকলেই কি আর তা থেকে শিক্ষা নেয়া যায়? ডাক্তারি বই পড়লেই কি আর ডাক্তার হওয়া যায়? কারো সম্পর্কে জানতে পারলেই কি তাকে চেনা যায়? কাউকে চেনার জন্য তার নাম কি, বাপের নাম কি, বংশ কি, গ্রামের বাড়ি কোথায়, কি করে, কোথায় যায়, কোথায় থাকে এসব তথ্য জানা নিছকই স্থূল ব্যাপার; এ দিয়ে কি আদৌ কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায় আসলেই?

-যাবে না কেন? এসব তথ্য পেলে মানুষের সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তো করা যায়। আলোচনা এগিয়ে নেয়া যায়।

-আসলেই কি যায়?

-জীবন দা’ আপনি এই যে প্রশ্ন শেষ করে থেমে থাকেন, চোখ দুটি স্থির হয়ে থাকে তখন না একটা ভ্রান্তি মতো হয়। এতোদিনের জানা সিদ্ধান্তগুলো কোথায় জানি নড়েচড়ে যায়। উত্তরগুলো সম্পর্কে আমি নিশ্চিত কিন্তু আপনার কথা বলার স্বর বা চোখের ভাষায় কেন যেন সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়। এটা কি আপনি ইচ্ছা করে করেন?

যদি করে থাকেন তবে আপনি তাতে বেশ অনেকটাই সফল কারণ আমি পুরোপুরি সম্মোহিত না হলেও মুগ্ধ তো বটেই। তা না হলে সকাল থেকে দুপুর পার হয়ে যাচ্ছে এখনো আমি আপনার সাথে আড্ডা দিয়েই যাচ্ছি? রাস্তায় জ্যাম কমলো কিনা সেটার খোঁজও নেই নি একবারও। ভাবা যায়? আপনি জটিল জিনিস। আপনাকে মশাই কালটিভেট করতে হচ্ছে।

আরেকটা কথা আপনার ঠিকানা কি? কোথায় পাওয়া যাবে পরবর্তীতে আপনাকে? মানে আপনি থাকেন কোথায়? পার্কে! আপনি ঘুমান কোথায় জীবন দা’? প্রতিদিন একজায়গায় ঘুমান? মানে আজ থাকবেন কোথায়? হেয়ালি করে বলবেন না তিনি যেখানে ব্যবস্থা করে এই টাইপের উত্তর শুনতে চাই না … সরাসরি বলেন।

-কি বলি বলেন তো।

-মানে কি? আসলেই আপনার কোনো ঠিকানা নাই?

-একেবারে নাই তা বলা যাবে না। পরিচিত কিছু মানুষজন আছে তারা মাঝেমধ্যে ধইরা নিয়া যায় তাদের থাকার জায়গায় থাকি। এই শহরে অনেক মাজার-দরগা আছে। যখন যেখানে সুযোগ হয় সেখানে থাকে। পার্কেও মাঝেমধ্যে ঘুমাই। পিজি হাসপাতালের বারান্দায়ও কয়েকদিন ঘুমাইছি।

পিজি হাসপাতালের এক কর্মচারী আছে নাম সিরাজ মিঞা। উনি এইবার আর ছাড়ে নাই; আজিজ মার্কেটের উপরে তার একটা থাকার জায়গা আছে। সেখানেই আছি এইবার ঢাকায় আইসা। সে ছাড়ে না।

-বাহ্ এটা ভালো একটা ঠিকানা, থাকলে খুঁজে পাওয়া যাবে। তা আপনি মোবাইল ব্যবহার করেন জীবন দা’?

-না বাপ। একজন একটা দিয়েছিল মানুষজন বড় ত্যক্ত করে তাই আর সাথে রাখি না।

-তাহলে আপনাকে আবার খুঁজে পাবো কিভাবে?

-খুঁজে পাওয়া কি দরকার আছে বাপ?

-সত্যি কথা বলতে গেলে সেই হিসেবে দরকার নেই। কিন্তু আপনাকে আমার ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে। আপনাকে কালটিভেট করতে হতে পারে। আমি মার্কেটিং-এর মানুষ সকলের সাথে যোগাযোগের পথ খোলা রাখি। কখন যে কাকে কোন কাজে দরকার হয় তা তো বলা যায় না। বলেন আপনার খোঁজ কি করে পাব?

-যাওয়ার সময় সিজারের নাম্বারটা নিয়া যাবেন, সেই বাপজিকে বললে আমি সংবাদ পাব।

-তাও ভালো আমি ভেবেছিলাম আপনি বলবেন মনে মনে ডাকবেন আমি চইলা আসবো। হা হা হা।

-হা হা হা…

হাসতে হাসতে জীবন সাধু গাইতে শুরু করলেন-

জানবো এই পাপী হতে
যদি এসেছ হে গৌর জীব ত্বরাতে।।

নদীয়া নগরে যত জন
সবারে বিলালে প্রেমরত্নধন।
আমি নরাধম না জানি মরম
চাইলে না হে গৌর আমা পানেতে।।

তোমারই সুপ্রেমের হাওয়ায়
কাঠের পুতুল নলিন হয়।
আমি দীনহীন ভজন বিহীন
অপার হয়ে বসে আছি কুপথে।।

মলয়া পর্বতের উপর
যত বৃক্ষ সকলই হয় সার।
কেবল যায় জানা বাঁশে সার হয়না
লালন প’লো তেমনি প্রেম শূন্য চিতে।।

(চলবে…)

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

২ Comments

  • limon , শনিবার সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৯ @ ৮:০৯ অপরাহ্ন

    ক্রমেই গভীরে যাচ্ছে…
    পড়ে বেশ উপকৃত হচ্ছি।
    জয় গুরু

  • উজ্জ্বল , রবিবার নভেম্বর ৩, ২০১৯ @ ৭:৪২ অপরাহ্ন

    আমি এতো টা উপর্যুক্ত হয়নি,মন্তব্য করার

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!