শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী

লোকনাথ বাবার লীলা : পাঁচ

দূর বিপদে পরে লোকনাথ বাবাকে একমনে স্মরণ করলেই তাঁর আত্মাটি দেহ ছেড়ে সেইখানে ছুটে গিয়ে তাকে রক্ষা করত। তখন তাঁর দেহটি নিশ্চল-নিস্পন্দ হয়ে পরে থাকত, দেহে প্রাণের কোন লক্ষণও দেখা যেত না। তারপর আত্মাটি দূর থেকে ফিরে এসে দেহে ঢুকতেই আবার সচল ও প্রাণবন্ত হত।

ভক্তদের মধ্যে একজন বলল- আপনি এরকম করলেন কেন? লোকনাথ বাবা বললেন- আমার এক ভক্ত স্টীমারে করে নদীপথে বক্সবাজার যাবে, সামুদ্রিক ঝড়ে তার স্টীমারটি সমুদ্রগর্ভে ডুবে যাবার উপক্রম হতে, সে বিপদে পরে আমাকে ডাকল। সেইজন্য ঝড়টাকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দিলাম, স্টীমারটি রক্ষা পেল।

এই ঘটনার তিনদিনপরে সেই ভক্ত আশ্রমে এসে সেই ঘটনার কথা সব বলল, তারপর বাবার চরণ ধরে আকূলভাবে কাঁদতে কাঁদতে বলল, বাবা, তুমি সত্যিই সর্বব্যাপী।

এই ভক্তের নাম বিহারীলাল মুখোপাধ্যায়। ঢাকা জর্জকোটের উকিল।

কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী ছিলেন বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর শিষ্য। গুরুর কৃপায় সাধনার পথে বেশ কিছুটা এগোতে পেরেছেন। কিছুদিন ধরে পেটের শূলবেদনায় তিনি খুবই কষ্ট পাচ্ছেন। এই বেদনা তাঁর সাধনার পথে বাধা সৃষ্টি করছে, ঠিকমত মন:সংযোগ করতে পারছেন না।

একবার বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী মহাশয় দ্বারভাঙ্গায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পরেন। প্রাণসংশয় হয়ে পরে, বাঁচার কোনো আশা নেই। গোস্বামী মহাশয়ের শিষ্য শ্যামাচরণ বক্সী নিরুপায় হয়ে বাদীর আশ্রমে চলে এলেন। ব্রহ্মচারী বাবার চরণ ধরে গোস্বামী মশাইয়ের প্রাণভিক্ষা চাইলেন।

প্রথমে লোকনাথ বাবা বললেন- কত আয়ু আর তাকে দেব?

শ্যামচরণ বাবার চরণে ধরে নিজের আয়ুর বিনিময়ে গুরুর প্রাণভিক্ষা চাইলেন। তখন শ্যামাচরণবাবুর গুরুভক্তির কথা চিন্তা করে বাবা গোস্বামীজীর রোগ নিরাময়ের ভরসা দিলেন। গোস্বামীজীকে দ্বারভাঙ্গা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

বাবা বললেন- শ্যামাচরণ, তুই চলে যা; আমি দ্বারভাঙ্গা হাসপাতালে যাচ্ছি।

এই বলে তিনি তাঁর ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে যোগাসনে বসলেন। বাইরে আশ্রমের লোকদের বলে গেলেন, আমি নিজে যতক্ষণ ঘরের দরজা না খুলি, ততক্ষণ বন্ধ দরজায় কেউ যেন ঘা না দেয়।

এই সময় ঢাকায় বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর অসুস্থতার খবরে তাঁর শ্বাশুড়ী মাতা ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে দ্বারভাঙ্গা যাবার জন্য রওনা হল। গোয়ালন্দ যেতে যেতে তিনি যখন তাঁর জামাতার আসন্ন মৃত্যুর কথা ভাবছিলেন, তখন ট্রেনের জানালা দিয়ে আকাশের দিকে নজর পরতেই দেখলেন, বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী আকাশ পথে বায়ুবেগে চলেছেন।

এদিকে লোকনাথ বাবা মুহুর্তমধ্যে দ্বারভাঙ্গা হাসপাতালে পৌঁছেই দেখলেন, বিজয়কৃষ্ণ মৃত্যুশয্যায় শায়িত আর তাঁর ভক্তগণ চারদিকে বসে তাঁকে হরিনাম শোনাচ্ছেন। ঠিক সেই মুহুর্তে লোকনাথ বাবা ঘরে ঢুকে বললেন- বিজয়কৃষ্ণ! এই দেখ, আমি এসেছি। এই বলে তার হাত ধরে হেঁচকা টানে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বললেন- তুই ওঠ, ভাল হয়ে গিয়েছিস। এই বলেই তিনি অন্তর্হিত হলেন, আর তাঁকে দেখা গেল না। বিজয়কৃষ্ণ সঙ্গে সঙ্গে রোগমুক্ত ও সুস্থ হয়ে উঠলেন।

কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী ছিলেন বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর শিষ্য। গুরুর কৃপায় সাধনার পথে বেশ কিছুটা এগোতে পেরেছেন। কিছুদিন ধরে পেটের শূলবেদনায় তিনি খুবই কষ্ট পাচ্ছেন। এই বেদনা তাঁর সাধনার পথে বাধা সৃষ্টি করছে, ঠিকমত মন:সংযোগ করতে পারছেন না।

একদিন তাই শূলবেদনার যন্ত্রণা নিয়ে প্রতিকারের জন্য বারদীত ব্রহ্মচারী বাবার আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখেই বাবা জিজ্ঞাসা করলেন- কিরে, তুই শূলবেদনায় খুব কষ্ট পাচ্ছিস, তাই না?

কুলদানন্দ অনেকক্ষণ ভাববার পর বললেন- আমি রোগমুক্তি চাই না, জীবন ও জন্ম হতে মুক্ত হতে চাই আমি। এখন রোগমুক্ত হয়ে ভোগ শেষ করার জন্য আবার জীবনে আবদ্ধ হতে চাই না। তাবে সাধনজীবনে যাতে আমি চরম উন্নতি লাভ করতে পারি, রোগ-যন্ত্রণা যাতে আমার সাধনাতে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, আপনি দয়া করে সেই উপায় বিধান করুন।

কথাটা শুনে অবাক হয়ে গেলেন কুলদানন্দ। তাঁর রোগের কথা কিছু বাবাকে না জানালেও তিনি যোগাসনে সে কথা জানতে পেরেছেন। সত্যিই তিনি সর্বজ্ঞ, সত্যিই অন্তর্যামী। বিস্ময়ের ঘোর কাটলে কুলদানন্দ বলল- হ্যাঁ বাবা, আমি শূল বেদনায় খুবই কষ্ট পাচ্ছি।

লোকনাথ বাবা বললেন- তুই যদি এ রোগের হাত থেকে মুক্ত হতে চাস, তো আমাকে বল।

কুলদানন্দ বললেন, আপনার যদি কৃপা হয়, তবে এ রোগ-যন্ত্রণা থেকে আমাকে মুক্ত করে দিন।

লোকনাথ বাবা মহাশক্তিধর মহাপুরুষ। তিনি তাঁর অলৌকিক যোগ-শক্তিবলে বহু রোগার্ত ব্যক্তির রোগ সারিয়ে থাকেন। কিন্তু কুলদান্দ সাধারণ মানুষ নন, তিনি ব্রহ্মচারী; সাধনার উচ্চস্তরে উপনীত হতে চান। তিনি পুনর্জন্ম চান না; তাই লোকনাথ বাবা তাঁকে বললেন- আমি তোর রোগ সারিয়ে দিতে পারি। উঠোনের ঐ বেলগাছের তলার একটু মাটি খেয়ে তা পেটে মাখলেই তোর রোগ সেরে যাবে, কিন্তু ভোগ শেষ হবে না।

ভোগ শেষ করার জন্য আবার তোকে জন্ম নিয়ে পৃথিবীতে আসতে হবে মৃত্যুর পর। এখন তোকে ভেবে ঠিক করতে হবে- এই দেহেই ব্যথা ভোগ করে শেষে সাধনার দ্বারা মুক্ত হবি, না এ জীবনে রোগমুক্ত হয়ে ভোগ শেষ করার জন্য দেহ ধারণ করে আবার আসবি?

কুলদানন্দ অনেকক্ষণ ভাববার পর বললেন- আমি রোগমুক্তি চাই না, জীবন ও জন্ম হতে মুক্ত হতে চাই আমি। এখন রোগমুক্ত হয়ে ভোগ শেষ করার জন্য আবার জীবনে আবদ্ধ হতে চাই না। তাবে সাধনজীবনে যাতে আমি চরম উন্নতি লাভ করতে পারি, রোগ-যন্ত্রণা যাতে আমার সাধনাতে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, আপনি দয়া করে সেই উপায় বিধান করুন।

কুলদানন্দের কথায় সস্তুষ্ট হলেন বাবা লোকনাথ। তিনি তাঁর মাথায় হাত রেখে আর্শীবাদ করলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পেটের যন্ত্রণা কমে গেলে। সে যন্ত্রণা সেদিন থেকে তাঁর সাধনায় আর কোনও বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারেনি।

<<লোকনাথ বাবার লীলা : চার ।। লোকনাথ বাবার লীলা : ছয়>>

………………………
সূত্র:
শ্রীযামিনী কুমার দেবশর্ম্মা মুখোপাধ্যায়ের ধর্ম্মসার সংগ্রহ গ্রন্থ থেকে।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

…………………
আরও পড়ুন-
লোকনাথ বাবার লীলা : এক
লোকনাথ বাবার লীলা : দুই
লোকনাথ বাবার লীলা : তিন
লোকনাথ বাবার লীলা : চার
লোকনাথ বাবার লীলা : পাঁচ
লোকনাথ বাবার লীলা : ছয়
লোকনাথ বাবার লীলা : সাত
লোকনাথ বাবার লীলা : আট
লোকনাথ বাবার লীলা : নয়
লোকনাথ বাবার লীলা : দশ
লোকনাথ বাবার লীলা : এগারো
লোকনাথ বাবার লীলা : বারো
লোকনাথ বাবার লীলা : তের
লোকনাথ বাবার লীলা : চৌদ্দ
লোকনাথ বাবার লীলা : পনের
লোকনাথ বাবার লীলা : ষোল
লোকনাথ বাবার লীলা : সতের
লোকনাথ বাবার লীলা : আঠার
লোকনাথ বাবার লীলা : উনিশ
লোকনাথ বাবার লীলা

……………..
আরও পড়ুন-
লোকনাথ ব্রহ্মচারীর উপদেশ : এক
লোকনাথ ব্রহ্মচারীর উপদেশ : দুই
লোকনাথ ব্রহ্মচারীর উপদেশ : তিন
লোকনাথ ব্রহ্মচারীর উপদেশ : চার
লোকনাথ ব্রহ্মচারীর উপদেশ : পাঁচ
লোকনাথ ব্রহ্মচারীর উপদেশ : উপসংহার

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!