মতুয়া সংগীত

শ্রীহীরামন গোস্বামী

হীরামন গোস্বামীর পদুমা ও কালীনগর লীলা
পয়ার

শ্রীহীরামন গোস্বামী পদুমা গ্রামেতে।
আসিলেন ফেলারাম জীবিত থাকিতে।।
বিকালে এল গোঁসাই বিশ্বাসের বাসে।
গোঁসাই দেখিতে লোক বহুতর আসে।।
পার্শ্ববর্তী লোক সব পুরুষ বা নারী।
আসে যায় সবে কয় বলে হরি হরি।।
কহিলেন ফেলারাম বিশ্বাস কুশাই।
কৃতার্থ হইনু অদ্য মোরা দুটি ভাই।।
ফেলারাম কহিলেন কুশাইর স্থানে।
গোঁসাই এসেছে কিছু লুঠ দেও এনে।।
আগমনে সংকীর্তন আরম্ভিল সবে।
যাবার বেলায় এরা লুঠ নিয়া যাবে।।
আনাইল বাতাসা হরির লুঠ দিতে।
রাখিল কীর্তন মাঝে আনন্দ করিতে।।
লেপন করিয়া ঠাই আসন সাজিয়ে।
তুলসী, কুসুম, আসনের পর দিয়ে।।
উঠিল পরমানন্দ কীর্তনের রোল।
ঘুরিয়া ফিরিয়া সবে বলে হরিবোল।।
কীর্তনের মাঝে বসি হাসিছে গোঁসাই।
ঝুঁকে পদ লুঠে প’ল স্মৃতি জ্ঞান নাই।।
স্বরূপের জ্যেষ্ঠ পুত্র কাঙ্গালী মণ্ডল।
গলে বস্ত্র করজোড়ে কহে স্তুতি বোল।।
আপনি যে উলঙ্গ উন্মত্ত নাম গানে।
হরি লুঠে পদ লাগে ভয় হয় মনে।।
কথা শুনি লুঠ পানে করে দৃষ্টিপাত।
পদটান দিতে বাধ্য হ’ল অকস্মাৎ।।
হীরামন বলে মোর হরি সর্বময়।
অনলে অনিলে জলে স্থলে শূন্যে রয়।।
বল শুনি তবে পদ রাখি কোনখানে।
তোরা পদ রাখ হরি নাই যে স্থানে।।
লুঠ হরি, পদ হরি, রাখিব কোথায়।
এত বলি দুটি পদ রাখিল মাথায়।।
ক্রমে মহাভাবে তনু মন শিহরিল।
চিত হ’য়ে কুষ্মাণ্ডের মত পড়ে গেল।।
কুম্ভকার চক্রাকার লাগিল ঘুরিতে।
এই পদ কোথা রাখি লাগিল বলিতে।।
পদ রাখিয়াছি আমি হরিলুঠ স্থানে।
লোকে মন্দ বলে কার্য মন্দ সে কারণে।।
হরি ছাড়া স্থান আমি পাইব কোথায়।
কোথায় রাখিব পদ না দেখি উপায়।।
সূক্ষ্ম জ্ঞান ভাব মোরে নাহি দিল হরে।
কি উপায় করি তোরা বলে দে আমারে।।
হরি ছাড়া স্থান তোরা দেখায়ে দে ভাই।
কোন স্থানে পদ রাখি ওঢ়াকাঁদি যাই।।
কাঙ্গালী হইয়া ভীত পড়িল কাঁদিয়ে।
ফেলারাম কুশাই কেন্দেছে দাঁড়াইয়ে।।
রায়চাঁদ রায় পুত্র কোদাই নামেতে।
পদ তলে প’ল ঢলে কাঁদিতে কাঁদিতে।।
সবে হরি হরি বলে করে কাঁদাকাঁদি।
হীরামন কহে ভক্ত হৃদি ওঢ়াকাঁদি।।
তুলসী কানন, পদ্ম বন সংকীর্তন।
সেই স্থানে হরি বিরাজিত সর্বক্ষণ।।
বিধির নির্মিত পদ বল কোথা রাখি।
আমি বোকা হরি ছাড়া স্থান নাহি দেখি।।
আমি বোকা আর বোকা ছিল বৃকোদর।
মল ত্যাগ না করিল দ্বাদশ বৎসর।।
নামাইয়ে পদ দুটি উঠে লম্ফ দিয়ে।
সংকীর্তন মাঝে লুঠ দিল লুটাইয়ে।।
প্রেমে মত্ত হ’য়ে হ’ল সেই নিশি ভোর।
মৃত্যুঞ্জয় সঙ্গে এল সে কালীনগর।।
তথা এসে বাল্য সেবা নিলেন গোঁসাই।
কহিছেন পুনঃ আমি পদুমায় যাই।।
প্রহরেক কালীনগরের বাড়ী বসে।
উলঙ্গ হইয়া জলে ঝাঁপ দিলে শেষে।।
কালীনগরের নদী পার হইলেন।
উত্তরাভিমুখে পদুমায় চলিলেন।।
তারক শ্রীমৃত্যুঞ্জয় দিলেন সাঁতার।
পিছে পিছে চলিলেন আনন্দ অপার।।
পিছে পিছে নেচে গেয়ে দুইজন চলে।
ঢেউ লাগে কালীনগরের নদীকূলে।।
পদুমায় চলিলেন ফেলারাম বাটী।
পশ্চাতে তারক মৃত্যুঞ্জয় এই দুটি।।
সাদরে আসনে হীরামনে বসাইলে।
শ্রীচরণ পাখলিল দু’নয়ন জলে।।
মুক্তকেশী হ’য়ে ফেলারামের রমণী।
কেশদ্বারা পাদপদ্ম মুছালেন তিনি।।
গোস্বামীকে তৈল মাখে আট দশ জনে।
স্নান করাইল পুকুরের জল এনে।।
বসাইল ঘরে এন সেবাদির কার্যে।
পায়স পিষ্টক আনে ফেলারাম ভার্যে।।
সম্মুখে আনিয়া থালা ভাজা বড়া ল’য়ে।
গোস্বামীর মুখে দিল স্বহস্তে তুলিয়ে।।
দশনে চিবা’য়ে মুখে রাখে হীরামন।
বিস্তার নাহিক করে দু’পাটি দশন।।
বড়া ধরি পুনঃ দিতেছিল বদনেতে।
অমনি চপটাঘাত করিল মুখেতে।।
ফেলারাম বলেছে সৌভাগ্য বড় মোর।
অমনি মারিল মুখে দ্বিতীয় চাপড়।।
ধাইয়া চলিল প্রভু পুকুরের পাড়ে।
মৃত্যুঞ্জয় চলিলেন গোস্বামীকে ধ’রে।।
হীরামন ধরে শেষে মৃত্যুঞ্জয় কেশে।
কপালেতে দুই মুষ্ট্যাঘাত মারে রোষে।।
চক্ষের নীচায় নাসিকার দুই পার্শ্বে।
দুই ভুষা মারি ইটা ধরিলেন শেষে।।
ঠেকাইতে হীরামনে হাত তুলিলেন।
মৃত্যুঞ্জয়ে ছাড়িয়া গোস্বামী চলিলেন।।
চণ্ডী মল্লিকের ঘরে করিল শয়ন।
গোঁসাই গোঁসাই বলি চলিল মদন।।
চৌকির খামায় লগ্ন গোস্বামীর পাও।
পদ ধরি বলে প্রভু মোর পদ দাও।।
গোস্বামীর পদে মাথা যখনে নোয়ায়।
অমনি মারিল লাথি তাহার মাথায়।।
বামপার্শ্বে খাম্বা ঠেকে যেন ছে’চা হ’ল।
গোস্বামীর লাথি হেতু জীবন রহিল।।
উঠিয়া চলিল প্রভু দক্ষিণাভিমুখে।
কালীনগরের দিকে চলিলেন রুখে।।
শ্রীগৌরচাঁদের পুত্র শ্রীউমাচরণ।
বোরা জমি পরিষ্কার করে সেই জন।।
আইল উপরে বহু কাঁদা তুলিয়াছে।
সে আইল ‘পর দিয়া গোঁসাই চলিছে।।
আসিয়া উমাচরণ করে দণ্ডবৎ।
অমনি গোঁসাই শিরে করে পদাঘাত।।
মস্তক পশিল গিয়া কাদার ভিতরে।
মৃত্যুঞ্জয় গৃহে প্রভু যান ক্রোধভরে।।
গোঁসাই বসিল গিয়া রন্ধনশালায়।
ঘরের নিকটে ভয়ে কেহ নাহি যায়।।
ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যুঞ্জয় তারকে পাঠায়।
গৃহে বসি ঝোঁকে মাত্র দেখিবারে পায়।।
হেনমতে রাত্রি গেল গোস্বামী উঠিল।
উত্তরের গৃহে এসে সকলে বসিল।।
নিশিতে স্বপনে দেখেছেন মৃত্যুঞ্জয়।
তোমাকে রাখিতে নারি গোস্বামীকে কয়।।
তোমায় চরণে যেন থাকয় ভকতি।
তোমাকে রাখিতে নাই আমার শকতি।।
স্বপ্ন শুনি হীরামন নামাইল পদ।
চলিলেন পূর্বমুখে বলি হরিচাঁদ।।
নদীর কিনারে গ্রাম কলাবাড়ী আদি।
প্রেমাকুল কূলে বসি ঝোঁকে নিরবধি।।
উত্তার নয়ন হ’য়ে বসিয়া তথায়।
পুনঃ আসিলেন মৃত্যুঞ্জয়ের আলয়।।
গোঁসাই বলেন কল্য না হ’ল রন্ধন।
রন্ধন করুক বধূ করিব ভোজন।।
ছিলাম রসই ঘরে না হইল রাঁধা।
সুস্থির হ’য়েছি অদ্য খেতে দাও দাদা।।
তাহা শুনি কাশীশ্বরী করিল রন্ধন।
গোঁসাই সুস্থির হ’য়ে করিল ভোজন।।
পুনর্বার হীরামন যাত্রা করিলেন।
তারক আসিয়া পদে প্রণাম করেন।।
ভূমিষ্ঠ হইয়া পদে করে প্রণিপাত।
গোঁসাই করিল পৃষ্ঠদেশে পদাঘাত।।
শব্দ হ’ল বিপরীত লড়ে উঠে ঘর।
পদ পড়ে পুষ্পসম পৃষ্ঠের উপর।।
বিপরীত শব্দ শুনে এল মৃত্যুঞ্জয়।
ক্রোধিত হইয়া এসে হীরামনে কয়।।
তারকে মারিলে পেয়ে কিবা অপরাধ।
সবাকার পিতা হয় এক হরিচাঁদ।।
গললগ্নী কৃতবাসে কহিছে তারক।
আমার অন্তরে বড় হয়েছে পুলক।।
এক লাথি দিয়াছেন আর লাথি দিলে।
পাইতাম শ্রীপদ তাহাতে বাদী হ’লে।।
গোস্বামীর প্রতি কেন চাহ কোপদৃষ্টে।
পদ্ম পুষ্পসম বাজিয়াছে মম পৃষ্ঠে।।
জন্মের সার্থক আমি কৃপার ভাজন।
গোঁসাই দিলেন লাথি ধন্য এ জীবন।।
অন্যলোকে লাথি ভেবে হ’য়েছে আকুল।
লাথি নহে মম পৃষ্ঠে আশীর্বাদ ফুল।।
তাহা শুনি গোস্বামীজী হাঁটিয়া চলিল।
মৃত্যুঞ্জয় তাহা শুনি নীরব হইল।।
হীরামন লীলা খেলা মহিমা অপার।
এ লীলা রচিল কবি রায় সরকার।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!