ভবঘুরেকথা
শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুর মতুয়া

-গৌতম মিত্র

পূর্বেবঙ্গে পাজিপুথি পাড়ায় আটঘড় কুরিয়ানায় ছিল শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুরের পূর্বেপুরুষের নিবাস। বর্তমান বসতি বরিশাল বিভাগের বাকেরগঞ্জ থানার ৬নং ফরিদপুর ইউনিয়নের ভাতশালা গ্রামে। শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুরের জন্ম ১৬ই পৌষ ১৩৪৯ বঙ্গাব্দে পূর্ণিমা তিথির বৃহস্পতিবার দিনে।

তার পিতা শ্রী বিপিনচাঁন ঠাকুর আর মাতা শ্রী কুসুম কুমারি বালা। পিতামহ শ্রীরামচরণ ঠাকুর প্রপিতামহ শ্রী মঙ্গল ঠাকুর। শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুরের গুরুদেব ছিলেন শ্রী জগবন্ধু ঠাকুর। গুরুদেব শ্রী জগবন্ধু ঠাকুর ছিলেন শিবাবতার পতিত পাবন ভগবান শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রিয় ভক্ত।

শ্রী জগবন্ধু ঠাকুরের বর্তমান আশ্রম পটুয়াখালী জেলাধীন আমতলী থানার তক্তাবুনিয়া ইউনিয়ন জগৎচাঁদ গ্রামে।

শ্রী বিপিনচাঁন বাংলা ১৩৪০ সনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সেই দাম্পত্য জীবনে তাদের কোন সন্তানাদি ছিল না। তারপর কালীচরণ ঠাকুরের মেয়ে কুসুমকুমারীর সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়েতে আবদ্ধ হন শ্রী বিপিনচাঁন। কিন্তু এই সংসারেও কোন সন্তানাদি হচ্ছিল না। গীতে আছে-

নিঃসন্তান মাতা পিতা ছিলেন তাহার।
পুত্র জন্য মাতা পিতা কাঁদে অনিবার।

জানা যায়, শ্রী বিপিনচাঁন ঠাকুরের বাড়ির পূর্বে পাশে ছিল শ্রী বিহারী ঘরামীর বাড়ি। সেই বাড়িতে দক্ষিণবঙ্গে হরিনাম প্রচারের জন্য মাঝেমধ্যে আসতেন শ্রী জগবন্ধু ঠাকুর। মাঝেমধ্যে হরি সেবা আয়োজনও হতো সেই বাড়িতে। অবশ্য সে সময় বিপিনচাঁন হরি ভক্তদের তেমন একটা ভালো চোখে দেখতেন না।

একবার সেই গৃহে গুরুদেব আগমন উপলক্ষ্যে বিহারী ঘরামী হরি সেবার আয়োজন করে গ্রামের সকলকে নিমন্ত্রণ করে। গীতে আছে-

জয় জয় বিপিনচাঁন ঠাকুরের জয়।
সত্যবাদী ছিল তিনি গ্রাম কর্তা হয়।।

কোনো কারণে সে দিন সেই হরি সেবায় বিপিনচাঁন উপস্থিত হন। তিনি গোঁসাইকে দেখেই উচ্চবাচ্য কথাবার্তা শুরু করে দেন। এর অন্যতম কারণ ছিল যে তিনি হরি ভক্তদের মোটেও পছন্দ করতেন না। তার উপর গুরুদেবের ছিল লম্বাচুল, বিশাল গোঁফ, গলায় মতুয়া প্রতীক নারিকেলের আচির মালা।

একাম্বর পরিধানে হাতে ছোট দণ্ড বীণাযন্ত্র ও সতত মুখে শ্রীশ্রী হরি-গুরুচাঁদ বোল। এসব দেখে বিপিনচাঁন বিরক্ত হয়ে গোঁসাইকে উচ্চস্বরে অনেক কথা শুনিয়ে দিলেন। গোঁসাই কিছু না বলে চুপ করে রইলেন। হরিসেবা চলতে লাগলো। নিয়মিত রীতিনীতি অনুসারে হরি সেবা শেষে যে যার মত নিজালয়ে চলে গেল।

বিপিনচাঁন বড়িতে এসে যখন নিদ্রা গেলেন তখন স্বপ্নে দেখলেন কে যেন বারংবার বলছে তুমি যদি ওই গোঁসাইয়ের কাছে শ্রীশ্রী হরিচাঁদ নামে দীক্ষিত না হও তবে তোমার রক্ষা নাই। তুমি গোঁসাইকে চিরতরে বরণ করে নাও তবে সকল বাঞ্চাপূর্ণ হবে।

স্বপ্ন শেষে বিপিনচাঁন নিদ্রা থেকে সজাগ হলো। তখন পূর্বাকাশ পরিস্কার হয়ে সূর্যদেব উদিত হবে হবে ভাব। তিনি তার স্ত্রীকে সজাগ করে স্বপ্নের বৃত্তান্ত সব শোনালেন। স্বল্প সময়ে প্রাতঃক্রিয়া করে সেই ঘরামি বাড়িতে গোঁসাই জগবন্ধু ঠাকুরকে দর্শন করতে বের হলেন তারা।

গোঁসাইকে দেখেই তারা দুজনে হরিনামে দীক্ষিত হওয়ার আকুতি জানালেন। নব্য ভক্তের এমন আকুতি দেখে স্বয়ং জগবন্ধু ঠাকুর ভক্তসহ নিজে উপস্থিত হলেন বিপিনচাঁনের বাড়িতে। তাদের দীক্ষা দিলেন হরিনামে। হরিনামে দীক্ষিত হয়ে সন্তান না থাকার দু:খের কথা খুলে বলেন শ্রীগুরুকে। গীতে আছে-

গুরু যুগল পদ ধরি কাঁদিয়ে বলে।
সু-পুত্র দাও ঠাকুর ভাসে আঁখি জলে।।

দীক্ষা নেয়ার পর তারা উভয় এক আত্ম এক প্রাণ নিয়ে শ্রীশ্রী হরিনাম কীর্তন করতে শুরু করেন। দৈনিক ত্রিসন্ধ্যা হরি গুরু সেবা পূজা প্রার্থনা করতে লাগলেন। গুরুদেব বিপিন ও তার স্ত্রীকে নিয়ে ১৩৩২ সনে পূর্ণ তীর্থ শ্রীধাম ওড়াকান্দি গেলেন। ওড়াকান্দির ধাম কর্তা শ্রীশ্রী হরি মন্দির করার নির্দেশ দিয়ে বললেন-

হরিঘড় কর তৈরি উওর ভিটিতে।
শান্তি হরি সেবা কর নিত্য সন্ধায়।
পহেলা বৈশাখে বারুণী মহোৎসব।
বিশ^ হরিনাম দিনে প্রসাদ বিলাবে।।

ওড়াকান্দি ধামের অধিপতি শ্রী পতি ঠাকুরের কাছে গেলেন। ধাম থেকে ফিরে বিপিন ও তার স্ত্রী শ্রী গুরু জগবন্ধু ঠাকুরের মহান কৃপায় অতি সূক্ষ্মভাবে ব্রহ্মচার্য রক্ষা করতে প্রাণপণ হরিনাম করতেন।

ব্রহ্মচার্য রক্ষা কর বল হরি হরি।
ডংকা কাশি বাধ্য ধুলে গড়াগড়ি।।
হরিবার রাত দিনে স্বাত্তিক আহার।
উপবাস থাক দেহে প্রতি বুধবার।।
আমার নির্দেশ বাক্য করিও পালন।
অভিষ্ট পূর্ণ করিবে প্রভু হরিচাঁন।।
হাতে কর শুভ কর্ম মুখে হরি বলে।
ব্রহ্মচার্য রক্ষা করে সততা চলে।।

পূর্ণব্রহ্ম পূর্ণবতার শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের অশেষ কৃপায় ভগবান শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের আশির্বাদে ও শ্রী গুরুদেবের দয়ায় ১৩৪৯ সালে ব্রজমোহন ঠাকুরের জন্ম হয়। শ্রী গুরুদেব তার নামকরণ করেন। ব্রজমোহন ঠাকুর লেখাপড়া শুরু করেন ৫ বছর বয়সে। প্রাইমারি শেষ করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

সেসময় তাদের পারিবারিক অবস্থা স্বচ্ছল ছিল না। তারা দুই ভাই ও তিন বোন নিয়ে ঠাকুরের কৃপায় কোনভাবে দিন বয়ে যায়। কিছুদিন পর তার পিতা বিপিনচাঁন ধরাধামে থেকে চলে গেলে সে বিপদ আরো বড় হয়।

পিতা চলে যাওয়ায় পারিবারিক সমস্ত দায়িত্ব এসে পরে ব্রজমোহন ঠাকুরের উপর। পারিবারিক অবস্থা ভাল নয় বলে লেখাপড়া বেশি দূর আগাতে পারে নি। এমন কি এক পর্যায় ছাত্র-ছাত্রী পড়িয়ে তাকে সংসার চালাতে হয়।

শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুর ১৯৭০ সালের ২৭ ফাল্গুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাদের ঘরে বাংলা ১৩৭২ সনে তার প্রথম পুত্র শ্রী তপন ঠাকুর, ১৩৭৬ বঙ্গাদে তার সেজ পুত্র, ১৯৮৫ সালে মেজ পুত্র শ্রী রতন ঠাকুর, ১৯৮০ সালে কন্যা বিউটি রানী এবং ১৯৯০ সালে ছোট পুত্র রিপন ঠাকুর জন্মগ্রহণ করে।

ব্রাহ্মণবাদী বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুরের বয়স ত্রিশ বছর। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় তিনি এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরেন। বাংলা ১৩৮০ সনে তিনি প্রথম এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর কাকা শ্রী নরসিংহ ঠাকুর দেহত্যাগ করলে তিনি তার পারলৌকিক ক্রিয়া নিজে মতুয়া বিধান মতে করেন।

ব্রাহ্মণ নাপিত কাউকে অগ্নি পর্যন্ত স্পর্শ করতে দেন নি। ২০০৭ সালে তার মাতা শ্রী কুশুম কুমারী বালার পারলৌকিক ক্রিয়া, ২০০৮ সালে তার মেঝ পুত্র শ্রী রতন ঠাকুরের শুভ বিবাহও মতুয়া মতে করান। ২০১৭ সালে তাঁর নাতি শ্রী প্রিয়াংকা রানীর বিবাহও মতুয়া মতে হয়।

তাঁর ভক্তদের বিবাহ, পারলৌকিক ক্রিয়া সবই সংগোঠিত হয় মতুয়া মতে। সমাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুর মতুয়া মত প্রতিষ্ঠায় কখনো পিছ পা হন নি। এরজন্য তাকে কম নির্যাচত-নিপিড়ন সহ্য করতে হয় নি। তারপরও তিনি ছিলেন অবিচল। এ অঞ্চলে মতুয়া মত প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা পালন করছেন শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুর।

প্রতিবছর ১লা বৈশাখ বিশ্ব হরিনাম দিবসে হরিনামের মেলা ও ভক্ত মিলন মহোউৎসব পালিত হয়। ভক্তকুলের মিলনমেলায় পরিণত হয় সেসময়।

………………………..
আরো পড়ুন:
মহান ধর্মগুরু হরিচাঁদ নিয়ে প্রাথমিক পাঠ
‘গুরুচাঁদ’ ইতিহাসের অজানা অধ্যায়
হরিচাঁদ ঠাকুরের আবির্ভাব ও মহাবারুনী’১৯
হরিচাঁদ ঠাকুরের আবির্ভাব ও মহাবারুনী স্নান’২০
মতুয়া সংগীত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!