মাওলা সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতী

সদর উদ্দিন চিশতীর বাণী: দুই

১৫.
যতক্ষণ মানুষের মনে দুনিয়ার আশা-ভরসা একটুকুও বাকী থাকে ততক্ষণ দুনিয়া হইতে ছুটিয়া আল্লাহতে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা হয় না। বিপদ বিশ্বাসীর পরীক্ষা। সাধারণত ঘোর বিপদের দ্বারা দুনিয়া হইতে একেবারে হতাশ হইয়া গেলে মানুষ আপন রবের নিকট পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করিয়া থাকেন।

১৬.
যদি কেহ কোন কল্যাণের উন্মেষ ঘটায় অথবা কাহারও কোন কল্যাণ করিয়া উহা গোপন রাখে অথবা যদি অসীম মন্দের কোন কোন অংশকে ক্ষমা করে তবে আল্লাহ্‌ তাহাকে স্নেহের ক্ষমা করিয়া তাহাকে উন্নত তকদীর দান করেন। কাহারও প্রতি কোন কল্যাণকর কাজ করিলে উহা গোপন রাখা ভাল।

১৭.
দেহের চাহিদার কারণে মানুষ বিষয়াসক্ত হইয়া থাকে। তাই তাহার নফস বা মন বিষয়-আশয়ের চিন্তার মধ্যে নিমগ্ন বা প্রোথিত হইয়া থাকে, মনকে বিষয়ের আসক্তিতে প্রোথিত করিয়া রাখা বা কলুষিত করা একই কথা। মন, বিষয়ে প্রোথিত থাকিলে উন্নতচিন্তায় উড্ডয়মান হইতে পারে না। বস্তুমোহে মোহাবিষ্ট থাকিয়া কালিমাচ্ছন্ন হইয়া থাকে।

১৮.
বিষয়বস্তু মনের খুঁটি বা স্তম্ভ। জীবগণের মন বিষয় নির্ভর, শিরিক নির্ভর। যে মন বিষয়কে স্তম্ভরূপে গ্রহণ করে না সেই মন সমুন্নত হইয়া আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করে। বিষয় ভিত্তিক মন ভঙ্গুর, দুর্বল। বিষয়ের খুঁটিহীনতার দ্বারা আল্লাহতা’লা মানুষের মনকে সমুন্নত করিয়া তোলেন। ইহা অবশ্য আমরা দেখিয়া থাকি যে, সাধু-সন্ন্যাসীগণ বিষয়মোহ শূন্য।

১৯.
‘সাইয়ুন’ অর্থ একটি বস্তু বা বিষয়। সাতটি ইন্দ্রিয়ের প্রতিটি ইন্দ্রিয়পথে অসংখ্য বা অনেক ‘সাঁই’ আগমন করে। ইহাদের সঙ্গে মানুষ করে শিরিক। সাধকের প্রত্যেকটি সাঁইকে গুরুরূপে আল্লাহ রূপান্তর সৃষ্টি করেন, তবেই সেই বিষয়ের সঙ্গে সাধকের শিরক আর থাকে না। গুরু তাহার অধীনস্থ সাধকের যে সাঁইকে রূপান্তর সৃষ্টি করেন সেই সাঁই শিষ্যের জন্য শিরিকমুক্ত হইয়া যায়।

২০.
যাহারা দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞা করিতে পারে না তাহারা কিছুই করিতে পারে না। যাহারা প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করিয়াও কোন বন্ধুর সুপরামর্শে মনকে বদলাইয়া ফেলে তাহাদিগ হইতেও ভাল কিছু আশা করা যায় না। কিন্তু যাহারা প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণের পর প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় থাকিয়া কর্ম আরম্ভ করে এবং কর্ম পথে ছোট্ট ছোট্ট বাঁধা বিপত্তি দ্বারা নিরস্ত হয় না তাহারাই অসাধ্য সাধন করিতে পারে।

২১.
দুনিয়ার দুঃখময় চির অতৃপ্ত জীবনই ‘জাহান্নাম’। আর দুনিয়ার চির চাহিদা পূর্ণ আকর্ষণের আগুনই জাহান্নামের আগুন, যে আগুনের কোন ধুয়া বা শিখা নাই। জাহান্নামের আগুনের প্রলোভনে মানব মন বার বার কীট পতঙ্গের ন্যায় এই আগুনে ঝাঁপ দেয় আর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জাহান্নামের এই আগুন জ্বালা গুরুভক্ত একজন শিষ্য তাহার গুরু হইতে প্রাপ্ত প্রত্যয়ী জ্ঞানে নিজ জীবদ্দশায় প্রতিটি ধাপে দেখিতে পায়।

২২.
আল্লাহ্‌ মানুষকে ধরেন তাহার মনের কর্ম্ম অনুসারে। মনের দ্বারা যে যেই রূপ চিন্তা করে এবং যাহা চাহিতে থাকে তাহা দ্বারাই সৃষ্টির বন্ধনে সে ধরা পড়ে। ধৈর্যহহীন মন বস্তুমোহে আকৃষ্ট হইয়া উহাতে জড়াইয়া থাকে, যাহার ফলে আল্লাহ্‌র ক্ষমা লাভ করা দূরবর্তী বিষয় হইয়া যায়। ধৈর্য সহকারে মনকে মোহের আকর্ষণ হইতে সরাইয়া রাখিতে চেষ্টা করিলে আল্লাহর ক্ষমাপরায়ণতার সম্যক পরিচয় পাওয়া যাইবে।

২৩.
মোহাম্মদ অর্থ প্রশংসিত। মোহাম্মদ স্থানে-কালে সীমাবদ্ধ নহেন। সম্যক গুরুরূপে মোহাম্মদই সর্বযুগে বিরাজমান। আল্লাহ নিজ স্বরূপ প্রকাশের ধারার মধ্যে আবরণী অর্থাৎ পর্দা গ্রহণ করিয়াছেন যেন তিনি বেপর্দা না হইয়া পরেন। মাটির মানুষ মোহাম্মদ তাঁহার এই পর্দা। যে পর্দার অন্তরালে তিনি প্রত্যক্ষ লীলারত উহাই প্রশংসিত। ইহা সৃষ্টি-লীলার অশেষ সৌন্দর্য ও বিজ্ঞানময় পরম রহস্য। এই জন্য মোহাম্মদ কোথাও সীমায় আবদ্ধ নহেন।

২৪.
‘মোহাম্মদ’ অর্থ প্রশংসিত। যে পরদার অন্তরালে তিনি প্রত্যক্ষ লীলারত উহাই প্রশংসিত। ইহা সৃষ্টি লীলার অশেষ সৌন্দর্য ও বিজ্ঞানময় পরম রহস্য। এইজন্য ‘মোহাম্মদ’ কোথাও সীমায় আবদ্ধ না, তিনি নূরে-মোহাম্মদী রূপে আল্লাহর সঙ্গে একই গুণে গুণান্বিত। যথা: আউয়ালে আখেরে জাহেরে বাতেনে তিনিই নবী, তিনিই রসুল তিনিই দাস তিনিই প্রশংসিত। তিনি ছাড়া আর কেহই আল্লাহর দাসত্বের যোগ্য হইতে পারে না। তাই তিনি ‘মোহাম্মদ’ অর্থাৎ প্রশংসিত।

২৫.
দুনিয়ার জীবন নিরাপত্তাহীন ও শাস্তিমূলক। মুসল্লি দুনিয়ার শাস্তির ভয়ে অত্যন্ত ভীত। রবের সংযোগ যদি কখনও ব্যাঘাত ঘটিয়ে ক্ষণিকের জন্যও দুনিয়ায় পদস্খলন ঘটে, রবের তরফ হইতে এইরূপ শাস্তির ভয়ে তাহারা সন্ত্রস্ত হইয়া থাকেন। অপরপক্ষে যাহারা দুনিয়ার অধিবাসী তাহারা দুনিয়ায় বাস করা যে কিরূপ শাস্তির বিষয় তাহা অনুভব করিতে পারেনা। এখানে উল্লেখ্য যে, এই পৃথিবীতে বাস করা আর দুনিয়ায় বাস করা এক কথা নয়। ‘দুনিয়া’ বস্তুবাদী মনের মস্তিষ্কে জন্ম লাভ করে।

২৬.
সমস্ত জগত আজ বস্তুবাদী। সুতরাং তাহাদের রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বপ্রকার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও বস্তুভিত্তিক। তাই জগতময় বৈষয়িক শক্তি অর্জনের লড়াই চলিতেছে। এই কারণে প্রত্যেক দেশে বৈষয়িক যুদ্ধে পরস্পরের উপর প্রাধান্য লাভের জন্য উহার তথাকথিত সুনিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতায় পাগল হইয়া উঠিয়াছে। বৈষয়িক শক্তি দ্বারা বৈষয়িক শক্তি মোকাবেলা করা যায়। তাই বস্তুশক্তি অর্জনের জন্য সকলেই তাহাদের সর্বশক্তি নিয়োজিত করিতেছে। মানুষ উৎসর্গ হইতেছে বস্তুর নিকট।

২৭.
‘সওয়াব’ অর্থ লাভ বা উপার্জন বা পুরস্কার। ‘উকবা’ অর্থ পরিণতি। সওয়াব দুই প্রকার: ১. অস্থায়ী লাভ এবং ২. স্থায়ী লাভ। পরিণতিও দুই প্রকার: ১. অস্থায়ী পরিণতি এবং ২. স্থায়ী পরিণত। প্রকৃতপক্ষে তাঁহার গুণের দ্বারা গুণান্বিত হওয়া উত্তম সওয়াব। এইরূপ উপার্জন বা লাভ চরিত্রগত হইয়া চিরস্থায়ী হইয়া যায়। ঐরূপ চরিত্র অর্জন করিয়া আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করিতে পারিলে উত্তম এবং স্থায়ী পরিণতি লাভ হয়। আর তাহা না হইলে অস্থায়ী পরিণতি প্রাপ্ত হইয়া জাহান্নামবাসী হইতে হয়। জাহান্নাম অস্থায়ী আবাস। ইহা সকলই বর্তমান।

২৮.
‘সওয়াব’ দুই পর্যায়ভুক্ত: ১. দুনিয়ার সওয়াব এবং ২. আখেরাতের সওয়াব (দ্র ৩:১৪৬-১৪৭)। দুনিয়ার জীবনে দোষত্রুটি ক্ষমা করা, সকল কর্ম ও কথার মধ্যে হইতে বৃত্তির অপচয় ক্ষমা করা, সত্যের উপর দৃঢ়ভাবে পদ প্রতিষ্ঠা করা, কাফের কাওমের উপর বিজয়ী হওয়ার সাহায্য দান করা ইত্যাদি হইল দুনিয়ার সওয়াব। আল্লাহ যেইসকল গুণ মানুষ তাহার আপন রব হইতে অর্জন করিয়া লয় সেই সকল গুণ যখন মানব চরিত্রে স্থায়িত্ব লাভ করে তখন উহাকে সওয়াব বলে। সওয়াব সাধকের জীবনের মূলধন। উহার সাহায্যে যাহা যখন প্রয়োজন তাহা আপন রবের অনুমোদনে ইচ্ছামত উৎপাদন করিয়া লইতে পারে। আপন রব নিজেই উত্তম সওয়াব এবং উত্তম প্রত্যাবর্তন বা পরাবৃত্ত। জন্মান্তরে বারে বারে রবের দিকে ফিরিয়া আসা ভাল নহে। তাহাকে পুরস্কার রূপে পাইলে উহাই উত্তম সওয়াব। তিনি উত্তম পুরস্কার।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!