সাধক কবি কিরণচাঁদ দরবেশ

সাধক কবি কিরণচাঁদ দরবেশ

শ্রী কিরণ চাঁদ দরবেশ ছিলেন স্বদেশী যুগের রাজনৈতিক কর্মী, সাহিত্য সাধক, গীতিকার এবং সন্ন্যাসী। শ্রী কিরণ চাঁদ দরবেশ ১১ আগস্ট ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশের মাদারিপুর জেলার রাজৈর থানাধীন খালিয়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত চট্টোপাধ্যায় পরিবারে চতুর্দশী উৎসবে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পিতার নাম কূলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও মাতার নাম রাশময়ী দেবী। পিতা ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন এবং তাঁর গৃহে লক্ষ্মী নারায়ণ ও শিবের মন্দিরে নিষ্ঠাভরে পূজা অর্চনা করতেন।

পিতামহ শ্রী দুর্গাচরণ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ডেপুটি কালেক্টর। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কাশী, পুরী ও কলকাতার মত ধর্মীয়স্থানে জমিজমা ক্রয় করেছিলেন। কবির মাত্র কয়েক মাস বয়সে তার মাতা রাসমণি দেবী স্বপ্নে দেখতে পান যে তাঁর পুত্রকে একজন সাধুপুরুষ এক ভীষণাশ্চর্যারূপী চতুর্ভূজা নারীর কাছ থেকে রক্ষা করছেন।

কিরণচাঁদ তিন বছর বয়সে তার পিতা-মাতার সঙ্গে কাশীতে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা মহাপুরুষ ও সাধক ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি সেই সময় নিদ্রামগ্ন ছিলেন; বলে তাঁরা ফিরে আসার উপক্রম করে, হঠাৎ স্বামীজি জেগে উঠে শিশু কিরণচাঁদকে দেখতে পান।

তিনি সহসা সেই শিশুকে স্নেহপরবশবত কোলে তুলে নেন এবং আশীর্বাদ করে মাতার হাতে তুলে দেন। সবাই এই ঘটনায় আশ্চর্য হন কারণ ত্রৈলঙ্গস্বামী এমন কাজ এর আগে আর করেননি। তাই অনেকেরই মনে হয়েছিল যে এই শিশু বড় হয়ে সাধুসন্ত হবেন।

শৈশবে তাঁর পিতা তাঁর জন্য গৃহশিক্ষক রেখে পড়াশুনার ব্যাবস্থা করেন। পরে গ্রামের স্কুলে ভর্তি হন। সেই সময় কবি মহাভারতসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ পাঠ শুনতে ভলবাসতেন। কবির মাত্র এগারো বছর বয়সে পিতৃবিয়োগ ঘটে। ১৮৯২ সালে পয়লা বৈশাখ কবির উপনয়ন হয়।

এরপর তাঁর অগ্রজ শ্রীশচন্দ্র, তাকে ঢাকার জুবিলি স্কুলে ভর্তি করে দেন ও হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করেন। সেখানে তিনি ব্রাহ্মসমাজের আদর্শের অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁদের সভায় উপস্থিত থাকতে শুরু করেন। ঢাকায় তাঁর বেশিদিন থাকা হয় নি। চলে যেতে হয় বরিশালে।

বাড়ি ফিরে তিনি আর্য মিশন ইন্সটিটিউশন স্কুলে ভর্তি হন যেখানে ভগবত গীতা পাঠ আবশ্যিক ছিল। তিনি গীতা কণ্ঠস্থ করে ফেলেছিলেন এবং একই সাথে নৃত্য-গীত-বাদ্যাদিতে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। ১৮৯৪ সালে তিনি বরিশালের ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

সেখানে তিনি Little brother of the poor নামের একটি সমাজসেবা সংস্থার সদস্য হন এবং বিভিন্ন সেবামূলক কাজে যুক্ত থাকেন। এই সময় তিনি ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অশ্বিনিকুমার দত্ত, গোরাচাঁদ, চন্দ্রনাথ দাশ (ইনিই সম্ভবত কবি কুসুমকুমারী দাশের পিতা এবং কবি জীবনানন্দ দাশের মাতামহ) প্রমুখদের সংস্পর্শে আসেন।

সেই সময় কবির ছাত্রাবস্থায়, শ্রীশ্রী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী (গোঁসাইজী), হিন্দু ধর্মানুসারী হয়ে কুমকুম ফুলের মালার আভূষনে নিজেকে ভূষিত করা শুরু করেছিলেন। একবার তিনি কোনো এক ধর্মানুষ্ঠানে ভোজনকালে সুরাপান করেছিলেন বলে ব্রাহ্মসমাজে বিদ্রোহ হয়।

ব্রাহ্মসমাজের শিবনাথ শাস্ত্রী গোঁসাইজীকে তিরস্কার করেন এবং কিরণচাঁদ দরবেশ এই বিদ্রোহে আরও বড় আকারে সামিল হয়ে পড়েন গোঁসাইজীর বিরুদ্ধে।

ভবিষ্যতে কিরণচাঁদ দরবেশ এই গোঁসাইজীরই শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

বন্ধু মাখনলালের অনুপ্রেরণায় কিরনচাঁদ শেষমেশ বিজয়কৃষ্ণ গোঁসাইজীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন বৃন্দাবনে গোঁসাইজীর আশ্রমে, ১৭ই আষাঢ় ১৩০২ (১৮৯৫) তারিখে। দীক্ষা নেবার সময় তার বয়স ছিল ১৭। শুরু হয় তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন।

১৮৯৭ সালে তিনি বিবাহ করেন বন্ধু মাখনলালের ভগনী সরোজবালা দেবীকে।

১৮৯৯ সালে তাঁর গুরুজীর তিরোধান হয়।

১৯০১ সালে তিনি তার গুরুর সমাধি মন্দির পুরীতে তৈরির কাজ শুরু করেন।

১৯০৩ সালে তিনি গুরুজীর উপদেশে ফটোগ্রাফি ও জীবনবীমার ব্যবসা শুরু করেন বরিশালে। ভালো আয় হতে লাগল এবং তিনি দান-ধ্যানও করতে লাগলেন। গুরুর আজ্ঞা মত ২৩শে কার্তিক ১৩১৯ তারিখে (নভেম্বর ১৯১২)
১২ বছরের বিবাহিত জীবন শেষ করে, স্ত্রী সরোজবালা দেবীর জন্য বিষয়-সম্পত্তির ব্যবস্থাপত্র সাঙ্গ করে বারাণসীর সঙ্গমে শ্রীপ্রবুদ্ধানন্দ স্বরস্বতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তাঁর নতুন নাম হয় কেশরানন্দ সরস্বতী কিন্তু তিনি কিরণচাঁদ দরবেশ নামে খ্যাত হন।

সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি কাশীধামে থেকে যান ভাড়া বাড়িতে। পরে তাঁর শিষ্যরা কাশীতে বিজয়কৃষ্ণ মঠের স্থাপন করেন। মেদিনীপুর ও শরিফাবাদেও শাখা আশ্রম খোলা হয়।

কিরণ চাঁদ খুব সুন্দর কবিতা লিখতে পারতেন।

সেইজন্য তাঁর গুরু গোঁসাইজী তাঁকে প্রবোধচাঁদের লেখা ‘শ্রীবৃন্দাবন শতক’ কাব্যগ্রন্থটি, বাংলায় লিখতে বলেন। গুরুজীর তিরোধানের বেদনাতেও তিনি কিছু কবিতা লিখেছিলেন। ১৯২২ সালে, কলকাতার বিডন স্ট্রীট থেকে প্রকাশিত করেন তাঁর ‘মন্দির’ কাব্যগ্রন্থ। কবির “মন্দির” কাব্যগ্রন্থের কবিতা-

চল সবে চল জগতের কাজে, সাধিতে হইবে সাধনা,
ভাই ভাই মিলে দাঁড়াইব মোরা, ভুলিয়া অতীত বেদনা।
আনন্দময় বিশ্ব-ভুবনে দুখ-গাথা আর গাবনা,
জীবন-আহবে বিজয় লভিব, পরাজিত কভু হবনা।

দুখে রোগে শোকে প্রতিবাসীজনে দিব আশ্বাস মন্ত্রণা,
ব্যথিত দেখিলে, সুমধুর বোলে করিব তাহারে সান্ত্বনা।
পাপের যাতনা আর ত রবেনা, পাপ-পথে কেহ যাব না,
নিরাশার কথা, আঁধারের গাথা, ভুলেও কখন’ গাবনা।

এস সবে মিলি হই আগুয়ান, পিছে ফিরি আর চাবনা,
যে রহিবে পড়ে’ তুলিব গো ধরে মরে’ যেতে কারে’ দিব না
দেখরে চাহিয়া হাসিছে যামিনী, হাসিছে উছল চাঁদিমা,
আঁধারের মাঝে কেন পড়ে’ তবে, মুছে ফেল সব কালিমা।

চল রে বাজায়ে বিজয়-বাদ্য, লইয়া বিজয় নিশানা,
সে প্রেম-কিরণ লুফিয়া পরাণে বিজয় কর রে ঘোষণা।

কিরণচাঁদ দরবেশ মহারাজের কথা অমৃত সমান। তিনি বলতেন, সংসারের বোঝা বা সাধনের পরিণতি- এ সব কোন কিছুতেই অদৃশ্য ভবিষ্যৎ কল্পনা করিয়া বৃথা চিন্তা করিও না। যাহারা ঈশ্বর মঙ্গলময় বলিয়া জানে, ভবিষ্যতের ভয়ে তাহারা কেন ভীত হইবে?

ভবিষ্যতে যাহা কিছু ঘটুক না কেন সবই তোমার মঙ্গলের জন্য, এ ধারণা দৃঢ় রাখিও। যিনি মঙ্গলময়, যাঁহার মত হিতৈষী তোমার আর কেহ নাই, তাঁহারই হাতে তোমার ভবিষ্যত রহিয়াছে, সুতরাং ভবিষ্যতের জন্য ভাবনা কি?

কেবল বর্তমান ভজনের দিকে দৃষ্টি রাখ। সংসারটা ত্যাগ করিয়া পরে ধর্ম হইবে, তাহা নয়। যদি ভগবৎ- কৃপার অধিকারী হইতে পার; তবে কি সংসার- কি অরণ্য সবই মধুময় হইবে। বাহিরের কোন সাজে, কোন প্রকার কাজে কিছুই যায় আসে না।

সংসারকে ভয় না করিয়া, উহাই ভগবানের ব্যবস্থা বলিয়া মানিয়া লইতে হইবে। ইহার পর যাহা তোমার পক্ষে প্রয়োজন ও আবশ্যক, ভগবান ঠিক সেইরূপই ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছেন। প্রত্যহ নিয়মিত সাধনই সকল প্রকার ব্যাধির একমাত্র মহৌষধ।

এই মহান সাধক ১৩৫৩ বঙ্গাব্দের ২৫ জ্যেষ্ঠ (১৯৪৬খ্রি:) বারাণসীতে অবস্থানকালে দেহত্যাগ করেন।

………………….
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে : ভারতের সাধক-সাধিকা
পুণঃপ্রচারে বিনীত- প্রণয় সেন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!