রাধারমণ দত্ত

-নূর মোহাম্মদ মিলু

ভ্রমর কইয়ো গিয়া,
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে,
ভ্রমর কইয়ো গিয়া ।।
ভ্রমর রে, কইয়ো কইয়ো কইয়োরে ভ্রমর,
কৃষ্ণরে বুঝাইয়া মুই রাধা মইরা যাইমু
কৃষ্ণ হারা হইয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।।

শুধু বাংলাদেশেই নয় সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে এই জনপ্রিয় গানটি শোনেননি, এমন কেউকে খুঁজে পাওয়াও সহজ নয়। এমনকি এই গানটি বিদেশী ভাষায় একই সুরে গাওয়া হয়েছে। এই জনপ্রিয় গানটি ছাড়াও- “কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো”, “প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে”, “আমারে আসিবার কথা কইয়া” সহ বেশকিছু গানের মূল শিল্পী, সুরকার ও গীতিকার রাধারমন দত্ত।

রাধারমণ দত্ত বা রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ (১৮৩৩–১৯১৫) হলেন একাধারে সাহিত্যিক, সাধক কবি, বৈষ্ণব বাউল, ধামালি নৃত্যের প্রবর্তক। সংগীতানুরাগীদের কাছে তিনি রাধারমণ এবং ভাইবে রাধারমণ বলেই সমাধিক পরিচিত। বাংলা লোকসংগীতের পুরোধা লোককবি রাধারমণ দত্ত।

তার রচিত ধামাইল গান বাঙ্গালীদের কাছে পরম আদরের ধন। রাধারমণ নিজ মেধা ও দর্শনকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। কৃষ্ণ বিরহের আকূতি আর না-পাওয়ার ব্যথা কিংবা সব পেয়েও না-পাওয়ার কষ্ট তাকে সাধকে পরিণত করেছে। তিনি দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, ভজন, ধামাইলসহ নানা ধরণের কয়েক হাজার গান রচনা করেছেন।

শ্রীহট্ট বা সিলেট অঞ্চলের পঞ্চখণ্ডে ত্রিপুরাধিপতি ‘ধর্ম ফাঁ’ কর্তৃক সপ্তম শতকে মিথিলা হতে আনিত প্রসিদ্ধ পাঁচ ব্রাহ্মণের মধ্যে ‘আনন্দ শাস্ত্রী’ নামক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব রাধারমণ দত্তের পুর্বপুরুষ ছিলেন বলে অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির ঐতিহাসিক গ্রন্থ শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তে পাওয়া যায়।

আনন্দ শাস্ত্রীর প্রৌপুত্র নিধিপতি শাস্ত্রীর পুত্র ভানু নারয়ন নামক ব্যক্তি তৎকালীন মণুকুল প্রদেশে ‘ইটা’ নামক রাজ্যের স্থপতি। ভানু নারায়ণের চার পুত্রের মধ্যে রামচন্দ্র নারায়ণ বা ব্রহ্ম নারাণের এক পুত্র ছিলেন প্রভাকর। মুঘল সেনাপতি খোয়াজ উসমান ইটা রাজ্য অধিকৃত করলে, এই রাজবংশের লোকগণ পালিয়ে গিয়ে আশেপাশের বিভিন্নস্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে।

এ সময় প্রভাকর দত্ত তার পিতার সাথে আলিসারকুল চলে যান। সেখানে কিছুদিন বসবাসের পর জগন্নাথপুর রাজ্যে এসে আশ্রয় নেন। কিছুদিন পর জগন্নাথপুর রাজ্যের তৎকালীন অধিপতি রাজা বিজয় সিংহের অনুমতিক্রমে প্রভাকর জগন্নাথপুরের পার্শ্ববর্তী কেশবপুর গ্রামে বাড়ি নির্মাণ করে সেখানে বসবাস শুরু করেন।

পরবর্তিতে রাজা বিজয় সিংহ প্রভাকরের পুত্র সম্ভুদাস দত্তকে মন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন। বানিয়াচংয়ের রাজা গোবিন্দ খা বা হবিব খার সাথে বিবাদে জগন্নাথপুর রাজ বংশের বিপর্য্যয়ের কারণ, রাজআশ্রীত কর্মচারীরাও দৈন্য দশায় পতিত হয়।

এ সময় সম্ভুদাস দত্তের পুত্র রাধামাদব দত্ত অন্যের দ্বারাস্থ না হয়ে, অনন্যচিত্তে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। রাধামাধব দত্ত সংস্কৃত ভাষায় জয়দেবের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘গীত গোবিন্দ’ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।

এছাড়া তার রচিত ভ্রমর গীতিকা, ভারত সাবিত্রী, সূর্যব্রত পাঁচালি, পদ্ম-পুরাণ ও কৃষ্ণলীলা গীতিকাব্য উল্লেখযোগ্য। এই প্রসিদ্ধ কবি রাধামাধব দত্তই ছিলেন রাধারমণ দত্তের পিতা। রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থের জন্ম ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে (১২৪০ বঙ্গাব্দ)।

কবি রাধারমণের পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উপাসনার প্রধান অবলম্বন সংগীতের সংগে তাঁর পরিচয় ছিল শৈশব থেকেই। খ্যাতিমান লোককবি জয়দেবের গীতগৌবিন্দের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন তার পিতা রাধামাধব দত্ত। পিতার সংগীত ও সাহিত্য সাধনা তাকেও প্রভাবিত করেছিল।

১২৫০ বঙ্গাব্দে রাধারমণ পিতৃহারা হন এবং মা সুবর্ণা দেবীর কাছে বড় হতে থাকেন। কিশোর বয়স থেকে রাধরমণ সৃষ্টিত্বত্ত নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সৃষ্টিকর্তার স্বরূপ অনুসন্ধানে মনোনিবেশে করেন। এজন্য তিনি বিভিন্ন সাধুসন্তের আদেশ উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন।

এই ধারাবাহিকতায় তিনি মৌলভীবাজারের ঢেউপাশা গ্রামের সাধক রঘুনাথ গোস্বামীর সাধন ভজনের কথা জ্ঞাত হয়ে তিনি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব মতবাদেও উপর ব্যাপক পড়াশুনা করেন। সবশেষে তিনি সহজিয়া মতে সাধন ভজন করেন। এই সাধন ভজনের জন্য তিনি বাড়ির পাশে নলুয়ার হাওরের একটি উন্মুক্ত স্থানে পর্ণকুঠির তৈরি করেন।

তিনি কৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলা নিয়ে লোকগান রচনা করেন। তিনি ভজন সংগীতে বিভোর হয়ে গান রচনা করে নিজেই তা গাইতেন। তাঁর মুখে শুনে শুনে তাঁর শিষ্যরা তা কাগজে লিখে রাখতেন। তাঁর নিজ হাতে রচিত গানের কোন পাণ্ডুলিপি নেই। কারণ তিনি তাৎক্ষণীনিকভাবে ভাবরসে বিভোর হয়ে গীতরচনা করতেন।

কবি রাধারমণের পুরো পরিবারের পারিবারিক জীবনধারায় বৈষ্ণব ও সুফীবাদেও প্রবল প্রভাব ছিল। লোককবি জয়দেবের গীতগৌবিন্দের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন তার পিতা রাধামাধব দত্ত। পিতার সংগীত-সাহিত্য সাধনা তাকেও প্রভাবিত করেছিল।

একই অঞ্চলের আরেক বিখ্যাত কবি হাছন রাজা থেকে রাধারমণ প্রায় ১৪/১৫ বছরের বড় হলেও তাদের মধ্যে ছিল দারুণ হৃদ্যতা। লোকমুখে কথিত আছে, হাছনরাজা রাধারমনকে তার সুনামগঞ্জের বাড়িতে দাওয়াত করে ছিলেন। কবি পত্রে লিখেছিলেন- ‘রাধার মন আছে কেমন? হাছন রাজা জানতে চায়।’ পত্র প্রাপ্তির পর রাধারমণ তার বাড়িতে যাওয়ার প্রস্ততি নিয়েও কি একটা অসুবিধায় যেতে না পেরে লিখেছিলেন- ‘গানের সেরা রাজা হাছন, পেলাম না তার চরণ দর্শন, বিফলে দিন গেল গইয়া।’

১২৭৫ বঙ্গাব্দে মৌলভীবাজারের আদপাশা গ্রামে শ্রী চৈতন্যদেবের অন্যতম পার্ষদ সেন শিবানন্দ বংশীয় নন্দকুমার সেন অধিকারীর কন্যা গুণময়ী দেবীকে বিয়ে করেন। কবির সংসারজীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি। রাধারমণ-গুণময় দেবীর রাজবিহারী দত্ত, নদীয়াবিহারী দত্ত, রসিকবিহারী দত্ত ও বিপিনবিহারী দত্ত নামে চার পুত্রের নাম জানা যায়।

দুঃখের বিষয় বিপিনবিহারী দত্ত ছাড়া বাকি তিন পুত্র এবং স্ত্রী গুণময় দেবীর অকাল মৃত্যু হয়। স্ত্রী ও পুত্রদের মৃত্যুতে রাধারমণ সংসারজীবন সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পরেন। ১২৯০ বঙ্গাব্দে ৫০ বছর বয়সে কবি চলে যান মৌলভীবাজার জেলাধীন ঢেউপাশা গ্রামে সাধক রঘুনাথ ভট্টাচার্যের কাছে।

সিলেটের বাউল গানের সুরের দ্বারা যিনি মানুষের মনে ঠাইঁ করে নিয়ে ছিলেন তিনি হলেন রাধারমণ। রাধারমণের গানের বেশ কিছু বই বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য প্রথমে রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

এছাড়া গুরু সদয়দত্ত, ড নির্মলেন্দু ভৌমিক,আব্দুল গফফার চৌধুরী, কেতকীরঞ্জন গুন, মুহাম্মদ আব্দুল হাই, অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, হুছন আলী, সৈয়দ মুরতাজা আলী, নরেশ চন্দ্র পাল, যামিনী কান্ত র্শমা, মুহম্মদ আসদ্দর আলী, মাহমুদা খাতুন, ড বিজন বিহারী পুরকাস্থ, সৈয়দ মুস্তফা কামাল, মো আজিজুল হক চুন্নু, জাহানারা খাতুন, নরেন্দ্র কুমার দত্ত চৌধুরী, অধ্যাপক সুধীর চন্দ্র পাল, অধ্যাপক দেওয়ান মো আজরফ, শামসুর করিম কয়েসসহ অনেক বিদগ্ধজন রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহ করে গেছেন।

মুন্সী আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন ‘রাধারমণ সঙ্গীত‘ নামে ও সুনামগঞ্জের মরহুম আব্দুল হাই ‘ভাইবে রাধারমণ বলে’ নামে বই প্রকাশ করেছেন। প্রখ্যাত লোক তত্ত্ববিদ চৌধুরী গোলাম আকবর রাধারমণের প্রায় চল্লিশ বছরের সংগ্রহের গানগুলো নিয়ে সিলেট মদন মোহন কলেজ সাহিত্য পরিষদের মাধ্যমে একটি বই প্রকাশ করেন। এতে তার তিন শতাধিক লোকগান স্থান পায়। রাধারমণের বেশকিছু গান বাংলা একাডেমীর সংগ্রহেও রয়েছে।

সংগ্রাহকদের মতে, রাধারমণের গানের সংখ্যা তিন হাজারেরও উপরে। রাধারমণ দত্ত গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ছাড়াও একজন ভাল চরিত্র অভিনেতা ছিলেন বলে জানা যায়। রাধারমণ সম্পর্কে অনেক আলৌকিক কথাও লোকমুখে শোনা যায়। কথিত আছে, রাধারমণ ভাবে কৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে লোকগান রচনা করতেন।

রাধারমণ দত্তের সাধনা ছিল সহজিয়া বৈষ্ণবরীতির, সঙ্গীত ছিল তার সাধনার অন্তর্ভূক্ত একটি বিষয়। টানা ৩২ বছর তিনি ঈশ্বরের সাধনা করেছেন। রাধারমণ দত্ত ৮২ বছর বয়সে ২৬ কার্তিক ১৩২২ বাংলা/১৯১৫ খ্রীস্টাব্দে শুক্রবার শুক্লাষষ্ঠি তিথিতে পরলোকে গমন করেন।

জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়। তারই শেষ স্মৃতি শ্মশান ঘাটটি বর্তমানে সমাধিক্ষেত্র হিসাবে সংরক্ষিত আছে। কেশরবপুর গ্রামের নরসিং মালাকারের স্ত্রী নিদুমনি দাস রাধারমণের সমাধিতে দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে সেবায়িতের কাজ করেছেন।

আজ থেকে ৬ বছর আগে নিদু মালাকার মারা যান। বর্তমানে কেশবপুর গ্রামের রম্নু মালাকারের স্ত্রী অনিতা রাণী মালাকার রাধারমণ মন্দিরের দেখভালোর কাজ করছেন। কেশবপুর গ্রামের লন্ডন প্রবাসী জনৈক ব্যক্তি রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থল পাকা করে দেন। বিশ্বখ্যাত এ মরমী সাধক ও লোককবির সমাধিস্থল সংরক্ষণের জন্য আজ পর্যন্ত কোন প্রকার সরকারী উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!