ভবঘুরে কথা
সারমাদ কাশানি

-রবিন জিয়াদ

সারমাদ, না প্রেমবেদনায় হলাম আমি কামপরায়ণ
করুণ প্রজাপতির হৃদয় না পায় মৌমাছির ধরণ,
পার হয়ে যায় জীবন যদি প্রিয়তমের সঙ্গলাভে
শাশ্বত পরমসুখে সব লোকে হয় সুখি এমন।।

সুফি সাধক সারমাদ কাশানিকে (১৫৯০-১৬৬১) বলা হয় ভারতবর্ষের মনসুর হাল্লাজ। মনসুর হাল্লাজের অমোঘ উচ্চারণ “আনাল হক (আমিই সত্য)” এর মতন তিনিও উচ্চারণ করেছিলেন “লা ইলাহা (খোদা নাই)”। এই আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দুর্বোধ্য ভাবে প্রকাশিত অসম্পূর্ণ কালেমা উচ্চারণের জন্যই তাকে রাজ অনুচর তৎকালীন মোল্লা এবং স্বয়ং সম্রাট আওরঙ্গজেবের রোষানলে পড়তে হয়।
জানা যায়, এই সুফি সাধক নগ্ন অবস্থায় দিল্লীর রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন সেটাও রোষানলে পড়ার আরেকটা কারণ। তাঁর প্রতি সমকামিতার অভিযোগও ছিলো।

সারমাদ! ধর্ম তোমায় অভিযোগ দিল সর্বনাশের
এক পলকের উন্মাদনায় বলি হলে বিশ্বাসের,
তোমার যে ধন-সম্পদ তা বিনয় ও ভক্তিপ্রেমটুকুই
সে প্রতিমার চরণে তাই মন রাখলে সমর্পণের।।

সারমাদ ছিলেন একজন আর্মেনিয়ান ইহুদী ব্যবসায়ী। ভারতবর্ষে বাণিজ্য করতে এসে মরমী সুফি সাধনার প্রেমে পরে আর ফিরে যাননি। তিনি সুফি সাধক “হারে ভারে”-এর অনুগ্রহ লাভ করে সাধনায় মগ্ন হন। সম্রাট শাজাহান এবং পরবর্তীতে সম্রাট দারাশিকোর আনুকূল্য লাভ করলেও আওরঙ্গজেবের নির্দেশে খোদার প্রতি অবিশ্বাসের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।

প্রেমের কশাইখানায় একমাত্র সুকর্ম হলো হত্যা
ক্ষয়ে যাওয়া, অসুস্থ বা দুর্বলচিত্তের জন্য নয় তা;
তুমি যে সত্যপ্রেমিক, পরোয়া করো না মরণকে
যে মরে গেছে মরবার আগে, সে কোনোদিন মরে না।।

কথিত আছে দিল্লীর পথে একদিন বাদশাহ আওরঙ্গজেব ঘুরতে বেরিয়ে দেখেন সারমাদ নগ্ন হয়ে রাস্তায় পরে আছেন। সম্রাট তার অনুচরদের নির্দেশ দেন তাঁকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিতে। এতে সারমাদ ক্রুদ্ধ হয়ে সম্রাটকে বলেন, ‘যদি তুমি মনে করো যে আমার নগ্নতাকে ঢেকে রাখা প্রয়োজন, তবে তুমি কেন তোমার মনকে আমার নিকট হতে ঢেকে রাখ না?’ আওরঙ্গজেব তখন সেই চাদরের দিকে তাকিয়ে দেখেন তিনি যাদের হত্যা করে সাম্রাজ্য দখল করেছিলেন তাদের কাটা মাথা সেখানে পরে আছে। তখন সারমাদ হাসতে হাসতে বলেন, ‘এখন আমায় বলো হে সম্রাট! আমি কি ঢাকবো? তোমার পাপ, নাকি আমার নগ্নতা?’

তিনি প্রীত হন আমার বিনম্র স্বভাব দেখে
মন্দ দৃষ্টি আর মদমত্ততা চুরি হয় আমার হাত থেকে,
তিনি আছেন অন্তরে; তাঁকে খুঁজে পেতে ভেতরে আমার
কী আশ্চর্য কথা, সে চোর আমাকে বাধ্য করে নগ্ন হতে।।

সুফি সাধনার পাশাপাশি সারমাদের ছিলো ভগবৎ প্রেমের অনুপ্রেরণা। এ ধারায় সাধক নিজেকে লাইলি রূপে মজনুর ইশক, রাধিকা রূপে কৃষ্ণ প্রেমের অনুসন্ধান করেন। অনুসন্ধান করেন প্রেমের মাধ্যমে মোহমুক্তি ঘটিয়ে চূড়ান্ত নির্বাণ লাভের।

দূরত্ব প্রিয়তম হতে? একমুহূর্তও নয়
সামান্য বোঝাপড়া ও ভাবনাও তাই সম্ভব নয়,
সাগরসম তাঁর কাছে এক ভাঙা পানপাত্র আমি
এমন অসাড় পাত্রে সাগর ধরবে তা কি করে হয়?

কথিত আছে ‘লা ইলাহা’ উচ্চারণের জন্য সারমাদকে রাজদরবারে অভিযুক্ত করা হয়। তাঁকে বলা হয় সম্পূর্ণ কলেমা উচ্চারণ করতে। কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানান। তিনি উত্তর দেন আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে কালেমার এই এতটুকুই স্পর্শ করতে পেরেছি তাই এর বেশি বলা আমার পক্ষে সম্ভব না। তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা হলে তিনি বলেন, তোমরা আমার মাথা কেটে ফেলো। তাহলে হয়ত আমি কালেমার বাকি পথটুকু অতিক্রম করতে পারবো। আমাকে বাঁচিয়ে রাখলেও হয়ত আমি সাধনার কোন স্থরে গিয়ে তার সন্ধান পাবো কিন্তু তা সময়সাপেক্ষ। তোমাদের মৃত্যুদণ্ডের কৃপায় তা তরান্বিত হতে পারে। আমি দ্রুতই আমার মাওলার সান্নিধ্য পেয়ে যাবো। সম্রাটের নির্দেশে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে দেখা যায় দিল্লী জামে মসজিদ থেকে সারমাদের কাটা মাথা গড়িয়ে পড়ছে আর উচ্চারণ করছে কালেমার বাকি অংশ “ইল্লাল্লাহ”…

আমি আর সে মিলে এক, যেমন শব্দ ও তার ব্যাখ্যা
দেখো বিচ্ছিন্নতায় একাত্ম হই, যেমন চোখ ও তার দেখা,
একমুহূর্তের জন্যও আমি আলাদা নই তাঁর কাছ থেকে
দেখো আমরাই যৌথ সবখানে, যেমন ফুল ও ফুলের গন্ধটা।।

…………………….
কাব্য অনুবাদ কৃতজ্ঞতা: আজহার ফরহাদ

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!