সীতারাম

নামের মাহাত্ম্য:
কলিযুগে বড় সরল-সহজ-সুগম পথ শ্রীভগবানের নাম কীর্ত্তন। নাম করতে করতে ভক্ত ‘সব শ্রীভগবান’- এই অনুভব করতে সমর্থ হন।

আকাশ একটি। ভারতের এই ‘নাম’ সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। বহির্ভারতের মানুষ অবশ ভাবে শ্বাসে প্রশ্বাসে নাম নিচ্ছে।

নাম আর নামী ভিন্ন নন।

শ্রীভগবান যেমন মৎস্যাদি অনেক অবতাররূপ ধারণ করে সাধুগনের পরিত্রাণ ও পাপাদি নাশ করেন, সেইরূপ নামও তাঁর অবতার বিশেষ।

তোরা নাম কর-নাম কর। পাপ-তাপ, রোগ-শোক, জ্বালা-যন্ত্রণা সব অবসান হবে।

যে কটি নাম উচ্চারণ করবে অথবা শ্রবণ করবে, সেগুলি সব রক্তে, মাংসে, অস্থিতে, মেদে, মজ্জায় মিশে যাবে। শরীর নামময় হয়ে যাবে।

নাম-কীর্ত্তন করতে করতে নাদের আবির্ভাব হয়। সেই নাদ হতে ওঙ্কার উদ্ভূত হন। এজন্য হরিনাম প্রণবেরও বীজ স্বরূপ।

নামী যেমন স্থির, নামও তেমনি স্থির। নামের সঙ্গ করতে করতে মন স্থির হয়ে যাবেই। সমস্ত উপাসক, যোগী জ্ঞানী এমনকি খৃষ্টান, মুসলমান পর্য্যন্ত এ নামকীর্তনে কৃতার্থ হয়ে থাকেন।

-শ্রীশ্রী সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব
… … …

তুমি-আমি:
তোমাকে যথার্থ রূপে কি করে দেখা যাবে, বোঝা যাবে, ধরা যাবে সেই কথাই মনে করছি। তুমি কৃপা না করলে তোমাকে ধরতে পারব না। বহুর মাঝে হারিয়ে ফেলে হাহাকার করছি, করবো।

শোন আমার মনের কথা-হে দয়িততম! আমি পুত্র হই আর তুমি পিতা সাজ। আমি যদি তোমার কার্য্যের, তোমার পদ্ধতির, তোমার স্নেহ-ভালোবাসার সমালোচনা করে তোমাকে দোষ দিই-বিদ্যার্জ্জনে, ধনার্জ্জনে স্বীয় সামর্থ্য প্রকট করি, সে তোমার দোষ নয়, সে দোষ আমার মলিন চিত্তদর্পণের। তুমি চির অমল, চির জাজ্বল্যমান, অতি পবিত্র, বিশুদ্ধ, পাবন।

পক্ষান্তরে আমি পিতা, তুমি যদি পুত্র সাজ- আর আমি পুত্ররূপী তোমার অশেষ দোষ আবিষ্কার করি- তোমার পিতৃভক্তি নাই, তুমি অবিনীত, অবাধ্য, পিতৃদ্রোহী বলি, তাহলে তা’ এ মলিন চিত্তদর্পণের দোষ! তুমি চিরসুন্দর, মনোরম, অভিরাম, পাবনতম। দোষ আমার।

হে বাঞ্ছিততম! তুমি যদি অগ্রজ সাজ আর আমি অনুজ হয়ে তোমার দোষ খুঁজে খুঁজে বের করতে থাকি- অগ্রজ স্নেহহীন, স্বার্থপর, আমার দ্বারা কেবল স্বার্থসিদ্ধি করতে চান বলি- সে দোষ তোমার নয়, আমার। তুমি অগ্রজ- চিরনির্ম্মল, চিরসুন্দর, সুললিত, সুশোভন, পরম পাবনতম। তোমার লেশমাত্র দোষ নাই।

আবার তুমি যদি অনুজ সাজ আর আমি অগ্রজ হয়ে তোমার ক্রটি, তোমার শত শত দোষ প্রকাশ করি- তোমার ভক্তিহীনতা, তোমার কুটিলতা, স্বার্থপরতার কথা প্রচার করতে থাকি- সে দোষ আমার। আমার মলিন দৃষ্টির, সমল চিত্তের। তুমি ঠিকই লক্ষ্মণের ও ভরতের ন্যায় ভ্রাতা। আমি আমার মহামলিন চিত্তের দোষে তোমার দোষ প্রকটিত করে বুকের ব্যথায় সারা হই।

হে সুচির-ঈপ্সিত! হে প্রাণেশ্বর! তুমি যদি পতি সাজ এবং আমি পত্নী হয়ে তোমার ভালোবাসার, তোমার প্রেমের নিন্দা করে কর্কশ ব্যবহারের কথা লোকসমাজে বলে বেড়াই, অতি হৃদয়হীন, দুঃশীল, দুর্মুখ পতি বলে যন্ত্রণা ভোগ করি- সে দোষ আমার। তুমি চিররমণীয়, মোহনীয়, কমনীয়, বরণীয়- অতি পাবনতম। তোমাকে মলিন করি আমার মহামলিন চিত্তের কালিমা দিয়ে।

আর তুমি যদি পত্নী সাজ আর আমি পতি হই এবং আমি যদি কেবল তোমার দোষ দর্শন করে তোমাকে লাঞ্ছনা করতে থাকি, কষ্ট দিই, জনসমাজে অতি দুষ্টা বলে, মুখরা, ভক্তিহীনা বলে প্রচারে রত হই- হে মহাবিশুদ্ধ! হে প্রিয়তম! সে দোষ তোমার নয়- আমার মলিন, সান্দ্র-অন্ধকার চিত্তদর্পণের।

হে ঈপ্সিততম! তুমি গুরু সাজ এবং আমি শিষ্য হয়ে যদি তোমার দোষ, তোমার ভালোবাসার বৈষম্য দেখি- তোমার পক্ষপাতিত্ব এবং আমার প্রতি অকৃপার কথা সকলকে জানাই- সে দোষ তোমার নয়- তা আমার নিবিড়, ঘন অন্ধকারে গড়া চিত্তদর্পণের।

পক্ষান্তরে তুমি শিষ্য সাজ আর আমি গুরু হই এবং কেবল তোমার সেবার ক্রটি, ব্যবহারের দোষ, তোমার কায়-বাক্য-মনের দুষ্টতা সতত আবিষ্কার করে অযোগ্য অধম শিষ্যের যন্ত্রণায় সারা হই- সে দোষ তোমার নয়, আমায় এ গাঢ় অন্ধকারে গড়া দুষ্ট চিত্তের।

প্রিয় হে! যা কিছু সব তুমি! অতি সুনির্ম্মল, চিরসুন্দর, চিরসুশীতল তুমি। আমি আমার মলিন মানস-দর্পণে তোমার শ্রীহীন ছবি অঙ্কিত করে যন্ত্রণা পাই, কত কথা বলি, নিন্দা করি, হৃদয়ের জ্বালায় অস্থির হই।

হে অতি মহাপাবন! হে অপাপবিদ্ধ নিত্য শুদ্ধ! হে দয়িত! তুমি এ চিত্তকে পরিপূত করে দাও- নচেৎ কেবল আঘাতের পর আঘাত দিয়ে তোমাকে ব্যথিত করে চলেছি কত কাল, কত জন্ম। শুধু বুঝিয়ে দাও, জানিয়ে দাও- দোষ কারও নয়- দোষ আমার। অপরের দোষ-দর্শন দূর করে দাও প্রিয়! হে নাথ! আমাকে আমার নিজের দোষদর্শনে নিরন্তর নিরত রাখ।

আমি যেন নিজের দোষ দর্শন করে একটি একটি দোষ ধরে ধরে তোমার চরণে সমর্পণ করতে সমর্থ হই। দোষের দ্বারা তোমার পূজা করে তোমার হয়ে যাই-

নত কর যত কর করহে তোমার।
কেড়ে নাও প্রিয়তম মোর অহঙ্কার।।
আমার আমিরে নাও তোমার করিয়া।
আমি-হারা হয়ে থাকি তোমার হইয়া।।

-শ্রীশ্রী সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব

… … …

হাহাকার দূর করিবার শক্তি:
আজ রোগে, শোকে, জ্বালায়, যন্ত্রণায়, অভাবে নরনারীকূল হাহাকার করিতেছে। এ হাহাকার দূর করিবার শক্তি কাহারও নাই। শাস্ত্র অবমাননার ফলে এ আগুন জ্বলিয়া উঠিয়াছে। যে স্থানে ভোগের প্রাবল্য, বুঝিতে হবে সেস্থানে শাস্ত্র ব্যাখ্যা বিকৃত। শাস্ত্রের প্রকৃত ব্যাখ্যা জানিবার ইহা একটি খুব সহজ সঙ্কেত। শাস্ত্রই শান্তির অনন্ত প্রসবণ।

এস ভ্রাতৃগণ, এস পুত্রগণ তোমরা ফিরে এস তোমাদের শান্তিরাজ্যে। ভোগমদিরা পানে উন্মত্ত হয়ে বহু জ্বালা ভোগ করিতেছ। ফিরে এস, ফিরে এস তোমাদের সংযমে, তোমাদের ত্যাগে, তোমাদের উপাসনায়, তোমাদের তপস্যায়।

বাক্যবীরে দেশ ছাইয়া গিয়াছে। শাস্ত্র ত্যাগ করিয়া সমাজ সংস্কার করিতে যাইয়া বাড়বানল জ্বলিয়া উঠিয়াছে, নিভাইয়া দাও। তোমাদের পিতৃমাতৃভক্তিতে, তোমাদের যথাকালে উপাসনায়, তোমাদের বিলাস-শূন্যতায়, তোমাদের শাস্ত্রবিহিত আহারে-বিহারে-পরিচ্ছেদে এই আগুন এমনি নিভিয়া যাইবে।

পিতামাতা গুরুজনকে ভক্তি কর, শুদ্ধাহারী, সদাচারী হও, দেখিতে পাইবে কি অনন্ত আনন্দ প্রস্রবণ তোমাদের হৃদয়ের মাঝে লুক্কায়িত আছে। সেই আনন্দ প্রস্রবণ হইতে অনন্ত অনাবিল আনন্দধারা নির্গত হইয়া তোমাকে আনন্দময়ের সম্মুখীন করিয়া দিবে।

আনন্দ ভিন্ন দর্শনের বস্তু আর সংসারের মাঝে থাকিবেন না। আনন্দ হইতে এ জগতের উৎপত্তি, স্থিতিও আনন্দে, একদিন লয়ও সেই আনন্দেই হইবে। ক্ষুদ্র বিষয়ানন্দ ত্যাগ করিতে না পারিলে সে পরমানন্দ লাভে কেহ সমর্থ হয় না, তাই আমার শাস্ত্র সংযমপথে নরনারীগণকে অহরহঃ আহ্বান করিতেছেন।

-শ্রীশ্রী সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!