ভবঘুরে কথা
খাজা গরিবে নেওয়াজ মঈনুদ্দীন চিশতী

-নূর মোহাম্মদ মিলু

বেলায়তের উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন আল্লাহর পুণ্যাত্মা বান্দাগণ আউলিয়া-এ-কেরাম হিসেবে স্বীকৃত। পাক ভারত উপমহাদেশের ইসলাম প্রচারে যাঁর অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে তিনি হলেন সুলতানুল হিন্দ আতায়ে রাসুল গরীবে নেওয়াজ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী।

খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী ৫৩৭ হিজরীতে মধ্য এশিয়ায় খোরাসানের অন্তর্গত সানজার নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ খাজা গিয়াসউদ্দীন, মাতার নাম সৈয়দা উম্মুল ওয়ারা শাহেনুর। পিতৃকূল ও মাতৃকূল উভয়দিক থেকে তিনি আল-হাসানী ওয়াল হোসাইনী বংশধরায় সম্পৃক্ততার কারণে আওলাদে রাসুলের অন্তর্ভুক্ত।

হুজুর গরীবে নেওয়াজ পিতার সান্নিধ্যে প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করেন। ৯ বছর বয়সে তরজমাসহ পবিত্র কুরআন শরীফ মুখস্থ করেন। ১৩ বছর পর্যন্ত পিতার তত্ত্বাবধানে কুরআন, হাদিস, ফিকহ্, উসুল, তাফসীর, আরবী সাহিত্য ব্যাকরণ, মানতিক, হিকমত দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে গভীর বুৎপত্তি লাভ করেন। তিনি প্রখ্যাত হাদিসবেত্তা ইমামুল হারামাইন হযরত আবুল মা’আলীর কাছে শরীয়তের বিভিন্ন সুক্ষাতিসুক্ষ্ম বিষয়ে পাণ্ডিত্য লাভ করেন।

সমরকন্দের প্রখ্যাত আলেম হযরত শরফুদ্দীন ও বোখারার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত হুসামুদ্দীনের কাছে দীর্ঘ পাঁচ বছর অধ্যয়ন করে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার কৃতিত্বপূর্ণ পূর্ণতা অর্জন করেন। খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী বোখারা থেকে নিশাপুরে আসেন। সেখানে যুগশ্রেষ্ঠ ওলী হযরত ওসমান হারুনীর কাছে মুরীদ হন এবং মুর্শীদের খেদমতে ২০ বছর অতিবাহিত করেন।

ওলীয়ে কামেল খাজা ওসমান হারুনী তার শিষ্যের মধ্যে বেলায়েতের ঝলক দেখতে পেয়ে খাজা মঈনুদ্দীন চিশতীকে খিলাফত প্রদান করেন। খাজায়ে খাজেগান আপন পীর মুর্শিদের অনুমতিক্রমে জ্ঞানী, গুণী, পণ্ডিত, দার্শনিকসহ অসংখ্য ওলীর সাথে সাক্ষাত করেন।

খাজা বাবা বাগদাদ শরীফে গাউছুল আজম বড়পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানীর সাহচর্যে ৫৭ দিন অবস্থান করেন। এ সময় গাউসে পাক খাজা বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, ইরাকের দায়িত্ব শায়েক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীকে আর হিন্দুস্থানের দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হলো। একই সুসংবাদ খাজা বাবার নিজ পীর মুর্শিদ খাজা ওসমান হারুনীর সাথে মদীনা শরীফে (অবস্থানকালে) রওছায়ে আকদাস জিয়ারতকালে নবী করিমের পক্ষ থেকে পেয়েছিলেন।

খাজা গরীবে নেওয়াজ নবীজির নির্দেশেই সুদূর আরব হতে ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান হয়ে প্রথমে লাহোর পরে দিল্লী হয়ে আজমিরে শুভাগমন করেন। ভারতবর্ষে চলছিল তখন অত্যাচারী শাসকদের শাসন। তিনি ভারতে মানুষকে শান্তির দাওয়াত দেন। তার হেদায়েতে দলে দলে লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। ফলে স্থানীয় রাজারা স্বীয় রাজ্য হারানোর ভয়ে মঈনুদ্দীন চিশতী ও তার অনুসারীদের উপর নানারকম অত্যাচার করতে চেষ্টা করে।

কিন্তু খাজা সাহেবের বেলায়েতের কাছে তাদের কোন কৌশলই ফলপ্রসূ হয়নি। বরং খাজা বাবার অনুসারীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকে। তিনি আধ্যাত্মিক ক্ষমতাবলে অতি অল্প সময়ে এতদঞ্চলে ইসলামের শান্তির বাণী প্রচার করেছেন সফলভাবে। তার নূরাণী চেহারা, রূহানী তাওয়াজ্জু এবং অলৌকিক ক্ষমতা দেখে অসংখ্য মানুষ ঈমানী সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী ৬৩৩ হিজরীর ৫ রজব দিবাগত রাত অর্থাৎ ৬ রজব সুবহে সাদেকের সময় ইন্তেকাল করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। গরীবে নেওয়াজের বড় সাহেবজাদা খাজা ফখরুদ্দীন চিশতী তার নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন।

জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার খাকীকে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পন করে সিলসিলার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। প্রতিবছর ১লা রজব হতে ৬ রজব পর্যন্ত আজমির শরীফে খাজা বাবার মাজারে অনুষ্ঠিত হয় ওরস মোবারক।

খাজা বাবার প্রত্যেকটি কার্যক্রম ছিল অলৌকিকতায় ভরপুর। খাজা গরীবে নেওয়াজের জীবদ্দশায় আজমিরবাসীরা হজ্জ সমাপনান্তে প্রত্যাবর্তন করে প্রায়শঃ বলত, “হুজুর, কাবা শরীফ হতে কখন আজমিরে আগমন করেছেন?”

উপস্থিত লোকজন প্রত্যুত্তরে বলত, “তিনি এ বছর হজ্জে গমন করেননি।” হজ্জ হতে প্রত্যাবর্তনকারীরা বলত, “তাকে আমরা অক্ষ খাজা বাবাকে কাবা শরীফ তাওয়াফ করতে দেখেছি।” এই ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, তিনি রাতে সশরীরে খানায়ে কাবা প্রদক্ষিণ করতেন এবং ভোরে আজমিরে উপস্থিত হয়ে বা জামায়াতে ফজরের নামাজ আদায় করতেন।

একদিন গরীবে নেওয়াজ সফররত অবস্থায় সাতজন অগ্নি উপাসকের একটি দলকে অগ্নিকুন্ডের পাশে পুজারত অবস্থায় দেখেন, সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন। অগ্নি উপাসকগণ হযরতের নূরাণী চেহারা দেখামাত্র তার পায়ে জড়িয়ে ধরেন।

খাজা বাবা তাদের অগ্নিপুজার উপকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেন, “হুজুর আমরা নরকের আগুন হতে রক্ষা পাবার জন্য, এর পুজা করে আসছি।” তাদের জবাব শুনে খাজা বাবা বলেন, “ওহে বোকার দল। খোদার আদেশ ব্যতীত আগুনের কোনরূপ কর্মশক্তি নাই। যে প্রভূর আদেশে আগুন কর্মক্ষম, তার উপাসনা না করে কেন তার সৃষ্টির উপাসনায় মত্ত রয়েছ?”

আগুনের পূজারিরা খাজা বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তাহলে আগুন কি আপনার ক্ষতি সাধন করতে পারে না? উত্তরে খাজা বাবা বললেন, “মঈনুদ্দীনের কথা রাখ, খোদার হুকুম ব্যতীত তার পায়ের জুতারও কোনরূপ ক্ষতিসাধন করতে পারবে না।”

এ কথা বলার সাথে সাথে খাজা বাবা নিজের জুতা জোড়া অগ্নিকুন্ডে ফেলে দিলেন। কিছুক্ষণ পর সবাই দেখল যে খাজা বাবার জুতা জোড়া বহাল রয়েছে আগুনে স্পর্শ করেনি। উক্ত আগুনের পূজারিরা খাজা বাবার অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করে গভীর আস্থার সাথে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং বহুদিন পর্যন্ত তারা খাজা সাহেবের কাছে অবস্থান করেন।

একবার এক বৃদ্ধ লোক খাজা বাবার দরবারে এসে নগরীর হাকিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলল, “হুজুর নগরীর হাকিম অন্যায়ভাবে আমার ছেলেকে হত্যা করে আমাকে পুত্রহারা করেছে। তার বিয়োগ ব্যথা আমি সহ্য করতে না পেরে আপনার কাছে এসেছি। দয়া করে এর একটা বিহিত ব্যবস্থা করুন।

খাজা তখন ওজুরত অবস্থায় ছিলেন। বৃদ্ধের এ কথা শুনে তার দয়ার সাগর উথলিয়ে উঠল। নিজের লাঠিখানা হাতে নিয়ে বৃদ্ধের বাসগৃহে যান। মৃত যুবকের কাছে উপস্থিত হয়ে তিনি কিছুক্ষণ মৌণভাব অবলম্বন করেন। উপস্থিত জনগণ, সাথী খাদেমগণ এবং বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ পরবর্তী ঘটনা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন।

অল্পক্ষণ পরে খাজা সাহেব মৌণতা ভঙ্গ করে খণ্ডিত মস্তক শরীরের সাথে যুক্ত করে যুবককে উদ্দেশ্য করে বলেন, “হে যুবক! তুমি যদি সত্যিই নিরপরাধ হও, তবে খোদার হুকুমে জিন্দা হও।” উপরোক্ত বাক্য উচ্চারণের সাথে সাথে নিহত যুবক কালেমা শরীফ পাঠ করতে করতে দাঁড়িয়ে গেল। পিতার হাতে পুনরুজ্জীবিত ছেলেকে অর্পন করে তিনি তার সঙ্গীদের নিয়ে স্বীয় আস্তানায় ফিরে আসেন।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!