স্বামী পরমানন্দ

১৩৬.
ধর্ম-শাস্ত্রাদিতে বর্ণিত সত্য হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। শুধু মুখস্ত করে অথবা ধর্মশাস্ত্রকে সিঁদুর, বেলপাতা দিয়ে পুজো করে কি লাভ?

১৩৭.
বুদ্ধি যদি বিবেকযুক্ত হয় আর হৃদয় যদি শ্রদ্ধাযুক্ত হয়, তাহলেই সে ফুটে উঠবে। আর ওই দুটোর অভাব হলেই পূর্ণতা প্রাপ্তিতে বাঁধা আসবে।

১৩৮.
বুদ্ধি যদি বিবেকযুক্ত হয় আর হৃদয় যদি শ্রদ্ধাযুক্ত হয়, তাহলেই সে ফুটে উঠবে। আর ওই দুটোর অভাব হলেই পূর্ণতাপ্রাপ্তিতে বাঁধা আসবে।

১৩৯.
সংযমের মধ্য দি আসে শৃঙ্খলা। সংযমহীন ব্যক্তিরা অশেষ ক্লেশ ও অশান্তি ভোগ করে থাকে এবং সমাজ জীবনেও বিপর্যয় ডেকে আনে।

১৪০.
অনন্তকাল ধরেও কেউ যদি যজ্ঞ, তপস্যা, সাধনা করে তাহলেও কিছু হবার নয়। যা চাই তা হলো প্রেম-প্রতিদান-প্রত্যাশারহিত প্রেম।

১৪১.
যারা বর্তমানকে অযথা নষ্ট করে, তাদের ভবিষ্যৎও নষ্ট-এটা নিশ্চিত। আর যাদের বর্তমান সুন্দর ও সংযত তাদের ভবিষ্যৎও সর্বাঙ্গসুন্দর।

১৪২.
রূপকে অর্থাৎ প্রাকৃত দেহকে প্রথমে আশ্রয় করে অপ্রাকৃত স্বরূপে পৌঁছতে হবে এবং সেখানেই শৃঙ্গারঘন রসরাজ শ্রীকৃষ্ণের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে।

১৪৩.
স্মৃতিশক্তির রহস্য হচ্ছে ব্রহ্মচর্য। ব্রহ্মচর্য পালন করতে পারলে মেধানাড়ী খুলে যায়। এই অবস্থায় মস্তিষ্কের বহু প্রসুপ্ত কোষ ক্রীয়াশীল হয়ে ওঠে।

১৪৪.
মনে রাখতে হবে স্বার্থপরতা ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতা থেকে পাপ ও অসাধুতার উৎপত্তি, আর নি:স্বার্থ প্রেম ও আত্মসংযম থেকে ধর্মের বিকাশ।

১৪৫.
নিত্য আর অনিত্যের সংজ্ঞা জানা হয়ে গেলেই তো জীবনের শিক্ষালাভ হয়ে গেল। এবার বাকি থাকে কি, না জীবনে যোজনা। সেইটাই করো।

১৪৬.
প্রত্যাশা-প্রতিদানের আশা না করে ভালোবাসতে থাকো। ভালোবেসে নিজেকে নিংড়ে নি:শেষ করে দাও। তাতেই আসবে জীবনের সম্পূর্ণ সার্থকতা।

১৪৭.
স্বার্থত্যাগ মানুষকে শান্তির দিকে নিয়ে যায়। তুমি সামান্য কষ্ট স্বীকার করলে যদি অপরের উপকার হয়, আনন্দ সহকারে তা করা তোমার কর্তব্য।

১৪৮.
যতক্ষণ না মানুষের মন অনন্তের স্পর্শ পাচ্ছে, ততক্ষণ তার সংকীর্ণতা দূর হবে না। অসীম বা অনন্তের স্পর্শ পেলেই মনের অনন্ত সমাপত্তি ঘটে।

১৪৯.
কোন মানুষের জীবনে যদি সংযম একবার করায়ত্ত হয়, তাহলে সে অনেকটাই এগিয়ে গেল। সংযমই তাকে অভীষ্টের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবে।

১৫০.
বিকেকী ও হৃদয়বান হও, অকপট হও এবং কর্মমুখর হয়ে ওঠো। আর এই কর্ম করবার জন্য চাই নৈতিক শৃঙ্খলাবোধ, শিষ্টাচার ও একপ্রাণতা।

১৫১.
যাঁর মধ্যে নারীপুরুষ কোন সংস্কার নেই অর্থাৎ লিঙ্গভেদ নেই, উচ্ছিষ্ট সংস্কার নেই, শিক্ষিত অশিক্ষিত ভেদ নেই, ধনী দরিদ্র ভেদ নেই -তিনিই বাউল।

১৫২.
পরিবারের সবার মধ্যে যদি প্রেম, ভালোবাসা, সহযোগিতা থাকে তবে তাই স্বর্গ হয়ে ওঠে আর যেখানে হিংসা, দ্বেষ, কুটিলতা, তাই হয়ে ওঠে নরক।

১৫৩.
মনই হল বন্ধন ও মুক্তির কারণ। অনিত্য বিষয়-বাসনা বিজড়িত মনই বন্ধনকারক। অনিত্য বিষয়বাসনা বিমুক্ত মন বা নিত্যমুখী মনই মুক্তি প্রদায়ক।

১৫৪.
মানুষ অপরকে সুখী করার জন্য এত যে দু:খ সহন করে, তার মূলে রয়েছে আত্মসুখত্যাগের মহিমা। কারণ ত্যাগের বেদিতেই প্রেম প্রস্ফুটিত হয়।

১৫৫.
ধর্মজীবন মানে কোনকিছুকে বিশ্বাস করে বসে থাকা বা কোন মতবাদকে বিশ্বাস করা নয়। প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে জীবনকে পরিপূর্ণরূপে ফুটিয়ে তোলা।

১৫৬.
পৃথিবীতে কেউ পরিপূর্ণ সুখী নয়। প্রত্যেকের জীবনে আছে সমস্যা ও সংকট। একমাত্র যিনি এর থেকে নির্লিপ্ত হতে পেরেছেন-তিনিই সুখী ও নিশ্চিন্ত।

১৫৭.
সর্বদা ভগবানে অকপট বিশ্বাস রাখবে, কারণ বিশ্বাস থেকে আসে শ্রদ্ধা এবং শ্রদ্ধা থেকে উৎপন্ন হয় আনুগত্য আর আনুগত্যের গীরতাই হলো উপসর্গ।

১৫৮.
প্রারব্ বশত বংশ পরম্পরার গুরুলাভ বা অন্য কোনভাবে দীক্ষা হতে পারে কিন্তু সদগুরু লাভ হয়ে না। মুমুক্ষুত্বম্ অর্থাৎ ব্যাকুলতাই সদগুরুলাভের উপায়।

১৫৯.
যিনি নিজেকে অত্যন্ত জ্ঞানী ভেবে অপরের থেকে শিক্ষাগ্রহণ করার ইচ্ছা করে না, তিনি কখনই কোন মহৎ কর্ম বা সৎকর্ম করতে সক্ষম হয় না।

১৬০.
বর্তমানে শিক্ষা কেবল একটা উপাধি ভূষণের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গভীর জ্ঞান মানুষকে করে নম্র আর বিনয়ী। হালকা শিক্ষা আনে নানা জটিলতা।

১৬১.
যেখানে যত্ন বা পুরষ্কার কেবল সেখানেই হয় কৃপা। কৃপা যত্ন সাপেক্ষ। ঈশ্বরের দিকে কেউ এক পা এগোলে তিনি তার দিকে একশ পা এগিয়ে আসেন।

১৬২.
পণ্ডিতেরা শাস্ত্রপাঠ করেছ মাত্র। তাদের সাধনা নেই। যা পড়েছে, জীবনে তার যোজনা নেই। যিনি জ্ঞানী তিনি সাধন করেছেন, জীবনে যোজনা করেছেন।

১৬৩.
তোমরা নির্মল হৃদয়ের অধিকারী হও, দেখবে এক এক করে সংশয় কেটে গিয়ে সত্যের আলো ফুটে উঠবে। একমাত্র তখনই বোধ করবে সত্যের স্বরূপ।

১৬৪.
সংসারে মানব যত নিয়ম দ্বারা মানবসমাজকে বাঁধতে চায়, মানবসমাজ ততই অনিয়ম ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ নিয়ম করলেই অনিয়ম উপস্থিত হয়।

১৬৫.
শান্তি হচ্ছে অন্তরের বোধ, অন্তরের উপলব্ধি। চিত্তের সাম্যতা আসলেই শান্তি পায় মানুষ, চিত্তের অসাম্যতা থেকে আসে অশান্তি। একে বিক্ষিপ্ত চিত্ত বলা হয়।

১৬৬.
কাম ও বাসনা তাদের মধ্যেই প্রবল যাদের শরীর বুদ্ধি প্রবল। যাদের মন শক্তিশালী তাদের এসব কম। যাদের বিবেক সবল তাদের মধ্যে ওসব থাকেই না।

১৬৭.
বীরই সত্যকে গ্রহণ করতে পারে। শক্তিমান, বীর্যবান, মেধাবানরাই সত্যকে গ্রহণ করতে পারে। সত্যকে গ্রহণ করার মত সৎসাহস খুব কম লোকেরই আছে।

১৬৮.
কর্মযোগ যার তার জন্য নয়। একমাত্র অবতার-পুরুষরা কারুর সাহায্য ব্যতিরেকেই নিষ্কাম কর্ম করতে পারেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে গুরুর দরকার হয়।

১৬৯.
ভয় দেখিয়ে বা কোন প্রলোভনে দেশজয় করা যায় মাত্র। কিন্তু মানুষের অন্ত:করণ তথা পৃথিবীজয় একমাত্র সম্ভব সেবার দ্বারা, জ্ঞানের দ্বারা ও ভালোবাসার দ্বারা।

১৭০.
যে নিজের প্রতি বিশ্বাস হারায়, সে সব কিছু হারায়। তুমি আনন্দস্বরূপ, তুমি যদি তোমাকে পেতে চাও তাহলে নিজের প্রতি আস্থা রাখ অর্থাৎ আত্মবিশ্বাসী হও।

১৭১.
ধর্মের জ্ঞান মানবকে মহান করে। মানবের এই জ্ঞানকে জীবনে যোজনা করতে হবে। এই জানা যদি জীবনে না যুক্ত হয় তাহলে সমস্তই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

১৭২.
মানুষ আসে স্বভাব-বৈশিষ্ট্য নিয়ে। ঐ স্বভাব-বৈশিষ্ট্যকে ফুটিয়ে তোলাই যথার্থ শিক্ষা। যিনি ঐ বৈশিষ্ট্যকে ধরিয়ে দিয়ে বিকাশের পথ দেখান তিনিই যথার্থ শিক্ষক।

১৭৩.
সৎসঙ্গে, সাধুসঙ্গে বিচারের ধারা বদলে যায়। বিচারের ধারা বদলেই রত্নাকর হয়েছিল বাল্মীকি। উপগুপ্তের সাথে সাক্ষাতের পর চণ্ডাশোক হয়েছিল ধর্মশোক।

১৭৪.
মানুষ যখন অপরের দোষ দেখতে শুরু করে, তখন সব দোষ তার নিজের মধ্যে বাসা বাধে। আর পরনিন্দা করা মানেই পরের দোষ কুড়িয়ে নিজেকে কলঙ্কিত করা।

১৭৫.
দল বেধে ডাকাতিও করা যায়, আবার সেবাদি ভাল কাজও করা যায়। কিন্তু দল বেধে কখনই ঈশ্বরলাভ করা যায় না। সে জন্য চাই একান্তে খোজ- কোনে বনে, মনে।

১৭৬.
পরোপকার অনুশীলনে জীবনে ত্যাগ প্রকট হয়, ভালোবাসার অনুশীলনে জীবনে প্রেম প্রকটিত হয় আর সংযম দ্বারা বা সংযমের অনুশীলনে জীবন শান্তি প্রকট হয়।

১৭৭.
ধ্যান না হলে কাঁদ। মা শিশুকে দোলনায় রেখেছেন। শিশু কাঁদলে মা এসে দোলনা থেকে তুলে নেন। মিথ্যে কাঁদলে তিনি বুঝতে পারেন এবং কাছে আসবেন না।

১৭৮.
জীবনে সত্যপালনের প্রতিজ্ঞা লও। সুচিন্তা, শুভকাজ কর এবং সত্য বল। সাধুসঙ্গ করে যাও। এগুলিই সদাচার। কেবল সদাচারের মধ্য দিয়ে সত্যকে বোধ করা যায়।

১৭৯.
যার চরিত্র নাই, তার কিছুই নাই। সমস্ত শক্তির বুনিয়াদ হল চরিত্র। মানব ব্যক্তিত্বের এটাই চাবিকাঠি। চরিত্রকে কেন্দ্র করে মানবের সমস্ত সৎগুণ বিকশিত হয়ে ওঠে।

১৮০.
স্ত্রীকে কখনও দৈহিক বা মানসিক পীড়ন করবেন না, পিতা-মাতার সেবা করবেন- দেখবেন আপনার অন্যায় যাই থাক, শাক-অন্ন খেয়েও আপনার বাড়িতে শান্তি থাকবে।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!