মতুয়া সংগীত

হরিচাঁদ জ্যেষ্ঠ পুত্র

পরিশিষ্ট খণ্ড : প্রথম তরঙ্গ
বন্দনা

জয় জয় হরিচাঁদ জয় কৃষ্ণদাস।
জয় শ্রী বৈষ্ণব দাস জয় গৌরী দাস।।
জয় শ্রী স্বরূপ দাস পঞ্চ সহোদর।
পতিত পাবন হেতু হৈলা অবতার।।
জয় জয় গুরুচাঁদ জয় হীরামন।
জয় শ্রী গোলোকচন্দ্র জয় শ্রী লোচন।।
জয় জয় দশরথ জয় মৃত্যুঞ্জয়।
জয় জয় মহানন্দ প্রেমানন্দময়।।
(জয় শ্রীসুধন্যচাঁদ সভ্যভামাত্মজ।
প্রেমানন্দে হরি গুরু শ্রীপতিচাঁদ ভজ।।)
জয় নাটু জয় ব্রজ জয় বিশ্বনাথ।
নিজ দাস করি মোরে কর আত্মসাৎ।।

ভগবান শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ উপাখ্যান।
পয়ার

হরিচাঁদ জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীগুরুচরণ।
গুরুচাঁদ নাম বলে সব ভক্তগণ।।
ঠাকুরের প্রিয় ভক্ত ছিল যত জনে।
ঠাকুর স্বরূপ বলি গুরুচাঁদে জানে।।
নির্জনেতে ভাবি হরিচাঁদের চরণ।
প্রভু গুরুচাঁদ অবতীর্ণ কোন জন।।
বহু চিন্তা করিলাম বড়ই কঠোর।
যোগাসনে রাত্রি হ’ল দ্বিতীয় প্রহর।।
এ সময় আচম্বিতে শব্দ এক হয়।
শূন্য হ’তে শুনা গেল দৈববাণী প্রায়।।
বলিলেন তোরা সবে ইষ্টজ্ঞানে সেব।
হরিচাঁদ পুত্র গুরুচাঁদ মহাদেব।।
মহাদেব কেন জন্ম নিল এই ঠাই।
ধ্যান তূল্য ভাবনা বিজ্ঞানে জ্ঞানে পাই।।
তাই লিখি চিন্তিয়া যা পাই ব্যবস্থায়।
শঙ্কর নন্দন হ’ল গণেশ তাহায়।।
পার্বতী মা পুত্র ইচ্ছা করিলেন মনে।
পুত্র চাই জানাইল শিব সন্নিধানে।।
শিব বলে মম শাপ আছে পূর্বকালে।
নিজ স্ত্রী গর্ভে কারু জন্মিবে না ছেলে।।
তুমি আমি বিহারিনু আনন্দ কাননে।
রতি ভাঙ্গিবারে চেষ্টা করে দেবগণে।।
ময়ূরকে পাঠাইল তাকে দেই শাপ।
ব্রহ্ম-ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছয় প্রস্তাব।।
ময়ূরে দিলাম শাপ দেবতা সহিতে।
পুত্র না জন্মিবে কারু সপত্নী গর্ভেতে।।
তবে যদি ওগো দেবী! পুত্র বাঞ্ছা কর।
করহ পূণ্যক ব্রত শতেক বৎসর।।
তাহা শুনি হৈমবতী ব্রত আরম্ভিল।
শতবর্ষ পরে সেই ব্রত পূর্ণ হ’ল।।
ব্রতপূর্ণ অন্তে দেবী হরিষ অন্তরে।
হরিদ্রা লইয়া যান স্নান করিবারে।।
স্নান করি এসে দেবী করে দরশন।
শয্যাপরে আছে পুত্র করিয়া শয়ন।।
হেনকালে আসিয়া কহেন মৃত্যুঞ্জয়।
পেয়েছ সাধের পুত্র ধরহ হৃদয়।।
ব্রতপূর্ণ ফলে পুত্র পেয়েছে শঙ্করী।
পুত্ররূপে কোলে পেলে গোলক বিহারী।।
পার্বতী করেন কোলে সাধনের ধন।
রূপেতে কৈলাস আলো ভুবনমোহন।।
গোলক বিহারী হরিপুত্র রূপ হ’ল।
দেখিবারে দেবগণে কৈলাসেতে এল।।
শঙ্করের পুত্র হ’ল শঙ্কট ভঞ্জন।
বাঞ্ছাপূর্ণকারী হরি জগৎ রঞ্জন।।
ভবের আরাধ্য পুত্র পাইল ভবানী।
সকলে দেখিল কিন্তু আসিল না শনি।।
সে কারণে মহাদেবী মনে হ’ল রোষ।
হেন পুত্র পাইলাম শনি অসন্তোষ।।
তাহা শুনি শনি যায় তাহাকে দেখিতে।
তার নারী ঋতুমতী ছিল সে দিনেতে।।
শনির রমণী কয় আমি ঋতুমতী।
ঋতু রক্ষা সময় হ’য়েছে কর রতি।।
শনি কহে যাব আমি কৈলাস পর্বতে।
হরি হন দুর্গা সুত তাহাকে দেখিতে।।
হেনকালে রতি! রতি না পারি করিতে।
বিশেষতঃ মাতা দুঃখী আমি না দেখা’তে।।
দেখিব গোলকনাথে পার্বতীর কোলে।
না করিব রতিক্রিয়া হেন যাত্রাকালে।।
এতবলি শনৈশ্চর করিল গমন।
শনির রমণী স্নান করিল তখন।।
ঋতু রক্ষা না করিয়া যাইবা যথায়।
যারে দেখ তার যেন মুণ্ড খ’সে যায়।।
রাগে রাগে গেল শনি ক্রোধ ছিল মনে।
রমণীর প্রতি ক্রোধ ছিল যে তখনে।।
ক্রোধভরে যায় শনি শিবের ভবন।
অই ক্রোধে পার্বতীর পুত্রকে দর্শন।।
মুণ্ড খণ্ড হ’য়ে গেল গণ্ডকী পর্বতে।
কীটরূপে শনি যায় মুণ্ড সাথে সাথে।।
কীটেতে পর্বত কাটে খণ্ড খণ্ড শীলে।
খণ্ড শিলা পড়ে গণ্ডকী নদীর জলে।।
চক্র বিশেষতে তায় হয় শালগ্রাম।
শালগ্রাম রূপেতে গোলোকনাথ শ্যাম।।
যদ্যপিও এই ভাব জাগে কারু মনে।
গোলোক নাথের মুণ্ড খ’সে গেল কেনে।।
একেত শনির নারী তাহার কোপেতে।
আর ত শনির দৃষ্টি হইল তাহাতে।।
তার মধ্যে আরো আছে পূর্বের ঘটনা।
প্রভু বুঝে হরিভক্তের মনের বাসনা।।
ভগবানের কাজ এই এক কার্য হ’তে।
স্বয়ং এর কত কাজ ঘটে সে কাজেতে।।
ব্রহ্মলোকে যাইয়া দুর্বাসা মুনিবর।
পারিজাত মালা পাইলেন উপহার।।
ব্রহ্মা বলে এই মালা যার গলে দিবে।
অগ্র পূজনীয় সেই হইবেক ভবে।।
পেয়ে হার মুনিবর ভাবে মনে মন।
এই মালা মম গলে না হয় শোভন।।
বনে থাকি বনফল করি যে আহার।
তপস্বীর কভু নাহি সাজে এই হার।।
এত ভাবি হার দিল ইন্দ্রদেবরাজে।
অহংকারে মত্ত ইন্দ্র মালা দিল গজে।।
গজের গলায় মালা বাঁধাইয়া শুণ্ড।
ছিঁড়িয়া গলার হার করে খণ্ড খণ্ড।।
ছেঁড়া হার পথে দেখি কুপিল দুর্বাসা।
ধ্যানস্থ হইয়া সব জানিল দুর্দশা।।
মুনিবর মনেতে পাইল বড় কষ্ট।
ইন্দ্রকে দিলেন শাপ হও লক্ষ্মীভ্রষ্ট।।
মালার মাহাত্ম্য আছে যে পরিবে গলে।
অগ্রপূজ্য হবে সেই ব্রহ্মাদেব বলে।।
ভবানীর পুত্র খণ্ড হ’ল যেইকালে।
চিন্তান্বিত হ’ল বড় দেবতা সকলে।।
নন্দীকে দিলেন আজ্ঞা শীঘ্র চলে যাও।
উত্তর শিয়রী যারে শয়নেতে পাও।।
কাটিয়া তাহার মুণ্ড আনিবা ত্বরায়।
সেই মুণ্ড জোড়া দিব পুত্রের গলায়।।
নন্দী গিয়া শ্বেতকরী শয়ন দেখিল।
উত্তর শিয়রী দেখি সে মুণ্ড ছেদিল।।
সেই মুণ্ড দেবগণ ধরি সকলেতে।
স্কন্ধে লাগাইয়া দিল শৈল সুতা সুতে।।
ভগবান পুত্র হ’ল জনক মহেশ।
গজানন গণশ্রেষ্ঠ নাম যে গণেশ।।
হেনপুত্র কোলে নিয়া বসিল ভবানী।
জন্ম-মৃত্যুহরা তারা গণেশ জননী।।
আর এক আছে তার দৈবের ঘটনা।
শঙ্খচূড় দৈত্য করে দেবতা তাড়না।।
দৈত্য ভয়ে ভীত সব দেবতা হইল।
দেবতার সঙ্গে শিব যুদ্ধেতে চলিল।।
সপ্ত রাত্রি সপ্তদিন যুদ্ধ করে ভোলা।
যুদ্ধকরে শঙ্খাসুরে জিনিতে নারিলা।।
দেবগণ স্তব করে বিষ্ণুর সদন।
কর প্রভু তুলসীর সতীত্ব ভঞ্জন।।
শঙ্খচূড় বেশ ধরি গিয়া নারায়ণ।
ছলে করে তুলসীর সতীত্ব হরণ।।
জানিয়া তুলসী শাপ দিলেন হরিরে।
পাষাণ হৃদয় হরি ছলিলে আমারে।।
বিনাদোষে আমার সতীত্ব বিনাশিলে।
নাহিক শীলতা তুমি হও গিয়ে শীলে।।
হরি বলে পূর্বে তুমি মোরে কৈলে আশা।
মোরে পতি পাবে ব’লে করিতে তপস্যা।।
কথা ছিল মনোবাঞ্ছা পুরাব তোমার।
সেই ছলে পতি নাশ করিনু এবার।।
আমি করি নাই তব সতীত্ব ভঞ্জন।
বাঞ্ছা পূর্ণ করি শাপ দিলে অকারণ।।
এক কার্যে দুই কার্য হইল আমার।
মোরে শাপ দিলে কেন করি অবিচার।।
পুরাতে তোমার বাঞ্ছা আসি তব ঘরে।
দেবতার উপকার করিবার তরে।।
না বুঝি শাপিলা মোরে পাষাণ হইতে।
পাষাণ হইব আমি গণ্ডকী পর্বতে।।
অন্যথা করিতে নারি তোমার এই বাক্য।
আমি শীলা হইলাম তুমি হও বৃক্ষ।।
থাকিব তোমার মূলে তোমার ছায়ায়।
ডালে ডালে মঞ্জরীতে পাতায় পাতায়।।
শালগ্রাম রূপে ব্রাহ্মণের ঘরে রব।
হেঁটে পিঠে বক্ষে বক্ষে তোমারে রাখিব।।
ভগবান এক কাজ করিতে সাধন।
বহু কর্ম তাহাতে করেন সমাপন।।
শালগ্রাম হইবে মালার সুতেতে।
গজ মুণ্ড ধরিলেন পার্বতী কোলেতে।।
মহামায়া জননীর বাঞ্ছা পূর্ণ করি।
থাকিল গণেশ রূপে আপনি শ্রীহরি।।
ভোলানাথ ভাবিলেন আমি বা কি করি।
আমার হইল পুত্র আপনি শ্রীহরি।।
অনন্ত বৃষভরূপে আমার বাহন।
গরুঢ় রূপেতে আমি বহি নারায়ণ।।
গণেশ রূপেতে হরি আমার নন্দন।
আমি পুত্র রূপ হ’য়ে ভজিব চরণ।।
শিব ভাবে হরি হ’ল আমার নন্দন।
হরির নন্দন হব আমি অভাজন।।
আমার বাসনা পূর্ণ করিব কোথায়।
পুত্ররূপে জন্ম লব গিয়া নদীয়ায়।।
এইবার সেই লীলা করে নারায়ণ।
অবশ্য হইব আমি হরির নন্দন।।
জীব উদ্ধারিতে প্রভু করিলে প্রতিজ্ঞে।
ভক্ত পারিষদ সব পাঠাইল অগ্রে।।
স্বয়ং এর অবতার হয় যেই কালে।
আর আর অবতার তাহে এসে মিলে।।
কেহ অগ্রে আসে কেহ পশ্চাতে আইসে।
লীলা প্রভাবেতে কালে তার মধ্যে মিশে।।
সেই মহাদেব অগ্রে এসে শান্তিপুর।
ভক্তি প্রচারিল হ’য়ে অদ্বৈত ঠাকুর।।
কৃষ্ণভক্তি নিন্দা শুনি পাষণ্ডীর মুখে।
পণ কৈল প্রভুকে আনিব মর্তলোকে।।
লয়ে ফুল তুলসী করিল অঙ্গীকার।
অদ্বৈত হুঙ্কারে হ’ল গৌর অবতার।।
সেও লীলা সাঙ্গ করি ভাবে পঞ্চানন।
এবার না হ’ল মম বাসনা পূরণ।।
শেষ লীলা হ’ল যশোমন্তের তনয়।
অবতীর্ণ হ’ল হরি সফলাডাঙ্গায়।।
শিব ভাবে হেন দিন আর কবে পাব।
এবার প্রতিজ্ঞা মম পূরণ করিব।।
বহুদিন পর এই হয়েছে সময়।
এবার হইব আমি প্রভুর তনয়।।
প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করিবারে পঞ্চানন।
ওঢ়াকাঁদি করিলেন জনম গ্রহণ।।
জন্মিলেন শান্তিদেবী মায়ের উদরে।
নিজের প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করিবার তরে।।
আরো কথা তার মধ্যে জীব পরিত্রাণ।
সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম প্রেম সুধাদান।।
অলৌকিক লীলারস পারিনে বর্ণিতে।
কথঞ্চিৎ বলি সেই প্রভুর কৃপাতে।।
হরিপাল গিয়াছিল প্রভুর সদনে।
সম্পত্তি বাড়িবে এই বাঞ্ছা করি মনে।।
প্রচুর সম্পত্তি তার হ’ল অল্প দিনে।
তার হ’ল গাঢ় ভক্তি প্রভুর চরণে।।
উঠিল প্রেমের ঢেউ তাহার হৃদয়।
এ সকল হল গুরুচাঁদের কৃপায়।।
যখনেতে প্রভু কৈল লীলা সম্বরণ।
ভক্তগণ কাঁদে ধরি প্রভুর চরণ।।
ওহে প্রভু আমাদের তুমি ছেড়ে গেলে।
কেমনে রাখিব প্রাণ দেহ তাহা বলে।।
ঋমণি নামিনী রামকুমারের ভগ্নী।
যম বুড়ি নাম গঙ্গাচর্ণা নিবাসিনী।।
ইত্যাদি অনেক ভক্ত কাঁদিতে লাগিল।
প্রভু বলে আমিত তোদের চিরকাল।।
“আমি নাহি ছেড়ে যাব জানিও বিশেষ।
গুরুচাঁদ দেহে এই করিনু প্রবেশ।।
গুরুচাঁদে ভকতি করিস মোর মত।
যাহা চা’বি তাহা পাবি মনোনীত যত।।”
এই সেই মহাপ্রভু পিতৃধর্ম রাখে।
মধুর মাধুর্য রস ঐশ্বর্যতে ঢেকে।।
জীবেরে ভুলায় প্রভু দেখায়ে ঐশ্বর্য।
প্রেমিক ভক্তের স্থানে গড়াল মাধুর্য।।
প্রধান গার্হস্থ ধর্ম গৃহস্থের কাজ।
পয়ার প্রবন্ধে কহে কবি রসরাজ।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!