হায়দার বাবা

-মূর্শেদূল মেরাজ

ব্যবসার জন্য বিদেশী বণিকদের কাছে ভারতবর্ষ বরাবরই ছিল অন্যতম আকর্ষণ। এদেশ থেকে পণ্য নিয়ে যেমন সওদাগরেরা বিভিন্ন দেশে বিক্রি করে মুনাফা করতো। তেমনি বিভিন্ন দেশ থেকে নানা পণ্য নিয়ে সওদাগরেরাও আসতো এদেশে বিক্রির জন্য। ব্যবসার উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশ থেকে বণিকরা যেমন নোঙ্গর করতো ভারতবর্ষের বিভিন্ন বন্দরে। তেমনি স্থলপথে আসতো কাফেলার পর কাফেলা।

কথিত আছে, তেমনি আঠারো শতকের দিকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলে ইরান থেকে আসে বেশ কয়েকজন সওদাগর। তাদেেই এক পরবর্তী প্রজন্ম রমজান আহমেদ নামের জনৈক ব্যক্তি চট্টগ্রাম থেকে পানিপথে ঢাকার সদরঘাটে চলে আসেন।

ঢাকায় আসার পর রমজান আহমেদ এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে তার পুত্র মঞ্জুরুল হোসেনের ঘরে জন্মগ্রহণ করে এক পুত্র। ২৫ ডিসেম্বর ১৯২৩ সালে ঢাকার নবাবপুরের জহুরিটোলায় জন্মানো সেই পুত্রের নাম রাখা হয় জুলফিকার হায়দার শাহ্। এই জুলফিকার হায়দার শাহ্’ই পরবর্তীতে ভক্তদের মাঝে ‘হায়দার বাবা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

জানা যায়, হায়দার শাহ্’র জন্মের আগেই তার পিতা মারা যান। মাও মারা যান তার বয়স যখন মাত্র চার। পিতামাতাহীন হায়দার দাদাজানের কাছেই প্রতিপালিত হন। হায়দার শাহ ঢাকা শহরে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সেখানে তিনি ইংরেজি ও আরবি সাহিত্যে এমএ করেন। ১৯৫৭ সালের দিকে দাদার আদেশে দেশে এসে বিয়ে করেন ফরিদা বানুকে। তাদের ঘরে জন্মে তিন পুত্র ও এক কন্যা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হলেও উর্দু, ফার্সি, আরবি, ইংরেজি ভাষায় অনূদিত ধর্মীয় বই পড়া ছিল হায়দার শাহ্’র নেশা। সারাক্ষণই তাতে মশগুল থাকতেন তিনি।

ষাটের দশকে হায়দার শাহ্ চাকরিতে যোগ দেন। প্রথমে আদমজী জুট মিলে প্রশাসনিক শাখার কর্মকর্তা হিসেবে, এরপর এক এক করে সুগার মিল, সুপারসাইন ক্যাবলস, প্যারাডাইস ক্যাবলস, দি মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক, হাবিব ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

১৯৭০ সালের দিকে তার ভেতরে পরবর্তী আসতে শুরু করে। চাকরিতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না। সে সবে ইস্তফা দিয়ে নামাজ, রোজা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরেন। এরপরও কোম্পানির লোকজন বিভিন্ন কাজ নিয়ে এলে তিনি বাসায় বসেই তা করে দিতেন।

১৯৭৪ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার বৈরাগ্যভাব প্রকট হয়। তিনি হাঁটতে শুরু করেন পথে পথে। ১৯৭৭ সালের দিকে তা বাড়তে শুরু করে। জানা যায়, সেসময় তিনি সকালে বের হয়ে পুরান ঢাকার বিভিন্ন পথঘাট হেঁটে জুরাইন কবরস্থানের গিয়ে বসে থাকতেন। মাঝেমধ্যে মিরপুর শাহ আলী’র মাজারেও যেতেন।

তবে সেসময় সারাদিন হাঁটাহাঁটি করলেও রাতে ঘরে ফিরে আসতেন। কিন্তু ১৯৮০ সালের দিক থেকে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। আর ঘরে ফেরা হয় না হায়দার শাহ্’র। রাস্তাতেই থাকতে শুরু করেন। তার ভিন্ন ধরনের আচরণ লোকের চোখে পরতে শুরু করে। লোকে অবাক হয়ে দেখেন এতো বড় চাকুরে সব কিছু ছেড়ে পথে পথে হাঁটছেন।

অনেকে হাসি তামাসা করতো। নানা কথা বলতো। কিন্তু তিনি কিছু বলতেন না কেবল হাঁটতেন আর হাঁটতেন। ধীরে ধীরে লোকে বুঝতে শুরু করে তার ভেতরে আধ্যাত্মিকতা উদয় হয়েছে। তার কাছে নানা আবদার নিয়ে লোক ভিড় করতে শুরু করেন। এভাবেই লোকমুখে তিনি হায়দার শাহ্ থেকে হয়ে উঠেন ‘হায়দার বাবা’।

১৯৮০ সালের আগে হায়দার বাবার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ এসবের বেশিভাগই লোকমুখে শোনা কথা। তিনি ভক্ত আশেকানের হৃদয়ে হায়দার বাবা রূপেই বিরাজ করেন।

হায়দার বাবা অধিকাংশ সময়ই আত্মমগ্ন থাকতেন-ধ্যান করে কাটাতেন। নামাজ-জিকিরে মশগুল থাকতেন। সে সময় তার কাছে কেউ কোনো আশায় আসলে তা বলবার আগেই বুঝে যেতেন। তারা কী সমস্যা নিয়ে এসেছে। প্রায় সময়ই বলতেন, ‘যাও দুই রাকআত নামাজ পড় তোমার কাজ হয়ে যাবে।’

তার কথা মান্য করায় লোকেদের সমস্যা যখন সমাধান হতে থাকলো; তখন লোকমুখে তা চারদিকে ছড়িয়ে পরতে লাগলো। তার কাছে গেলেই আশাপূর্ণ হয় এমন কথা ছড়িয়ে পরায় ভক্ত-আশেকানের ভিড় বাড়তে শুরু করে।

আশির দশকের পর হায়দার বাবা কথা বলা বন্ধ করে দেন। এসময় থেকে আর কখনোই ভাত বা ভারি খাবারও আর খেতেন না। একই পোষাকে থাকতেন দিনের পর দিন। দুনিয়ার কোনো কিছুর প্রতিই তার আর কোনো আগ্রহ ছিল না। একমাত্র কাজ হেঁটে চলা।

হাঁটতে হাঁটতে কখনো হঠাৎ দাঁড়িয়ে পরতেন। কখনো বা অপলক তাকিয়ে থাকতেন আকাশের দিকে। কিছু সময় পর আবার হাঁটতে শুরু করতেন। তার এই হাঁটাহাঁটি দেখে উৎসুক মানুষ নাম দেন ‘হাঁটাবাবা’। শুধু ভক্ত আশেকানরাই না উৎসুক জনতাও ভিড় করতো তার চারপাশে।

১৯৯০ সালের দিকে হায়দার বাবাকে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার তাজমহল রোডে প্রায়ই হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যেত। বিষয়টা লক্ষ্য করে স্থানীয়রা তাজমহল রোড ঈদগাহ মসজিদের সামনে একটা ছোট্ট কক্ষে বাবার জন্য একটা দরবার করে দেন। দরবার হওয়ার পর হায়দার শাহ্‌ প্রায়ই সেখানে যেতেন। রাত্রি যাপনও করতেন।

হায়দার বাবা কথা বলা বন্ধ করে দেয়ার পর নানা সমস্যা নিয়ে আসা আগত লোকজন সমস্যায় পরে যায়। তারা অনেক কিছু বললেও বাবা উত্তর দিতেন না। একসময় তারা বুঝতে শুরু করে বাবার সঙ্গে হাঁটলে সকল বিপদ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। এই বিশ্বাসেই সকলে তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে।

ভোর ভোর ভক্তরা এসে জড়ো হতো বাবার আস্তানায়। কখন বাবা উঠবেন সেই ভাবনা সকলে অপেক্ষা করতেন। বাবার জন্য সাথে করে নিয়ে আসতেন নানান বাহারি খাবার। তবে হায়দার বাবা সেসব বিশেষ খেতেন না। ঘুম থেকে উঠেই হাঁটতে শুরু করতেন। ভক্তরা ব্যাগে করে খাবার, ফ্লাক্সে করে চা নিয়ে তার পিছন পিছন হাঁটতেন যদি বাবা খায়।

হায়দার বাবার ভক্ত কেবল নিম্নবৃত্তের মানুষ ছিল তা কিন্তু নয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর, বিভিন্ন পেশার মানুষজন ছিল তার ভক্ত। ধনী-গরীব সকল শ্রেণীর মানুষ বাবার পেছন পেছন হাঁটতেন। যদি বাবার দয়া হয়। বাবার কৃপা পাওয়ার আশায় অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিও বাবার পেছন পেছন হাঁটতেন।

বাবা কারো সাথে কথা বলতেন না। তেমন কিছু খেতেনও না। তবে মাঝে মধ্যে চা-বিস্কুট খেতেন। সকল সময়ই ধ্যানে মশগুল থাকতেন। তা সে হাঁটার সময় হোক বা হাঁটতে হাঁটতে থমকে যাওয়ার সময়ই হোক বা বিশ্রাম নেওয়ার সময়ই হোক।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাবার সাথে হাঁটা মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকতো। গন্তব্য কোথায় কেউ জানে না। বেশিভাগ সময় শহরের মধ্যে হাঁটলেও বাবা মঝেমধ্যে শহরের বাইরেও চলে যেতেন। এমনকি হাঁটতে হাঁটতে ঢাকার বাইরে গাজীপুর, সাভার, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, পাবনা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থানে চলে যেতেন বলেও তার ভক্তদের কাছ থেকে জানা যায়।

হায়দার বাবা যখন হাঁটতেন অনেক সময়ই রাস্তায় ছোটখাটো যানজট লেগে যেত। তার ভক্ত-আশকানরা যানবাহন-মানুষ সরিয়ে বাবাকে হাঁটার জায়গা করে দিতো। এই মিছিলের মতো মানুষজনের হেঁটে চলা দেখে অনেকে বিরক্ত হতেন। আবার যারা হায়দার বাবার মহিমা জানতেন তারা দুই হাত জড়ো করে ভক্তি দিতেন।

বাবার ভক্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় তাজমহল রোডের সেই ছোট্ট কক্ষে তাদের জায়গা দেয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয়দের অর্থে ২০০০ সালের দিকে মোহাম্মদপুরেরই নুরজাহান রোডে একটা জায়গা কিনে ২০০২ সালে দরবার তৈরি করা হলে বাবা সেখানে বসতে শুরু করেন।

সারাদিন বিভিন্ন পথঘাটে হেঁটে রাত হলে বাবা দরবারের দিকে হাঁটতে শুরু করতেন। সেখানে গিয়ে ঘুমিয়ে পরতেন। এভাবেই তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় মানে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত হেঁটে চলেছেন এই শহরের বুকে। অনেকে তাকে বলতো পাগল, অনেকে বলতো ভণ্ড। তাতে তার কিছু এসে যেত না। তিনি সেসবে কান দেন নি কখনো। যারা তাকে চিনতে পেরেছিল তারা তাকে ভক্তি করেছেন-মর্যাদা দিয়েছেন।

তার ভক্ত-মুরিদ-আশেকানরা বাবার নানান অলৌকিক কীর্তির কথা বলেন। বলেন বাবার কাছে আসার পর তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা। মনোবাসনা পূর্ণ হওয়ার অগুণিত ঘটনা শোনা যায় তাদের মুখে।

বিশ্বাসীরা বলেন, স্রষ্টার সাথে যখন সৃষ্টির সরাসরি সংযোগ স্থাপন হয় তখন তাদের কাছে দুনিয়ার সমস্ত কিছু তুচ্ছ হয়ে যায়। মানুষকে পথ দেখাতে তারা পথ নামে। মানুষের কল্যাণে তারা জীবন উৎসর্গ করে। কেবল পরিবারের কাছে নয় তারা বেঁচে থাকে ভক্তকুলের হৃদয়ে। ভক্তদের চোখে হায়দার বাবা তেমনি একজন কামেল মানুষ। যিনি মুর্শিদ রূপে এই ধরাধামে এসেছিলেন।

বৃহস্পতিবার ১৩ মার্চ ২০১৪ সালের ভোরে হায়দার বাবা দেহত্যাগ করেন। হায়দার বাবাকে ঢাকার মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডে সমাহিত করা হয়। তার মাজারকে ঘিরে প্রতিবছর ওরশ পালন হয়। এতে যোগ দেয় বাবার ভক্ত-মুরিদ-আশেকান সহ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ।

…………………………………………….
আরো পড়ুন : মাজ্জুব ওলিদের মর্যাদা

…………………………….
কৃতজ্ঞতা:
হায়দার বাবার দরবার শরীফ

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!