ভবঘুরেকথা
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

১৮৮৫, ২৫শে ফেব্রুয়ারি
গিরিশের শান্তভাব, কলিতে শূদ্রের ভক্তি ও মুক্তি
শ্রীরামকৃষ্ণ – আর আছে স্বপ্নসিদ্ধ আর কৃপাসিদ্ধ।

এই বলিয়া ঠাকুর ভাবে বিভোর হইয়া গান গাহিতেছেন:

শ্যামাধন কি সবাই পায়,
অবোধ মন বোঝে না একি দায়।
শিবেরই অসাধ্য সাধন মনমজানো রাঙা পায়।।
ইন্দ্রাদি সম্পদ সুখ তুচ্ছ হয় যে ভাবে মায়।
সদানন্দ সুখে ভাসে, শ্যামা যদি ফিরে চায়।।
যোগীন্দ্র মুনীন্দ্র ইন্দ্রদ্র যে চরণ ধ্যানে না পায়।
নির্গুণে কমলাকান্ত তবু সে চরণ চায়।।

ঠাকুর কিয়ৎক্ষণ ভাবাবিষ্ট হইয়া রহিয়াছেন। গিরিশ প্রভৃতি ভক্তেরা সম্মুখে আছেন। কিছুদিন পূর্বে স্টার থিয়েটারে গিরিশ অনেক কথা বলিয়াছিলেন; এখন শান্তভাব।

শ্রীরামকৃষ্ণ (গিরিশের প্রতি) – তোমার এ ভাব বেশ ভাল; শান্তভাব, মাকে তাই বলেছিলাম, মা ওকে শান্ত করে দাও, যা তা আমায় না বলে।

গিরিশ (মাস্টারে প্রতি) – আমার জিব কে যেন চেপে ধরেছে। আমায় কথা কইতে দিচ্ছে না।

শ্রীরামকৃষ্ণ এখনও ভাবস্থ অনতর্মুখ। বাহিরের ব্যক্তি, বস্তু ক্রমে ক্রমে সব ভুলে যাচ্ছেন। একটু প্রকৃতিস্থ হইয়া মনকে নাবাচ্ছেন। ভক্তদের আবার দেখিতেছেন। (মাস্টার দৃষ্টে) এরা সব সেখানে (দক্ষিণেশ্বরে) যায়; – তা যায় তো যায়; মা সব জানে।

(প্রতিবেশী ছোকরার প্রতি) – “কিগো! তোমার কি বোধ হয়? মানুষের কি কর্তব্য?”

সকলে চুপ করিয়া আছেন। ঠাকুর কি বলিতেছেন যে ঈশ্বরলাভই জীবনের উদ্দেশ্য?

শ্রীরামকৃষ্ণ (নারায়ণের প্রতি) – তুই পাস করবিনি? ওরে পাশমুক্ত শিব, পাশবদ্ধ জীব।

ঠাকুর এখন ভাবাবস্থায় আছেন। কাছে গ্লাস করা জল ছিল, পান করিলেন। তিনি আপনা-আপনি বলিতেছেন, কই ভাবে তো জল খেয়ে ফেললুম!

[শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রীযুক্ত অতুল – ব্যাকুলতা ]

এখনও সন্ধ্যা হয় নাই। ঠাকুর গিরিশের ভ্রাতা শ্রীযুক্ত অতুলের সহিত কথা কহিতেছেন। অতুল ভক্তসঙ্গে সম্মুখেই বসিয়া আছেন। একজন ব্রাহ্মণ প্রতিবেশীও বসিয়া আছেন। অতুল হাইকোর্ট-এর উকিল।

শ্রীরামকৃষ্ণ (অতুলের প্রতি) – আপনাদের এই বলা, আপনারা দুই করবে, সংসারও করবে, ভক্তি যাতে হয় তাও করবে।

ব্রাহ্মণ প্রতিবেশী – ব্রাহ্মণ না হলে কি সিদ্ধ হয়?

শ্রীরামকৃষ্ণ – কেন? কলিতে শূদ্রের ভক্তির কথা আছে। শবরী, রুইদাস, গুহক চণ্ডাল – এ-সব আছে।

নারায়ণ (সহাস্যে) – ব্রাহ্মণ, শুদ্র, সব এক।

ব্রাহ্মণ – এক জন্মে কি হয়?

শ্রীরামকৃষ্ণ – তাঁর দয়া হলে কি না হয়। হাজার বৎসরের অন্ধকার ঘরে আলো আনলে কি একটু একটু করে অন্ধকার চলে যায়? একেবারে আলো হয়।

(অতুলের প্রতি) – “তীব্র বৈরাগ্য চাই – যেন খাপখোলা তরোয়াল। সে বৈরাগ্য হলে, আত্মীয় কালসাপ মনে হয়, গৃহ পাতকুয়া মনে হয়।

“আর আন্তরিক ব্যাকুল হয়ে তাঁকে ডাকতে হয়। আন্তরিক ডাক তিনি শুনবেনই শুনবেন।”

সকলে চুপ করিয়া আছেন। ঠাকুর যাহা বলিলেন, একমনে শুনিয়া সেই সকল চিন্তা করিতেছেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ (অতুলের প্রতি) – কেন? অমন আঁট বুঝি হয় না – ব্যাকুলতা?

অতুল – মন কই থাকে?

শ্রীরামকৃষ্ণ – অভ্যাসযোগ! রোজ তাঁকে ডাকা অভ্যাস করতে হয়। একদিনে হয় না; রোজ ডাকতে ডাকতে ব্যাকুলতা আসে।

“কেবল রাতদিন বিষয়কর্ম করলে ব্যাকুলতা কেমন করে আসবে? যদু মল্লিক আগে আগে ঈশ্বরীয় কথা বেশ শুনত, নিজেও বেশ বলত; আজকাল আর তত বলে না, রাতদিন মোসাহেব নিয়ে বসে থাকে, কেবল বিষয়ের কথা!”

[সন্ধ্যা সমাগমে ঠাকুরের প্রার্থনা – তেজচন্দ্র ]

সন্ধ্যা হইল; ঘরে বাতি জ্বালা হইয়াছে। শ্রীরামকৃষ্ণ ঠাকুরদের নাম করিতেছেন, গান গাহিতেছেন ও প্রার্থনা করিতেছেন।

বলিতেছেন, “হরিবোল, হরিবোল, হরিবোল”; আবার “রাম রাম রাম”; আবার ‘নিত্যলীলাময়ী’। ওমা, উপায় বল মা! “শরণাগত, শরণাগত, শরণাগত”!

গিরিশকে ব্যস্ত দেখিয়া ঠাকুর একটু চুপ করিলেন। তেজচন্দ্রকে বলিতেছেন, তুই একটু কাছে এসে বোস।

তেজচন্দ্র কাছে বসিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে মাস্টারকে ফিস্‌ফিস্‌ করিয়া বলিতেছেন, আমায় যেতে হবে।

শ্রীরামকৃষ্ণ – আমি ওদের অত টানি কেন? ওরা নির্মল আধার – বিষয়বুদ্ধি ঢোকেনি। থাকলে উপদেশ ধারণা করতে পারে না। নূতন হাঁড়িতে দুধ রাখা যায়, দই পাতা হাঁড়িতে দুধ রাখলে দুধ নষ্ট হয়।

“যে বাটিতে রসুন গুলেছে, সে বাটি হাজার ধোও, রসুনের গন্ধ যায় না।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!