আল-বেরুনী

জ্ঞানপিপাসু আল-বিরুনী: পর্ব এক

-মাবরুকা রাহমান

আল-বিরুনী [৯৭৩- ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দ]

ইতিহাসের পাতায় পাতায় অসংখ্য মহান মনীষীর জীবন গল্প আমরা পাই। কেউ ধর্মীয় গুরু, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ গণিতবিদ আবার কেউ হয়ত কবি। আজ আমরা এমন এক মনীষী সম্পর্কে জানবো যিনি একাধারে ছিলেন, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, গণিতবীদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গবেষক, ভাষাতত্ত্ববিদ, ঐতিহাসিক, ভূগোলবিদ, ধর্ম নিরপেক্ষ বিশ্লেষক, দার্শনিক।

এত সব সম্ভাষণেও তাকে ব্যাখ্যা করা যায় না, এত সম্ভাষণও কম মনে হয় তার জন্য। তিনি হচ্ছেন ইতিহাস সৃষ্টিকারী মুসলিম পণ্ডিত ব্যক্তি আল-বিরুনী।

বলা হয় ইসলামী ইতিহাস নয় বরং বিশ্ব ইতিহাসে উনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ব্যক্তি, এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূত্রপাতও তার হাত ধরেই হয়। এরকম বহুগুণে গুণান্বিত মৌলিক চিন্তার মানুষ ইতিহাসে খুব কমই আছেন।

আল বিরুনীর পূর্ণ নাম হচ্ছে আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনী। তার জন্ম বর্তমান রুশীয় তুর্কিস্তানের থিওয়ায়। তার ছোট বেলা কাটে দারিদ্রে। তবু তার মা চাইতেন ছেলে তার বিজ্ঞানী হবে, পরম করুনাময়ের দয়ায় মানবকল্যাণের কাজ করবে।

কিন্তু দারিদ্রতার কারণে আল বিরুনীকে অনেকটা সময় ব্যয় করতে হতো কাজের জন্যও। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বালক বয়সেই তিনি পবিত্র কোরান মুখস্থ করে ফেলেছিলেন। আল বিরুনীর মাতৃভাষা ইরানী হলেও তিনি বহু রকম ভাষা শিখে ছিলেন।

তার শহরে ভারত বা গ্রীক থেকে আসা বণিকদের সাথে তিনি কথা বলতেন। তাতে বণিকরা বাণিজ্য করতে পারতো তার কাছ থেকে তার ভাষা শিখে নিয়ে। আর তিনিও ওদের ভাষা শিখে নিতেন জ্ঞান আরোহনের পথ সহজ করতে।

যে মানুষ এতগুলো ভাষা চমৎকার ভাবে মনে রাখতে পারে তার স্মৃতি কত ক্ষুরধার তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই গ্রীক উদ্ভিদবিজ্ঞানীর মধ্য দিয়েই তার বিজ্ঞানের পথে যাত্রা। বিজ্ঞানী তার নিজ দেশে ফেরার আগে আল বিরুনীকে নিয়ে যায়। খাওয়ারিজিমের একজন রাজপুত্র আবু নাসের মনসুর, যিনি নিজেও একজন জ্ঞানী শিক্ষাবিদ, তার প্রাসাদে তার কাছে শিক্ষা গ্রহণের জন্য।

এবং তার স্মরণ শক্তি কতটা প্রখর ছিল সে ব্যাপারে আরও একটা ঘটনার উদাহরণ হলো, একদিন তিনি তার মায়ের সাথে বনে কাঠ কুড়ানোর সময় তার মা ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন যখন। তখন তিনি তার মাকে একটা পাতাসহ ডাল এনে দেখিয়ে বলেন, দেখো মা এ পাতাটা আগে এখানে ছিলো না। এটা নতুন।

তার মা অবাক হয়ে বলেন, তার মানে তুমি একখানের সমস্ত উদ্ভিদ ও তার পাতা চেনো? আল বিরুনী হেসে বললেন, হ্যাঁ মা, আমি এখানের সমস্ত পাতা এবং এদের আকার ধরণ সম্পর্কে জানি। যাওয়া আসার পথে আমি এদের চিনে রাখতাম। তার এই বক্তব্যে তার মা মুগ্ধ হন।

পরবর্তীতে এই বনেই কাজ করতে করতে তিনি এক গ্রীক উদ্ভিদবিদের সহচার্যে আসেন। এবং তার বিজ্ঞানের পথে পথচলার সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে তিনি কেবল উদ্ভিদ বিজ্ঞানই নয়, বরং বিজ্ঞানের আরও বহু শাখায় বহু নতুন দিক উন্মোচন করেন।

এই গ্রীক উদ্ভিদবিজ্ঞানীর মধ্য দিয়েই তার বিজ্ঞানের পথে যাত্রা। বিজ্ঞানী তার নিজ দেশে ফেরার আগে আল বিরুনীকে নিয়ে যায়। খাওয়ারিজিমের একজন রাজপুত্র আবু নাসের মনসুর, যিনি নিজেও একজন জ্ঞানী শিক্ষাবিদ, তার প্রাসাদে তার কাছে শিক্ষা গ্রহণের জন্য।

এবং আবু নাসেরের সহযোগিতায় তিনি তৎকালীন বিজ্ঞানী ‘আব্দুল সামাদ আল হাকিম’-এর কাছে জ্যোতির্বিজ্ঞান শেখা আরম্ভ করেন।

শীগ্রই তিনি দুটো মৌলিক মূল্যবান তথ্য আবিষ্কার করেন-

এক- তিনি পৃথিবীর পরিধি এবং বিভিন্ন শহরের দ্রাঘিমাংশ অক্ষাংশ নির্ণয় করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এবং নিকোলাস কোপারনিকাসের চারশ বছর পূর্বেই তিনি ধারণা দেন যে পৃথিবী স্থির নয় বরং এটি অন্য সব গ্রহের মতই সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে নির্দিষ্ট কক্ষপথ ধরে আর নিজের অক্ষের উপরেও ঘুরে।

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এত দূরদর্শী চিন্তা করেও ইতিহাসের পাতায় এরকম এক যুগান্তকারী চিন্তারজনক হিসেবে তার নাম প্রথমে আসে না।

আল বিরুনী ছিলেন বিনয়ী। জ্ঞান আহরণে আগ্রহী।

তিনি আবু নাসের রাজ্যত্বকালে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্যে এক বিশাল গবেষণাগার নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি রাত দিন কাজ করতেন। আরও পরীক্ষানিরীক্ষার আয়োজনও করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে খাওয়ারিজিমের তৎকালীন সুলতানের মৃত্যুর পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন তিনি শহরে থাকবেন না।

তিনি নানান দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াবেন যেহেতু বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি সংস্কার এবং ইতিহাস নিয়েও তার গভীর আগ্রহ।

তার উল্লেখযোগ্য রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে, ‘নেচার অফ গড’, ‘স্কুবা ডাইভিং ইন ১০০০ এডি’, ‘দ্যা গ্রেট আর্ট অফ হিন্দুস’, ‘দ্যা প্রোপার্টিস অফ চাইনীজ টি’, ‘পাওয়ার অফ মুনলাইট’, ‘হোয়াই দ্যা আর্থ ইজ রাউন্ড’, ‘জিওমেট্রি অফ ফ্লাওয়ারস’, ‘নেচার অফ টাইম’, ‘ল’স অফ নেচার’, ‘সোলার আন্ড লুনার ইয়ার’, ‘দ্যা পারফিউম আর্ট’ প্রভৃতি।

নতুন সুলতান মামুন ইবনে মুহাম্মদের ওখানে থেকেই দায়িত্ব আগের মতই পালন করার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি বেড়িয়ে পড়েন দেশ বিদেশ ঘুরে জ্ঞান অর্জন করবার জন্য।

এভাবেই তিনি পরিচিত হতে থাকেন নানান শাসকদের সাথে। কেবল মাত্র তার জ্ঞানের প্রতি গভীর ভালোবাসাই সকলের সাথে তার সম্পর্ক গভীরই করে তুলতে থাকে। অনেকের রাজ্যেই তিনি থাকেন, জ্ঞান লাভ করতে, আবার বেড়িয়ে পড়েন।

এরকমই এক শাসক শামস আল মাউলির রাজ্যে তিনি প্রায় দশ বছর কাটান। যেখানে তিনি ঔষধি গাছের গুণাবলী নিয়ে একটি বই রচনা করেন এবং তা উৎসর্গ করেন সুলতানের নামে।

সুলতান বিস্মিত হয়ে জানান বিরুনী জ্যোতির্বিজ্ঞানী তা তিনি জানতেন কিন্তু সাথে যে উদ্ভিদ বিজ্ঞানীও সেটা তার জানা ছিল না।

সেখানেই তিনি পরবর্তীতে রচনা করেন ‘দ্যা রিমেইনিং সাইনস অফ পাস্ট সেঞ্চুরি’ যা মূলত ইতিহাস নির্ভর বই। যেখানে তিনি নানান জাতির সংস্কৃতি, ধর্ম, জীবন নিয়ে লিখেছেন।

আল বিরুনী এমন একজন ব্যক্তি যিনি যে বিষয়ই আগ্রহী হয়েছেন সে বিষয় নিয়েই কোন না কোন নতুন দ্বার উন্মোচন করেছেন। তিনি ত্রিকোনমিতি নিয়ে লিখেছেন, নির্ণয় করেছেন মিনিট আর সেকেন্ডের হিসাব।

এক সূত্র মতে, তিনি জীবদ্দশায় একশত তেরোটি রচনা লিপিবদ্ধ করেছেন। অপর সূত্র মতে, তিনি প্রায় একশত আশিটি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

তার উল্লেখযোগ্য রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে, ‘নেচার অফ গড’, ‘স্কুবা ডাইভিং ইন ১০০০ এডি’, ‘দ্যা গ্রেট আর্ট অফ হিন্দুস’, ‘দ্যা প্রোপার্টিস অফ চাইনীজ টি’, ‘পাওয়ার অফ মুনলাইট’, ‘হোয়াই দ্যা আর্থ ইজ রাউন্ড’, ‘জিওমেট্রি অফ ফ্লাওয়ারস’, ‘নেচার অফ টাইম’, ‘ল’স অফ নেচার’, ‘সোলার আন্ড লুনার ইয়ার’, ‘দ্যা পারফিউম আর্ট’ প্রভৃতি।

তার লেখার বিস্তৃতি এবং তার ভাবনার গভীরতা এত যে সে নিয়ে লিখলে লেখা ফুরাবে না।

সুলতান শামসের নিকটে থেকে তিনি যেভাবে কাজ করছিলেন তা বেশ স্বস্তিদায়ক ছিল তার জন্যে। কিন্তু সে দিনও ফুরায়। রাজনৈতিক পালা বদলে সুলতান বদলে যায়। এবারও নতুন সুলতান তাকে থেকে যেতে বললেও আল বিরুনী তাতে রাজি হন না।

ফিরে যাওয়ার সময় এক মহিলা তাকে অবাক হয়ে জিগ্যেস করে, আপনি বিখ্যাত পণ্ডিত আল বিরুনী না? আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’

(চলবে…)

………………………………..
আরো পড়ুন:
জ্ঞানপিপাসু আল-বিরুনী: পর্ব এক
জ্ঞানপিপাসু আল-বিরুনী: পর্ব দুই

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!