আল-বিরুনী

জ্ঞানপিপাসু আল-বিরুনী: পর্ব দুই

-মাবরুকা রাহমান

তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ। আমিই আল-বিরুনী। আমি আমার স্বদেশে ফিরে যাচ্ছি।’

ভদ্র মহিলা বলেন, ‘আপনাকে এখানে অনেক দেখতাম আপনি চলে যাচ্ছেন কেনো?’

বিরুনী উত্তর দেন, ‘জ্ঞান অর্জন করতে।’

মহিলা তাকে আবার জিগ্যেস করে, ‘তাহলে স্বদেশ ছেড়ে এসেছিলেন কেন?’

বিরুনী উত্তর দেন, ‘জ্ঞান অর্জন করতে।’

স্বদেশে ফিরে তিনি জানতে পারেন, মামুন ইবনে মুহাম্মদের ছেলে মামুন ইবনে মামুন এখন শহর শাসন করছে। কিন্তু পিতার মতই পুত্রও জ্ঞান অনুরাগী হওয়ায় এখানে ফিরে বিরুনী তার প্রাপ্য সম্মান তো পেলেনই, সাথে দেখলেন তার রেখে যাওয়া গবেষনাগার আরও বড় করে করা হয়েছে।

আল বিরুনী অসংখ্য ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তিনি দুটি বই সংস্কৃতিতে অনুবাদ করেছিলেন যা ভারতীয়দের অন্যান্য দেশের নিয়ম নীতি, বিজ্ঞানের নানান নিয়মসহ ভূগোল, অংক, চিকিৎসা শাস্ত্র এবং আরও নানার প্রধান বিষয় জানতে সহয়তা করবে।

নিযুক্ত হয়েছে আরও অনেক তরুণ বিজ্ঞানী। বিরুনী তাতে আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন। তিনি তো এটাই চেয়েছিলেন, মানুষ শিখবে জানবে, জ্ঞান অর্জন করতে শ্রম দিবে।

এই সুলতান মামুন ইবনে মামুনের সময়েই ঘটে এক অভিভূত ঘটনা। একদিন সুলতান ডেকে আনেন বিরুনীকে এক মেহমানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। দেখা যায় সেই মেহমান আর কেউ নন, তিনি হচ্ছে ইতিহাসের আরেক পণ্ডিত চিকিৎসক ইবনে সিনা।

এই দুই অসাধারণ জ্ঞানী মনীষীকে মুখোমুখি করিয়ে মামুন তাদের জ্ঞান চর্চার জন্য বিতর্কের আয়োজন করে দেন। সুলতানের সামনেই দুই জ্ঞানীর চলে প্রশ্ন উত্তর খেলা। উল্লেখ্য তখন বিতর্কের মধ্য দিয়েই জ্ঞানীরা নিজেদের মধ্যে আলাপ জমাতেন, বন্ধুত্ব করতেন।

বিরুনী আর ইবনে সিনা একে অপরকে নানান প্রশ্ন করেন, উত্তরে মতের মিল অমিল হয় এবং যুক্তি খণ্ডনের যুদ্ধও চলে। সেটা এতই রোমাঞ্চকর ছিল যে পরবর্তীতে এই দুইজন প্রচুর পত্র চালাচালি করতেন নিজেদের মাঝে। সুলতান মামুনও বেশ আনন্দিত হন এরকম দুইজন ব্যক্তিত্বকে একত্রিত করতে পেরে।

আল বিরুনী অসংখ্য ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তিনি দুটি বই সংস্কৃতিতে অনুবাদ করেছিলেন যা ভারতীয়দের অন্যান্য দেশের নিয়ম নীতি, বিজ্ঞানের নানান নিয়মসহ ভূগোল, অংক, চিকিৎসা শাস্ত্র এবং আরও নানার প্রধান বিষয় জানতে সহয়তা করবে।

মামুন ইবনে মামুনের রাজ্যত্ব দখল করে নেন সুলতান মাহমুদ গজনী। তিনি ছিলেন আত্মগরিমায় নিমগ্ন। তিনি রাজ্য দখলে নিয়েই লাইব্রেরি এবং গবেষণাগার বন্ধ করে দিবেন বলেন।

এরপর তিনি অন্য রাজ্য জয় করতে যাবেন ঠিক করেন যেখানে তিনি বিরুনীকে চান না। কারণ তার ধারণা বিরুনী কেবল মামুনেরই বন্ধু হতে পেরেছিল এবং বন্ধুত্বতার কারণে তিনি গজনীকে মানবেন না।

এই কথার জবাবে বিরুনী বলেন, ‘আমার সাথে মানুষের বন্ধুত্ব হয় জ্ঞানের উপর নির্ভর করে। যারা জ্ঞানপিপাসু তারাই আমার বন্ধু হয়ে ওঠেন, এর সাথে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই।’

এরপরই বিরুনী লিখেন ঐতিহাসিক বই ‘তাকিক-মালি-এ-হিন্দ’। এই বই লেখার জন্যই তিনি সংস্কৃত ভাষা শেখেন। বইটিতে তিনি উল্লেখ করেন- হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে। ভারতবর্ষের জীবন যাপন সম্পর্কে, ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে এবং ভারতবর্ষের জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা সম্পর্কে।

সুলতান গজনী একথা শুনে তক্ষুণি ঘোষণা দেন তার সৈন্যদলের সাথে একদল বিজ্ঞানী যাবে এবং বিজ্ঞানী দলের প্রধান হবে আল বিরুনী।

বিরুনী অবাক হয়ে বলেন, ‘সৈন্যদের সাথে যুদ্ধের মাঝে আমি গিয়ে কি করবো?’

সুলতান জানান, তার তাবু থাকবে আলাদা, তিনি স্বাধীন ভাবেই কাজ করবেন যা এতদিন করেছেন। পরবর্তীতে সুলতান গজনীর সাথে বিরুনীর সম্পর্কও মজবুত হয়।

তার চেয়েও বেশি মজবুত সম্পর্ক গড়ে ওঠে সুলতান মাহমুদের ছেলে মাসুদের সাথে। বিরুনী মাসুদকে বলেন, তার দীর্ঘ দিনের ইচ্ছা ভারত ভ্রমণের এবং সুলতান যেন সে সুযোগ তৈরি করে দেন।

এরপরই বিরুনী লিখেন ঐতিহাসিক বই ‘তাকিক-মালি-এ-হিন্দ’। এই বই লেখার জন্যই তিনি সংস্কৃত ভাষা শেখেন। বইটিতে তিনি উল্লেখ করেন- হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে। ভারতবর্ষের জীবন যাপন সম্পর্কে, ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে এবং ভারতবর্ষের জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা সম্পর্কে।

তার মধ্যে অংকশাস্ত্র, ইতিহাস, জ্যোতির্বিদ্যা, এখানের খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই বই সেইসময়কার উপমহাদেশ সম্পর্কে লেখা অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং এর মধ্য দিয়ে তখনকার জীবন ধারা আর তখনকার উপমহাদেশীয় জ্ঞান বিজ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক চর্চা সম্পর্কে জানা যায়।

আল বিরুনী মুসলিম হলেও ছিলেন ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষ। তিনি বহু বার সনাতন ধর্মালম্বীদের নানাবিধ আচার অনুষ্ঠানে মুগ্ধ হয়েছেন। তার মধ্যে সংকীর্ণতা ছিল না।

তিনি বরাবরই ছিলেন জ্ঞানের পূজারী, সত্যের বাহক। তার দূরদর্শীতা বিস্ময়কর। এরকম শুধুই জ্ঞানের পিপাসু নির্মোহ একজনকে নিয়ে যত লিখা যায় ততই কম।

সে জন্য শেষ এই লেখার শেষ করছি আরেকটি ঘটনা দিয়ে-

আল বিরুনী তার সব ভাবনার উপসংহার হিসেবে একটি এগারো খণ্ডের বিশাল গ্রন্থ লিখেন। যার নাম তিনি রাখেন, ‘আল-কানুন আল মাসুদ’। এটি সুলতান মাসুদ আল গজনীকে উৎসর্গ করে তিনি লিখেন।

তখন বিরুনী বলেন, ‘হে আমার সুলতান, আপনি আমাকে এই উপহার আমার লেখা বইয়ের বিনিময়ে দিয়েছেন কিন্তু আমি তো জ্ঞানের জন্য লিখি, জ্ঞানের বিনিময়ে লিখি। আমি তো অর্থের জন্য লিখি নি। আশা করি আপনি আমার অপারগতা বুঝবেন।’

এই বইয়ে মোট অধ্যায় একশ বিয়াল্লিশটি, এখানে তার সমস্ত অর্জন করা জ্ঞান উল্লেখ ছিল। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আবহাওয়া বিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, খাওয়ারিজিমের শহরের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের অভিজ্ঞতা, পূর্ববর্তী এবং সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের সাথে হওয়া আলাপ সমূহ ইত্যাদি।

এই গ্রন্থ যারপরনাই সুলতানকে খুশি করে। খুশি হয়ে তিনি কয়েকটি উটের পিঠে রূপা ভর্তি ব্যাগ চাপিয়ে বিরুনীর জন্য উপহার স্বরূপ পাঠান।

সুলতানের সেনা বিরুনীকে বলে, এই উটগুলোর পিঠে চাপানো ব্যাগ ভরা রূপা। এগুলো সুলতান বইয়ের বিনিময়ে তাকে পাঠিয়েছেন।

এ কথা শুনে বিরুনী উটগুলো নিয়ে সুলতানের দরবারে ফিরে যান, এবং রূপার ব্যাগ সমেত উট ফিরিয়ে দেন। সুলতান অবাক হয়ে বলেন, ‘এ তো তোমার প্রাপ্য।’

তখন বিরুনী বলেন, ‘হে আমার সুলতান, আপনি আমাকে এই উপহার আমার লেখা বইয়ের বিনিময়ে দিয়েছেন কিন্তু আমি তো জ্ঞানের জন্য লিখি, জ্ঞানের বিনিময়ে লিখি। আমি তো অর্থের জন্য লিখি নি। আশা করি আপনি আমার অপারগতা বুঝবেন।’

আল বিরুনী সম্পর্কে যত বলা হয় ততই কম। অসংখ্য বিষয়ে এরকম গভীর জ্ঞানের অধিকারী, বিনয়ী, নির্লোভী মনীষী ইতিহাসে খুব কম আছেন। মুসলিম ইতিহাসের জন্য তিনি গর্ব।

এবং তিনি এতটাই মূল্যবান যে নানান দেশই দাবী করে থাকে যে তিনি সেই দেশীয় লোক বা তার জন্মস্থান সে সব দেশে। কিন্তু আল বিরুনীর মত মানুষ কোন নির্দিষ্ট দেশের হয় না, তারা সমগ্র পৃথিবীর এবং তারা লিখত থাকে মহাকালের পাতায়।

(সমাপ্ত)

………………………………..
আরো পড়ুন:
জ্ঞানপিপাসু আল-বিরুনী: পর্ব এক
জ্ঞানপিপাসু আল-বিরুনী: পর্ব দুই

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!