মনোরঞ্জন বসু

আমার কাকা মনোরঞ্জন বসু

-গৌতম বসু

বিখ্যাত বাউল বিশেষজ্ঞ ও বাউল সাধক মনোরঞ্জন বসু ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ১৪ই এপ্রিল মঙ্গলবার বর্তমান মাগুরা জেলার সদর থানাধীন উত্তর নওয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা চন্দ্রকান্ত বসু পৈতৃক সূত্রে জোতদার। পেশায় স্কুল শিক্ষক ও নেশায় শখের হোমিও চিকিৎসক ছিলেন।

তার মাতা শান্তিলতা বসু ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিনী। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মনোরঞ্জন ছিলেন পঞ্চম। তিন ভাইয়ের অকাল মৃত্যুর পর তাঁর জন্ম হয়েছিল, তাই তিনি ছিলেন মা-বাবার অত্যন্ত আদরের। কিশোর বয়স থেকেই মনোরঞ্জন ছিলেন সংসার বিরাগী।

তিনি প্রায়শই বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশে যাত্রা করতেন- আবার ফিরে আসতেন।এভাবে তিনি নেপালসহ অখণ্ড ভারতের বহু অঞ্চল ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেন। বিচিত্র জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে এসে তাদের ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন।

সংসারের বন্ধন মুক্ত হওয়ার ফলে তাঁর মন প্রসারিত হয়, দৃষ্টি-ভঙ্গি উদার হয়, সামাজিক সংস্কার ও শাস্ত্রীয় ধর্মের বন্ধন মুক্ত হয়ে তিনি জগৎ ও জীবনের এক উন্মুক্ত প্রান্তরে নিজেকে আবিষ্কার করেন।

কিশোর বয়সে তাঁর নিজ গ্রামে এক সাধুসঙ্গের অনুষ্ঠানে এক মোল্লা একজন বাউলকে নিষ্ঠুরভাবে অপমান করে। এই ঘটনা তাঁর সংবেদনশীল মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। তিনি ধর্মতত্ত্বের শিকড় সন্ধানে প্রবৃত্ত হন। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-মুসলিম-জৈন-জরাথ্রুষ্ট প্রভৃতি ধর্মের গ্রন্থগুলো তিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন।

এরপর তিনি অধ্যয়ন করেন গুরুবাদী বিভিন্ন লৌকিক ধর্ম; আউল, বাউল, সুফিবাদ, সহজিয়া, কর্তাভজা ইত্যাদি।

অবশেষে তিনি লালনের মতাদর্শে– যা বাউল ধর্ম নামে পরিচিত, তাতে গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। বাউল ধর্মের যুক্তি-উদারতা ও মানবতাবোধে উদ্ধুদ্ধ হয়ে এই ধর্ম মতে দীক্ষিত হওয়ার পর তিনি একজন সদগুরুর সন্ধানে বিভিন্ন আখড়ায় ও আশ্রমে ঘুরে বেড়ান।

অত:পর ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় এসে লালন সাঁইজির প্র-শিষ্য কোকিল সাঁইজিকে গুরু বলে গ্রহণ করেন। লালন মতে দীক্ষিত হওয়ার পর তিনি লালনের গান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। লালন সাঁইজির ধর্ম মত তাঁর সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রচারিত।

১৯৬৮ সালে তিনি ‘আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রী’ এবং ১৯৭০ সালে ‘ভীষক-রত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হন। নিজস্ব গবেষণায় তিনি বেশ কিছু জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধির ঔষধ উদ্ভাবন করেন। বলা বাহুল্য, ‘মেসার্স শান্তি ঔষধালয়’ আজও তাঁর চিকিৎসা খ্যাতির উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে।

তিনি দেখলেন, এই সঙ্গীতের কোন প্রামাণ্য গ্রন্থ না থাকায় সেগুলি নানাভাবে বিকৃত হচ্ছে। যেমন, শিল্পীদের উচ্চারণ বিকৃতি, মতলব বাজদের নিজস্ব তত্ত্ব প্রক্ষেপণ এবং তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের ভুল ব্যাখ্যা ইত্যাদি। তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে এই বিকৃতি ও বিভ্রান্তিরগুলো তুলে ধরেন।

তাঁর লেখা বই “বাউল মতের শিকড় সন্ধানে”-এর মধ্যে বাউল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও পারস্পর্যহীন এই সব বিকৃতি ও বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করেছেন।

পেশাগত জীবনে মনোরঞ্জন বসু ছিলেন একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন Board of Unani & Ayurvedic Systems of Medicine, Pakistan তাঁকে চিকিৎসক হিসেবে Registration প্রদান করেন। ঐ বছর থেকেই তিনি কবিরাজি চিকিৎসা শুরু করেন।

১৯৬৮ সালে তিনি ‘আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রী’ এবং ১৯৭০ সালে ‘ভীষক-রত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হন। নিজস্ব গবেষণায় তিনি বেশ কিছু জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধির ঔষধ উদ্ভাবন করেন। বলা বাহুল্য, ‘মেসার্স শান্তি ঔষধালয়’ আজও তাঁর চিকিৎসা খ্যাতির উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে।

তবে বাউল সাধক হিসাবে তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতির নিচে তাঁর চিকিৎসা খ্যাতি অনেকটা চাপা পড়ে গেছে। দেশ-বিদেশের অনেক বাউল-বিশেষজ্ঞ ও গবেষক তাঁর তত্ত্ব ও তথ্যে সমৃদ্ধ হয়েছেন। এঁদের উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন-

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ‘হারামনি খ্যাত’ ড. মনসুর উদ্দীন। নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. আনোয়ারুল করিম, বিশিষ্ট বাউল গবেষক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ড. আবুল আহসান চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. অরুণ বসু, Berlin Cultural Institute এর পরিচালক Dr. Mardrin William, আমেরিকার বিশিষ্ট লালন গবেষক ড. কেরল সালমান, লন্ডন প্রবাসী লালন গবেসক সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর ইরানী স্ত্রী, প্রসাদ প্রমুখ।

মনোরঞ্জন বসু ছিলেন প্রকৃত মানবতাবাদী। এর অসংখ্য উদাহারণের মধ্যে একটিমাত্র উল্লেখ করলেই হবে- মনোরঞ্জন বসু তখন সপরিবারে যশোরে। কঠিন দারিদ্র্যতার মধ্যে, তাঁর দিনাতিপাত। দু’দিন প্রায় অনাহারে কাটানোর পরে অনেক কষ্টে অর্জিত দশটি টাকা নিয়ে তিনি বাজারে যাচ্ছিলেন।

সঙ্গে ছিল তাঁর বড় মেয়ে। তখন তাঁর বয়স ৮-৯ বছর। মেড়ো মন্দিরের কাছে গিয়ে তিনি দেখলেন এক লোক খাঁচায় পুরে অনেকগুলো বাবুই পাখি বেচতে এসেছে। বাবুই পাখির মাংস নাকি খুব সুস্বাদু। যশোর শহরে তখন প্রায়ই বিক্রি হতে দেখা যেত।

এই হলেন মনোরঞ্জন বসু, যাঁর নাম ক্রমবিবর্তিত ও সম্প্রসারিত হয়ে আজ ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাইয়ে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য ভক্ত ও অনুরক্তের অন্তরে যিনি ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই রূপে মহিমান্বিত। পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আজ দেশব্যাপী অসংখ্য ভক্তের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত গুরু-গুরুদেব বা সাঁইজি পরিচয়ে।

তিনি পাখি বিক্রেতাকে দাম জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, এক খাঁচা দশ টাকা। তিনি আগে-পিছে না ভেবেই পকেট থেকে দশ টাকা বের করে দিলেন। তারপর তিনি খাঁচার দরজা খুলে দিলেন। পাখিরা হুড়মুড় করে বাইরে বের হয়ে এল।

মুক্তির আনন্দে দিশেহারা সেই পাখিরা দল বেঁধে আকাশে উড়ে গেল। মনোরঞ্জন বসু তন্ময় হয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন সে মুক্ত বিহঙ্গের উড্ডয়ন দৃশ্য। অবাক বিস্ময়ে এই দৃশ্য তাঁর মেয়েটি দেখছিল। কিন্তু পাখিদের মুক্তির চেয়ে সে বরং ভাবছিল তাদের ক্ষুদার্থ সংসারটির কথা।

অনেকক্ষণ নীরবতার পর সে অস্ফুট কণ্ঠে বলল, “বাবা! এখন কি হবে” তুমি বাজার করবে কি দিয়ে?”

তিনি স্নেহার্দ্য কণ্ঠে উত্তর দিলেন, “ঐ টাকাটা থাকলে আমরা একদিন ক্ষধার কষ্ট থেকে বাঁচতে পারতাম। কিন্তু এতগুলো প্রাণি বাঁচত না। এই দৃশ্য নিশ্চয়ই আমাদের চিরদিনের আনন্দের উৎস হয়ে থাকবে।”

এই হলেন মনোরঞ্জন বসু, যাঁর নাম ক্রমবিবর্তিত ও সম্প্রসারিত হয়ে আজ ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাইয়ে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য ভক্ত ও অনুরক্তের অন্তরে যিনি ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই রূপে মহিমান্বিত। পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আজ দেশব্যাপী অসংখ্য ভক্তের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত গুরু-গুরুদেব বা সাঁইজি পরিচয়ে।

কিন্তু আমার কাছে তাঁর একটাই পরিচয়- তিনি আমার কাকা মনোরঞ্জন বসু। যিনি তাঁর মনুষ্য মহিমায় আমার অন্তর্লোক আলোকিত করেছেন। স্বতোৎসারিত ঝর্ণা ধারার মত পল্লবিত করেছেন আমার সমস্ত জীবন।।

<<ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই ।। মরমী সাধক মহেন্দ্রনাথ গোস্বামী>>

………………………….
বি: দ্র: এখানে একটা ব্যাপার- ১৯২৮ সালের ১৪ই এপ্রিল মঙ্গল বার ছিল। বাবার জীবিত অবস্থায়ই এই দিনে অধিবাস করে অনুষ্ঠান ২ দিন ব্যাপি করতাম। তারপর বাবার মৃত্যুর পরও অদ্যবধি করে আসছি। আজ কিন্তু ১৪ই এপ্রিল নয়।

বাবা বলে গিয়েছিলেন বৈশাখ মাসের প্রথম মঙ্গলবার, তা যে তারিখই হোক, তারিখ নয়, বারটা ঠিক রাখবা। সে কারণে আজ বৈশাখের প্রথম মঙ্গলবার, তাই তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে সাধুসঙ্গ। জয়গুরু। -তপন বসু (ফকির মনোরঞ্জন বসুর পুত্র)

…………………………………….
আরো পড়ুন:
ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই
আমার দেখা কবিরাজ গোঁসাই

মরমী সাধক মহেন্দ্রনাথ গোস্বামী
একজন লালন সাধকের কথা
আমার পিতা ভক্ত মনোরঞ্জন গোঁসাই ও তাঁর দর্শন

মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -এক
মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -দুই
মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -তিন

মনোরঞ্জন গোঁসাই: স্বরূপ সন্ধানী দার্শনিক
মনোরঞ্জন গোঁসাই ও তাঁর জীবন দর্শন
আমার কাকা মনোরঞ্জন বসু

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!