বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: চার

বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: চার

জাহের এবং বাতেনের লীলাখেলা :
প্রকাশ্য এবং গোপনীয় দুইটি বিষয় পাশাপাশি প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলছে। যেমন কোরানের আয়াত। আয়াত অর্থ নিদর্শন, চিহ্ন। দৃশ্যমান জগতের প্রতিটি বিষয় এক-একটি আয়াত তথা নিদর্শন। আবার যাহা দৃশ্যমান নহে এবং স্থূল চোখে ধরা যায় না উহাও আল্লাহর আয়াত তথা নিদর্শন।

হজরত মুসা যখন তূর পর্বতে আল্লাহর আয়াতের সংযোগ স্থাপন করলেন, তখন হজরত মুসা চেতন হারিয়ে ফেলেন তথা অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং সেই অজ্ঞান অবস্থায় হজরত মুসা বলে ফেলেন, ‘আমি আদিতেই তথা সর্বপ্রথমেই মোমিন ছিলাম।’ জাহেরি আয়াতের সঙ্গে যুক্ত হলে অজ্ঞান হবার প্রশ্নই উঠে না।

কিন্তু আয়াত বলে ধরে নিতেই হবে। কারণ ইসলামের প্রতিটি বিষয়ে জাহের এবং বাতেনের সমন্বয়ে দেখতে পাই।

পীর:
যারা অজানা কিছু জানতে আগ্রহী তাদেরকে বলছি, সবাইকে নয়। তোমার পীর যত বড় পীরই হোক না কেন যদি তুমি তার থেকে সত্য না পাও তবে ফেলে দাও তাকে। কারণ পীর এখানে মুখ্য বিষয় নয়, মুখ্য বিষয় হলো সত্য পাওয়া। সত্য হলো আল্লাহর রহস্যলোকের কিছু জানা।

সুরেশ্বরীর শান কত বড় রে… ভাণ্ডরীর শান কত বড় রে… খাজা বাবার শান কত বড় রে… শান বললেও আছে, না বললেও আছে, তুমি কি ঘোড়ার ডিমটা পাইলা। তুমিতো বকরির তিন নম্বর বাচ্চার মতো দুধ না পেয়ে পীরের বাড়িতে গিয়ে শুধু লাফালাফিই করে গেলা।

আসো বসো মুরিদ হও, ধ্যান-সাধনা কর, যদি আল্লাহর রহস্যলোকের কিছুই না পাও আমাকে ফেলে চলে যাও, এখানে পীর বড় নয় এখানে সত্য বড়। সারা জীবন বাবা বাবা ডাকবা পাইবা না ঘোড়ার ডিমওসেই বাবা ডাইকা কোন লাভ নাই।

মারেফত কী?
আরবি ‘আরাফা’ শব্দ হতে মারেফত। আরাফা অর্থ হলো জানা, জ্ঞানলাভ করা। মারেফত অর্থ লব্ধজ্ঞান। মারেফত দিয়ে জগত ও জীবনের যে কোনো বিষয়ের সাম্যক জ্ঞান জানা যায়। স্থুল দর্শন প্রকৃত দর্শন নয়। সূক্ষ্ম দর্শন প্রকৃত দর্শন। জ্ঞানীগণ সূক্ষ্মতা অবলম্বন করে জীবন ও জগতকে দেখেন-ইহাই মারেফত।

লোকেরা যাকে মারেফত বলে মনে করে, আসলে উহা মারেফত নয়। কারণ অজ্ঞাত বিষয় জানাটাই মারেফত। অজ্ঞাত বিষয়টা অজ্ঞাত থেকে যায় বলে মারেফত জ্ঞান লাভ হয় না। মারেফতের মূল কেন্দ্রভূমি আপন দেহ-মন। আপন দেহ-মনের পরিচয় পেলে মানুষ তার রবের পরিচয় পায়।

রবের পরিচয় পেলে সে তার সৃষ্টিকর্তার, পালনকর্তা ও ধ্বংসকর্তার সম্যক পরিচয় লাভ করে। যতদিন পর্যন্ত মানুষ এই রবের পরিচয় না পায় ততদিন সে দুঃখচক্রের আবর্তে নিজের দুঃখ নিজে সৃজন করে ঘুরতে থাকে। এ জন্য কোরান বলছে, ওয়াত্তাকু রাব্বাকুম তোমরা তোমাদের রব সম্বন্ধে সাবধান হও। ইহাই মারেফতের গোপন কথা।

মানুষ আল্লাহর রহস্য:
দেহ যদি আত্মার পোশাক হয় তবে পোশাকটাই কি আত্মা বলবো? কাপড় যেমন দেহের পোশাক তাই বলে কি কাপড়ের পোশাককে দেহ বলে চালিয়ে দেব?

আত্মার বিজ্ঞানী হজরত মঈনউদ্দীন চিশতী তাঁর পবিত্র ‘মকতুবাদে খাজা’ নামক পুস্তকে ঘোষণা করলেন, ‘চুঁ জুমলা ফানা গাশতে বতু হে চুনামুনদা খাহেকে আনাল্লাহে বগু খাহেকে হু আল্লাহ’ অর্থাৎ যদি তুমি সম্পূর্ণ আল্লাহতে ফানা হয়ে যেতে পার তখন ইচ্ছা হয় বলো তুমি আল্লাহ না হয় আমি আল্লাহ একই কথা।’

আত্মার বিজ্ঞানী হজরত বু আলী শাহ্ কলন্দর তাঁর দিওয়ান-এ ঘোষণা করলেন, ‘বা শাকলে শায়খে দিদাম মোস্তফারা, না দিদাম মোস্তফারা বালকে খোদারা’ অর্থাৎ ‘আপন পীরের আকৃতিতে নবী মোস্তফাকে দেখলাম এবং উহা নবী মোস্তফা নন বরং স্বয়ং আল্লাহকে দেখলাম’ বলে কেন ঘোষণা করলেন?

এ রকম হাজার হাজার আত্মার বিজ্ঞানীদের আত্মাকে জানবার বিজ্ঞানময় ফর্মুলা আমরা পেয়ে আসছি। এতকিছু পাবার পরও আমরা বিভিন্ন গোত্রের বিভিন্ন প্রকার ধর্মের সাইনবোর্ড কাঁধে নিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করছি। কিন্তু সাইনবোর্ড ফেলে দিয়ে সত্য সন্ধানের দৃঢ় মনোবল নিয়ে কয়জন এগিয়ে এসেছি?

কুসংস্কার, সংকীর্ণতা, গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকা, নিজ নিজ বাপ-দাদার দ্বারা প্রকাশে গর্ববোধ করি। কিন্তু নিরপেক্ষ মনোবল নিয়ে সত্যের সন্ধান কি করতে পেরেছি? আল্লাহ তো সর্ববিষয়েই ক্ষমতাবান বলে অনেকবার ঘোষণা করছেন।

তবে আল্লাহর কথা কেন আকাশে মেঘের গর্জন করার মতো শব্দ করে আমাদেরকে জানিয়ে দিলেন না? না হয় বিজলি চমকানোর মতো আলোর বিচিত্র রেখা দিয়ে আল্লাহর কথা কেন লিখে দিলেন না? না হয় বরফের টুকরো শিলার পতনের মতো তাঁর লিখিত বাণী কেন পৃথিবীতে নিক্ষেপ করে আমাদেরকে জানালেন না?

হেলিকপ্টার আকাশে উড়ে বিজ্ঞাপন ফেলার মতো ফেরেস্তাদের দিয়ে কেন ফেলে দিলেন না? মানুষের ঠোঁটেই যদি আল্লাহর কথা পেয়ে থাকি এবং তাই আমরা পেয়ে আসছি, তাহলে নিঃসন্দেহে কি বলতে পারি না যে, মানুষই আল্লাহর রহস্য?

আত্মার বিজ্ঞানী মনসুর-হাল্লাজের আনাল হক তথা ‘আমিই একমাত্র সত্য’ ঘােষণার গভীরতম রহস্য এখানেই লুকিয়ে আছে।

আত্মার বিজ্ঞানী হজরত বায়েজিদ বােস্তামিকে তার এক মুরিদ প্রশ্ন করেছিলেন যে, কী রকম লােকের সাহচর্যে থাকবাে? তার উত্তরে তিনি এটুকুই বলেছিলেন যে, যার মধ্যে আমি এবং তুমি নেই।

আত্মার বিজ্ঞানী শামসে তাব্রিজ-এর আমিই সর্বপ্রথম, আমিই সর্বশেষ, আমিই একমাত্র প্রকাশ্য এবং আমিই একমাত্র গােপনীয় ’ বলার মাঝে এই গভীরতম রহস্যের ইঙ্গিত বহন করেছে।

খান্নাস মিশ্রিত নফ্স-অপবিত্র:
আধুনিকতম বিজ্ঞানের অনেক প্রকার প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা। যে কোনো দর্শনকে চারিদিক দিয়ে আঘাত করে। যতটুকু জানি এই বলে যে, সমগ্র সৃষ্টিরাজ্য আল্লাহর তৌহিদে বাস করে। তৌহিদে যারা বাস করে তাদের ইসলামিক ধর্মীয় পরিভাষায় মুসলমান বলা হয়।

আল্লাহর সৃষ্টিরাজ্যে কোথায় কোনো অসঙ্গতিপূর্ণ কিছুই দেখতে পাওয়া যায় না। কারণ সমগ্র সৃষ্টিরাজ্য আল্লাহর তৌহিদের বিধান দ্বারা পরিচালিত। এমনকি মানুষের হাত-পা-চোখ-নাক-মুখ ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সৃষ্টিরাজ্যের বিধান অনুযায়ী চলছে। কেবলমাত্র মানুষের মনটাই তৌহিদে বাস করে না, কারণ কিছুদিনের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

এই স্বাধীনতার বিষয়টি ছোটবেলায় কিছুই বোঝা যায় না। বয়স বাড়তে বাড়তে যৌবনের দ্বারপ্রান্তে এলেই স্বাধীনতার বিষয়টি একটি নফ্স তথা একটি প্রাণ বুঝতে পারে। মানুষের নফ্স যখন স্বাধীনতার বিষয়টি বুঝতে পারে তখনই মানুষ তৌহিদের বিধান হতে ছিঁটকে পড়ে এবং খান্নাসরূপী শয়তানের খপ্পরে পড়ে যায়।

এই খান্নাসরূপী শয়তানের খপ্পরে পড়লেই মানুষ মোহ-মায়ার বন্ধনে আপনিই আবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর মহাবিধান হতে সরে পড়ে। তাই কোরান বলছে, ‘মিন শাররিল ওয়াস ওয়াসিল খান্নাস’ তথা খান্নাসের কুমন্ত্রণা হতে মুক্ত হও।

এই খান্নাসই মানুষের সুন্দর জীবনটাকে ঝাঁঝরা করে দেয়। এই খান্নাস হতে মুক্তি পেতে গেলে গুরু ধরতে হবে এবং গুরুর দেওয়া পথ-প্রদর্শনের বাণীগুলো বুকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে। গুরুর দেওয়া ধ্যান-সাধনা, মোরাকাবা-মোশাহেদায় পরিপূর্ণরূপে বিলিয়ে দিতে পারলেই নিজের পরিচয়টুকু পরিষ্কার বোঝা যায়।

তাই বলা হয়েছে, যে তার নফ্সকে (রূহকে নয়) চিনতে পেরেছে কোনো সন্দেহ নাই সে তার রবকে চিনতে পেরেছে। তাই পৃথিবীর বিখ্যাত মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী তাঁর অমূল্য গ্রন্থ মসনভী শরীফে বলেছেন-

‘ম্যায় নে নে হামুবুদ গুফতে আনাল হক, দার সুরতে মানসুর, মানসুর না বুদা বারাদার বারামাত।’

অর্থাৎ না না আমি আল্লাহই ঘোষণা করেছি আনাল হক মুনসুর হাল্লাজের সুরতে, মুনসুর হাল্লাজ বলে নাই সর্বশক্তিমান আল্লাহই বলেছেন।

……………………………
আরো পড়ুন:
বাবা জাহাঙ্গীর

বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: এক
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: দুই
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: তিন
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: চার
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: পাঁচ
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: ছয়
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: সাত

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!