বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: পাঁচ

বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: পাঁচ

পৃথিবীকে কিছু দিন, পৃথিবীও আপনাকে মনে রাখবে:
এই পৃথিবী বড়ই কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতার সামান্য উপযুক্ততা যারই মাঝে থাক না কেন, এমনকি অতি নিন্মশ্রেণীর (?) মানুষের প্রতিও এই পৃথিবী কৃতজ্ঞতা জানাতে মোটেই কার্পণ্য করে না। শুনেছি মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেছে এমন এক জেলে যার নাম রামদয়াল (নামটি সঠিক নাও হতে পারে)।

রামদয়ালের ছেলে আজ হতে প্রায় শতবর্ষ আগে পাঠশালায় লেখাপড়া করতে যেত। জেলে রামদয়াল ছেলেকে পাঠশালায় না দিয়ে তারই সঙ্গে মাছ ধরার কৌশল শিখাতে নিয়ে গেল। ছেলের লেখাপড়া করার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও বাবার আচরণে প্রতিবাদ না করে বাবার সঙ্গেই মাছ ধরায় রত ছিল।

এভাবে বেশ কিছু বছর কেটে যাবার পর জেলে রামদয়াল একদিন মারা গেল। ছেলে মাছ বিক্রির টাকা জমিয়ে জমিয়ে বেশ কিছু জায়গাজমি খরিদ করল। তারপর নয় ইঞ্চি ইঁটের গাঁথুনি দিয়ে বিরাট এক কলেজ প্রতিষ্ঠা করলো।

সেই কলেজ আজও আছে, আজও সেই কলেজের প্রতিষ্ঠাতার নামটি পৃথিবী কৃতজ্ঞতার সহিত বার বার উচ্চারণ করে জানিয়ে দেয়। সেই কলেজটির নাম গুরুদয়াল গভর্নমেন্ট কলেজ। কিশোরগঞ্জ জেলাতে এই কলেজের অবস্থান।

সামান্য একজন জেলের এই বিশাল অবদানটি আজও পৃথিবী কৃতজ্ঞতার সহিত স্মরণ করে। এই পৃথিবীতে কেউ কিছু দান করলে সেই দানের উপযুক্ততা অনুসারে পৃথিবী কমবেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যায়। আর যারা ধনৈশ্বর্যের বিরাট মালিক হবার পরও পৃথিবীকে কিছুই দিয়ে যায় না, তাদের নাম কুত্তাও মনে করে না।

কৃতজ্ঞতার অপূর্ব প্রতিফলন দেখি পৃথিবীর অবয়বে। নিষ্ঠুরতার কঠিন প্রতিফলনটিও দেখতে পাই পৃথিবীর ওই একই অবয়বে। পৃথিবী যেন বলছে, ‘খেয়েই গেলে! আনন্দ করেই গেলে! সুখভোগের পুকুরে ডুবেই রইলে! একটা কানাকড়িও পৃথিবীকে দান করে গেলে না! এটাই কি মানবের জীবন?

ভিন্ন ভিন্ন জাতির ভিন্ন ভিন্ন এবাদত, কিন্তু লক্ষ্য একটাই:
তোমরা তো মূর্তি পূজা করো-হাতে প্রদীপ নিয়ে দাঁড়িয়ে মন্ত্রপাঠ করে। সুরা ইব্রাহীমের ৪নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, প্রত্যেক জাতির জন্য অবশ্যই রসুল পাঠানো হয়েছে। কেবল তাহাই নহে। বলা হয়েছে সেই জাতির নিজেস্ব ভাষায় নিজস্ব সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে রসুল পাঠানো হয়েছে।

জাজিরাতুল আরবের জন্য মহানবী মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ্, বেথেলহামের জন্য যিশুখৃষ্ট তথা ঈশা রুহুল্লাহ্, মিশরের জন্য মুসা কালিমুল্লাহ্, সুরিনামের জন্য হজরত লুত, ড্রাবিডিয়ানের জন্য হজরত দাউদ এবং সোলায়মান, আদ জাতির জন্য হজরত হুদ এবং সামুদ জাতির জন্য হজরত সালেহ্ এইভাবে প্রত্যেক জাতির মধ্যে রসুল পাঠানো হয়েছে।

তাহলে অখণ্ড ভারতে (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান) কি রসুল পাঠানো হয় নাই? যদি বলো পাঠানো হয় নাই, তাহলে সুরা ইব্রাহীমের ৪নম্বর আয়াত-এর উপর কেমন করে বিশ্বাস করা যায়?

হিন্দুরা মূর্তি পূজা করে, কিন্তু মূর্তি উপলক্ষ্য লক্ষ্য ব্রহ্মা। সুতরাং ব্রহ্মার পূজা করা হয় উপলক্ষ্য মূর্তির মাধ্যমে। মুসলমানদের কাবা চারটা দেয়াল দিয়ে বানানো। মুসলমান কখনও দেয়াল পূজা করে না। বরং দেয়ালের ভেতরে যে আল্লাহ্-জাল্লাহ্-শানহু থাকেন তাঁরই এবাদত করেন।

মুসলমানের প্রার্থনার মূল বিষয়টি সোবহানা রাব্বুল আজিম এবং সোবহানা রাব্বুল আলা তিনবার করে পড়ার মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়া আর হিন্দুদের মূল বিষয়টি হলো মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে নারায়ণকে পাওয়া। এতেই বুঝা যায় প্রত্যেক জাতির নিজেস্ব সংস্কৃতির উপর দাঁড়িয়ে রসুল পাঠানো হয়েছে। এই কথাগুলো গর্দভ মানতে পারে না। মানে তারাই যারা জ্ঞানী ও প্রেমিক। প্রেমবিহনে প্রার্থনাটি একটি শুকনো কাষ্ঠখণ্ডের মতো।

মানব দেহটাই হাকিকি কবর:
নফ্স এবং রূহের অধিকারী মানুষটি নিজেই ধরতে অথবা বুঝতে পারে না যে, তার দেহের ভেতর কেমন করে নফ্স আর রূহ আছে। একটি মানুষ কেবল নিজের দেহের অবস্থানটি বুঝতে পারে। ক্ষুধা, ঘুম, যন্ত্রণা, হাসি, আনন্দ আর সম্মান বিষয়গুলো বুঝতে পারে এই দেহ নামক জীবন্ত কবরে অবস্থান করার দরুন।

একটি মানুষ বুঝতেই পারে না অথবা বুঝতেই চায় না যে, এই জীবন্ত দেহটাই জীবাত্মার কবর। পাখিকে যেমন খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখে তেমনি মানবদেহ নামক জীবন্ত খাঁচায় জীবাত্মাটিকে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তাই মানুষ রহস্যলোকে থেকেও এই দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকার দরুন বাহিরের সবকিছু বুঝতে পারে, কিন্তু জীবাত্মাটির বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে যায়।

মারেফতি গান আর মারেফতের কিছু বই পড়ে অথবা এখানে সেখানে গিয়ে কিছু কথা শিখলেই রহস্যলোকের জ্ঞান অথবা মারেফতি জ্ঞানের কাঁচকলাটিও বুঝবার উপায় থাকে না। বুঝবার একমাত্র উপায়টি হলো সেই পীরের কাছে মুরিদ হওয়া, যিনি এই রহস্যলোকের জ্ঞান হাসেল করতে পেরেছেন।

অন্যথায় অনুষ্ঠান-উপাসনার ভরং চরং দেখিয়ে যারা পীর সাজে তারা রহস্যলোকের জ্ঞান বিষয়ে অন্ধ। আর এক অন্ধ অপর অন্ধকে কেমন করে পথ দেখাবে? পথ দেখাতে গিয়ে দুজনাই গর্তে পড়ে যায় এবং গর্তে পড়াটাই স্বাভাবিক। নির্জনবাস আর বছরের পর বছর মোরাকাবা করার নিয়মকানুনগুলো শিখিয়ে দিতে হবে।

মোকাম আর লতিফার সূক্ষ্ম বিষয়গুলো শিখিয়ে দিয়ে নির্জনবাসে ধ্যানসাধনার পথটি দেখিয়ে দিতে হবে এবং সেই সঙ্গে মুরিদকে বলে দিতে হবে যে, এতদিন আমার কথামতো ধ্যানসাধনার মোরাকাবাটি করে যদি রহস্যলোকের কিছুটা জ্ঞান অর্জন করতে না পার তবে আমাকে ফেলে দিয়ে অন্য পীরের মুরিদ হয়ে যেয়ো।

আজকালকার পীর সাহেবরা এ রকম কথাটি যে বলতে হবে মুরিদকে তা-ও জানে না। কারণ যিনি পীর হয়েছেন তিনি জীবনে মাত্র একটি চার মাসের মোরাকাবা করেন নাই। যিনি মোরাকাবাই করেন নাই তিনি আবার কেমন করে পীর হন? ধর্মীয় বই-পড়া প্রচুর বিদ্যা দিয়ে বিদ্বান হওয়া যায়, কিন্তু রহস্যলোকের জ্ঞান অর্জন করা যায় না।

……………………………
আরো পড়ুন:
বাবা জাহাঙ্গীর

বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: এক
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: দুই
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: তিন
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: চার
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: পাঁচ
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: ছয়
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: সাত

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!