বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: ছয়

বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: ছয়

মানুষ বুঝতেই পারে না যে, সে শয়তানের গোলামি করছে:
আমরা পদে পদে ভুল করি। বুঝতে চেষ্টা করেও অদৃশ্য কারণে বুঝতে পারি না। কারণ খান্নাসরূপী শয়তানটি যতক্ষণ পর্যন্ত পবিত্র নফ্সের সঙ্গে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত ভুল করাটা স্বাভাবিক। তাই এই শয়তানটিকে তাড়িয়ে দেবার আহ্বান করছে কোরান।

বান্দাকে পরীক্ষা করার জন্যই এই শয়তানটিকে প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেবলমাত্র পরীক্ষা করার জন্য। তাই বড় বড় ওলিদের প্রশ্ন করতে গেলে তারা বলেন যে, এই শয়তানটিকে মুসলমান বানাতে গিয়ে বারো বছর, পনের বছর ধ্যানসাধনা করতে হয়েছে তথা মোরাকাবা-মোশাহেদা করতে হয়েছে।

তাই ওলিরা বলেন যে, মনে হবে কত রকম পরীক্ষা দিতে হবে, কিন্তু আল্লাহর পরীক্ষাটি মাত্র একটি পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষাটি হলো, নিজের পবিত্র নফ্সের সঙ্গে যে শয়তানটি খান্নাসরূপে বিরাজ করছে সেই শয়তানটিকে মুসলমান বানিয়ে ফেলা। কারণ এই শয়তানের চাওয়া আর পাওয়ার কোনো শেষ নাই। যত পাবে ততই চাইবে।

অথচ এই শয়তানের একমাত্র বাসস্থানটি হলো প্রতিটি মানুষের অন্তর (জিনদের কথাটি ইচ্ছা করেই বলা হলো না)। মানুষের হাত-পা, চোখ-কান তথা এক কথায় সমস্ত দেহটি মুসলমান, কিন্তু অন্তরটি মুসলমান নয়। কারণ অন্তরের মাঝেই আর একজন বাস করছে আর তারই নাম শয়তান (অবশ্য রূহও বাস করছে তবে এখানে বুঝাবার জন্য বলা হলো না)।

এই শয়তানটি অন্তরে বাস করে মানুষকে যে কত রকম নাজেহাল করে, কত রকম যে মিথ্যা বলতে হয়, কত রকম যে ঘৃণ্য প্রতিযোগিতা করতে হয়, কত রকম যে দাতা সাজতে হয়, কত রকম যে কৃপণ হতে হয়, কত রকম যে স্বার্থ হাসিলের জঘন্য চালাকি করতে হয়, কত রকম যে হিংসা-বিদ্বেষ করতে হয় তা বলে এবং বুঝিয়ে শেষ করা যাবে না।

হাকিকতে প্রতিটি মানুষ শয়তানের গোলামি করছে, কিন্তু মেজাজিতে মনেই হবে না যে শয়তানের গোলামি করছে। তাই আল্লাহর ওলিরা দুনিয়ার এই চাকচিক্যের মাঝেও নির্জনে ধ্যানসাধনাটি করে যায়। মেজাজি ইবাদতের অনুসারীরা বুঝতেই পারে না যে শয়তানটি বহাল তবিয়তে আপন আপন অন্তরে বাস করছে।

অন্তর হতে শয়তানটি পরিষ্কার করতে পারে নি, অথচ চলনে-বলনে-লেবাসে তাদেরকেই খাঁটি মনে করে ভুল করছি। হায় রে আল্লাহর পরীক্ষা! সব কিছু বুঝেও শয়তান কিছুই বুঝতে দেয় না। কারণ শয়তান শিখিয়ে দেয় যে, বাহিরে খুঁজে দেখ শয়তান কোথায় আছে। বাহিরে শয়তান থাকে না। থাকবার বিধানটি কোরানে দেওয়া হয় নাই।

অথচ মানুষ বাহিরের শয়তান খোঁজে। আপন অন্তরে শয়তান বাস করছে, অথচ খুঁজতে হয় বাহিরে। মানুষ জানে যে, আসমান-জমিন আল্লাহর তসবিহ পাঠ করছে, আসমান জমিন আল্লাহর তৌহিদে বাস করছে, তবু এত বড় মহাসত্যটি জানবার পরও মানুষ ভুলে যায় যে, তার আপন হৃদয় ঘরেই শয়তান বাস করছে, শয়তান মিটি মিটি হাসছে।

এই আপন হৃদয় ঘরে বাস করা শয়তান মানুষকে শয়তানের গোলাম বানিয়ে রেখেছে, মানুষকে শয়তানের কেনা গোলাম বানিয়ে রেখেছে। আপন হৃদয়ঘরে শয়তান বাস করে কত প্রকার শোষণ, নির্যাতন, জুলুম-অত্যাচার, ঘৃণ্য প্রতিযোগিতা, খুনখারাপি, দুর্নীতি আর ঘুষ-চুরি-ডাকাতি শিখিয়ে দিচ্ছে তার ইয়াত্তা নাই।

আরও চাই আরও চাই করেও চাওয়ার শেষ নাই। ঠুনকো সম্মানের মূলা নাকের ওপর ঝুলিয়ে শয়তান মানুষকে দিয়ে গাধার মতো ঘুরাচ্ছে অথচ মানুষ বুঝতেই পারে না যে, সে শয়তানের গোলামি করছে। গাবতলি বাজারের গরু-ছাগলের হাট হতে কিনে আনা গরুর মতো শয়তানের গোলামি করছে এটা মানুষ বুঝতেই পারে না।

যখন বুঝতে পারে তখন নফ্স মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে ফেলেছে। মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করার পর সব কিছু দিবালোকের মত পরিষ্কার। তখন আর বুঝেও লাভ নাই।

সৃষ্টিরহস্যের আলোচনা:
আল্লাহ মানুষের পূর্বে ফেরেস্তাদের তৈরি করলেন। চরিত্রের বিশ্লেষণে ফেরেস্তা হলাে সম্পূর্ণ ভালাে (অ্যাবসােলিউট গুড)। এই সম্পূর্ণ ভালাে ফেরেস্তাদের অপবিত্র কাজ করার কোনাে অধিকারই দেওয়া হলাে না। কিন্তু এই সম্পূর্ণ ভালােটাই তথা ফেরেস্তাদের আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণ ভালাে লাগলো না।

তিনি বানালেন শয়তান। শয়তান হলাে সম্পূর্ণ অপবিত্র (অ্যাবসােলিউট ব্যাড)। এই সম্পূর্ণ অপবিত্র তথা শয়তানকেও আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণ খারাপ লাগলো। তাই তিনি সম্পূর্ণ ভালাে ফেরেস্তা আর সম্পূর্ণ খারাপ শয়তানের সংমিশ্রণে বানালেন মানুষ।

এই ফেরেস্তা এবং শয়তানের মিশ্রিত রূপ মানুষই আল্লাহর কাছে সবচাইতে প্রিয়। তাই মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব তথা আশরাফুল মাখলুকাত (ক্রাউন অব দ্য ক্রিয়েশন) বলে ঘােষণা করলেন।

নির্দিষ্ট সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (লিমিটেড ফ্রি উইল অ্যান্ড চয়েজ) দেওয়া হলাে। এই ইচ্ছাশক্তি তথা আমিত্ব বর্জন করে আল্লাহতে ফানা হয়ে যাবার ফর্মুলা দিলেন। আমিত্ব বর্জন করলেই আল্লাহর জাতের সঙ্গে মিশে যাবার সর্বোচ্চ পুরস্কার পাবার কথা ঘােষণা করলেন।

এক ফোঁটা পানি অনেক পানির মধ্যে ফেলে দিলে যেমন সম্পূর্ণরূপে মিশে যায়। সেই নির্দিষ্ট পানির ফোটাটি আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তেমনি একের মধ্যে মিশে একাকার হয়ে যাবার একমাত্র উপদেশ দিলেন।

আত্মার বিজ্ঞানী হজরত শেখ ফরিদের ‘আমিই অলি, আমিই আলি, আমিই নবী, আমিই মাওলানা, আমিই বীরপুরুষ এবং আমিই মন্দিরের ব্রাহ্মণ পুরােহিত’ বলার গভীরতম রহস্য এখানেই লুকিয়ে আছে।

আত্মার বিজ্ঞানী শামসে তাব্রিজকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, তিনি কি মুসলমান? তার উত্তরে তিনি এটুকুই বললেন যে, তিনি অগ্নি উপাসকও নন, খ্রিস্টানও নন, ইহুদিও নন এবং মুসলমানও নন। তিনি জীবনের মধ্যে নেই, মৃত্যুর মধ্যেও নেই ; তিনি পানিতেও নেই, মাটিতেও নেই ; তিনি আগুনও নন, বাতাসও নন, মাটিও নন, পানিও নন ; তিনি পুরুষও নন, তিনি মহিলাও নন এবং ফেরদৌস নামক বেহেস্তের ফেরেশতাও নন।

যদি আমরা প্রশ্ন করি, তবে আপনি কে? উত্তরটি সহজ, যা হজরত মনসুর হাল্লাজ বলেছিলেন।

কোনাে একজন আত্মার বিজ্ঞানী আল্লাহর অলিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, তার কি মৃত্যু নেই? তিনি উত্তর দিলেন, না অলি আল্লাহ কখনােই মরেন না। (অলি আল্লাহি লা ইয়া মুতু) আবার প্রশ্ন করা হলাে, কেন মরেন না?

তিনি সুন্দর একটি উত্তর দিলেন, যেহেতু মৃত্যুর স্বাদ কেবলমাত্র একবারই গ্রহণ করতে হয়, দুইবার নয়, সেহেতু অলি আর মরেন না। যেহেতু মারা যাবার আগেই অলি মারা যান, সেহেতু পুনরায় মরার প্রশ্নই আসে না।

আত্মার বিজ্ঞানী হজরত আবদুল কুদ্দুস বলেছিলেন, ‘গুফতে কুদ্দুসি ফকিরি দার ফানা ওয়া দার বাকা খুদবাখােদ আজাদ বুদি খােদ গেরেফতার আমদি’ অর্থাৎ বলে দাও ফকিরের তথা আল্লাহর অলির লয় এবং স্থিতি ইচ্ছাকৃত এবং দেহধারণ ও দেহত্যাগ তাঁর ইচ্ছাকৃত-অর্থাৎ এখানে লাশটি পড়ে আছে, কিছু দূরে সেই একই সময়ে আবার সেই একই দেহ নিয়ে পরিচিত লােকদের সঙ্গে কথা বলছেন।

এই আত্মার বিজ্ঞান শিক্ষার তাগিদ‌ দিতে গিয়ে ইসলাম ঘােষণা করছে, যাকে বিজ্ঞানের তথা হেকমতের জ্ঞান দান করা হয়েছে তাকে যথেষ্ট কল্যাণ দান করা হয়েছে। বিরাট বিরাট যুক্তির অকাট্য প্রমাণ দিয়ে অনেক কিছু করা যায়, একজনের মুখে তালা মেরে দেওয়া যায়, আনন্দ আর আত্মতৃপ্তিতে মনকে ভরিয়ে তােলা যায়।

যুক্তির মাধ্যমে সত্যের কাছাকাছি এগুনাে যায় অথবা সত্যের আলাের সন্ধান পাওয়া যায়। বিরাট বিরাট বিজ্ঞানের আবিষ্কারে মানুষকে অবাক করে দেওয়া যায়। মানুষ কোনাে দিন যা ধারণাও করে নি সেই নতুন ধারণার ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে চিন্তা ভাবনা করতে পারা যায়।

বােতামে টিপ দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা একটা দেশকে বােমার আঘাতে মানচিত্রের চেহারা বদলিয়ে দেওয়া যায়। মনে করুন আরও অনেক অনেক কিছু করা যায়। মনে করুন মানুষটাকে কেটে জোড়া লাগানাে যায় তবুও তাে একটি প্রশ্ন, একটি জিজ্ঞাসা থেকে যায়।

যেদিন এই সামান্যতম একটি জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়া যাবে সেইদিন আমার মনে হয় মানুষ পাবে প্রকৃত শান্তি পাবে। এর আগে মানুষ শান্তি পেতে পারে কি না সন্দেহ (অবশ্য ইহা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ধারণা, সুতরাং আমার ধারণাও ভুলও হতে পারে)।

সেই ছােট্ট জিজ্ঞাসাটি, ছােট্ট প্রশ্নটি হলাে : দেহতে যে আমিটি বাস করছে যে আমিটি কথা বলছে, যে আমিটি দেখছে, যে আমিটি অনুভব করছে- সেই আমিটি কে? সেই আমিটার নাম কী? সেই আমিটার পরিচয় কী? এত জ্ঞান বিজ্ঞান যে আধসের (?) মাথার মগজে গুজে রাখা হয়েছে সেই মগজের মালিক ‘আমিটা কে? গোঁজামিলের উত্তর, আত্মতৃপ্তির উত্তর নানা মুনি নানা রকমে বােঝাতে চেয়েছেন, কিন্তু ঐ পর্যন্তই।

……………………………
আরো পড়ুন:
বাবা জাহাঙ্গীর

বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: এক
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: দুই
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: তিন
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: চার
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: পাঁচ
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: ছয়
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: সাত

প্রাসঙ্গিক লেখা

2 Comments

  • মিরজাহান , রবিবার ১৭ মে ২০২০ @ ৮:৩১ অপরাহ্ন

    সাধু…
    জয়গুরু…

  • Sp Forid Shah , বুধবার ২০ মে ২০২০ @ ৫:০২ অপরাহ্ন

    আসসালামু আলাইকুম ,,দাদা আমি জানতে চাই ,,যে আদম যে গন্ধম খেয়ে ছিলো ,সে গন্ধম টা মুলত কি ছিলো ,,এবং এর হাকিকত কি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!