বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: সাত

বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: সাত

কর্ম বন্ধন নয়, কামনাই কর্মের বন্ধন:
কর্ম বন্ধন নয় বরং কর্ম এবাদত। কর্মের অভ্যন্তরে খান্নাসের দেওয়া কামনাগুলো যখন আপনার ভেতর হতে প্রকাশিত হয়ে পড়ে তখনই কর্মটি বন্ধনে পরিণত হয়ে যায়। খান্নাসের চাওয়া-পাওয়াগুলো মানবদেহের বাহিরে থাকে না, বরং নফ্সের অভ্যন্তরেই লুকিয়ে থাকে।

সেই কামনাগুলো যখন কর্মগুলোর উপর হস্তক্ষেপ করে বসে তখনই কর্ম বন্ধন হয়। সুতরাং কামনার জন্মদাতা পবিত্র নফ্স নহে বরং অপবিত্র খান্নাস। সুতরাং যেইমাত্র কামনা কর্মের উপর প্রভাব বিস্তার করে তখনই কর্ম বন্ধন হয়ে পড়ে। কামনার বন্ধন মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রতারিত করে।

মৃত্যু নামক ঘটনাটি যখন জীবন সায়াহ্নে এসে দাঁড়ায় তখনই মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারে, সব কর্মগুলোই আমার বৃথা, নিষ্ফল, অসাড়। কিন্তু তখন করার আর কিছুই থাকে না। ঢাকাইয়া ভাষায় বলে- অপারেশন সাকসেসফুল, কিন্তু রোগী মারা গেছে।

মহানবী ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন, সংসারধর্ম পালন করেছেন, অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু কামনার বন্ধন এক মুহূর্তের তরেও স্পর্শ করতে পারে নি।

যেখানে অবিশ্বাসের ভূমি সেখানেই বিশ্বাসের ফসল জন্মে। অবিশ্বাসের মাঠটা যদি পোড়া মাটিও হয়, কোন ফসল জন্মাতে পারে না বলে যদি কোন জাঁদরেল জাননেওয়ালা বলে, তবু বিশ্বাসের ফসল কী করলে জন্মাবে তার চলে অবিরাম গবেষণা। কেবল মানুষ নামক জাতটা বিশ্বাস নামক ফসলটার জন্ম দেবার গবেষণায় মেতে থাকবে।

কারণ অবিশ্বাস আছে বলেই তো বিশ্বাসের মোহর মারার ইচ্ছাটা থেকে ছিল, থাকে এবং থাকবে। অবিশ্বাসের নাম যদি মা হয় তবে সেই মায়ের পেটের সন্তানটির নামই বিশ্বাস। কাকের বাসায় কোকিলের জন্ম। অসাধুর ঘরে সাধুর জন্ম। মূর্তিপূজারক আজরের ঔরশে ইব্রাহিম। পুঁজিবাদের পেটে সাম্যবাদ।

প্রচণ্ড ঝাঁকুনির প্রেমে প্রশান্তির দ্যুতিদর্শন। ময়লা আবর্জনার পেটে জন্ম হয় অবাক করা সব বড় বড় গাছ-গাছড়া। অবিশ্বাস যেমন কাঁদাতে জানে তেমনি হাসাতেও পারে। অবিশ্বাসের জঞ্জালের মাঝে বিশ্বাসের এমন সব মণিমাণিক্য বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করে ফেলেন যে, সবাই ধন্য ধন্য করতে করতে বাধ্য হয়।

শত বছর আগে যা ছিল অবিশ্বাস্য, গাঁজাখুরি গল্প, আজ সেটাই বিশ্বাস্য এবং বাস্তব বলে সবাই মেনে নিচ্ছে এবং মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

মারেফতের গোপন দর্শন:
পৃথিবীর চিন্তাশীল ব্যক্তি এবং বৈজ্ঞানিকদের আকুল আবেদন করছি আপনারা মানুষ মারার নতুন নতুন ফাঁদ আবিষ্কার না করে গবেষণা করে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করুন যে, এই হার মাংসের তৈরি মানবদেহটাতে যে আমিটা তথা রূহ তথা আত্মাটা বাস করছে, সে কে? কি তার পরিচয়? কিভাবে তার পরিচয় পাওয়া যেতে পারে তার ফর্মুলা দান করুন।

বিদ্যুতের শক্তির মত এত গতির অধিকারী তো আমিটা নয়। যদি ধরে নেই, দেহের সবকিছুর মিলিত সিনথেসিসটাই আমি নামক প্রাণটা, তবে ইহাতে কি একটা বিরাট গোঁজামিলের ফাঁকি মারা হয় না? এই ফাঁকি মারা যতদিন চলতে থাকবে, যে কোন ইজমের দোহাই দিয়েই হোক না কেন, তাতে কি পৃথিবীতে শান্তি আসতে পারবে?

‘দরিদ্রতার যেমন অভিশাপ আছে প্রাচুর্যের তেমনি অভিশাপ আছে’-এই দর্শন ইসলাম আমাদেরকে দিয়েছে। তাহলে শান্তি কোথায়? একটা অজানা অতৃপ্ত কামনা-বাসনার স্রোতে ভেসে চলেছি। অহংকার, আত্মগরিমা অনেক সময় সাময়িক শান্তি দেয়, আবার সেই একঘেয়ে অহংকার এবং আত্মগরিমা ভালো লাগেনা।

কোথায় যেন নিজেকে সমর্পণ করতে পারলে আরাম পেতাম, পেতাম শান্তি-এ রকম প্রশ্ন বুকের ভেতর বোবার মত কেঁদে ওঠে।

প্রাচুর্যের অভিশাপে ইউরোপ-আমেরিকার তরুণ-তরুণীরা দিশেহারা হয়ে শান্তি খোঁজে। রাশিয়ার দর্শন(ফিলোসফি)- হচ্ছে খাদ্যই সবকিছু, আর কিছু নেই, এই ভেটো মারা কথাতেও শান্তি নেই, গণতন্ত্রেও শান্তি নেই, রাজতন্ত্রে শান্তি নেই, জাতীয়তাবাদেও শান্তি নেই, তবে শান্তি কোথায়?

এই বিরাট অথচ অতি ক্ষুদ্র এবং অতি পরিচিত প্রশ্নের উত্তর যেদিন মানব জাতি আবিষ্কার করতে পারবে যেদিন আমি’কে চিনবার কোন সার্বিক বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা দিতে পারবে, যার দ্বারা ‘আমি’কে চেনা যায়, সেদিনই পৃথিবীর মানুষগুলো প্রকৃত শান্তি পাবার আশা করতে পারে।

আঘাতের বিনিময়ে আঘাত প্রদান করা হলো সামাজিক আইন, কিন্তু আঘাতের প্রতিদানে ক্ষমা করতে পারলে হয় প্রেম। কারণ আল্লাহ পাক ছাড়া কিছুই নেই। সুতরাং প্রেমও তিনি, আঘাতও তিনি।

তাই তিনিই পরম দয়ালু এবং চরম শাস্তিদাতা এবং চরম সত্যে তিনিই দাতা, তিনিই গ্রহীতা, তিনিই আশেক, তিনিই মাশুক, তিনিই প্রেমের মধুমিলন, আবার তিনিই প্রেমের বিরহে বিরহী। কারণ তিনি ছাড়া কিছুই নেই। তাই তিনি আহাদ তথা অ্যাবসোলিউট তথা অখণ্ড একক।

ধর্ম একটিই বহু নয়:
একটি মানুষ ভাবে যে, সে একা কিন্তু সে মোটেই একা নহে। এই দেহটিই একটি মানুষের পরিচয় বহন করে, কারণ নফ্স তথা জীবাত্মাটি নিরাকার, দেহটির আকার আছে তাই দেহ দিয়ে নফসের পরিচয় পাওয়া যায়। এই দেহের মধ্যে তিনজন বাস করে যথা- নফস, খান্নাসরূপি শয়তান তথা মায়া এবং “’আমি রূপে’ নয় বরং আমরারূপে আল্লাহ বাস করেন।

আল্লাহ বলেছেন, তুমি একা হও সঙ্গে সঙ্গে আমার ডাক শুনতে পাবে। নির্জনে একাকি আল্লাহকে জিকিরের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত ডেকে চলছি, কিন্তু ডাকের জবাব পাই না। যখন বুঝতে পারলাম আমি মোটেই একা নই, আমার সঙ্গে শয়তানকে খান্নাসরূপে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।

যেমন দুধের মধ্যে মাখনকে ঢুকিয়ে রাখা হয়। দুধ দেখে মনেই হয় না যে, এই দুধেরই মধ্যে মাখন লুকিয়ে আছে। এই খান্নাসরূপি শয়তানটি আমার সঙ্গে আছে বলেই আমরা দুইজন হয়ে গেলাম। আল্লাহ বলেছেন, একা ডাকলেই সঙ্গে সঙ্গে জবাব পাবে।

ডাক দেওয়াকে আরবি ভাষায় দাউন বলা হয়। একা ডাকাকে দাউন+ইয়া= দাউন উদুনি। দুইজন ডাকলে হয় দাউন+না= উদুনা। উদুনা হলে ডাকের জবাব পাওয়া যায় না, আমি+খান্নাস হয়ে গেল উদুনা। আমি একা হলে হয়ে যায় উদুনি। তাই কোরানের সুরা মোমিনের ষাট নং আয়াতে বলা হয়েছে উদুনি তথা একা ডাক। বলা হয়নি উদুনা তথা খান্নাসকে সঙ্গে নিয়ে ডাক।

এই খান্নাসকে সরিয়ে দাও তাহলে তুমি একা। তাই খাজা বাবা তার প্রধান খলিফা কুতুবউদ্দিন বকতিয়ার কাকীকে বলেছেন যে, একা হয়ে ডাক, জবাব তোমার ভেতরে সঙ্গে সঙ্গেই পাবে। ইহাই শান্তির ধর্ম, ইহাই আত্মসর্মপনের ধর্ম।

এই আত্মসর্মপনের ধর্মটিকে অনেক ভাষায় অনেক রকম নাম দেওয়া হয়। যেমন পানি, জল, ওয়াটার, আব্বুন, একুয়া, ছুয়ি, তান্নি, মিজু ইত্যাদি। একই পানির এত নাম, কিন্তু মূলে একই জিনিস। একই ধর্ম-বহু দেশের বহু ভাষায় অনেক রকম নাম, আসলে একই ধর্ম।

আমার কথাগুলো কি সত্য:
সবচাইতে প্রাচীনতম সংগীতটির নাম কি তুমি জান? মানুষকে মরণের ভয় দেখানো। সংগীত আর কান্নার বিলাপ পাথর কেউ নাড়িয়ে দেয়। তাইতো মানুষ বিরহের যাতনায় পাথর হয়ে যায়, কিন্তু যদি সেই সময় তারই সামনে করুন সুরে সংগীত পরিবেশন করা হয় তাহলে হয় সে বিমোহিতের পুকুরে ডুবে যাবে নয়তো মনের প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির শীলাটি নাড়িয়ে তুলবে নতুবা মৃদু একটি ঝাঁকুনি পেতে পারে।

উষ্ণ মরুভূমির কঠিন পাথরটি চিৎকার করে বলতে চায়, যা তোমরা শোনা নাই। বলতে চায় ঝর্ণার জলের স্রোতের ধারে যদি আমি থাকতে পারতাম তাহলে আমি সবসময় জলের ভালোবাসায় সিক্ত হতে পারতাম। আমার দৈহিক চাহিদাকে আমি অস্বীকার করতে পারি না কারণ প্রকৃতির অদৃশ্য বন্ধনে আমাকে বেঁধে রাখা হয়েছে।

অপরূপ রূপসীর প্রতি তাকালে আকর্ষণতো জাগবেই। কিন্তু তুমি সে আকর্ষণটাকে প্রচণ্ড ধমক দাও, ধমক দাও তোমার ইচ্ছাশক্তির দ্বারা। যদি প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তিকে হার মানাতে চাও তাহলে তোমার ঠোঁট দুটি দেওয়ালে ঘঁষে ফেলো।

আমি রহস্যের জ্ঞান পাবার আশায় জ্ঞানের পুকুরে বড় আশা করে জাল ফেললাম কিন্তু সেই জালে একটিও জ্ঞানের মাছ পেলাম না। পেলাম কেবলই ড. ডিগ্রিধারী বিদ্বানদের মাথার খুলিগুলো। আমি জানি, সত্য সবসময় ঘৃণা করে মিথ্যাকে যেমন গ্রে হাউন্ড কুকুরগুলো ঘৃণা করে চিতা বাঘগুলোকে।

সত্য উলঙ্গ, উলঙ্গের কোন ঢাকনা থাকে না। সেই উলঙ্গ সত্যটিকে পাবার আশায় ধ্যানমগ্ন হয়ে দেখতে পেলাম মাত্র একটি জিনিস। সেই জিনিসটির নাম হলো আমারই আমি। এই আমার আমির ভেতরেই ঢেকে আছে পরম সত্যটি। ঢাকনা খোলা মাত্রই দেখতে পেলাম আমার ঐ আমিটি চিৎকার দিয়ে ঘোষণা করছে আমিই একমাত্র সত্য।

মনের মাঝে শয়তান:
পাথর, কাঠ, মাটি এবং বিভিন্ন ধাতব পদার্থগুলো আল্লাহর তুষ্টি পাঠ করছে তথা প্রশংসা করছে। কিন্তু এই পদার্থগুলোর উপর যখন লোভ, মোহ, মায়া বিভিন্ন রকমে বিভিন্ন স্টাইলে তুলে ধরে সেই তুলে ধরা বিষয়টির অনুসরণ করাকেই শয়তানের ইবাদত করা বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

সুতরাং শয়তান পাথর, মাটি, গাছ এবং পদার্থের মাঝে থাকে না। থাকতে পারে না এবং থাকার অধিকারও দেওয়া হয়নি। বরং শয়তানের একমাত্র বাসস্থানটি হলো মানুষের মন। মন ছাড়া শয়তান থাকতে পারে না। যেমন পানি ছাড়া মাছ বাস করতে পারে না।

যখনই মানুষের মনের মাঝে শয়তান তার অনেক রকম লোভ ও মোহের কলাকৌশলগুলো তুলে ধরে এসব, সেই তুলে ধরা বিষয়গুলো তখন শয়তানের ইবাদত করতে শুরু করে দেয় এবং যখন শয়তান চন্দ্রগ্রহণের মতো মনটাকে একদম শয়তানের অনুগত করে ফেলে, তখনই সেই মানুষটিকে বলা হয় জীবন্ত মানুষরূপী শয়তান।

……………………………
আরো পড়ুন:
বাবা জাহাঙ্গীর

বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: এক
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: দুই
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: তিন
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: চার
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: পাঁচ
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: ছয়
বাবা জাহাঙ্গীরের বাণী: সাত

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!