বাহাউদ্দিন নকশবন্দী

-মূর্শেদূল মেরাজ

শেখ বাহাউদ্দীন নকশবন্দী বোখারার (উজবেকিস্তান) পার্শ্ববর্তী কাসরে আরেফান নামক স্থানে ১৪ মুহররম ৭১৮ হিজরী (১৮ মার্চ ১৩১৮ সালে) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জালানুদ্দীন। প্রচলিত ধারণা মতে, শেখ বাহাউদ্দীনই ইসলামের প্রধান চার তরিকার অন্যতম নকশবন্দী তরিকার প্রতিষ্ঠাতা।

আবার অনেকে বলেন, এই তরিকা পূর্ব থেকেই প্রচলিত ছিল শেখ বাহাউদ্দীনের মাধ্যমে প্রসার ঘটায় তরিকাটি তার নামেই পরিচিতি লাভ করে। এই সূত্রে এই তরিকার প্রবর্তক হিসেবে বায়জিদ বোস্তামীকে ধরা হয়। বায়জিদ বোস্তামী থেকে শুরু করে বাহাউদ্দীন নক্শবন্দীয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে এই তরিকা বিস্তার লাখ করে।

কথিত আছে, শেখ বাহাউদ্দীনের জন্মের অনেক আগেই তৎকালীন প্রসিদ্ধ আলেম মোহাম্মদ বাব সাম্মাসী ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন, কাসরে আরেফানে এমন একজন জন্মগ্রহণ করবে যে শরিয়ত ও তরিকতের খ্যাতিমান ইমাম হবে। এমন কি তিনি শেখ বাহাউদ্দীনের পিতাকে এও বলেছিলেন, তোমার ঘরেই জন্মাবে সেই গৌরবময় সন্তান যে আমার সিলসিলা আলোকিত করবে।

কথা মতো জন্মের তৃতীয় দিন বাহাউদ্দীনকে কোলে নিয়ে তার পিতা সাম্মাসীর দবরাবে হাজির হন। সাম্মাসী শিশুটিকে কোলে নিয়ে তার মুরিদ ও খলিফা আমীর কালালকে বলেন, ‘এ শিশু পুত্র সম্পর্কে তোমার প্রতি আমার হুকুম হল- তুমি এর আধ্যাত্মিক শিক্ষার ভার গ্রহণ করবে। এর তালিম ও তরবিয়াতের ব্যবস্থা এবং একে বেলায়েতের শীর্ষস্থানে পৌঁছে দিবে।’

একদিন বাহাউদ্দীন তার পীর সাম্মাসীর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। পথে মুখ ঢাকা জনৈক ব্যক্তি তার সাথে কথা বলতে চাইলো। কিন্তু তিনি তা আমলে নিলেন না। সোজা পীরের দরবারে হাজির হলেন।

সাম্মাসী বললো, ‘পথে তোমার সাথে যার সাক্ষাত হল তার সাথে কথা বল নাই কেন? তিনি ছিলেন হজরত খিজির (আ)।’ উত্তরে বাহাউদ্দীন বললেন, ‘হুজুর আমি আপনার কাছে আসছিলাম, এজন্য অন্য কোন দিকে লক্ষ্য করি নি।’ গুরুর প্রতি এই ভক্তি দেখে সাম্মাসী মুগ্ধ হলেন।

সাধনাকাল
শৈশব থেকেই বাহাউদ্দীন অসংখ্য সুফি সাধকদের সাহচর্য লাভ করেন। অল্প বয়সেই তিনি সাম্মাসীর হাতে বায়াত হন। তার প্রথম দীক্ষাগুরু সাম্মাসী হলেও তিনি সাম্মাসীর মুরীদ কালালের কাছে আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।

বাহাউদ্দীনের ১৮ বছর বয়সে তার পিতা সাম্মাসীর কাছে পুত্রের বিয়ের অনুমতি প্রার্থনা করেন। নকশবন্দী এ ঘটনা সম্পর্কে বলেন, ‘সে রাত্রিতে আমি নামাজে সিজদায় গিয়ে দোয়া করলাম, হে আল্লাহ তুমি আমাকে এ গুরুভার বহন করা থেকে মুক্তি দান কর।

পরদিন দরবারে হাজির হলে আমাকে লক্ষ্য করে সাম্মাসী বললেন, ‘হে আমার মাওলা এ গুনাহগার বান্দাকে তোমার মর্জির উপর কায়েম থাকার তৌফিক দান কর।’ যতদূর জানা যায় এ ঘটনার পর বাহাউদ্দীন নকশবন্দী সাম্মাসীর জীবদ্দশায় বিয়ে করেন নি।

পরবর্তীতে বোখারায় অবস্থানকালে তিনি বিয়ে করেন। বিয়ের পর এ পর্যায়ে মায়ের আদেশে উপার্জনের উদ্দেশ্যে বাহাউদ্দীন সমরকন্দে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পথিমধ্যে এক মসজিদের দেয়ালে কবিতার দুটি লাইন তার সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়। তিনি আবার কসরে আরেফান ফিরে আসেন।

মসজিদের দেয়ালে লেখা ছিল, ‘বন্ধু তোমার সাথে দেখা হওয়ার সময় হয়েছিল। তুমি আরেকটু ধৈর্য ধরলেই আমাকে পেতে।’

জানা যায়, সাম্মাসীর মৃত্যুর পর তিনি কালালের কাছে বিদায় নিয়ে সমরকন্দ যান। সেখানে প্রথমে খ্যাতিমান আলেম শেখ ফাতাহ’র সেবায় কিছুকাল অবস্থান করেন। সেখান থেকে বিদায় নিয়ে অলি খলীল আক্কার দরবারে তার সেবায় দীর্ঘ বার বছর কাটিয়ে দেন। এ সময় তিনি অনেক অলি-আওলিয়ার সাহচর্যে আসেন।

তিনি বোখারার মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়াতেন। ইবাদত রিয়াজত, মোযাহাদা ও মোরাকাবায় মগ্ন থাকতেন সর্বদা। স্রষ্টার প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরে শুরু করেন এক সময়। তার নি:স্ব অবস্থা দেখে একদিন এক অলি প্রশ্ন করলো, তোমার খাওয়া-পরার ব্যবস্থা কি?

উত্তরে তিনি বললেন, ‘পেলে খাই অন্যথা না খেয়ে থাকি।’ শুনে অলি হেসে বললেন, ‘এতো খুবই সহজ কাজ। আসল কাজ হল নিজের নফসকে সদা সর্বদা মাকামে তৌবায় নিয়ন্ত্রিত রাখা, যাতে অনাহারে খাকলেও সে তোমাকে কখনও বিপথগামী করতে না পারে।’

সেই নফসের পবিত্রতা লাভের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ চার যুগের বেশি সময় ধরে তিনি কঠিন সাধনা করেন। একসময় তার ভাবনায় আসে, পরবর্তী সময়ের মানুষের হায়াত কি এতো দীর্ঘ হবে? তারা কি এত কষ্ট স্বীকার করতে পারবে?? বোখারায় ফিরে তাই একটা সহজ তরিকা লাভের আশায় মসজিদে চিল্লায় বসেন।

এ সময় তিনি লাগাতার পনের দিন সেজদায় পড়ে থাকেন। নামাজের সময় হলে শুধু জামাতে ফরজ নামাজ আদায় করতেন। এ পুরো সময়টায় তিনি এক দানা আহার বা এক ফোঁটা পানিও স্পর্শ করেন নি। এর কিছু দিনের মধ্যই নতুন তরিকার রূপরেখা তার অন্তরে প্রকাশ পায়।

বাহাউদ্দীন নকশবন্দী সেজদায় দোয়া করতেন, ‘হে প্রভু! তুমি আমাকে এমন তরিকা দান করো, যে তরিকায় সহজে তোমার পরিচয় লাভ করা যায়। আমি যাতে বঞ্চিত না হই। ..মোহাম্মাদের অনুসারীদের জন্য সহজ তরিকার দাবী আদায় না করে আমি সেজদার থেকে উঠবো না।’

অবশেষে পনের দিন পর খোদার তরফ থেকে নির্দেশ আসে, ‘আমি তোমাকে এমন তরিকা দান করব, যে তরিকায় দাখিল হওয়ার পর কেউ বঞ্চিত হবে না।’

মানুষের শরীরে দশটি লতিফা, এর পাঁচটি লতিফা ‘আলমে-আমর’ বা সূক্ষ্ম জগতের। অপর পাঁচটি লতিফা ‘আলমে-খালক’ বা জড় জগতের। আলমে-আমরের পাঁচ লতিফা হলো- কল্ব, রূহ, সির, খফী ও আখ্ফা নূরের তৈরি, সে জন্য তা নূরানী।

স্রষ্টার শব্দ দ্বারা যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, তার মধ্যে ‘আলমে-আমরের’ পাঁচ লতিফা শামিল। আর ‘আলমে খালক’ বা জড় জগতের পাঁচ লতিফা হলো অন্ধকারাচ্ছন্ন। সেগুলো হলো- আগুন, পানি, মাটি, বাতাস ও নাফ্স।

নকশবন্দী তরিকা প্রবর্তনের পূর্বে নফস বা প্রবৃত্তি পরিশুদ্ধির জন্য ‘তরকে হাকীকী’ বা দুনিয়ার সব কিছু ত্যাগ করার উপদেশ দেয়া হতো। নফসের পবিত্রতা রক্ষার জন্য কঠিন ও কঠোর সাধনা করতে হতো। কারণ নফস নিয়ন্ত্রক করা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।

অহেদউদ্দীন কিরমানী তার কবিতায় লিখেন-

‘ষাট বছর কঠোর সাধনায় অহেদউদ্দীন
অবশেষে সে․ভাগ্যের দর্শন হয় এক রজনীতে।’

খোদার তরফ থেকে বাহাউদ্দীন নকশবন্দীর উপর নির্দেশ হয়, ‘নাফ্সের নিয়ন্ত্রণ খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তার বর্ণ অন্ধকার কয়লার মতো কালো। আর ‘কলব’ যেহেতু নূর থেকে সৃষ্ট স্বচ্ছ আয়নার মতো। তাই তুমি প্রথমে কলব পরিশুদ্ধ করো। তাহলে মানুষের অন্তরে অতি দ্রুত বাতিনী নূর আলোকিত হবে। অন্তরে স্রষ্টার প্রেমভাব উদয় হলে মন্দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়।

নির্দেশনা পাওয়ার পর তিনি তার কাছে যারা আসতো, তাদের এ নফসের বদলে প্রথমে কলব পরিশুদ্ধের শিক্ষা দিতেন। তিনি হলেন নকশবন্দীয়া তরিকার ইমাম বা সহজ তরিকার প্রতিষ্ঠাতা।

(চলবে…)

………………………
আরো পড়ুন:
শেখ বাহাউদ্দীন নকশবন্দী: এক
শেখ বাহাউদ্দীন নকশবন্দী: দুই

…………………
তথ্যসূত্র
উইকিডিয়াসমূহ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!