বেদ রচনার গোড়ার দিক : এক

বেদ রচনার গোড়ার দিক : এক

-সুকুমারী ভট্টাচার্য

সাধারণ ভাবে অর্ধশিক্ষিত ও শিক্ষিত ভারতবাসীর মনে একটা বিশ্বাস ব্যাপক ভাবে দীর্ঘকাল ধরেই আছে যে বেদের যুগের মানুষ বেদে বিশ্বাসী ছিল। পরিসংখ্যানগত ভাবে হয়তো কথাটা ঠিকই, অর্থাৎ বেশির ভাগ মানুষ হয়তো বেদে বিশ্বাসী ছিল। এ কথা বললেই যে-দুটি প্রশ্ন আসে তা হল-

১. বেদের যুগ কোনটা? এবং
২. বিশ্বাস কীসে ছিল?

ঐতিহাসিকরা মোটের ওপর খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতক থেকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক পর্যন্ত বৈদিক সাহিত্যের রচনাকালের ব্যাপ্তি ধরেন। এর মধ্যে খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতক থেকে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকের মধ্যেই ঋকুসংহিতা/ও যজুঃসংহিতা রচনা সমাপ্ত হয়েছিল। এটা কিছুটা আগেও হয়ে থাকতে পারে, কারণ, বৈদিক আর্যরা এ দেশে আসার সময়ই কিছু পূর্বপরিচিত সূক্ত–কবিতা ও গান সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।

সামবেদ কোনও স্বতন্ত্র রচনা নয়, ঋগ্বেদের সূক্তগুলির নানা বিন্যাসে এটি রচিত। অর্থাৎ, যজ্ঞে গান গাইবার জন্যে ঋগ্বেদের কবিতাগুলিকে সুবিধে মতো সাজিয়ে এ বেদটি নির্মিত যাতে, সামবেদের গায়ক উদগীতারা যজ্ঞে গান করতে পারেন।

ঋগ্বেদের হোতারা এগুলো যজ্ঞে আবৃত্তি করতেন। অথর্ববেদের কিছু অংশ ঋগ্বেদেরও পূর্বে রচিত, কিন্তু ধর্মাচরণের সম্ভ্রান্ত ধারার মধ্যে সেগুলির স্থান হয়নি। এর কিছু অংশ ঋগ্বেদ থেকে সরাসরি ধার নেওয়া, সামান্য অদলবদল করে সাজানো।

অন্য কিছু ঋগ্বেদ সামবেদ সংকলিত হওয়ার পরে রচিত। এবং ওই দুটি বেদের সংকলন সমাপ্ত হয়ে যাওয়ায় ওগুলিতে স্থান না হওয়াতে কিছু কিছু রচনা অথর্ববেদে সন্নিবেশিত হয়। যজুর্বেদের মন্ত্রগুলি ঋগ্বেদ রচনার সামান্য কিছু পরে (কিছু-বা অনেকটাই সমকালে) রচিত হতে শুরু করে এবং ঋগ্বেদ সংকলিত হওয়ার অনেক পরে শেষ হয়; এই কারণে ঋগ্বেদ রচনা খ্রিস্টপূর্ব দশম শতক নাগাদ শেষ হলেও যজুর্বেদের রচনা ও অথর্ববেদের রচনা ও সংকলন আরও কিছুকাল ধরে চলতে থাকে।

যজুর্বেদ রচনা খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতক নাগাদ শেষ হয়, অথর্ববেদ আরও দু-তিনশো বছর ধরে চলে। যজুর্বেদের মূল ধারা ধরেই ব্ৰাহ্মণসাহিত্যের সূচনা। ঋগ্বেদে গদ্য একেবারেই নেই, যজুর্বেদ কোথাও কোথাও গদ্য আছে এবং সেই ধারাতেই।

অথর্ববেদেও কিছু গদ্য আছে। আর ব্রাহ্মণসাহিত্য পুরোপুরি গদ্যেই রচিত। তবে এ পর্যন্ত সবই–এবং এর পরেও শ-তিনেক বছর পর্যন্ত–বেদের যে-সাহিত্য রচনা হয় তা সম্পূর্ণ আস্য, অর্থাৎ বৈদিক আর্যরা নিরক্ষর ছিল তাই তারা মুখে মুখে রচনা করত, এবং পুত্র-শিষ্য-পরম্পরা সে-সাহিত্য কণ্ঠস্থ করত। খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতক থেকে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত এই ছশো বছর মুখ্যত বেদ রচনাকাল–বৈদিক যুগ।

এর পরে, উপনিষদ। অন্তত মুখ্য উপনিষদগুলি রচনা হওয়ার পরেও বেদের সম্পর্কে অন্য সাহিত্য রচিত হতে থাকে; তার নাম সূত্র বা বেদাঙ্গসাহিত্য: সে-রচনা চলে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক পর্যন্ত। এর সঙ্গে পূর্বের বৈদিক সাহিত্যের প্রভেদ হল, আগেরটিকে বলা হয় অপৌরুষের অর্থাৎ এটি কোনও মানুষের রচনা নয়, এ সাহিত্য দৈবশক্তির দ্বারা ঋষিদের কাছে প্রতিভাত।

যদিও বেদাঙ্গসাহিত্য রচনার কালে দেশে লিপি ও লেখা এসে গেছে, কিন্তু রচনা দেখে বোঝা যায় যে, বেদাঙ্গও আস্য রচনা। কারণ, এটি নিরতিশয় সংক্ষিপ্ত, সূত্রের আকারেই সমস্তটা রচিত হয়েছিল। অর্থাৎ লেখা তখন মানুষের ঐহিক সাংসারিক নানা প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে, শাস্ত্র রচনায় বা ধামাচরণে নয়।

বেদের কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ থেকে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতক হলেও এর তিনটি ভাগ করা যায়-

ক. ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব বেদের অধিকাংশ সংহিতার রচনাকাল- খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ থেকে অষ্টম শতকের শেষ বা সপ্তম শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত।

খ. অথর্ব সংহিতার শেষার্ধ ও ব্রাহ্মণসাহিত্য রচনাকাল (যদিও প্রথমদিকের ব্রাহ্মণগুলির রচনা এর আগেই শুরু হয়ে গেছে), অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম থেকে ষষ্ঠের শেষ ও পঞ্চমের পূর্বার্ধ পর্যন্ত; এবং

গ. বেদাঙ্গী-সাহিত্য রচনাকাল অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ বা পঞ্চম শতককাল। বৈদিক আর্যরা যখন ভারতবর্ষে আসে তখন তারা সঙ্গে নিয়ে আসে যাযাবর সময়ের পশুচারিতা, এবং পথে যেখানে যেখানে দু-এক বছর থেমেছিল সেখানে পেয়েছিল কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা। এ দেশে এসে তারা সম্মুখীন হল কৃষিজীবী এক সুস্থিত নাগরিক সভ্যতার।

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ থেকে দশম শতক পর্যন্ত মুখ্যত কৃষি ও পশুপালনই ছিল তাদের জীবিকা; এর সঙ্গে সঙ্গে ছিল যুদ্ধ, মৃগয়া ও লুণ্ঠন। এখানে আসবার পরে পায়ের তলায় মাটি পেতে কিছু সময় লেগেছিল, কিন্তু তারপর থেকেই মোটামুটি সাব-কটি বৃত্তি অব্যাহত রেখেই বেদের পরবর্তী অংশ অর্থাৎ ঋগ্বেদের প্রথম মণ্ডলের প্রথমার্ধ এবং দশম মণ্ডল, যজুর্বেদসংহিতা, অথর্ববেদের প্রথম দিকের রচনা এবং একেবারে গোড়ার দিকের ব্রাহ্মণগুলি রচনা চলছিল। এই অধ্যায়টি এইগুলির রচনাকালকে অবলম্বন করেই।

এই সময়ে উৎপাদনব্যবস্থা যা ছিল তা প্রয়োজনের পক্ষে পর্যাপ্ত ছিল না। প্রাগার্যদের কাছ থেকে হরণ করা এবং নিজেরা দখল করে পাওয়া জমি, ফসল গোধন, লুণ্ঠন, মৃগয়া এ সব মিলেও প্রয়োজনের অনুপাতে যথেষ্ট খাদ্যসম্পদ জুটিত না। নিরন্তর খাদ্যাভাব, অনাহার, ও দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনায় উৎপীড়িত ছিল জনসমাজ।

এর ওপরে শীতের দেশ থেকে অপেক্ষাকৃত গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে আসায় নতুন কিছু রোগব্যাধির আক্রমণও ছিল; আর ছিল প্রাগার্যদের দ্বেষহিংসা এবং তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ, এবং নিজেদের মধ্যে গোষ্ঠীকলহ। দুর্ভিক্ষ, মহামারি, প্রাগার্যদের কাছে পরাজিত হওয়ার আশঙ্কা ও অভিজ্ঞতা দুটিই বাস্তব ব্যাপার ছিল। অকালমৃত্যু, জরা এগুলোও জীবনযাত্রার অঙ্গ ছিল।

খরা বা অজন্মা, প্লাবনের মতো পশুপালে মড়কের ফলে পশুনাশ–এ-ও মাঝে মাঝে ঘটত। বহু দূরদেশে থেকে দু-তিন শতাব্দী ধরে ধাপে ধাপে এখানে-ওখানে থেমে থেমে এ নতুন দেশে এসে, সচ্ছলতা, স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা, দীর্ঘপরমায়ু–এ সব সুনিশ্চিত করার কোনও উপায় তাদের জানা ছিল না। তাই যজ্ঞ। এবং পৃথিবীর সব প্রাচীন সমাজে কোনও না কোনও না আকারে যজ্ঞ ছিল।

আর ছিল জাদুবিদ্যা, প্রাচীন পৃথিবীর সব সমাজেই যা চালু ছিল- যজ্ঞের সঙ্গে এর উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। প্রভেদ হল, যজ্ঞে দেবতাদের অনুরোধ করা হয় প্রাথীর মনস্কামনা পূরণ করার জন্যে, আর জাদুবিদ্যায় কোনও দেবতাকে না ডেকে সরাসরি কোনও অতিলৌকিক শক্তির দ্বারস্থ হয়ে ওই প্রার্থনাগুলোই পেশ করা হয়।

কোনওটাতেই নিশ্চিত ফল মেলে না, তবু মানুষ যেখানে অন্যথা সম্পূর্ণ নিরুপায়, সেখানে ইষ্টসাধনের জন্যে কোনও না কোনও চেষ্টা সে করবেই। বেদের যুগে যজ্ঞ এবং যাদু যুগপৎ চলিত ছিল। জাদুর কোনও সুসংহত শাস্ত্র আমরা পাই না, কেবল ঋগ্বেদে কিছু কিছু সূক্ত এবং অথর্ববেদে বেশ-কিছু সুক্তে এর অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে–যদিও অনুষ্ঠানের কোনও নির্দেশিকা পাওয়া যায় না।

কিন্তু যজ্ঞানুষ্ঠানের প্রক্রিয়া মোটামুটি স্পষ্ট ও ব্রাহ্মণ ও সূত্র সাহিত্যে সম্পূর্ণ ভাবে পাওয়া যায়। এ কথাও মনে রাখা দরকার যে, যজ্ঞের মধ্যে বহুলাংশে জাদুবিদ্যা অনুপ্রবিষ্ট ছিল, কারণ যজ্ঞানুষ্ঠান কেমন করে উদ্দিষ্ট ফল দেবে তা জানা ছিল না বলেই হিংটিংছট’ ধরনের কিছু কিছু অংশ যজ্ঞে ইতস্তত চোখে পড়ে।

তা হলে যে-ছবিটা চোখে আসে, তা হল ব্যাপক নিরাপত্তার অভাব–জীবনের সকল ক্ষেত্রেই–এবং এর প্রতিবিধানের জন্যে নানা বিচিত্র যজ্ঞের অনুষ্ঠান। মনে রাখতে হবে পশুচারী জীবনে যজ্ঞ ছিল নেহাতই সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান: দেবতার উদ্দেশে স্তবগান ও আবৃত্তির সঙ্গে পশুহত্যা এবং পরে সেটি রোধে খাওয়া।

কৃষিজীবী সুস্থিত জীবনে বীজ বোনা ও ফসল তোলার মধ্যে সময়ের ব্যবধান অনেক বেশি এবং এমন স্থিতিশীল সমাজে সমস্যাও অনেক বেশি। ফলে, একটি ছোট গোষ্ঠীর উদ্ভব হয় যারা সমাজের নানা সমস্যা, অভাব-অভিযোগের প্রতিকারের জন্যে ক্রমাগতই নতুন নতুন যজ্ঞ উদ্ভাবন করবে, নবতর প্রক্রিয়া বানিয়ে তুলবে এবং সমাজের অসহায় মানুষ অনন্যেপায় অবস্থাতে সে সবই মেনে নিয়ে নতুন নতুন অনুষ্ঠান করবে।

কাকতালীয়বৎ ফল আসবে কোনও কোনও অনুষ্ঠানে। আবার, সম্ভাব্যতার বিজ্ঞান অনুসারে কোনও কোনওটা নির্ম্মফলও হবে। তবু মানুষ ফিরে ফিরে সেই সব যজ্ঞের অনুষ্ঠানই করবে, কারণ ইষ্টসিদ্ধির জন্যে আর কোনও পথই তার জানা নেই।

এই ছিল বেদের প্রথম পর্যায়ে মানুষের সামাজিক অবস্থান এবং তার মানসিক পরিমণ্ডল। সে চোখ মেলে দেখে সমস্যা-পরিকীর্ণ জীবনযাত্রা; তার থেকে সে সর্বাস্তঃকরণে মুক্তি কামনা করে এবং সমাজের বিজ্ঞ বয়স্ক মনস্বীরা যজ্ঞক্রিয়ার মাধ্যমে যে প্রতিবিধান প্রবর্তন করেছেন তা-ই অনুষ্ঠান করে চলে–ফল হোক বা না হোক।

ফল না হলে সে নিজেকে, নিজের যজ্ঞক্রিয়াকে দোষ দেবে এবং আবার যজ্ঞ করবে, যেহেতু আর কোনও প্রতিবিধান তার জানা নেই, জাদু ছাড়া। এমন মনে করার যথেষ্ট সংগত কারণ আছে যে যজ্ঞ আর জাদু সমাজের বিভিন্ন স্তরে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হত।

(যেমন এখনও হয়। শিক্ষিত বাড়িতে বিপদে পুরোহিত ইষ্টদেবতার অথবা নৈমিত্তিক অনুষ্ঠানের দেবতার পুজো করে, এবং ফল না হলে বা দেরি হলে পরিবারের অন্য স্তরে ওঝা, গুণিন ডেকে ঝাড়ফুক করা হয়। দেবতা মারফত পূজার ইস্ট্রসিদ্ধির প্রয়াস, আর দেবতাকে বাদ দিয়ে অতিলৌকিকের সাহায্যে ওই উদ্দেশ্যই সিদ্ধ করার চেষ্টা–এ দুটিই যুগপৎ আচরিত হয়)।

অথর্ববেদের যে সব জাদু-অংশ ঋগ্বেদের পূর্ববতী তা সেই সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছিল যখন সমাজের বেশি শক্তিমান অংশ যজ্ঞ করছিল; কাজেই কালগত ভাবে এ দুটি সমকালীন ছিল।

এই মানসিক বাতাবরণের মধ্যে সৃষ্ট খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতক থেকে খ্রিস্টপূর্ব দশম শতক পর্যন্ত কালে রচিত ঋগ্বেদ সংহিতা। এ সাহিত্যের অধিকাংশটাই যজ্ঞকেন্দ্রিক, যদিও অনুষ্ঠানের কথা এতে সরাসরি তেমন নেই। যেমন আছে দেবতাদের উদেশে স্তব ও গান, যার নাম সূক্ত। এর অধিকাংশেই দেবতাকে বলা হচ্ছে: ‘তোমাকে এই দিলাম, তুমি আমাদের এই দাও।’

এক কথায়, ঐহিক সুখস্বচ্ছন্দ্য, যেটা প্রকৃতিকে মানুষের স্বার্থের অনুকূলে জয় করার দ্বারা পাওয়া যায়, সেই জয় করার কাজটা দেবতার হাতে দেওয়া হচ্ছে, হব্যের বিনিময়ে। এ সব প্রার্থনাই তখনকার সমাজে জীবনমরণের সমস্যা; প্রাগার্য ঈর্ষার পরিমণ্ডলে টিকে থাকার সমস্যা, প্রকৃতির নানা দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার সমস্যা।

এটা মনে রাখলে প্রার্থনাগুলির আকুতি আমাদের কাছে অর্থবহ হয়। নিশ্চয়ই সে-সমাজের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করত যে, যজ্ঞে হব্য ও স্তব দিয়ে দেবতাদের যথাবিহিত ভাবে আহ্বান ও মিনতি করলে তারা ইন্সিত ফল দেবেন। আগন্তুক উৎপাত না ঘটলে যথাকলে ফসল ফলত, অকস্মাৎ রোগব্যাধি না হলে মানুষ দীর্ঘজীবীই হত, শক্তিতে ও অস্ত্ৰে উৎকর্ষ থাকলে শত্রুজয়ও অবশ্যম্ভাবী ছিল; সেটা যজ্ঞ করলেও হত, না করলেও হত।

যেহেতু প্রতিবার যজ্ঞে প্রার্থিত ফল মেলে না, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শত্রুর জিঘাংসার বিরুদ্ধে মানুষ স্বভাবতই অসহায়, তাই ফলাফলুক বা না ফলুক দেবতাদের দ্বারস্থ হলে মনে একটা আশ্বাস জন্মায় যে, তার প্রার্থনা পূর্ণ হবে। মানুষের সার্বিক অসহায়তা এমনই ছিল যে, এ ধরনের আশ্বাস মনে মনে নির্মাণ না করলে সে বেঁচে থাকতেই পারত না।

তবু মানুষ যে দিন চোখ খুলে বহির্জগৎকে দেখতে শুরু করেছে সে দিন থেকেই সে হিসেব মেলাতে চেষ্টা করেছে: দেবতাকে যথোচিত স্তব ও নৈবেদ্য দিয়েই প্রার্থনা করা সত্ত্বেও কেন সর্বদা ফল পাওয়া যায় না? এ চিন্তা অন্য জীবের নেই, সে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বিশেষ দেবতার আরাধনা করে না, কাজেই বঞ্চিত বোধ করার কোনও কারণই তার নেই।

মানুষের আছে। ফলে ঋগ্বেদের আদিপর্ব থেকে তার হিসেবে গরমিল দেখা দিয়েছে। যখনই দুই আর দুয়ে চার হয়নি, তখনই সে প্রশ্ন করেছে; এ প্রশ্নের উদ্ভব এক ধরনের যন্ত্রণায়, হিসেব না মেলার অর্থ বিশ্বাসের ভিত টলে যাওয়া। হিসটারম্যান যেমন বলেছেন, ‘তখন ব্যাপারটা আর একটি বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর যজ্ঞকে অস্বীকার করা নয়, বরং যজ্ঞ নামক নিরবয়ব প্রতিষ্ঠানটিকেই অস্বীকার করা। যজ্ঞতত্ত্ব হয় সত্য নয় মিথ্যা।’১

যত দিন যাচ্ছিল ততই হিসেব না মেলার অভিজ্ঞতা বাড়ছিল, অতএব বাড়ছিল প্রাণপণ শক্তিতে বিশ্বাসের সঙ্গে অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা; এবং এখানে যে অবশ্যম্ভাবী ব্যৰ্থতা তারই অনুপাতে বাড়ছিল সন্দেহ। মানুষ বাকনির্ভর জীব, তাই সে যুগের বহুতর সন্দেহ বেদেই বিধৃত আছে। যজ্ঞের যুগে মানুষ কী বিশ্বাস করত? এর উত্তর কোথাও স্পষ্ট উচ্চারণে পাওয়া যাবে না।

কিন্তু ঋগ্বেদ থেকে যা বোঝা যায় তা হল, জনসাধারণ মোটের ওপরে বিশ্বাস করত-

১. দেবতারা আছেন;
২. তারা মানুষের হিতৈষী অর্থাৎ মানুষের কষ্টের প্রতিকার করতে চান;
৩. তাঁরা শক্তিমান অর্থাৎ মানুষের অভীষ্ট পূরণের ক্ষমতা তাঁদের আছে; এবং
৪. যজ্ঞে স্তোত্র ও হাব্য পেলে তাঁরা প্রীত হন ও ভক্তের প্রার্থনা পূরণ করেন।

ধীরে ধীরে আরও একটা বিমূর্ত ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস জন্মেছিল: এ বিশ্বচরাচর নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে একটা অমোঘ শুভশক্তির দ্বারা, যাকে তারা পরে ‘ধাত’ নাম দিয়েছিল। দিনরাত্রির পর্যায়ক্রমে বা ঋতুগুলির নিয়মিত আবর্তন এই ঋতেরই প্রকাশ। চরাচরের অন্তর্নিহিত সত্য হল এই ঋত, যা দেবতাদের দ্বারা লঙ্ঘিত হয় না, যার বিপরীতে অবস্থান অনূত’ বা মিথ্যার।

এ সব বিশ্বাস ছিল তাদের পায়ের তলায় মাটি, মাথার ওপরের আকাশ। এগুলো টলে গেলে তাদের ভুবনে দেখা দেয় চূড়ান্ত বিপর্যয়। ধর্ম তাই সংহতি আনে; বাজারের কথায়, ‘…মানুষের ইতিহাসে ধর্ম হল নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী প্রাচীরগুলির অন্যতম।’২।

বেদ রচনার গোড়ার দিক : দুই>>

…………..
(১) ‘it is no longer a question of denying a particular person’s (or group’s) sacrifice, but of denying the abstract institution of sacrifice. The doctrine of sactifice is either true of false –J C Heesterman. On th origin etc. S.

…………..
বেদে সংশয় ও নাস্তিক্য – সুকুমারী ভট্টাচার্য।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

.……………….
আরও পড়ুন-
বেদ রচনার গোড়ার দিক : এক
বেদ রচনার গোড়ার দিক : দুই
……………
বেদে সংশয় ও নাস্তিক্য : এক
বেদে সংশয় ও নাস্তিক্য : দুই
বেদে সংশয় ও নাস্তিক্য : তিন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!