আজ্ঞা চক্র যোগ আসন ধ্যান

-বিদ্যুৎ মিত্র

বেচারা ছাত্রটির কথা ভাবুন একবার, শিক্ষক তাকে বলেছেন, চলতি হপ্তার সোমবার দশটায় তার পরীক্ষা। চলতি হপ্তায়, নাকি আগামী হপ্তার সোমবারে? শতচেষ্টাতেও মনে করতে পারছে না ছাত্রটি। এই অবস্থায় আলফা লেভেলে পৌঁছে শিক্ষক ঠিক যা বলেছিলেন, সেটা মনে করতে পারবে সে।

এগুলো দৈনন্দিন জীবনের ছোটোখাটো সমস্যা, ধ্যান করে, সহজ সরল নিয়মের সাহায্যে সমাধান বের করে আনা যায়।

এবার বিরাট লাফ দিয়ে অনেক সামনে চলে যাবো আমরা। একটা ঘটনা, যেটা ঘটলে আপনি খুব খুশি হন, ঘটুক বলে কল্পনা করছেন, সেটার সাথে বাস্তব ঘটনার সংযোগ ঘটাবো আমরা, তারপর দেখবো কাল্পনিক ঘটনাটার কি অবস্থা হয়। পদ্ধতি গুলো সহজ, শুধু যদি ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেন, আপনার কাল্পনিক ঘটনা বাস্তব ঘটনা হয়ে উঠবে।

লেখাটিতে যা যা আছে

১নং বিধি-

ঘটনাটা ঘটবে, এই আকাক্ষা বা বাসনা আপনার থাকতে হবে। ‘কাল সকালে রাস্তায় প্রথম যে লোকটার সাথে দেখা হবে, দেখবো নাক ঝাড়ছে সে, এ-ধরনের ঘটনা এমনই তাৎপর্যহীন যে আপনার মন এটার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সম্ভবত আপনার এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না।

আপনার বস্ আগের চেয়ে ভালো ব্যবহার করবেন, অথবা নির্দিষ্ট একজন ক্রেতা আপনার পণ্যের প্রতি অধিকতর আকর্ষণ বোধ করবেন, সাধারণত করতে ভালো লাগে না এই ধরনের একটা কাজ এরপর করতে ভালো লাগবে-এগুলো সত্যি তাৎপর্যপূর্ণ এবং আকাঙ্ক্ষা করার মতো ব্যাপার।

২নং বিধি-

ঘটনাটা যে ঘটবে এ বিশ্বাস আপনার থাকতেই হবে। আপনি যা বিক্রি করতে চান সেটা যদি ক্রেতার কাছে প্রচুর পরিমাণে থেকে থাকে, ক্রেতা আপনার পণ্য কেনার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠবে এ আপনি বিশ্বাস করতে পারেন না। যুক্তি দিয়ে উপলব্ধি করে ঘটনাটা ঘটবে বলে যদি বিশ্বাস করতে না পারেন, আপনার মন এর বিরুদ্ধে কাজ করবে।

৩ নং বিধি। ঘটনাটা ঘটবে, এই প্রতীক্ষায় থাকতে হবে আপনাকে। এটা একটা সম্মু বিধি, এর গভীর অর্থ আছে। প্রথম দুটো বিধি সহজ এবং নিষ্ক্রিয়। এই তৃতীয়টির মধ্যে কিছুটা গতি আছে। একটা কিছুর আকাঙ্ক্ষা করা যায়, একটা ঘটনা ঘটবে বলে বাসনা করা যায়।

বিশ্বাস করা যায় ঘটনাটা ঘটবে। কিন্তু তবু সেটা ঘটবে এই প্রতীক্ষায় বা প্রত্যাশায় নাও থাকতে পারেন। আপনি চান আপনার বস্ আপনার সাথে ভালো ব্যবহার করবেন, আপনি বিশ্বাস করেন ভালো ব্যবহার করা তার পক্ষে সম্ভব, কিন্তু তবু ভালো ব্যবহার পাওয়ার প্রতীক্ষা করা থেকে এখনো অনেক দূরে রয়েছেন আপনি।

এখানে প্রতীক্ষা করা মানে কোনো ঘটনা ঘটবেই বা কিছু পাবেনই বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। ঠিক এই পর্যায়েই ধ্যান এবং মানস চোখে ছবি দেখার মতো শক্তিশালী মাধ্যমগুলোকে কজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়।

৪ নং বিধি-

আপনি কোনো সমস্যা তৈরি করতে পারেন না। এটা একটা মৌলিক, সর্ব নিয়ন্ত্রক বিধি। ‘কি মজাই না হয় যদি আমার বকে বেকুব বানিয়ে এমন কিছু খারাপ। কাজ তাকে দিয়েই করিয়ে নিতে পারি যাতে সবাই তাকে অযোগ্য বলে ধিক্কার দেয়।

আর চাকরি থেকে বরখাস্ত করে তার আসনে আমাকে বসায়! আলফায় আপনি যখন সক্রিয় ভাবে কাজ করবেন, আপনার সংস্পর্শে হাইয়ার ইন্টেলিজেন্স থাকবে, এবং হাইয়ার ইন্টেলিজেন্সের দৃষ্টিতে এই ব্যাপারটা কোনোমতেই মজার বলে মনে হবে না।

আপনি আপনার বসকে ফাঁদে ফেলে তার চাকরি খেতে পারেন, কিন্তু তখন আপনি। সম্পূর্ণ একা থাকবেন–এবং বিটা লেভেলে। আলফায় আপনার এই ষড়যন্ত্র ফলবে না।

ধ্যানমগ্ন অবস্থায় পৌঁছে আপনি যদি কোনো ধরনের বুদ্ধিমান অস্তিত্বকে দলে ভিড়িয়ে তাকে দিয়ে খারাপ কোনো কাজ করিয়ে নেয়ার কুমতলব আঁটেন, সেটা হবে রেডিওর নব ঘুরিয়ে অস্তিত্বহীন স্টেশনের গান শুনতে চেষ্টা করার মতোই নিষ্ফল।

কেউ কেউ ব্যাপারটা বিশ্বাস করে না। তাদের প্রশ্ন, অভিশাপ যদি সত্যি হয়, শয়তান উপাসকরা যদি মানুষের ক্ষতি করতে পারে, মনকে নিয়ন্ত্রণ করে আমরা কেন তা পারবো না? কেন পারা যায় না, সেটা বলা কঠিন, কিন্তু পারা যায় না সেটা গবেষণায় নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে। এসব কাজ বিটায় করা যায়, আলফাতে নয়, থিটাতে নয়, সম্ভবত ডেলটাতেও নয়।

সময় নষ্ট করানোর পক্ষপাতী নই আমরা, তবু যদি আপনার সন্দেহ থাকে, নিজেই ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। ধ্যানমগ্ন হোন, কারো মাথায় ব্যথা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে দেখুন।

সফল হওয়ার জন্যে যে সব নিয়ম রীতি পালন করে তৈরি করা পর্দায় ছবি দেখতে হয়, সেগুলো যদি নির্ভুল, নিখুঁত ভাবে পালন করতে পারেন, ফল হবে দুটোর একটা হয় আপনি, আপনার সাবজেক্ট নয়, মাথাব্যথার শিকার হবেন অথবা আলফা লেভেলে থাকা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে না।

এবার, এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত গুণে সম্পূর্ণ জেগে উঠবেন আপনি, আগের চেয়ে । ভালো বোধ করবেন। প্রয়োজনীয় সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। একটা শক্তিকে কাজে নামিয়ে দিয়েছেন আপনি। বিশ্বাস করুন, ওই শক্তি ঘটনাটা ঘটিয়ে ছাড়বে। দেখবেন সত্যিই ঘটছে!

মনের ভালো এবং মন্দ দিক সম্পর্কে যে-সব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারেন আপনি, সেসবের উত্তর এর মধ্যে পাবেন না। এ ব্যাপারে পরে আরো আলোচনা করবো।

এখন, এমন একটা ঘটনা বেছে নিন যেটা কোনো সমস্যার সমাধান, যেটার সমাধান আপনি চান বা বাসনা করেন, আপনার মনে বিশ্বাস আছে ব্যাপারটা ঘটতে পারে। বাকি থাকলো, প্রতীক্ষা বা প্রত্যাশা করা। নিচের অনুশীলনের সাহায্যে, আসুন, প্রত্যাশা করাটাও শিখে নেয়া যাক।

আপনাকে অসুবিধের মধ্যে ফেলছে এই রকম একটা সমস্যা বেছে নিন, যে সমস্যার কারণ এখনো আপনার কাছে পরিষ্কার নয়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, আপনার বস্ কিছুদিন থেকে খুব বদমেজাজী হয়ে আছেন। আপনি আপনার লেভেলে রয়েছেন, এখন তিনটে কাজ করতে হবে আপনাকে।

প্রথম কাজ। আপনার মনের পর্দায় পরিষ্কার, উজ্জল ভাবে ফুটিয়ে তুলুন সম্প্রতি ঘটা একটি ঘটনা বা দৃশ্য, যেটার সাথে আপনার সমস্যা জড়িয়ে আছে।

দ্বিতীয় কাজ। এই ঘটনা বা দৃশ্যের ছবি ধীরে ধীরে ডান দিকে সরিয়ে পর্দা থেকে বের করে দিন। এবার বাঁ দিক থেকে পর্দার ওপর আরেকটা ঘটনা বা দৃশ্যের ছবি নিয়ে আসুন, যেটা আগামীকাল ঘটবে। এই দৃশ্যে আপনি দেখবেন আপনার বসের চারদিকে যারা রয়েছে তারা সবাই হাসিখুশি, আপনার বস্ একটা সুখবর শুনছেন।

বোঝাই যাবে, তার মেজাজ এখন আগের চেয়ে ভালো। সমস্যার কারণটা কি তা যদি আপনি সঠিক ভাবে জানেন, সমাধান ঘটছে এই দৃশ্যটাও চাক্ষুষ করুন। সমস্যাটা যেরকম নিখুঁতভাবে মনের পর্দায় দেখেছিলেন, সমাধানটাও সেরকম নিখুঁত আর পরিষ্কারভাবে দেখুন।

তৃতীয় কাজ। এবার এই দৃশ্যটাও ডান দিকে সরিয়ে পর্দা থেকে বের করে দিন। বাঁ দিক থেকে আরেকটা দৃশ্য নিয়ে আসুন পর্দায়। আপনার বস্ এখন হাসিখুশি, আনন্দিত–যতোটা তিনি আনন্দিত হতে পারেন বলে মনে করেন আপনি, ততোটা।

দৃশ্যটা এতো পরিষ্কার ভাবে দেখতে হবে আপনাকে, যেন বাস্তবে সেটা সত্যি ঘটেছে। বেশ একটু সময় নিয়ে দৃশ্যটা দেখুন, গভীরভাবে অনুভব করুন ব্যাপারটা।

এবার, এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত গুণে সম্পূর্ণ জেগে উঠবেন আপনি, আগের চেয়ে । ভালো বোধ করবেন। প্রয়োজনীয় সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। একটা শক্তিকে কাজে নামিয়ে দিয়েছেন আপনি। বিশ্বাস করুন, ওই শক্তি ঘটনাটা ঘটিয়ে ছাড়বে। দেখবেন সত্যিই ঘটছে!

এটা কি সব সময় কাজ করবে, প্রতিবার?

উহুঁ।

তবে, আপনি যদি এটা চর্চা করতে থাকেন, আপনার অভিজ্ঞতা হবে এই রকম।-ধ্যানমগ্ন অবস্থায় সমস্যা সমাধানের প্রথম প্রচেষ্টা সফল হবে। সফল হলেও, কে বলবে এটা একটা কাকতালীয় ঘটনা নয়? এ-কথা তো ঠিক যে সমস্যাটা সমাধানযোগ্য এই বিশ্বাস আপনার ছিলো বলেই ওটাকে আপনি বেছে নিয়েছিলেন।

সমাধানের সম্ভাবনা ছিলো বলেই না আপনি বিশ্বাস করেছিলেন সমাধান হবে। তারপর, দ্বিতীয় বার চেষ্টা করে দেখলেন। এবারও আপনার সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। সমাধান হয়ে গেল তৃতীয় বা চতুর্থ সমস্যারও। এভাবে, কাকতালীয় ঘটনার সংখ্যা একের পর এক বাড়তেই থাকবে।

কিন্তু ধ্যানমগ্ন হওয়ার অভ্যেস এবং অন্যান্য অনুশীলন চর্চা করা ছেড়ে দিন, কাকতালীয় ঘটনার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। আবার চর্চা শুরু করুন, সংখ্যায় ওগুলো বাড়তে শুরু করবে আবার।

কারো কারো গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর লেভেলে পৌঁছে আমাদের মন উপলব্ধি করে, সময় বাঁ দিক থেকে ডান দিকে বয়ে যাচ্ছে। অন্য কথায়, ভবিষ্যৎ আমাদের বাঁ। দিকে আর অতীত আমাদের ডান দিকে, এই ধারণা জন্মায়। সম্ভব হলে পরে এটা নিয়ে আরো আলোচনা করবো আমরা। তার আগে হাতের অন্যান্য কাজ সারতে হবে।

চর্চা চালিয়ে গেলে ধীরে ধীরে নৈপুণ্য এবং দক্ষতা বাড়বে আপনার। সমাধানের সম্ভাবনা আগেরগুলোর চেয়ে একটু কম, এবার এই জাতের সমস্যা দূর করতে সক্ষম হবেন আপনি। তারপর সময়ের সাথে সাথে, চর্চা করতে থাকায়, আপনার সাফল্যগুলো হয়ে উঠবে বিস্ময়কর, অবিশ্বাস্য।

প্রতিটি সমস্যা নিয়ে কাজ করার সময়, শুরুতেই এর আগের সাফল্যের অভিজ্ঞতাটা মনের পর্দায় অল্প সময়ের জন্যে ফুটিয়ে তুলুন। পরে, এরচেয়ে উন্নত কোনো সাফল্যের অভিজ্ঞতা অর্জিত হলে, এটাকে বাদ দিয়ে নতুনটাকে রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করুন।

মেক্সিকোর একজন ছাত্র, অবসর সময়ে ট্যাক্সিও চালায়। আরোহী পাবার জন্যে ধ্যান পদ্ধতি নিয়মিত ব্যবহার করে সে। বাজার মন্দা, এই সময় একদিন চলে গেল। নিজের লেভেলে, ধ্যানমগ্ন অবস্থায় মনে তৈরি করা পর্দায় স্যুটকেস হাতে একজন লোকের ছবি দেখলো, যে এয়ারপোর্টে যেতে চায়।

প্রথম কয়েকবার কিছুই ঘটলো না। তারপর ব্যাপারটা ঘটলো, সুটকেস হাতে সত্যি সত্যি এলো একজন লোক, এয়ার পোর্টে যেতে চায়। পরের বার মনের পর্দায় এই লোকটার ছবি ফোঁটালো সে, সব ভালো ভাবে ঘটলে যেমন লাগে সেই রকম একটা অনুভূতি হলো তার, এবং সেই সাথে আরেকজন আরোহী এলো, সে- ও এয়ারপোর্টে যাবে।

আশা করা যায় এই পুনরাবৃত্তি তার জীবনে বার বার ঘটতেই থাকবে, চর্চা যদি বন্ধ না করে।

অন্যান্য অনুশীলন আর টেকনিকে যাবার আগে একটা কথা। প্রশ্নটা সম্ভবত আপনার মনেও উঁকি দিয়েছে। বলেছি, ছবিগুলোকে বাঁ দিক থেকে পর্দায় নিয়ে এসে ডান দিক দিয়ে বের করে দেবেন। কেন?

কারো কারো গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর লেভেলে পৌঁছে আমাদের মন উপলব্ধি করে, সময় বাঁ দিক থেকে ডান দিকে বয়ে যাচ্ছে। অন্য কথায়, ভবিষ্যৎ আমাদের বাঁ। দিকে আর অতীত আমাদের ডান দিকে, এই ধারণা জন্মায়। সম্ভব হলে পরে এটা নিয়ে আরো আলোচনা করবো আমরা। তার আগে হাতের অন্যান্য কাজ সারতে হবে।

………………..
অশেষ কৃতজ্ঞতা- আত্ম-উন্নয়ন : বিদ্যুৎ মিত্র

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

…………………
আরও পড়ুন-
ধ্যান কি করে করতে হয় : প্রথম কিস্তি
ধ্যান কি করে করতে হয় : দ্বিতীয় কিস্তি
ধ্যান কি করে করতে হয় : তৃতীয় কিস্তি
মন নিয়ন্ত্রণ
ধ্যান বিজ্ঞানাদি

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!