দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়া-১

দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়া-১

-মূর্শেদূল মেরাজ

ভারতবর্ষে সুফি মতবাদকে জনপ্রিয় করায় যাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য তাদের মধ্যে অন্যতম খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া। তাঁর গুরু শেখ ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকার। যার মূল কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকি হয়ে খাজা মঈনউদ্দিন চিশতির সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ষোলতম শতাব্দিতে মোগল সম্রাট আকবরের উজির আবুল ফজল মোবারক রচিত আইন-ই-আকবর এ নিজামউদ্দিনের জীবনী উল্লেখ রয়েছে।

চোদ্দ শতকের ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানির ভাষ্যমতে, ‘নিজামউদ্দিন আউলিয়া তৎকালীন মুসলিমদের উপরে এতোটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে তারা দুনিয়াবী চিন্তা বাদ দিয়ে ইবাদতের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। পার্থিব বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে পারার মতো ব্যক্তিত্বের জাদু নিয়ে দিল্লীতে সুফিবাদকে জনপ্রিয় করেন এই আউলিয়া।’

নিজামউদ্দিন আউলিয়া বলতেন, ‘আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। তাই মানুষকে ভালোবাসলেই আল্লাহ সবচেয়ে বেশি খুশি হন।’ ধর্মীয় বহুত্ববাদ এবং সকলের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। সুফি ধারায় জীবনকালেই স্রষ্টার সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব বলে বিশ্বাস করতেন নিজামউদ্দিন আউলিয়া।

ষষ্ঠ হিজরিতে এশিয়া মাইনরের বড় বড় শহরগুলো যখন তাতারিদের হামলায় ধ্বংস হচ্ছিল। তখন সেখানের মানুষজন পরিবার-পরিজন নিয়ে দলে দলে ভারতবর্ষের দিকে আসতে শুরু করে। সে দলে নিজাম আউলিয়ার বংশও ছিল। তার পূর্বপুরুষরা ছিল সাদাত বংশীয়।

বোখারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে অন্যান্য পরিবারের মতো নিজাম আউলিয়ার দাদা আলী বোখারী ও নানা খাজা আরব ভারতবর্ষে চলে আসেন। পাকিস্তানের লাহোরে কিছুদিন অবস্থান করে তারা ভারতের উত্তরপ্রদেশের বদায়ুনে স্থায়ী হন। সেসময় ভারতবর্ষের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন শামসুদ্দীন আলতামাশ।

তিনি নিজাম আউলিয়ার পিতা সৈয়দ আহমদকে বদায়ুনের কাজী পদে নিযুক্ত করেন। কথিত আছে, অল্প কিছুদিন পরই সৈয়দ আহমদ বাদশাহের দেয়া কাজীর পদ ছেড়ে স্রষ্টার ধ্যানে মশগুল হয়ে পড়েন। এ সময় একদিন মসজিদে বসেই অনুভব করেন তার দিকে যেন সকল কিছু এগিয়ে আসছে। সেদিনই বাড়ি ফিরে তার সন্তান আগমনের সুসংবাদ পান।

জন্ম ও শৈশব
নিজামউদ্দিন আউলিয়া ৩ এপ্রিল ১২৩৮(২৭ সফর ৬৩৪/৬৩৬ হিজরি) সালে বাদায়ুনে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় মোহাম্মদ। তার পিতা অবশ্য তাকে নিজাম নামে ডাকতেন। নিজাম শিশুকাল থেকেই আকাশে চাঁদ-সূর্যের উদয়াস্ত ও নক্ষত্র দেখতে খুব ভালো বাসতেন।

জানা যায়, চার বছর বয়স থেকেই নিজাম পিতার সাথে জঙ্গলে যেতেন। সেখানে পিতার দেখাদেখি তিনিও ধ্যানে মগ্ন হতেন। জনশ্রুতি আছে, একদিন নিজাম একাকী জঙ্গলের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় এক যোগী তার পায়ে চুমু খেলে তার সঙ্গীরা যোগীকে প্রশ্ন করে, এর মধ্যে আপনি কী দেখতে পেয়েছেন?

যোগী বলেন, ‘এ বালক অনেক বড় মানুষ, সময় হলে দেখবে।’

কেউ বলেন, ‘এ কি শহরের শাসনকর্তা হবে?’

যোগী বলেন, ‘শহরের শাসনকর্তাও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে।’

অপর একজন বলেন, ‘তাহলে এ বালক কি বাদশাহ হবে?’

যোগী বলল, ‘আরে সাতরাজার মুকুট তার পদতলে থাকবে।’

এসময় নিজাম বলে উঠে, ‘ক্ষমতা ও বাদশাহী কেবল আল্লাহর জন্য। যদি আল্লাহ আমাকে পরীক্ষায় ফেলেন এবং আপনি জীবিত থাকেন তাহলে আমার কাছ চলে আসবেন, আমি সাতটি মুকুটই আপনাকে দান করে দেব।’

যোগী বলল, ‘সত্য বলেছ, তুমি সত্য বলেছ।’

নিজামের বয়স যখন পাঁচ, সে সময়ই তার পিতা সৈয়দ আহমেদ আল হুসাইনি বাদায়ুনি মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি কোনো সম্পদ রেখে না যাওয়ায় নিজাম ও তার মাকে অত্যন্ত দারিদ্রতার মধ্যে জীবনযাপন করতে হয়। অধিকাংশ সময় তাদের অভুক্ত থাকতে হতো।

তার মা ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী রমনী। ঘরে খাবার না থাকলে তিনি হেসে বলতেন, ‘নিজাম আজ আমরা আল্লাহর মেহমান।’ শিশু নিজাম এতে বেশ উৎফুল্ল হতো। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, ‘খাবারের চেয়ে রোজাই আমার কাছে মজাদার, রোজাই আমার প্রিয় খাদ্য।’

যদি কখনো পরপর কয়েকদিন ঘরে খাবারের ব্যবস্থা হতো। তখন নিজাম মাকে বলতো, ‘মা! অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেল, আমরা আবার কখন আল্লাহর মেহমান হব?’

শিক্ষাজীবন
অল্প বয়সেই নিজামকে বাদায়ুনের মক্তবে ভর্তি করে দেয়া হয়। সেখানে তিনি অল্পদিনেই কোরান খতম করেন এবং আরবি শিক্ষা লাভ করেন। এরপর বদায়ুনের খ্যাতিমান আলেম মাওলানা আলাউদ্দীন উসুলীর কাছে ফিকার শাস্ত্র ‘কুদুরী’ খতম করেন।

এই খতম উপলক্ষ্যে তার মা শহরের শিক্ষিত জ্ঞানীগুণীদেরকে দাওয়াত করে, তাদের হাতে নিজ হাতে বোনা পাগড়ি দস্তারে ফজিলত হিসেবে নিজামের মাথায় বাঁধান। এ সময় ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, ‘এ বালকের মাথা কোনো মানুষের সামনে নত হবে না।’

পিতার মৃত্যুর পর পাঁচ বছর বয়সী নিজামকে নিয়ে তার মা দিল্লী চলে আসেন। সেখানে সে যুগের সবচেয়ে খ্যাতিমান আলেম মাওলানা শামসুদ্দীন ও মাওলানা কামলুদ্দীন জাহেদের কাছে ছওমে জাহেরী শিক্ষা লাভ করেন। বলা হয়ে থাকে সুলতান বলবনের ওপরও তাদের ব্যাপক প্রভাব ছিল।

বারো বছর বয়সেই নিজামউদ্দিনের শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটে। সেসময় একদিন তার মা পুত্রের হাত ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি নিজামকে তোমার কাছে সোপর্দ করছি।’ এ কথা বলেই তিনি চিরদিনের জন্য চোখ বন্ধ করেন।

সারাজীবন তিনি সুতার কাজ করে চরম অভাব-অনটনের মধ্যেও পুত্রের লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছেন। নিজামউদ্দিন আউলিয়া বলতেন- ‘মাতৃ বিয়োগের বেদনার স্মৃতি ভুলে থাকার জন্য তিনি শায়খ নজীবের সাথে সময় কাটাতেন।’

(চলবে…)

……………………………
আরো পড়ুন:
দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়া-১
দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়া-২
দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়া-৩
দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়া-৪

…………
তথ্যসূত্র:
উইকিপিডিয়াসমূহ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!