ভবঘুরেকথা
হাসন রাজা

হাসন রাজা: বাংলার এক রাজর্ষি বাউলের মর্মপাঠ: দুই

-জহির আহমেদ

শ্বাসপ্রশ্বাসের রেচক-পূরক-কুম্ভকের মাধ্যমে রতিক্ষয় নিবারণ ও তার উর্ধ্বগমনের দ্বারাই মানুষের আত্মশক্তি বৃদ্ধি পায়। অধিকাংশ মানুষ সাধন-ভজন না জেনে নারী সংসর্গে গিয়ে মূলে বিনাশ হয়ে যায়। হাসন রাজার মনেও এ আফসোস ছিল। এ বিষয়ে দেহতত্ত্বের কিছু গানও তিনি লিখেছেন। যেমন-

এ যৌবন ঘুমেরই স্বপন।
সাধন বিনে নারীর সনে হারাইলাম মূলধন।।

আর দৈ বলিয়া চুন গুলিয়া খাইলো কতজন।
হক না জেনে মুখ পুড়িল লালছের কারণ।।

আওলিয়া ছাড়া নদীর কূলে যে করে আসন।
জ্ঞানশূন্যরে কুম্ভীরে খায়, ধরিয়া গর্দন।।

ফকির হাসন রাজায় বলে ঠেকছি খাইয়া নদীর জল।
নিশার চোটে লাগলো ঠোঁটে উল্টা বড়ির কল।।

হাসন রাজার গানে পরমের সাথে মিলনের আকুতি, জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্ব, জগতের অনিত্যতা, সংসারাবদ্ধ ও প্রমোদমত্ত মানুষের সাধন-ভজনে অক্ষমতার খেদোক্তি প্রধানত প্রতিফলিত হয়েছে। জগত সংসারের বৃথা কাজে ভুলে থেকে প্রভুর নাম নিতে পারছেন না বলে নিজেকে দীনহীন ভেবে করুণ সুরে হাসন রাজা দুঃখবোধ করছেন এভাবে-

আমি না লইলাম আল্লাজির নাম।
না কইলাম (করলাম) তার কাম।
বৃথা কাজে হাছন রাজায় দিন গুয়াইলাম।।

ভবের কাজে মত্ত হইয়া দিন গেল গইয়া।
আপন কার্য না করিলাম, রহিলাম ভুলিয়া।।

নাম লইব নাম লইব করিয়া আয়ু হইল শেষ।
এখনও না করিলাম প্রাণ বন্ধের উদ্দেশ।।

আশয় বিষয় পাইয়া হাছন (তুমি) কর জমিদারি।
চিরকাল থাকিবেনি হাছনরাজা লক্ষ্মণছিরি।।

কান্দে কান্দে হাছন রাজা, কী হবে উপায়।
হাসরের দিন যখন পুঁছিবে খোদায়।।

ছাড় ছাড় হাছন রাজা, এই ভবের আশ।
এক মনে চিন্তা কর, হইতাম বন্ধের দাস।।

সর্বশক্তিমানের হাতে আমাদের সব কিছু। তিনিই আমাদের নিয়ন্ত্রক। তাঁর হাতে মানব-ঘুড়ির নাটাই। তাঁর ইচ্ছাতেই ওড়ে হাসন রাজার জীবন-ঘুড়ি-

গুড্ডি উড়াইল মোরে, মৌলার হাতের ডুরি।
হাসন রাজারে যেমনে ফিরায়, তেমনে দিয়া ফিরি।।
মৌলার হাতে আছে ডুরি, আমি তাতে বান্ধা।
যেমনে ফিরায়, তেমনি ফিরি, এমনি ডুরির ফান্ধা।।

ভাবুকের জন্য সংসার এক মায়ার বেড়ি। স্ত্রী-পুত্র সে মায়াকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয়। কিন্তু আল্লাহর দিকে হাসন রাজার মন মজে গেছে, সংসারের বাঁধনে পড়ে তাই সে ছটফট করে-

হাসন রাজা বলে ও আল্লাহ
ঠেকাইলায় ভবের জালে,
বেভুলে মজাইলায় মোরে এই ভবের ও খেলে।।

স্ত্রী হইল পায়ের বেড়ি পুত্র হইল খিল
কেমনে করিবায় হাসান বন্ধের মিল,
স্ত্রী-পুত্রের আশায় রইলায় ভবেতে মজিয়া
মরন কালে স্ত্রীপুত্র না চাইব ফিরিয়া।।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, হাসন রাজার পূর্বপুরুষ হিন্দু ছিলেন। তাদেরই একজন বীরেন্দ্রচন্দ্র সিংহদেব মতান্তরে বাবু রায় চৌধুরী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। হাছন রাজার পুর্বপুরুষের অধিবাস ছিল অয্যোধ্যায়। সিলেটে আসার আগে তারা যশোর জেলার কাগদি নামক গ্রামের অধিবাসী ছিলেন।

ষোল শতকের শেষের দিকে সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার কোণাউরা গ্রামে তার পূর্ব পুরুষ বিজয় সিংহ বসতি শুরু করেন। পরে তিনি কোণাউরা গ্রাম ছেড়ে আরেকটি নতুন গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন এবং বংশের আদি পুরুষ রামচন্দ্র সিংহদেবের নামের প্রথমাংশ ‘রাম’ যোগ করে নামকরণ করেন ‘রামপাশা’।

হাছন রাজা ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ শহরের নিকটবর্তী সুরমা নদীর তীরে লক্ষণশ্রী পরগণার তেঘরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জমিদার দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী ও মাতা হুরমত জাহান বিবি।

হাছন রাজা পশু পাখি ভালোবাসতেন। ‘কুড়া’ ছিল তার প্রিয় পাখি। তিনি ঘোড়াও পুষতেন। তাঁর প্রিয় দুটি ঘোড়ার একটি হলো জং বাহাদুর, আরেকটি চান্দমুশকি। এরকম আরো ৭৭টি ঘোড়ার নাম পাওয়া গেছে।

হাসন রাজার আর এক মজার শখ ছিল ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের জড়ো করে রুপোর টাকা ছড়িয়ে দেওয়া। বাচ্চারা যখন হুটোপুটি করে সেগুলো কুড়িয়ে নিত, তা দেখে তিনি খুব মজা পেতেন।

আনন্দময় এই ইহজীবন চিরস্থায়ী নয়। আবার পরজীবনে মুক্তি পেতে ক্ষমতার বাহাদুরি কোন কাজেই লাগবে না। মানুষের ক্ষমতা-প্রতিপত্তি মৃত্যুর পর নিঃশেষ হয়ে যায়। এ উপলব্ধি থেকেই হাসন রাজা হয়ে গেলেন অন্য মানুষ।

প্রেম মানুষকে মহান করে। মানবতা ও সৃজনশীলতা অন্য মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন স্মৃতি হয়ে থাকে। হাসন রাজা প্রেয়সী ও প্রভু প্রেমে মগ্ন হয়ে যে গান লিখলেন, তা মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। তাই মানুষের হৃদয়েই বেঁচে আছেন তিনি।

রুহ বা আত্মাই মানুষের দেহকে প্রাণময় করে। কিন্তু নিজের দেহকে ফাঁকি দিয়ে সে আবারও একদিন অজানা দেশেই চলে যায়। পিতা-মাতার আনন্দের মিলনে মানুষের জন্ম। জন্ম নিয়ে মানুষের মনপাখি দেহ খাঁচায় এসে বন্দী হয়। বন্দী হয়ে ছটফট করে।

মানব মনের চিরন্তন এ কান্নাকে হাসন রাজা তার জনপ্রিয় গানে সুর দিয়েছেন এভাবে-

মাটিরও পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে,
কান্দে হাসন রাজার মন মুনিয়া রে।
মায়ের বাপে কইরা বন্দী খুশিরও মাজারে,
লালে ধলায় বন্দি হইলাম পিঞ্জিরার ভিতরে।

পিঞ্জিরায় সামাইয়া ময়নায় ছটফট ছটফট করে,
মজবুতও পিঞ্জিরা ময়নায় ভাঙ্গিতে না পারে।
উড়িয়া যাইব ময়না পাখি পইরা রইব কায়া,
কিসের দেশ কিসের খেশ কিসের মায়া মায়া।
হাসন রাজা ডাকবো যখন ময়না আয় রে আয়,
এমনও নিষ্ঠুরও ময়না আর কি ফিরে চায়।

স্ত্রী, সন্তান, পরিবার, জমিদারি ও পারিষদ নিয়ে অফুরন্ত সুখেও মধ্যে থেকেও হাসন ছিলেন মনোদুঃখী। তাঁর কেবলই মনে হতো, এ পার্থিব জীবন ছেড়ে একদিন সঙ্গীহীন চলে যেতে হবে। মানব জীবনের অসারতা উপলব্ধি করে তিনি লিখতেন মরমী গান।

তিনি উপলব্ধি করলেন, জগতের সুখ সাগরে মজে থাকা মানুষ মৃত্যুকে স্মরণ করে না। তারা জগৎ সংসারে ঘোরতরভাবে মত্ত হয়ে থাকে। এই অনুতাপ থেকেই হাসন রাজা গানে গানে বলেন-

হাসন রাজারে, একদিন তোর হইবো রে মরণ।
মায়া জালে বেরিয়া মরণ না হইলো স্মরণ।
একদিন তোর হইবো রে মরণ।।

যখন আসিয়া যমের দূত হাতে দিবে দড়ি।
টানিয়া টানিয়া লইয়া যাইবে যমের পুরি।।

কোথায় গিয়া রইবো তোমার সুন্দর সুন্দর স্ত্রী।
কোথায় রইবো রামপাশা আর সাধের লক্ষণছিরি।।

আর যাইবায়নি রে হাসন রাজা রাজগঞ্জ দিয়া।
আর করবানি রে হাসন রাজা দেশে দেশে বিয়া।।

করবানি রে হাসন রাজা রামপাশায় জমিদারী।
করবানি রে কাপনা নদীর পাড়ে ঘুরাঘুরি।।

ছাড়ো ছাড়ো হাছন রাজা ভবের আশা।
প্রাণ বন্ধের চরণ তলে করো গিয়া বাসা।।

গুরুর উপদেশ শুনিয়া হাসন রাজায় কয়।
সব তেয়াগিলাম আমি দেও পদাশ্রয়।।

(চলবে…)

হাসন রাজা: বাংলার এক রাজর্ষি বাউলের মর্মপাঠ: তিন>>

……………………..
আরো পড়ুন:
হাসন রাজা: বাংলার এক রাজর্ষি বাউলের মর্মপাঠ: এক
হাসন রাজা: বাংলার এক রাজর্ষি বাউলের মর্মপাঠ: দুই
হাসন রাজা: বাংলার এক রাজর্ষি বাউলের মর্মপাঠ: তিন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

…………………..
আরও পড়ুন-
সাধক ভবা পাগলা
শাহ্ আব্দুল করিম : জীবনী ও গান
সাধক রাধারমণ দত্ত
মহর্ষি মনোমোহন ও মলয়া সঙ্গীত
মোহন চাঁন বাউল
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-১

জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-২
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৩
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৪
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৫
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৬
জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৭

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!