হজরত ওমর

এ কথায় হজরত ওমরের পৌরুষে আঘাত লাগলো। তিনি স্থির থাকতে পারলেন না। বলে উঠলেন- ‘ওরে আল্লাহর দুশমন! আমরা সবাই জীবিত।’

আবু সুফিয়ান বললো, ‘উ’লু হুবল-হুবলের জয় হোক।’

নবীজীর ইঙ্গিতে ওমর জবাব দিলেন- ‘আল্লাহু আ’লা ও আজাল্লু- আল্লাহ মহান ও সম্মানী।’

খন্দকের যুদ্ধেও ওমর সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। খন্দকের একটি বিশেষ স্থান রক্ষা করার ভার পড়েছিল ওমরের ওপর। আজও সেখানে তাঁর নামে একটি মসজিদ বিদ্যমান থেকে তাঁর সেই স্মৃতির ঘোষণা করছে। এ যুদ্ধে একদিন তিনি প্রতিরক্ষায় এত ব্যস্ত ছিলেন যে, তাঁর আসরের নামাজ ফউত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

নবীজী তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন- ‘ব্যস্ততার কারণে আমিও এখন পর্যন্ত নামাজ আদায় করতে পারিনি।’ (আল-ফারুক- শিবলী নু’মানী- ২৫)

হুদাইবিয়ার শপথের পূর্বেই হজরত ওমর যুদ্ধের প্রস্তুতি আরম্ভ করে দিলেন। পুত্র আবদুল্লাহকে পাঠালেন কোন এক আনসারীর নিকট থেকে ঘোড়া আনার জন্য।

তিনি এসে খবর দিলেন, ‘লোকেরা নবীজীর হাতে বাইয়াত করছেন।’ ওমর তখন রণসজ্জায় সজ্জিত। এ অবস্থায় দৌড়ে গিয়ে তিনি নবীজীর হাতে বাইয়াত করেন।

হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্তগুলি বাহ্য দৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য অপমানজনক মনে হলো। ওমর উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। প্রথমে আবু বকর, তারপর খোদ নবীজীর নিকট এ সন্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন।

নবীজী বললেন- ‘আমি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর নির্দেশ ব্যতীত কোন কাজ আমি করিনে।’ ওমর শান্ত হলেন। তিনি অনুতপ্ত হলেন। নফল রোযা রেখে, নামাজ পড়ে, গোলাম আযাদ করে এবং দান খয়রাত করে তিনি গোস্‌তাখীর কাফ্‌ফারা আদায় করলেন।

খাইবারে ইহুদীদের অনেকগুলি সুরক্ষিত দুর্গ ছিল। কয়েকটি সহজেই জয় হলো। কিন্তু দু’টি কিছুতেই জয় করা গেল না। নবীজী প্রথম দিন আবু বকর, দ্বিতীয় দিন ওমরকে পাঠালেন দুর্গ দু’টি জয় করার জন্য। তাঁরা দু’জনই ফিরে এলেন অকৃতকার্য হয়ে।

তৃতীয় দিন নবীজী ঘোষণা করলেন- আগামীকাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে ঝাণ্ডা দেব, যার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন।’

পর দিন সাহাবায়ে কিরাম অস্ত্র সজ্জিত হয়ে নবীজীর দরবারে হাজির। প্রত্যেকেরই অন্তরে এই গৌরব অর্জনের বাসনা।

ওমর বলেন- ‘আমি খাইবারে এই ঘটনা ব্যতীত কোনদিনই সেনাপতিত্ব বা সরদারীর জন্য লালায়িত হইনি।’ সে দিনের এ গৌরব ছিনিয়ে নিয়েছিলেন শের-ই-খোদা আলী (র)।

খাইবারের বিজিত ভূমি মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হলো। হজরত ওমর (র) তাঁর ভাগ্যের অংশটুকু আল্লাহর রাস্তার ওয়াক্‌ফ করে দিলেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই প্রথম ওয়াক্‌ফ। (আল-ফারুক- ৩০)

খলীফা হজরত আবু বকর যখন বুঝতে পারলেন তাঁর অন্তিম সময় ঘনিয়ে এসেছে। মৃত্যুর পূর্বেই পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে যাওয়াকে তিনি কল্যাণকর মনে করলেন। তাঁর দৃষ্টিতে ওমর ছিলেন খিলাফতের যোগ্যতম ব্যক্তি। তা সত্ত্বেও উঁচু পর্যায়ের সাহাবীদের সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করা সমীচীন মনে করলেন।

মক্কা বিজয়ের সময় হজরত ওমর ছায়ার মত নবীজীকে সঙ্গ দেন। ইসলামের মহাশত্রু আবু সুফিয়ান আত্মসমর্পণ করতে এলে ওমর নবীজীকে অনুরোধ করেন- ‘অনুমতি দিন এখনই ওর দফা শেষ করে দিই।’ এদিন মক্কার পুরুষরা নবীজীর হাতে এবং মহিলারা নবীজীর নির্দেশে ওমরের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করছিলেন।

হুনায়িন অভিযানেও হজরত ওমর অংশগ্রহণ করে বীরত্ব সহকারে লড়াই করেছিলেন। এ যুদ্ধে কাফিরদের তীব্র আক্রমণে বারো হাজার মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিল।

ইবন ইসহাক বলেন- মুহাজির ও আনসারদের মাত্র কয়েকজন বীরই এই বিপদকালে নবীজীর সাথে দৃঢ়পদ ছিলেন। তাদের মধ্যে আবু বকর, ওমর ও আব্বাসের (র) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তাবুক অভিযানের সময় নবীজীর আবেদনে সাড়া দিয়ে হজরত ওমর তাঁর মোট সম্পদের অর্ধেক নবীজীর হাতে তুলে দেন।

নবীজীর মৃত্যুর খবর শুনে ওমর কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকেন। তারপর মসজিদে নবীর সামনে যেয়ে তরবারি কোষমুক্ত করে ঘোষণা করেন, ‘যে বলবে নবীজী মারা গেছেন, আমি তার মাথা দ্বিখণ্ডিত করে ফেলবো।’

এ ঘটনা থেকে নবীজীর প্রতি তাঁর ভক্তি ও ভালোবাসার পরিমাণ সহজেই অনুমান করা যায়।

নবীজীর মৃত্যুর পর ‘সাকীফা বনী সায়েদায়’ দীর্ঘ আলোচনার পর ওমর খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে হজরত আবু বকরের হাতে খিলাফতের বাইয়াত গ্রহণ করেন। ফলে খলীফা নির্বাচনের মহা সংকট সহজেই কেটে যায়।

খলীফা হজরত আবু বকর যখন বুঝতে পারলেন তাঁর অন্তিম সময় ঘনিয়ে এসেছে। মৃত্যুর পূর্বেই পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে যাওয়াকে তিনি কল্যাণকর মনে করলেন। তাঁর দৃষ্টিতে ওমর ছিলেন খিলাফতের যোগ্যতম ব্যক্তি। তা সত্ত্বেও উঁচু পর্যায়ের সাহাবীদের সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করা সমীচীন মনে করলেন।

তিনি আবদুর রহমান ইবন আউফকে (র) ডেকে বললেন, ওমর সম্পর্কে আপনার মতামত আমাকে জানান।’

তিনি বললেন- ‘তিনি তো যে কোন লোক থেকে উত্তম; কিন্তু তাঁর চরিত্রে কিছু কঠোরতা আছে।’

আবু বকর বললেন- ‘তার কারণ, আমাকে তিনি কোমল দেখেছেন, খিলাফতের দায়িত্ব কাঁধে পড়লে এ কঠোরতা অনেকটা কমে যাবে।’

তারপর আবু বকর অনুরোধ করলেন, তাঁর সাথে আলোচিত বিষয়টি কারো কাছে ফাঁস না করার জন্য।

অতঃপর তিনি উসমান ইবন আফ্‌ফানকে ডাকলেন। বললেন, ‘আবু আবদিল্লাহ, ওমর সম্পর্কে আপনার মতামত আমাকে জানান।’

উসমান বললেন- আমার থেকে আপনিই তাঁকে বেশী জানেন।

আবু বকর বললেন- তা সত্ত্বেও আপনার মতামত আমাকে জানান।

উসমান বললেন- তাঁকে আমি যতটুকু জানি, তাতে তাঁর বাইরের থেকে ভেতরটা বেশী ভালো। তাঁর মত দ্বিতীয় আর কেউ আমাদের মধ্যে নেই। আবু বকর তাঁদের দু’জনের মধ্যে আলোচিত বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ করে তাঁকে বিদায় দিলেন।

এভাবে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে মতামত নেওয়া শেষ হলে তিনি উসমান ইবনে আফ্‌ফানকে ডেকে বললেন- ‘এটা আবু বকর ইবন আবী কুহাফার পক্ষ থেকে মুসলমানদের প্রতি অঙ্গীকার। আম্মা বাদ’- এতটুকু বলার পর তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন।

তারপর উসমান ইবন আফ্‌ফান নিজেই সংযোজন করেন- ‘আমি তোমাদের জন্য ওমর ইবনুল খাত্তাবকে খলীফা মনোনীত করলাম এবং এ ব্যাপারে তোমাদের কল্যাণ চেষ্টায় কোন ত্রুটি করি নাই।’

অতঃপর আবু বকর সংজ্ঞা ফিরে পান। লিখিত অংশটুকু তাঁকে পড়ে শোনান হলো। সবটুকু শুনে তিনি ‘আল্লাহু আকবার’ বলে ওঠেন এবং বলেন- আমার ভয় হচ্ছিল, আমি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় মারা গেলে লোকেরা মতভেদ সৃষ্টি করবে।

উসমানকে লক্ষ্য করে তিনি আরো বলেন- আল্লাহ তাআলা ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ থেকে আপনাকে কল্যাণ দান করুন।

তাবারী বলেন- অতঃপর আবু বকর লোকদের দিকে তাকালেন। তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতু উমাইস তখন তাঁকে ধরে রেখেছিলেন। সমবেত লোকদের তিনি বলেন- ‘যে ব্যক্তিকে আমি আপনাদের জন্য মনোনীত করে যাচ্ছি তাঁর প্রতি কি আপনারা সন্তুষ্ট? আল্লাহর কসম, মানুষের মতামত নিতে আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি।

আমার কোন নিকট আত্মীয়কে এ পদে বহাল করিনি। আমি ওমর ইবনুল খাত্তাবকে আপনাদের খলীফা মনোনীত করেছি। আপনারা তাঁর কথা শুনুন, তাঁর আনুগত্য করুন।’ এভাবে ওমরের (র) খিলাফত শুরু হয় হিঃ ১৩ সনের ২২ জামাদিউস সানী মুতাবিক ১৩ আগস্ট ৬৩৪ খৃঃ।

হজরত ওমরের রাষ্ট্র শাসন পদ্ধতি

হজরত ওমরের রাষ্ট্র শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা সম্ভব নয়। দশ বছরের স্বল্প সময়ে গোটা বাইজান্টাইন রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটান। তাঁর যুগে বিভিন্ন অঞ্চলসহ মোট ১০৩৬টি শহর বিজিত হয়।

ইসলামী হুকুমাতের নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠা মূলতঃ তাঁর যুগেই হয়। সরকার বা রাষ্ট্রের সকল শাখা তাঁর যুগেই আত্মপ্রকাশ করে। তাঁর শাসন ও ইনসাফের কথা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে কিংবদন্তীর মত ছড়িয়ে আছে।

হজরত ওমর প্রথম খলীফা যিনি ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধি লাভ করেন। তিনিই সর্বপ্রথম হিজরী সন প্রবর্তন করেন, তারাবীর নামাজ জামাআতে পড়ার ব্যবস্থা করেন, জন শাসনের জন্য র্দুররা বা ছড়ির ব্যবহার করেন।

(চলবে…)

……………………………..
পুনঃপ্রচারে বিনীত: নূর মোহাম্মদ মিলু

……………………
আরো পড়ুন:
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-১
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-২
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৩
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৪
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৫
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব : পর্ব-৬

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!