জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৪

জালাল উদ্দীন খাঁর তত্ত্বদর্শন : পর্ব-৪

-রব নেওয়াজ খোকন

পরমতত্ত্ব:
আত্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইতোপূর্বে ‘পরম’ শব্দটিও এসেছে। পরম শব্দের আভিধানিক অর্থ- প্রথম, আদ্য, প্রকৃত, প্রধান ইত্যাদি। আধ্যাত্মবাদে পরম শব্দটি দিয়ে মহাজগতের অধিষ্ঠাতা বা মহাসত্ত্বা ঈশ্বরকে বোঝান হয়। পরমাত্মা বলতে বোঝান হয় ঈশ্বরাত্মাকে। বেশিরভাগ সাধকের মতে আত্মাকে শক্তি এবং পরমাত্মাকে মহাশক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়। মহাজগত মহাশক্তিরই মহাপ্রকাশ।

এ মহাশক্তি সকল শক্তির উৎস বা আধার। জীবাত্মা তাঁরই অংশবিশেষ। সেই সমীকরণ অনুযায়ী উভয় প্রকার আত্মার মধ্যেকার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও গভীর, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে অবিচ্ছেদ্য। তত্ত্বালোচনায় এ দ্বৈতসত্ত্বা সম্পর্কিত বহুবিধ বৈচিত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়। জালালদর্শনে এ তত্ত্ব প্রাধান্য পেয়েছে। কবির পরমতত্ত্ব নিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় গান-

কী ছুরত বানাইলে খোদা
রূপ মিশায়ে আপনার,
এই ছুরত দোজখে যাবে
যে বলে সে গোনাহ্গার।।

মানব-ছুরতের মাঝে
তুমি আছো তোমার কাজে,
আদম বানিয়ে কী বনলে?
লীলা বোঝা হলো ভার।।

মানব দেহেতে খোদা
দম থাকতে না হবে জুদা
কে-বা আদম কে-বা খোদা?
কে করিবে কার বিচার।।

দেখিলাম দুনিয়া ঘুরে
দুই ছুরত এক মিল না পড়ে,
লক্ষ-কোটি আকার ধরে
সাজিলে তুই নিরাকার।।

এতো রূপ যে ধরতে পারে
তোমরা কী বলো গো তারে?
হয় কী নাহয় এই আকারে
বেহদ্দ রূপে আপনার।।

যে ডুবে ঐ রূপের শানে
কালির লেখা আর কি মানে?
জালাল উদ্দীন এ-জীবনে
সার বুঝেছে একাকার।।

জীব-পরম সম্পর্কের গভীরতা কবির যৌক্তিক ব্যাখ্যায় রচনাটিতে প্রাণবন্ত রূপ ধারণ করেছে। নিজের রূপ মিশিয়ে তৈরি করা সৃষ্টিকে দোজখে পাঠাবেন স্রষ্টা? এ যে নিজের বিচার নিজে করার শামিল! সাধক প্রচলিত এ বিশ্বাসে প্রশ্ন তুলেছেন। এমন কি যারা এটি বলে বা বিশ্বাস করে, তাদের গোনাহ্গার বলতেও দ্বিধা করেন নি। মহাসত্ত্বায় নিজেকে বিলীনের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রত্যয়ের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন খুব কম সাধকই করতে পারেন। বস্তুুত সূফীসাধকগণ স্বর্গ-নরক বা বেহেশত-দোযখকে মুখ্য হিসেবে না দেখে বরং এসবের যিনি নিয়ন্তা, তাঁকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

তাঁর নৈকট্য প্রাপ্তিই সাধকের লক্ষ্য। মানব ছুরতে নিজেকে উৎসর্গ করে, মানবে রূপান্তর হয়ে, স্রষ্টা যে কর্মযজ্ঞে মেতেছেন; তাতে তিনি কীসের আত্মগৌরব প্রচার করেন? এ নিয়েও কবির প্রশ্ন। লক্ষ-কোটি রূপে নিজেকে প্রকাশ করে, নিরাকার সাজার অর্থ জালাল ঠিক বুঝে নিয়েছেন। দ্বৈতবাদের ঝামেলা থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছেন। তিনি আর কালির লেখা মানতে চান না। যাঁর রূপ, স্বরূপে ধরা পরেছে, তাঁর খুঁজে আর বাইরে তাকাতে চান না।

আত্মমগ্ন হয়েই স্বর্গীয় শান্তি উপভোগ করতে চান। মহাচৈতন্যের এ বিশাল স্বর্গভূমিতে পা রেখে জালাল আত্মবিস্মৃত হয়েছেন। নিজেকে স্থাপন করছেন চূড়ান্ত লক্ষ্যে। এমতাবস্থায় বেহেশত-দোযখ নিয়ে মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। তাসাউফ তত্ত্বের সূত্রানুযায়ী সিদ্ধাত্মারা ইল্লিনের আলোয় মিশে যায়। পাপাত্মা মিশে সিজ্জিনের অন্ধাকারে। অতএব, ইল্লিনের আলোয় যাঁর অবগাহন, দোযখ কিংবা পাপ তাঁর জন্য হুমকি বা ভীতিপ্রদ হতে পারে না। পরমতত্ত্বের অন্য একটি গানে পরমকে বেঁধেছেন কবি গোলকধাঁধার জালে-

গোলক ধাঁধা গোলে বাঁধা
গোল নিয়ে মোর বাজলো গোল
এই পারে গোল, সেই পারে গোল
গোলের নাহি আছে কূল।।

প্রকৃতির স্বভাব গোল
চন্দ্র-সূর্য গ্রহ গোল,
আকাশ-পাতাল যে করলো গোল
তারে নিয়ে মহা গোল।।

গোল বিন্দুতে সৃষ্টি সবার
গর্ভে থাকতে সব গোলাকার,
গোলের দুগ্ধ খেয়ে আবার
গোলের লাগি হয় ব্যাকুল।।

গোল কড়িতে গোল বড়িতে
দেহরাজ্যের গোল মিটাইতে,
কূল না পেয়ে শেষ কালেতে
গোল গুটিতে দিতে হয় গুল।।

গোল বাসনে অন্ন খেয়ে
বিষম গোলে দিন কাটিয়ে,
সদায় ব্যস্ত যে গোল নিয়ে
সকল গোলের হয় সে মূল।।

জালাল উদ্দীন ভেবে কয়
সকলি গোল বিশ্বময়,
গোল ভাঙলে হয় গোল পরিচয়
গোলবাগিচায় ফুটবে গুল।।

‘গোল’ শব্দটি এতো বিচিত্র ও বহুমুখী অর্থের সমৃদ্ধি নিয়ে, পৃথিবীর আর কোনো কবির কাব্যে উঠে এসেছে কিনা আমার জানা নেই। আর কোনো সাধক এ শব্দটিকে এতো সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন কিনা তাও জানা নেই। জালাল উদ্দীন খাঁর এ গোলতত্ত্বের সঠিক মীমাংসাও আমার জানা নেই। এমন কি কারো জানা আছে বলেও বিশ্বাস করতে পারছি না। এ গোলকধাঁধার প্রকৃতি জাগতিক অন্যান্য ধাঁধার মতো নয়। এ ধাঁধা মহকালের মহারহস্যের জালে আবৃত। এপার-ওপার সর্বত্রব্যাপি গোল বা রহস্যের সঠিক মীমাংসা কোনো সসীম জীবের পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়।

অনন্ত মহাজগতের তুলনায় মানুষ অতি নগন্য এক ক্ষুদ্র জীব। তারপক্ষে এ সৃষ্টিজগতের সঠিক উদ্দেশ্য কিংবা বিধেয় কোনোটাই জানা সম্ভব নয়। কারণ, কবির ভাষায় প্রকৃতির স্বভাব গোলাকার, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ গোলাকার। অতএব এসব যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁর প্রকৃতি নিয়ে গোল বাঁধা স্বাভাবিক। গোলবিন্দু থেকে অর্থাৎ গোলাকার জরায়ুতে জীবের প্রাথমিক অবস্থান।

আবার সে গোলকধারী মায়ের মাতৃস্তন্যের আকারও গোলাকার। যে গোলের দুগ্ধপোষ্য হয় জীবশিশু, সে শিশু বড় হয়ে এর জন্যই বিপরীত অর্থে উন্মাদ হয়ে ওঠে। এসব যেন গোলেরই গোলমেলে বৈশিষ্ট্য। গোল কড়ি তে কেনা গোল বড়ি খেয়ে, দেহরাজ্যের গোলমাল মিটাতে ব্যর্থ হয়ে শেষে গুল গুটিতে গুল দিতে হয়। গোল বাসনে খাবার খেয়ে বেঁচে থাকা জীবনের গোল মিটাতে গিয়ে ব্যর্থতা নেমে আসে।

এসব গোলের মূলে যে মহাগোলেরই কারসাজি। এই যে গোল নিয়ে মহাগোলের কারখানা, এ থেকে জালাল উদ্দীন খাঁ শিক্ষা নিতে সাধকদের তাগিদ দিচ্ছেন। লম্বা-বেঁটে বাদ দিয়ে জগতের গোল প্রকৃতির সাথে একাত্ম হতে বলেছেন। তবেই মিটে যাবে সকল গোল এবং গুলবাগিচায় গুল ফুটবে। সাধকের বাস্তব জীবনেও প্রতিকি হিসেবে এ গোলতত্ত্বের ইঙ্গিত রেখেছেন। তাঁর বসতবাড়ির আঙ্গিনায় নির্মাণ করে রেখে গেছেন গোলাকৃতির একটি বিশেষ ঘর। জানা যায় সে ঘরে বসে তিনি কাব্যচর্চা করতেন ও ধ্যানমগ্ন থাকতেন।

পরমসত্তাকে গোলের গোলা থেকে কবি কখনো টেনে এনেছেন একেবারে ক্বালবের ভেতর। যেখানে সকল দূরত্বের অবসান ঘটিয়েছেন-

দিলের খবর জানো খোদা
জানে রুহ্ ইনছানি,
কেউরে করাও ধরম-করম
আমায় করাও শয়তানি।।

কালবে রূহ্ গায়বে খোদা
মোকাম মঞ্জিল মাহমুদা,
ধ্যানে দিদার নুরুল হূদা
জাল্লে জালাল নূরানি।।

সেই দেশেতে করো দাখিল
চাই না তোর দরবেশি হাসিল,
খুলিয়া দাও কপাটের খিল
ফুল ফুটায়ে আসমানি।।

নীল আকাশে থরে থরে
মেঘ ছুটে যায় বায়ুভরে,
তজল্লি-শান তার উপরে
আরশে-আলা রব্বানি।।

বেহেশত খানায় যাব না আর
পুলসেরাত না হইব পার,
চাই তোমারই হুব্বে দিদার
এশকে মৌলার দেওয়ানি।।

যে পিরিতে দেওয়ান হাফেজ
গাউসুল আজম শামছ-তবরেজ,
শরাতে হয় মনসুর খারেজ
শূলেতে যার কোরবানি।।

সেই বাতাস লাগাও হে অঙ্গে
জালাল উদ্দীন তোমার সঙ্গে,
নেচে গাইবে প্রেম তরঙ্গে
যেখানে পীর জিলানি।।

দিল বা মনের খবর জানার ক্ষমতা রয়েছে একমাত্র পরমের। আর জানে ইনছানি রূহ্ বা জীবাত্মা। সে অনন্য ক্ষমতা যাঁর, তিনিই সকল ভালো-মন্দের নিয়ন্তা। ক্বালবের সাথে সংশ্লিষ্ট জীবাত্মা ও পরমাত্মার পাশাপাশি রয়েছে নূরে-মোহাম্মদীয় আত্মার উপস্থিতি। কবি মোহাম্মদীয় আত্মাকে মোকামে মঞ্জিল বলে উল্লেখ করেছেন। কবির প্রার্থনা, সে মঞ্জিলের কপাট যেন খুলে দেয়া হয়। দরবেশী হাসিলের চেয়ে পরম স্রষ্টার সান্নিধ্যই তাঁর মুখ্য চাওয়া।

নীলাকাশের মেঘের ভেলায় চড়ে উড়ে যাওয়া বাতাস ভেদ করে, উর্ধ্বলোকের পরমের নিকট পৌঁছার কল্পনায় কবি উন্মুখ। পুলসিরাত পার হয়ে বেহেশতে যাবার কোনো বাসনা তাঁকে আলোড়িত করে না। তিনি মৌলার প্রেমের পাগল। তাঁর প্রেমাষ্পদের নৈকট্যই একমাত্র কাম্য। সাধককবি হাফেজ, শামছ-তবরেজ সাধনার বলে যাঁর কাছে পৌঁছেছিলেন, কিংবা মনসুর হেল্লাজকে যাঁর প্রেমের অপরাধে শূলে চড়ানো হয়েছিলো, সেই পরম প্রভুর কাছে পৌঁছাই তাঁর একমাত্র ব্রত।

মূল্যবোধ:
পরমতত্ত্বে জালাল পরমকে দূরের-কাছের, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য এসব বৈপরীত্যযুক্ত বৈচিত্রে চিত্রায়িত করে, দ্বৈতরসের রসময়তায় সিক্ত করেছেন। তাতে প্রচলিত শরিয়া আইন লংঘিত হয়েছে বটে, তবে তাসাউফের উচ্চতর বিজ্ঞানচিন্তার মূর্ত প্রতিফলন ঘটেছে। সাধারণ শ্রেণির ধর্মচিন্তায় তা ব্যাঘাত সৃষ্টি করলেও, ঐশী প্রেমে আসক্ত সাধকের জন্য বয়ে এনেছে মৌলিক বার্তা। প্রেমিক হৃদয়ের স্বকীয় আবিষ্কার এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। অতএব আমরা যেনো প্রেমিক কবিকে ভুল না বুঝি।

(চলবে)

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!