ভাববাদ আধ্যাত্মবাদ

জীবন সাধনা

-লুৎফর রহমান

জাগতিক অভাব মানুষের বেদনা উপহাসের জিনিস নয়। জাগতিক দুঃখ ও দৈহিক অভাবের ভিতর দিয়েই আল্লাহ্ তার মহিমা এবং গুপ্ত ভাব প্রকাশ করেন। সুতরাং দেহের অভাবকে উপহাস করলে চলবে না, দেহের কথা ভাবতে হবে।

এই দেহের অভাবের জন্য মানব-সংসারে কত পাপই না অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আল্লাহ্ যে প্রতিজ্ঞা করেছেন, সে প্রতিজ্ঞায় মনুষ্য বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে নাই। হযরত ঈসা (আঃ) বলেছেন, ক্ষেতের পুষ্প কেমন সুন্দর, পক্ষীরা আহারের চিন্তায় ব্যস্ত হয় না অথচ গলা ভর্তি করে সন্ধ্যাকালে তারা কুলায় ফিরে আসে।

আল্লাহ্ মানুষের কথা কি ভুলে যাবেন? মানুষকে তিনি আরও বেশি ভালোবাসেন, মানুষকে কি তিনি আরও বেশি সুশোভিত করবেন না? আল্লাহ্ আর এক জায়গায় বলেছেন, আমার বান্দার কাছে মিথ্যা প্রতিজ্ঞা করি নাই।

তবু মানুষ আল্লাহকে বিশ্বাস করে নাই। অবৈধ মিথ্যা পথে সে অন্ন এবং বস্ত্রের সন্ধানে ফিরেছে। অন্ন এবং বস্ত্রের জন্যে মানুষ কী পাপই না করেছে, তা ভাবতেও মন। অস্থির এবং ভীত হয়ে ওঠে। আত্মাকে বিনষ্ট করে সে বেশ্যা নারীর শুভ্র পোশাকে দেহকে সমিতো করেছে, অবৈধ অন্ন মুখে তুলে দিয়েছে।

কেন জীবনের পথ এত জটিল করে নিলে তোমরা? কে তোমাদের এই সর্বনেশে শিক্ষা দিয়েছে? আত্মাকে অপবিত্র করে, প্রাণঘাতী দারিদ্র্য-দুঃখকে বরণ করে জীবনকে ব্যর্থ করে দেবে? এরই নাম কি দ্ৰতা? এ ভদ্রতা কে শিখিয়েছে তোমাদের? পরিশ্রম করতে লজ্জাবোধ কর? শ্রমকে তোমরা সম্মান করতে জান না?

চৌর্য, হীন দাসত্ব, কাপুরুষতা, আত্মার দীনতা ও মিথ্যার পোশাক তোমাদের কাছে ভদ্রতা? ৬০ টাকা বেতনে চাকরি করে অসৎ উপায়ে মাসিক ২০০ টাকা আয় করতে তোমাদের মনুষ্যত্ব লমিতো হয় না? আর এই চুরি করার সৌভাগ্য কয়জনের হবে? এ যে বিনষ্ট হবার পথ।

পরিশ্রমকে তোমরা সম্মান করলে বুঝতে পারবে, কয়লার মধ্যে, কল-কারখানার ধুলা বালির মাঝে, মাঠের কাদায়, কামার ঘরে অগ্নিস্ফুলিঙ্গে তোমাদের মনুষ্যত্ব ও শক্তি লুকিয়ে আছে। দুর্বল, কাপুরুষ, শক্তিহীন, ধর্মহীন, দুঃখী হয়ে তোমরা মরো না। চাকরি ক’টি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে?

চাকরির নেশা ত্যাগ করে তোমরা দিকে দিকে ছুটে পড়। পাশ্চাত্য দেশে মানুষ শিল্প ও দৈহিক পরিশ্রমকে সম্মান করতে শিখেছে- কত প্রতিভা কত স্থানে আপন আপন জীবনকে সার্থক করেছে। তারা মানুষ, তাদের শক্তিতে সমস্ত জাতির দেহে অফুরন্ত শক্তি সঞ্চিত হয়েছে, তারাই জাতির মেরুদণ্ড এবং প্রাণ।

কয়েকজন কেরানি ইংরেজ জাতিকে গিরি লঙ্ঘন করতে, আকাশে উড়তে, সমুদ্র অতিক্রম করতে শিক্ষা দেয় . নাই। কী অফুরন্ত বিরাট শক্তি সমস্ত জাতির দেহে রক্ত প্রবাহের কর্ম প্রেরণা ঢেলে দিয়েছে।

জাহাজ-নির্মাণ, কামান-বন্দুক তৈরি, অসংখ্য কলকজা, তালা-চাবি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, ছাপাখানা, কৃষি, অস্ত্র-সরঞ্জাম, স্থপতি শিল্প, ভূ-তত্ত্ব, খনি, চারুশিল্প, বস্ত্র তৈরি, সুঁই, সূতা, বাদ্যযন্ত্র, শিশি-বোতল, ধাতুর পাত্র, বাসন ও কাঁচ নির্মাণ প্রভৃতি লক্ষ্য করার কাজে নিজেদের প্রতিভা তাঁরা নিয়োগ করেছেন-

শুধু চাকরির সন্ধানে তাঁরা তাঁদের জীবন। ব্যর্থ করে দেন নাই। জাতির অভাব চাকরিতে পূরণ হবে না। এর ফলে দেশে পরস্পর বিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ বেড়েই উঠবে অভাবে দেশের মানুষের মনুষ্যত্ব থাকবে না।

ইংরেজ জাতিকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় এরা বড্ড বাবু; আমরা এত খাঁটি, তার প্রতিদানে পাই এক মুষ্টি ছাতু, আর এরা ছায়ায় বসে এত সুখ ভোগ করে। এরা যে কত দুঃখ করেছে, উন্নতির সাধনায় এরা কত ত্যাগ স্বীকার করেছে, কত প্রাণ দিয়েছে, তার সীমা নাই।

জ্ঞান ও বিদ্যালোচনা চাকরির জন্য নয়। জ্ঞান মানুষের জীবনকে অসংখ্য প্রকারে সফল করবার সুযোগ ও সুবিধা করে দেয়। জ্ঞানকে দাসত্বের কাজে নিয়োগ করে জ্ঞানের মর্যাদা নষ্ট করো না। জীবনে ঘুমন্ত শক্তি, মস্তিষ্কের সহস্র লুকান ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলবার অমোঘ উপায় হচ্ছে জ্ঞান।

এ দেশে কি শিল্প চর্চা ছিল না? দেশের মানুষ কি কোনো কালে শিল্প প্রতিভার পরিচয় দেয় নাই? আল্লাহর সৃষ্টি এদেশে মানুষের সঙ্গে ইউরোপের মানুষের কি কোনো পার্থক্য আছে? যদি জাতি চাকরির নেশা ত্যাগ করে তার সমস্ত শক্তি বিবিধ পথে নিয়োগ না করে, তা হলে আবার বলি, জাতির দুঃখ বেড়েই যাবে।

অভাব ও দুঃখের অন্ত থাকবে না। যে জাতি অভাব ও দুঃখ ভোগ করে, জগতে তাদের অস্তিত্ব থাকে না। পরিশ্রমকে অশ্রদ্ধা করো না। এম,এ, পাস করে তোমরা কখনো বাবুটি হয়ো না, এই হচ্ছে সর্বনাশের কথা। হাতের ক্ষমতোকে অবহেলা করো না। কুলির মতো সর্বত্র কাজ কর, কাজই জগতের প্রাণ।

জগৎ বাবু হওয়ার, বসে বসে শুধুই চিন্তা করবার ক্ষেত্র নয়। জগৎ চায় কাজ। এই যে দেশে কৃষক, কামার, তাঁতী, জেলে, স্বর্ণকার, কাঠের মিস্ত্রী, রাজমিস্ত্রী, মালী, চিত্রকর, শিল্পী, ভাস্কর- এরা কি অশ্রদ্ধার পাত্র? লেখাপড়া জানে না বলেই এরা মানুষের অশ্রদ্ধা ভোগ করছে। জাতির বাচবার যন্ত্রপাতি এদেরই হাতে।

যেদিন এরা লেখাপড়া শিখবে, সেদিন জাতির পরিচালক হবে এরাই। এদের ইচ্ছায় জাতি উঠা-বসা করবে। যদি বাঁচতে চাও দেশের যুবক সম্প্রদায়কে বলি, লেখাপড়া শিখে সর্বপ্রকার হীনতাকে উপহাস করে তোমরা তোমাদের দুইখানি হাতকে নমস্কার করে নাও।

তোমাদের ভিতর যে শক্তি আছে, সে শক্তিকে ভাড়া না দিয়ে স্বাধীনভাবে নিজের এবং জাতির মঙ্গলের পথে নিযুক্ত কর, সকল দেশের সকল জাতির মুক্তির পথই এই। প্রাচীন এবং বর্তমান সমস্ত উন্নত জাতির পানে তাকাও- দেখতে পাবে, তারা কখনও পরিশ্রমকে অশ্রদ্ধা করে নাই।

দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং সহিষ্ণুতা ব্যতীত কোনো কাজে সফলতা লাভ হয়। মানুষ ইচ্ছা করে, তাই সম্ভব। চাই একাগ্রতা, বিশ্বাস এবং সাধনা। আন্তরিকতা ব্যতীত কোনো কাজেই সিদ্ধিলাভ সম্ভব নয়। জগতে যে সমস্ত উত্তম উত্তম কাজ দেখতে পাচ্ছ, তা কঠিন পরিশ্রম, ত্যাগ এবং দুঃখের ফল।

ইংরেজ জাতিকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় এরা বড্ড বাবু; আমরা এত খাঁটি, তার প্রতিদানে পাই এক মুষ্টি ছাতু, আর এরা ছায়ায় বসে এত সুখ ভোগ করে। এরা যে কত দুঃখ করেছে, উন্নতির সাধনায় এরা কত ত্যাগ স্বীকার করেছে, কত প্রাণ দিয়েছে, তার সীমা নাই।

তোমরাও এইভাবে ত্যাগ স্বীকার কর, দুঃখ বরণ কর, হৃদয়ের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এবং নিজের ও জাতির কল্যাণ অর্জন করতে হবে।

কাজের ডাকে, কর্তব্যের ডাকে কাজ কর; শুধু অর্থলোভেই কাজে অগ্রসর হয়ো না। শুধু অর্থলোভে মানুষকে শ্রেষ্ঠ এবং পূর্ণ করে না। অর্থের মীমাংসা হলেই অর্থলোভীর সাধনায় জড়তা এবং শৈথিল্য আসে। শুধু অর্থ-লোভ জাতির শক্তিকে খর্ব করে দেয়।

সমস্ত কর্ম-প্রেরণার অন্তরালে কর্তব্য বৃদ্ধি এবং জাতির প্রতি প্রেম মানুষকে শক্তিশালী এবং বিজয়ী করে। অর্থ যদি লাভ হয়, তবে তা কাজ করতে করতে ঘটনাক্রমে হয়ে উঠে।

একদিন রাস্তার পার্শ্বে তিনি কতকগুলি অতি সুন্দর খোদাই কাঠের কাজ দেখতে পান। এই কাজ শেখবার তাঁর আন্তরিক আগ্রহ হল। বলে-কয়ে কোনোরকমে মুদির কবল হতে রক্ষা পেয়ে সেই মিস্ত্রীর কারখানায় ভর্তি হলেন। সেখানে তিনি সাত বৎসর কাজ করেন। ঐকান্তিক আগ্রহ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, প্রাণঢালা সাধনায় তাঁর কাজের তুলনা নাই।

সার জসুয়া রেনল্ডস্ বলেছেন, “যদি কোনো কাজে সফলতা চাও, তা হলে যখন ঘুম থেকে ওঠ, তখন থেকে নিদ্রা যাওয়া পর্যন্ত সেই কাজে সমস্ত চিন্তা, সমস্ত মন ঢেলে দাও।”

বাস্তবিক ইহাই সফলতার পথ। কর্মী ও সাধকের কাছে সকাল নাই, দুপুর নাই, সন্ধ্যা নাই, কাজকে সর্বাঙ্গসুন্দর করবার জন্যে তিনি কাজের মধ্যে একেবারে ডুবে যাবেন। সাধনায় সিদ্ধি লাভের ইহা গুপ্ত রহস্য। অভাব, দারিদ্র অসুবিধা মানুষের সাধনার পথে কোনো কালেই বাধা হয় না।

বাধা অনেক সময় সাধকের জীবনকে দুঃখময় করে তোলে বলে দুঃখ করো না, যেহেতু জীবনের প্রতি চিরদিনই এমনি জটিল ও সমস্যাপূর্ণ। তোমাদের দুঃখ ও ত্যাগের ফলে যদি ভবিষ্যৎ মানব-সমাজ দুঃখ, কুসংস্কার, মূর্খতা ও অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পায়, সেই কথা চিন্তা করে মনে মনে আনন্দ কর।

আজকাল এই দুঃখ নীরবে আঁখিজলে সয়ে যাও, আল্লাহর দয়ার কথা ভেবে কাজ করতে থাক। যদি সাধনায় সিদ্ধিলাভ হয়, সেই দিন সমস্ত দুঃখের প্রতিদান পাবে। মানব-সমাজ তোমার কাছে একদিন কৃতজ্ঞ হবেই।

কোনো কাজ একবারে হয় নাই, আবার কর। আবার কর- যতবার না হয়, ততবারই কর। এর শেষে সিদ্ধি। প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তিরা হয়তো কোনো কাজ হঠাই করে ফেলেন, কিন্তু পরিশ্রম, চিন্তা ও পর্যবেক্ষণ সফলতার পথ।

স্বর্ণকার, চিত্রকর, ভাস্কুর এবং ইঞ্জিনিয়ার সেলিনীর জীবন বড়ই চমৎকার। তাঁর পিতা ফ্লোরেন্সের রাজ দরবারে বেতনভুক্ত গায়ক ছিলেন। তার চাকরি গেলে পুত্রকে এক স্বর্ণকারের কাছে কাজ শিখতে পাঠান। অতি অল্পদিনের মধ্যেই বালক অনেক কাজ শিখে ফেলল।

বাপের জিদে কিছুদিন তাকে এই সময় আন্তরিক অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাঁশি বাজানো শিখতে হয়েছিল। এর কিছুদিন পর সেলিনী পোপের অধীনে স্বর্ণকার গায়করূপে চাকরি পান। তার সোনা, রূপা এবং ব্রোঞ্জ ধাতুর কাজ অতি আশ্চর্য। কারো সাধ্য ছিল না, তেমন কাজ করতে পারে।

কোনো সুন্দর কারিগরের সংবাদ পেলেই সেলিনী তার কাজ দেখতেন এবং যাবৎ না দক্ষতা গুণে তাকে অতিক্রম করতে পারতেন, তাবৎ তার শান্তি থাকত না, তাঁকে পরাস্ত করা চাই, তার পর অন্য কথা। তাঁর কর্মশক্তি ছিল অসাধারণ।

শিল্পী চাট্র শিল্প-সাধনায় কতদিন মগ্ন থেকে যশের আসন লাভ করেছিলেন, তা পড়লে বিস্মিত হতে হবে। খুব ছোট বেলাতেই তার বাপ মারা যান। মা দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করেন। এই অবস্থায় তাকে গাধার পিঠে শেফিল্ড শহরে দু’বেলা ঘরে ঘরে দুধ যোগান দিতে হতো। তারপর কিছু দিন এক মুদির দোকানে তাঁকে কাজ করতে হয়।

একদিন রাস্তার পার্শ্বে তিনি কতকগুলি অতি সুন্দর খোদাই কাঠের কাজ দেখতে পান। এই কাজ শেখবার তাঁর আন্তরিক আগ্রহ হল। বলে-কয়ে কোনোরকমে মুদির কবল হতে রক্ষা পেয়ে সেই মিস্ত্রীর কারখানায় ভর্তি হলেন। সেখানে তিনি সাত বৎসর কাজ করেন। ঐকান্তিক আগ্রহ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, প্রাণঢালা সাধনায় তাঁর কাজের তুলনা নাই।

সাত বৎসরে তিনি একজন সুদক্ষ কারিগর হলেন। তাঁর অবসর সময় বিনা কাজে ব্যয় হত না। কাজের পূর্ণতা এবং চারুতার জন্যে কখনও চিত্র আঁকছেন, কখনও মাপজোক নিচ্ছেন- সঙ্গে সঙ্গে আত্মোন্তির জন্যে বইপুস্তক পড়াও কামাই নাই।

এই সময় ফ্রান্সের চতুর্থ হেনরী তাকে নিমন্ত্রণ করেন। তিনি কয়েকজন সহযোগী নিয়ে যন্ত্রপাতিসহ রুয়েন শহরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। রুয়েন একটা প্রধান হস্তশিল্পের কেন্দ্র। সেখানে তিনি বিশেষ সমাদর লাভ করলেন। এখানে তার কাজের আদর হতে লাগল। দুর্ভাগ্যবশত এই সময়।

এর কিছুকাল পরে আরও উন্নত জ্ঞান-লাভের জন্যে তিনি লণ্ডনে রয়েল একাডেমীতে ভর্তি হন। জীবন্ত মানুষের মূর্তি নির্মাণ, চিত্রবিদ্যা প্রভৃতি কার্যে তিনি অতিশয় খ্যাতি অর্জন করেন। সহিষ্ণুতা, সাধনা, অধ্যবসায় এবং কঠিন পরিশ্রম আর তার সঙ্গে তাঁর প্রতিভা তাকে বড় করেছিল। তিনি অতিশয় দানশীল ছিলেন, কিন্তু সে কথা কেউ জানত না।

যে কোনো কাজই কর- বাইরের উপদেশে বিশেষ কিছু লাভ হয় না। মানুষ মানুষকে কিছু শিখাতে পারে না। মানুষ মানুষকে একটু দেখায় মাত্র, নিজের ওস্তাদ নিজেকেই হতে হবে। পরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে জগতের কোনো কাজেই কৃতিত্ব লাভ করা যায়।

সাধনায় প্রাণ বিশ্বাস এবং আত্মনির্ভরতা কোথা থেকে বুদ্ধি যোগায়, পথ পরিষ্কার হয়ে আসে, তা ভাবলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। আল্লাহ মানুষকে এমনি পূর্ণ করে গঠন করেছেন যে, তার পরের কাছে হাত পাতবার আবশ্যকতা খুব অল্পই আছে।

শিল্পকে জীবনে অনেক সময় অপরিসীম দুঃখ ভোগ করতে হয়েছে তা, ভেবে সাধক তার কাজ ত্যাগ করেন নাই। কত কর্মী মানুষের অশ্রদ্ধা এবং অবহেলায় প্রাণ পর্যন্ত দিয়েছেন- তাঁদের সমাপ্ত সাধনায় নতুন নতুন সাধক পূর্ণতা এনে দিয়েছেন।

স্টকিং মেশিন- নির্মাতা রেভারেণ্ড উইলিয়াম লী এক নারীকে ভালোবাসতেন। লী ধর্মপ্রচারক ছিলেন। তিনি প্রায়ই প্রেম-প্রার্থী হয়ে তার প্রিয়তমার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। কিন্তু সেই নারী তাকে ভালোবাসত না, হাতে স্টকিং তৈরি করত, আর তার সহকর্মী মেয়েদের সঙ্গে কথা বলত। লী প্রিয়তমার এই ব্যবহারে অতিশয় মনঃক্ষুণ্ণ হন।

তিনি মনে মনে ঠিক করলেন এমন এক যন্ত্র তৈরি করতে হবে যাতে আর কেউ হাতে স্টকিং তৈরি করতে না পারে। প্রিয়তমাকে শাস্তি দেবার মানসে তিনি চিন্তা আরম্ভ করলেন। একটা অতি লাভজনক ব্যবসায় এই প্রেমের দ্বন্দ্ব আরম্ভ হয়। লী প্রচারকার্য ত্যাগ করে যন্ত্রের সফলতার দিকে মন দিলেন।

ঐকান্তিক সাধনার ফলে তিনি কয়েক বছরেই এই আশ্চর্য কৌশলময় যন্ত্রটি তৈরি করতে সক্ষম হলেন। তার উদ্ভাবিত যন্ত্রটি নিয়ে তিনি প্রদর্শনের জন্য রানী এলিজাবেথের সঙ্গে দেখা করলেন। দরিদ্রের অন্ন মারা যাবে, এই কথা বলে রানী তাকে অশ্রদ্ধা করলেন। লী অতঃপর দুঃখে সে স্থান ত্যাগ করলেন।

এই সময় ফ্রান্সের চতুর্থ হেনরী তাকে নিমন্ত্রণ করেন। তিনি কয়েকজন সহযোগী নিয়ে যন্ত্রপাতিসহ রুয়েন শহরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। রুয়েন একটা প্রধান হস্তশিল্পের কেন্দ্র। সেখানে তিনি বিশেষ সমাদর লাভ করলেন। এখানে তার কাজের আদর হতে লাগল। দুর্ভাগ্যবশত এই সময়।

এই উদ্দেশ্যে তিনি ইউরোপ পরিভ্রমণ করতে মনস্থ করেন। তিনি পায়ে হেঁটে ইউরোপের বৃহৎ বৃহৎ প্রাচীন অট্টালিকা, দুর্গ এবং গীর্জা পরিদর্শন করেন এবং সেগুলির নক্সা হাতে গ্রহণ করেন। এডিনবরা শহরে স্কট মনুমেন্টের নক্সা প্রস্তুত করবার প্রতিযোগিতায় তিনিই প্রথম স্থান অধিকার করেন। তাঁরই নক্সা অনুযায়ী এডিনবরায় এই বিখ্যাত সাহিত্যিক স্মৃতিমন্দির নির্মিত হয়।

একদল ধর্মান্ধ গোঁড়া সম্প্রদায় সম্রাটকে হত্যা করে। ফলে লীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠল। তিনি রুয়েন ছেড়ে প্যারিস শহরে গেলেন। সেখানে সবাই তাকে ধর্মহীন এবং বিদেশী বলে অবজ্ঞা করলেন। একটি বিশেষ লাভজনক যন্ত্রশিল্পের উদ্ভাবক অতঃপর বিদেশে মনের কষ্টে, অবহেলায়, রোগে, দুঃখে প্রাণত্যাগ করেন।

অতঃপর তার ভাই কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে স্বদেশে পালিয়ে আসেন। এই সময় আল বলে আর একজন সুদক্ষ শিল্পী তার সঙ্গে যোগ দিয়ে যন্ত্রটিকে সর্বাঙ্গ সুন্দর এবং সফল করে তুললেন। ক্রমে দেশের সর্বত্র স্টকিং মেশিনের সমাদর হল।

মানুষের কাজ এইভাবেই সমাদর লাভ করে। মানুষ প্রথম প্রথম কোনো কথা, কোনো সাধনার দিকে ফিরে তাকায় না। মানুষের এ স্বভাব, তা বলে ভাবনা করলে চলবে না।

জগতে এখনও অনেক কিছু নতুন করে তৈরি করবার আছে। জগতের যা কিছু প্রয়োজন তা মানুষের ত্যাগের ফলে তৈরি হয়ে থাকে- তারপর কাজে নেমে পড়লেই হয়। জাতির ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করবার জন্যে, পল্লীর দুঃখ দূর করবার জন্য এখন দেশের মানুষের অগ্রসর হওয়া মাত্র বাকি।

হাত-পা গুটিয়ে মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা না করে হাত-পা খাঁটিয়ে শক্তি ও মনুষ্যত্বের সদ্ব্যবহার করে নিজের এবং জাতির মঙ্গল চেষ্টা করাই উত্তম। জাতির না হোক, সমাজের না হোক, দেশের ছেলেরা যদি আপন আপন মা-বোনের সেবা করতে পারে, সাধু জীবন-যাপন করে প্রতিবেশীদের স্বার্থে আঘাত না করে, তা হলেই যথেষ্ট।

আর্থার হ্যাঁলাস বলেছেন- ”ইংরেজ জাতির ভিতর থেকে শ্রমিক, শিল্পী, মিস্ত্রী ফেলে দাও, সমস্ত জাতিটা অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়বে। সমস্ত জাতির দেহটা তাদের ঘরের মতো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়বে। তাই বলছি কয়েকজন রাজ কর্মচারী এবং দেশের ভদ্রলোক এরাই জাতির শক্তি এবং প্রাণ, এ কথা পাগল ছাড়া আর কেউ মনে করে না।

কোনো মানুষের কৃতিত্ব বিশেষত্ব এবং গুণ চাপা থাকবে না- সে ছুতোরই হোক, আর রাজমিস্ত্রী, গায়ক, কামার স্বর্ণকার, শিল্পী যাই হো- মানুষের অন্তনিহিত ক্ষমতো তার কাজের ভিতর দিয়ে তাকে শ্রেষ্ঠত্ব এবং সম্মান দান করবেই।

জর্জ কেম্প একজন সামান্য লোক ছিলেন। তাঁর পিতার সম্পত্তি ছিল কতকগুলি গরু ও ছাগল। প্রথম জীবনে তিনি সামান্য একজন মিস্ত্রীর কাছে শিক্ষানবীশি করেন। স্থাপত্য শিল্পে তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল। ভালো উল্লেখযোগ্য নতুন, পুরাতন সুদৃশ্য অট্টালিকা দেখলেই তিনি তার চিত্র গ্রহণ করতেন।

এই উদ্দেশ্যে তিনি ইউরোপ পরিভ্রমণ করতে মনস্থ করেন। তিনি পায়ে হেঁটে ইউরোপের বৃহৎ বৃহৎ প্রাচীন অট্টালিকা, দুর্গ এবং গীর্জা পরিদর্শন করেন এবং সেগুলির নক্সা হাতে গ্রহণ করেন। এডিনবরা শহরে স্কট মনুমেন্টের নক্সা প্রস্তুত করবার প্রতিযোগিতায় তিনিই প্রথম স্থান অধিকার করেন। তাঁরই নক্সা অনুযায়ী এডিনবরায় এই বিখ্যাত সাহিত্যিক স্মৃতিমন্দির নির্মিত হয়।

কয়েক বৎসর আগে ব্রিটেন এবং রাশিয়া পারস্যকে দুই লক্ষ পাউন্ড ধার দেয়, একটা এঙ্গলোফ্রেন্স কোম্পানিও পারস্যকে ৬০ লক্ষ পাউণ্ড কর্জ দেন। প্রফেসার জ্যাকসন। বলেছিলেন, “বিদেশীর এই সমবেদনার সঙ্গে সঙ্গে পারস্যকে কুসুমের সুবাস এবং বুলবুলের সঙ্গীত ত্যাগ করে কাস্তে-কোদাল নিয়ে শস্য-ক্ষেত্রে নামতে হবে।” যে জাত শ্রমকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে না, সে জাত জগতে বড় আসন পায় না।

অসংখ্য প্রকারে মানুষ নিজ নিজ জীবনকে উল্লেখযোগ্য করে তুলতে পারে। যে দেশের মানুষ এ বুঝে না, সে দেশের লোক দাস ও গোলামের জাতি ছাড়া আর কী? চাকরিকেই সম্মানের মাপকাঠি মনে করা যার পর নাই ভুল। জাতিকে সমৃদ্ধশালী করে তোলবার পথ এ নয়।

জাতির শক্তির পশ্চাতে অনন্ত বিচিত্র জীবন ধারা দেশের শিরায় শিরায় খেলে যাচ্ছে। মিশর, পারস্য, ব্ৰহ্মদেশ, এশিয়া মাইনর প্রভৃতি ছোট ছোট দেশেও ব্যবসা-বাণিজ্য দ্বারা অর্থাগমের বিবিধ পন্থা আছে। আমাদের দেশেও থাকা চাই। একজন আর একজনের নাড়ী ছিঁড়ে খেলে কয়েকজন লোক ছাড়া বাকি সকল লোকই মারা যাবে।

মিথ্যা ও মূর্খতার বিরুদ্ধে যুবক সমাজকেই বিদ্রোহী হতে হবে। অত্যাচারী মরুব্বীর দল যে চাকরিকেই সম্মানের জীবন মনে করে নিষ্ঠুর হস্তে সে মানসিকতাকে ভেঙ্গে না দিলে আর উপায় নাই। পরের গলগ্রহ হয়ে অসাধু পথে দাসত্বের লৌহচাপে, অভাবের অভিশাপে মানুষের জীবনীশক্তি এবং মনুষ্যত্ব দুই-ই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে। শ্রমকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ কর। কালি-ধুলার মাঝে, রৌদ্র-বৃষ্টিতে কাজে নেমে যাও। বাবু হয়ে ছায়ায় পাখার তলে থাকবার কোনো দরকার নাই। এ হচ্ছে মৃত্যুর আয়োজন। কাজের ভিতর কু-বুদ্ধি, কু-মতলব মানবচিত্তে বাসা বাঁধতে পারে না।

কাজের শরীরের সামর্থ্য জন্মে, স্বাস্থ্য, শক্তি, আনন্দ, কূর্তি সবই লাভ হয়। মদ খেয়ে আনন্দ করবার কোনো প্রয়োজন হয় না। পরিশ্রমের পর যে অবকাশ লাভ হয়, তা পরম আনন্দের অবকাশ। শুধু চিন্তার দ্বারা জগতের হিত সাধন হয় নাই। মানব জাতির সমস্ত কল্যাণ বাহুর শক্তিতেই সাধন হয়েছে।

মানুষের বাহু অত্যাচারিত মনুষ্য, পীড়িত-লাঞ্ছিত মনুষ্যকে উদ্ধার করছে, জগতের জালিমকে বিনষ্ট করেছে; রাক্ষসের মুখ থেকে নির্দোষ দুর্বল মানুষকে বাঁচাচ্ছে। কাপুরুষ ছাড়া মানুষের বাহুকে অন্য কেউ অশ্রদ্ধা করে না।

শুধু চিন্তা করে মানুষ পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে সমর্থ হয়। মানব-সমাজে, মনুষ্যের সঙ্গে কাজে, রাস্তায়, কারখানায়, মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে মানুষ নিজেকে পূর্ণ করে। চিন্তা এবং পুস্তক মানবচিত্তের পাপড়ি খুলে দেয় মাত্র, বাকি কাজ সাধিত হয় সংসারের কর্মক্ষেত্রে।

কয়েক বৎসর আগে ব্রিটেন এবং রাশিয়া পারস্যকে দুই লক্ষ পাউন্ড ধার দেয়, একটা এঙ্গলোফ্রেন্স কোম্পানিও পারস্যকে ৬০ লক্ষ পাউণ্ড কর্জ দেন। প্রফেসার জ্যাকসন। বলেছিলেন, “বিদেশীর এই সমবেদনার সঙ্গে সঙ্গে পারস্যকে কুসুমের সুবাস এবং বুলবুলের সঙ্গীত ত্যাগ করে কাস্তে-কোদাল নিয়ে শস্য-ক্ষেত্রে নামতে হবে।” যে জাত শ্রমকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে না, সে জাত জগতে বড় আসন পায় না।

(চলবে…)

<<স্বভাব-গঠন ।। বিবেকের বাণী>>

………………..
মহৎ জীবন -লুৎফর রহমান।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………………….
আরও পড়ুন-
মানব-চিত্তের তৃপ্তি
আল্লাহ্
শয়তান
দৈনন্দিন জীবন
সংস্কার মানুষের অন্তরে
জীবনের মহত্ত্ব
স্বভাব-গঠন
জীবন সাধনা
বিবেকের বাণী
মিথ্যাচার
পরিবার
প্রেম
সেবা
এবাদত

………………….
আরও পড়ুন-
মহৎ জীবন : পর্ব এক
মহৎ জীবন : পর্ব দুই
মহৎ জীবন : পর্ব তিন
কাজ : পর্ব এক
কাজ : পর্ব দুই
কাজ : পর্ব তিন
কাজ : পর্ব চার
ভদ্রতা : এক
ভদ্রতা : দুই

……………………
আরও পড়ুন-
মহামানুষ … মহামানুষ কোথায়
মহিমান্বিত জীবন
মহামানুষ
যুদ্ধ
স্বাধীন গ্রাম্যজীবন
আত্মীয়-বান্ধব
সত্য প্রচার
নিষ্পাপ জীবন
উপাসনা
নমস্কার
তপস্যা
তীর্থ-মঙ্গল
আত্মার স্বাধীনতার মূল্যবোধ
মনুষ্য পূজা
মন্দতাকে ঘৃণা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!