জ্যোতির্ময় চৈতন্য

জ্যোতির্ময় চৈতন্য

মহাপ্রভুর অনবদ্যরূপ, অনুপম গুণ, সুচিশুদ্ধ চরিত্র ও অনির্বচনীয় মাধুর্যে সে যুগের প্রত্যেকটি মানুষ আকৃষ্ট হইয়াছিল। তাঁহার স্পর্শে ক্রূর শ্বাপদও হিংসা ভুলিয়াছিল। দুর্বৃত্ত, পাষণ্ড, দস্যু ও লম্পট বহু ব্যক্তি তাঁহার সংস্পর্শে ধর্মাত্মা হইল।

সমাজের সকল আত্মিক দৈন্য ও নীচতার বেদনা তিনি দূরীভূত করিলেন এবং বৈষম্যছিন্ন অগণিত নরনারীকে এক মহাসাম্যের ভূমিকায় উন্নীত করিতে প্রভূত যত্ন করিলেন। অশান্তির হাহাকারে ব্যাকুল জীবকুলকে ডাকিয়া ডাকিয়া থাকিয়া থাকিয়া শাশ্বত শান্তির সন্ধান দিলেন।

তিনি অবতীর্ণ হইয়াছিলেন নদীয়ায় কিন্তু তিনি সমগ্র বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষের এবং সমগ্র জগতের সর্ব মানবের। বিশ্ব পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একটি মহাপ্রাণ মহাপুরুষের আর সন্ধান নাই। যাঁহাকে সেই যুগে আপামর সকলে রাজা প্রজা ধনী দরিদ্র উচ্চবর্ণ নিম্নবর্ণ অন্ত্যজ পণ্ডিত মূর্খ পুরুষ নারী সকলেই আন্তরিক ভালোবাসিয়াছে এবং তাঁহাকে পরম হিতৈষী ভাবিয়া তাঁহার শিক্ষা মস্তকে ধারণ করিয়াছে।

মহাপ্রভু তৎকালে প্রচলিত হিন্দুর বর্ণাশ্রম বা মুসলমানের বা অন্য জাতির কোনও ধর্মের নিন্দা করেন নাই বা কাহাকেও ধর্মান্তরিত করার জন্য কখনও চেষ্টা করেন নাই। কিন্তু তিনি এমন এক বিশুদ্ধ ও উদার পরমধর্ম বা আত্মধর্মের বাণী প্রচার করিয়াছেন যাহার মধ্যে হিন্দুর বর্ণাশ্রমী, অন্ত্যজ, মুসলমান, খৃষ্টান, বৌদ্ধ, শিখ এবং অন্যান্য সকল ধর্মাবলম্বীর স্থান আছে এবং কাহারও প্রত্যাখ্যান নাই।

যে ধর্মের মধ্যে সকল আত্মার অধিকার আছে এবং যাহা বর্ণাশ্রমাদি সকল অনাত্মধর্ম বা নৈমিত্তিকধর্মের উপর বিরাজমান তাহাই নির্গুণ ও নিত্য আত্মধর্ম। তাহা জীবমাত্রেই নিত্যধর্ম।

মহাপ্রভু সেই বিমল প্রেমধর্মের প্রতি মানবজাতির সকল ধর্মাবলম্বীরই দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন এবং সহজ সরলভাবে এক অখণ্ড মানব মহাজাতি স্থায়ীভাবে গঠনের উদ্বোধন করিয়া গেলেন, যাহা ইতিপূর্বে পৃথিবীতে অন্যকোনও মহাপুরুষ করেন নাই।

তাঁহার শিক্ষার মধ্যে আছে নীতি ও দৈবীসম্পদের শিক্ষালাভসহ বিশুদ্ধ ঈশ্বরভক্তির উপদেশ। সংযম সহিষ্ণুতা বিনয় প্রভৃতি নীতিধর্মসহ ভক্তি ও সত্যধর্মের অপূর্ব সমন্বয়ের এইরূপ উদার বাণী, এই মহাদান, এইরূপ ঈশ্বরপ্রেম ভিত্তিক স্থায়ী ও আন্তরিক বিশ্বজীবের প্রতি প্রেমের বিতরণ, পৃথিবীর ধর্মেতিহাসে ইহাই সর্বপ্রথম।

মহাপ্রভু প্রবর্তিত এই প্রেমধর্মই বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম, যাহাতে নাই কোনও সঙ্কীর্ণতা, কোনও জাতীয় গণ্ডি, কোনও উচ্চ নীচ ভেদ। ইহাই পৃথিবীতে এক অখণ্ড মহাজাতি বা মানবসমাজ গঠনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভিত্তি। এক বিশ্ব নামের বিশ্বস্থিত সকল সন্তানই এক অখণ্ড পরিবারের জন এবং তাঁহার প্রতি অন্তরের প্রেম ভক্তি বিশ্বধর্ম।

এই ঈশ্বরপ্রেমই ঘনীভূত হইয়া প্রকৃত জীবপ্রেমরূপে প্রকাশিত হয়। কেবল সংবাদপত্রে লিখিলে বা বক্তৃতা দিলে বা জাতীয় স্বার্থে কাজ করিলে বিশ্বপ্রেম হয় না। সকল জাতি ও ধর্মের ঊর্ধ্বে ঈশ্বরপ্রেমের বাণী মহাপ্রভুর শ্রেষ্ঠ অবদান। ইহাই প্রকৃত ধর্মবিপ্লব।

এই ধর্মবিপ্লবের গৌরচন্দ্রিকা হইয়াছিল গৌরাঙ্গের অবতীর্ণ হইবার পূর্বে, যেদিন শান্তিপুরের পণ্ডিত শ্রেণী ভক্তকুলপতি শ্রীল অদ্বৈতাচার্য প্রভুভক্তির ভূমিকাকে সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান দিয়া তৎকালের সমাজের চিরাচরিত নিয়মকে উপেক্ষা করিয়া নামাচার্য হরিদাস ঠাকুরকে পিতৃশ্রাদ্ধের অন্নপাত্র ভোজন করাইলেন।

মহাপ্রভু অবতীর্ণ হইয়া অদ্বৈতাচার্য, নিত্যানন্দ প্রভু ও হরিদাস ঠাকুর প্রভৃতি সেনাপতিসহ প্রেমের যুদ্ধ করিয়া বিশ্বজয়ী হইলেন। শ্রীল নিত্যানন্দ প্রভু হরিনাম প্রচারে, মহোৎসবে ও প্রেমধর্মের আকর্ষণে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানবসমাজে নতুন সঞ্জীবনী শক্তি সঞ্চারিত হইল।

মনুষ্যসমাজ হতাশার গহ্বর হইতে উত্থিত হইয়া নতুন জীবন লাভ করিল। মানবজাতির অমূল্য জীবনের তাৎপর্য সকলে বুঝিতে পারিল। মহাভারত ও ভাগবত প্রভৃতি ধর্মশাস্ত্রে যে-কোনও জাতি ধর্মের ঈশ্বরভক্তের যেরূপ উৎকর্ষ ও ভক্তিহীন উচ্চবর্ণের যেরূপ নিন্দার কথা আছে তাহা মহাপ্রভুর পূর্বে সমাজে তেমন প্রচারিত হয় নাই।

মহাপ্রভু ও তাঁহার পার্ষদগণ দ্বারে দ্বারে গ্রামে গ্রামে ভক্তিধর্মের সর্বোৎকর্ষের বাণী প্রচার করিলেন। তাহাতে সকল জাতির ব্যক্তিগণ নিজেদের মানবজন্মের দুর্বলতা বুঝিয়া ভক্তিধর্মে প্রবেশ করিয়া ধন্য হইলেন। বলপ্রয়োগ, সমাজের উৎপীড়নে বা অর্থলোভে বা রাজনৈতিক কারণে বহু হিন্দু ধর্মান্তর গ্রহণ করিয়াছেন কিন্তু হিন্দুধর্মের মহিমার আকর্ষণ ভিন্ন অন্য কারণে অন্যধর্মী কেহই হিন্দুধর্মে প্রবেশ করেন নাই।

…………………………………
পণ্ডিতপ্রবর জ্যোতির্ময় নন্দের ‘জ্যোতির্ময় রচনাঞ্জলি’
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে: ভারতের সাধক-সাধিকা
পুণঃপ্রচারে বিনীত -প্রণয় সেন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!