ভাববাদ আধ্যাত্মবাদ

কাজ : পর্ব দুই

-লুৎফর রহমান

পতিত, অবজ্ঞাত, হীন, ছোট মানুষের কানের কাছে আজ আমাদিগকে শক্তির গান গাইতে হবে। মানুষ পাপ ও মূর্খতাকে ঘৃণা করতে শিখুক, সে জ্ঞান সাধনার দ্বারা আত্মচেষ্টায় মানুষের সম্মান পূজা লাভ করুক। জলে বৃষ্টিতে কি গা ভেজে না? পিচ্ছিল পথে কি মানুষ হাঁটে না?

পড়ে যেয়ে কি পথের মাঝে বসে থাকতে হবে? আল্লাহর সৃষ্টি-রহস্য বুঝতে পারি নি, দুঃখ-সুখ সবাই তার স্নেহের দান; কিন্তু দুঃখে পড়েছি বলে কি আমি দুঃখকে জয় করতে চেষ্টা করব না? পাপ অন্যায় করেছি, অজ্ঞান অন্ধকারে আত্মা অচেতন হয়ে আছে, সে অজ্ঞান- সে আঁধার কি ঘুচাতে হবে না?

ভদ্রলোক রাজা, জমিদার বড় মানুষের ছেলে জ্ঞানে অর্থে পুণ্যে ধর্মে বড় হবে, আর যারা ছোট, তারা চিরকালই ছোট হয়ে থাকবে, এ তোমরা কেউ বিশ্বাস করো না। যে তাঁতী, যে জেলে, যে কামার, যে রাজমিস্ত্রি সেও ভদ্রলোক হতে পারে।

চাই তার জ্ঞান, চরিত্র-শক্তি বিনয় ও সত্যপ্রিয়তা। বিনয়ের অর্থ অত্যাচারী অহঙ্কারী ব্যক্তির পদধূলি মাথায় নেওয়া নয়। অত্যাধিক বিনয় ও ভক্তি নম্রতার মানব জীবন অনেকখানি ব্যর্থ হয়ে যায়! অসন্তোষ ও বিদ্রোহ এ দু’টিও চাই।

তুমি দরিদ্র নও, তোমার ভিতরের শক্তিকে তুমি জাগিয়ে তোল। জীবনে যে কোনো অবস্থায় যে কোনো সময় তুমি নিজেকে বড় করে তুলতে পার। তোমাকে কোথায়ও যেতে হবে না, তোমার ছোটও হতে হবে না, এই বয়সেই তুমি জগতের পণ্ডিতমণ্ডলীর চিন্তার সঙ্গে যোগ স্থাপন কর, জীবন ব্যর্থ হবে না।

সামান্য কৃষক হয়ে জীবনকে অবনমিত করে ফেলেছ, এ মনে করো না। আলোক রহস্য, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র, শরীরতত্ত্ব, ইতিহাস, বিবিধ ধর্মশাস্ত্র আলোচনা করে কি তুমি তোমার জীবনকে ধন্য করতে পার না? স্কুল কলেজে না গেলেই কি জীবন মাটি হয়ে গেল?

জান না কোনো বাধাই জীবনের গতিকে রুদ্ধ করে রাখতে পারে না। চিন্তা ও সাধনা দ্বারা সকল বিঘ্নের মীমাংসা হয়ে যাবে। যে বিষয় ভালো লাগে, জীবন ভরে তারই আলোচনা করো, তোমার সমাজকে তুমি মৃত্যুর পূর্বে তোমার কাজে ঋণী করে রেখে যেতে পারবে। উপাধি না পাও কোনো ক্ষতি নাই!

তোমার গুণের আদর না হয়, তাতেও বিশেষ কিছু মনে করবার দরকার নাই। জ্ঞান আলোচনার যন্ত্রপাতি, বড় বড় অধ্যাপক ও অট্টালিকা দরকার নাই। অধ্যাপকের আড়ম্বর আর যন্ত্রপাতিতে মানুষ জ্ঞানের পথকে বরং অসরল, অসহজ করে তুলেছে। জ্ঞানের পথ সব সময়েই আনন্দ ভরা ও সহজ।

জীবনকে বড় করে তোলার ক্ষমতা, মানুষকে সুখ দেবার ও সাহায্য করবার ক্ষমতা তোমার মধ্যে আছে। মানুষের সকল সুখের মূল অর্থ। নিজের পরিবার ও দীন-দুঃখীর সেবা করাও অর্থ ছাড়া হয় না। যার বুদ্ধি আছে, যে পরিশ্রম করতে পারে, তার দুঃখ নাই। জীবনে সে নিজে সুখ সংগ্রহ করে নিতে পারবে, পরকেও সে সুখ দেবে।

অর্থলাভ শিক্ষকদের শাসন, গুরুজনের অসহিষ্ণুতা আর সাধারণ মানুষের ধিক্কার-ভয় জ্ঞানের আনন্দকে নষ্ট করে ফেলেছে। এক একটা বিষয় বুঝতে দার্শনিক পণ্ডিতদের কতদিন কতমাস কেটে গিয়েছে তা আমাকে একদিনেই ঠিক করে নিতে হবে! বিদ্রোহী অবুঝ মনকে পিটিয়ে বুঝতে ও জানতে হবে, এতে কি প্রকৃত জ্ঞান লাভ হয়? এই ভাবের জ্ঞান সাধনায় কি আনন্দ আছে?

যে বিষয়ে আলোচনা করতে মনে খুব আনন্দ জন্মে, তুমি, সেই বিষয়েরই আলোচনা কর; জীবনে তুমি কীর্তি অর্জন করতে পারবে। আলস্য করে, শুধু খেয়ে-পরে, শুধু পৃথিবীর কলহ-দ্বন্দ্ব নিয়ে তুমি তোমার জীবনকে নিরর্থক করে দিও না- এ আমার অনুরোধ।

যে কুঁড়ে এবং আলসে, তার স্বাস্থ্য ঠিক থাকে না, তার মন অবসন্ন হয়ে পড়ে।

শরীরের পরিশ্রম অপেক্ষা মাথার পরিশ্রমের মূল্য বেশি। হাত-পাগুলি মাথার আদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। বুদ্ধিহীন মাথার আদেশ পালন করতে যেয়ে হাত-পাগুলির পদে পদে দুঃখ আর বিড়ম্বনা ভোগ করতে হয়।

জগতের শ্রেষ্ঠ ও সভ্য জাতিগুলি মস্তিষ্কের সদ্ব্যবহার করেই বড় হয়েছে। সভ্য জাতির সামনে টিকে থাকতে হলে নিজেদের সম্মান ও জীবনের জন্যে বেশি করে মাথার সদ্ব্যবহার করতে হবে। চারদিকে যে এত বেদনা, এত দুঃখ দেখতে পাচ্ছ, এর একমাত্র কারণ জাতির বুদ্ধির দৈন্যতা।

ব্যাধি, অনাহার এইসব দরিদ্র জাতির মধ্যেই বেশি দেখা যায়। শত শত বছর আমরা আমাদের জীবনের মূল্য বুঝি না, কেন আমরা পথে পড়ে মরবো না? যে পরিশ্রম করে না তার দুঃখ তো হবেই। বিশ্বের পথে যে চারদিকে চেয়ে না চলে, তাকে তো রথের চাকার তলে পড়ে চূর্ণ হতেই হবে।

চুরি-বাটপাড়ি করে, দেশের মানুষকে কৌশলে ফেলে পয়সা অর্জন করা বিশেষ কঠিন নয়; কিন্তু এ ভাবে পয়সা উপায় করে বেঁচে থাকা যদি অন্যায় না হয়, তা হলে অভাবগ্রস্থ লোকদের বিরুদ্ধে কথা বলবার অধিকার তোমার নাই।

জীবনে অন্যায় পন্থা অবলম্বন করে সুখী ও ভদ্রলোক হতে যেয়ো না; তার চেয়ে মুটে মজুরের মতো হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে জীবনের পবিত্রতা রক্ষা করা বেশি মনুষ্যত্ব।

জীবনকে বড় করে তোলার ক্ষমতা, মানুষকে সুখ দেবার ও সাহায্য করবার ক্ষমতা তোমার মধ্যে আছে। মানুষের সকল সুখের মূল অর্থ। নিজের পরিবার ও দীন-দুঃখীর সেবা করাও অর্থ ছাড়া হয় না। যার বুদ্ধি আছে, যে পরিশ্রম করতে পারে, তার দুঃখ নাই। জীবনে সে নিজে সুখ সংগ্রহ করে নিতে পারবে, পরকেও সে সুখ দেবে।

যে অপদার্থ সেই দরিদ্র হয়। দরিদ্র হয়ে থাকা জীবনের পক্ষে এক অপমান। যে সমাজে সামাজিক মর্যাদা ঠিক রাখবার জন্য দরিদ্র হয়ে থাকতে হয়, সে সমাজ তুমি ত্যাগ কর। দেশের মায়ায় গ্রামের মায়ায় জীবনের দুঃখ বাড়িয়ে লাভ কী?

তোমার সত্য জীবনের সঙ্গে তুমি সন্ধি স্থাপন কর- তুমিই আদর্শ ভদ্রলোক, আমি তোমাকে সম্মান করবো। এ জগতে কে তোমাকে ছোট বলে ঘৃণা করে? করুক না- তুমি যেন নিজেকে ঘৃণা না কর। তোমার মনুষ্যত্ব, তোমার বিবেক যেন তোমাকে ঘৃণা করার অবসর না পায়।

যেখানকার মানুষ তোমার সাদা কাপড়, তোমার চটক দেখে তোমায় সম্মান করে; তোমার অভাব ও ঋণের জন্য তোমাকে ঘৃণা করে, সেস্থান ছেড়ে যেখানে পয়সা আছে সেখানে চলে যাও-নারী-পুরুষ ছেলে-মেয়ে কঠিন পরিশ্রম কর- দুঃখ থাকবে না। অলস পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে যারা প্রতিজ্ঞা করেছে, তারাই এ জগতে দুঃখী হয়ে থাকে।

মানুষের নিজের শক্তির উপর বিশ্বাস নাই, তাই সে এত ভীরু। ভিখারির মতো সে মানুষের দয়ার পানে চেয়ে থাকে। কে তোমাকে এ জগতে পাঠিয়েছে, মানুষ তোমার খোদা নয়। যে তোমাকে এ জগতে পাঠিয়েছে, সেই তোমার আহার ঠিক করে রেখেছে। তোমাকেও পরিশ্রম করতে হবে, খুঁজে নিতে হবে, ঘরের মধ্যে বসে কাঁদলে চলবে না।

খোদাতালা সব সময়ে তোমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন, তার কথা ভেবে তারই উপর নির্ভর করে তুমি সাগরে ঝাঁপ দাও। সাবধান, অন্যায়কে আশ্রয় করে কখনো খোদার নাম নিও না। অন্যায়ের সঙ্গে যার জীবন জড়িত হয়ে আছে, তার খোদাকে ডাকবার অধিকার নাই।

মানুষ যেদিন অন্যায়কে অবলম্বন করেছে, সেদিন সে মিথ্যাকে আশ্রয় করেছে, সেদিন সে আল্লাহর সঙ্গে শত্রুতা আরম্ভ করেছে। আল্লাহ্ দয়ালু এ কথা ভেবে তোমার পাপ করার কোনো অধিকার নাই। অবিবাহিত চরিত্রহীন ব্যক্তিকে বরং ক্ষমা করা যায়, কিন্তু বিবাহিত মিথ্যাবাদী, প্রতিজ্ঞা ভঙ্গকারী, নিষ্ঠুর স্বার্থপর মানুষকে আমরা কখনও ক্ষমা করতে প্রস্তুত নই।

যে অনাথিনী বিধবার সম্পত্তি অপহরণ করে, যে মানুষের সঙ্গে দাম্ভিক ব্যবহার করে, যে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করে না, যে নিন্দুক, যে দুর্বল নারী জাতির উপর অত্যাচার করে,- সে খোদার শত্রু।

মানুষ যে পথে গিয়েছে, সে পথেই যে তোমাকে চলতে হবে তা নয়। যে পথে চলে হাজার মানুষের দুঃখের মীমাংসা হয় নি, দেখাদেখি তুমিও কেন সে পথে চলো? তোমাকে নতুন পথ খুঁজে নিতে হবে- যে পথে কেউ যায় না, সেই পথেই তুমি চল।

তোমার সত্য জীবনের সঙ্গে তুমি সন্ধি স্থাপন কর- তুমিই আদর্শ ভদ্রলোক, আমি তোমাকে সম্মান করবো। এ জগতে কে তোমাকে ছোট বলে ঘৃণা করে? করুক না- তুমি যেন নিজেকে ঘৃণা না কর। তোমার মনুষ্যত্ব, তোমার বিবেক যেন তোমাকে ঘৃণা করার অবসর না পায়।

পরাধীন জাতির ভদ্রলোক কে তা ঠিক করে বলতে পারি নি। তোমাকে ছোট বলে কোনো অভাগা ঘৃণা করবে, তা আমি বুঝি না। ছোট বলে কেউ যদি তোমাকে হীন চোখে দেখে, দেখুক আপত্তি নাই- যেন মিথ্যাবাদী দুবৃত্ত না বলে।

জীবন সাধনার পথে অনেক দুঃখ-ব্যথা আসতে পারে। কিন্তু সে সব দুঃখ-ব্যথাকে উপহাস করে তুমি সময়ের ব্যবহার করো। কেঁদে, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে জীবন কাটালে কোনোই লাভ নাই, কেউ ফিরে তাকাবে না। পরীক্ষায় পাস করে চাকরির উমেদারিতে বছরের পর বছর পাগলের মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছ?

মিথ্যা সম্মানের জন্য কি পল্লীর দরিদ্র ঘরের সতী কুলবধূ চরিত্রহীনা বড়লোকদের বিলাসিনী পতিতা বন্ধুদের স্বর্ণালঙ্কার ও বহুমূল্য পোশাক-পরিচ্ছেদ পরতে চায়? এ জগতে গায়ের জোরে অনেকেই ভদ্রলোক হতে পারে, গায়ের জোরে তোমার ভদ্রলোক হয়ে দরকার নাই।

জীবনের কাজ করতে হলে বড় সহিষ্ণুতা চাই, খোদার উপর বিশ্বাস করে সহিষ্ণু হয়ে পরিশ্রম করো, দুঃখের মেঘ তোমার মাথার উপর হতে সরে যাবে। আমি এ কথা পুনঃ পুনঃ বলছি, যে পাপী, মিথ্যাবাদী ও ভণ্ড, সে যেন খোদার উপর নির্ভর করে খোদার মহিমা ও দয়ার অপমান না করে।

যে মিথ্যাবাদী মানুষকে ব্যথা দেয়, যে ভণ্ডমানব সমাজের দুঃখ বর্ধন করে কী বলে খোদা তাকে ভালবাসেন? কুকুরের মতো পরিত্যক্ত হাড় খেয়ে সে এ জগতে বেঁচে আছে।

দুদিন পরিশ্রম করেই তুমি রাজা হবে, এ মনে করো না। দুই একদিন বা দুই একমাস কঠিন পরিশ্রম করে ফল লাভ করার আশা করো না। বহুদিন ধরে অল্প অল্প পরিশ্রম করলে বরং ফল লাভ হয় কিন্তু অল্প কিছুদিন কঠিন পরিশ্রম করলেও কোনো লাভ হয় না।

কোরান (শ) বহুস্থানে সহিষ্ণুতার গুণ লেখা আছে। বড় বড় লোক যেমন পরিশ্রমী তেমনি সহিষ্ণু। মন অবুঝ হয়ে বলছে, কতদিনে এ কাজ হবে? কতকাল আর অপেক্ষা করবো? না, এমন কথা ভেবো না। বছরের পর বছর চলে গিয়েছে, আর সময় নাই, এরূপ মনে না করে। সম্মুখের দিনগুলিকেই যথেষ্ট মনে কর।

আজকার এই নূতন দিন, বার বছর পর কত পুরাতন হয়ে যাবে তা কি ভেবে দেখেছ?- আজকাল এই নবীন ঊষা কিছুকাল পরে অতীতের স্বপ্ন বলে মনে হবে। এই সময়েই তোমার যাত্রা শুরু হোক। নিজেকে বিশ্বাস করো, এই তুচ্ছ দিনগুলি তোমাকে কত সম্পদ দান করে তা তুমি পরে দেখে নিও।

জীবনের দিনগুলি কি অপব্যবহার করা যায়? এই সাধের মানব জন্ম কি আর পাওয়া যাবে? তুমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক দিন হতে মণি রহ কুড়িয়ে নিতে পার। অর্থ সঞ্চয় করা আর সময়ের সুব্যবহার করা একই কথা।

জীবন সাধনার পথে অনেক দুঃখ-ব্যথা আসতে পারে। কিন্তু সে সব দুঃখ-ব্যথাকে উপহাস করে তুমি সময়ের ব্যবহার করো। কেঁদে, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে জীবন কাটালে কোনোই লাভ নাই, কেউ ফিরে তাকাবে না। পরীক্ষায় পাস করে চাকরির উমেদারিতে বছরের পর বছর পাগলের মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছ?

এতে প্রতিপন্ন হচ্ছে, তুমি নিতান্তই নির্বোধ। চাকরির উমেদারিতে থাক, আর চাকরি-জীবন অবলম্বন করে- সময়কে অনর্থক উড়িয়ে দেবার অধিকার তোমার কৈ? নিজের জন্য না হোক, পরের জন্য তোমার উদ্যম ও শক্তি ব্যয় কর।

শরীর কোনো কাজ করে না, কাজ করে মন। পরিশ্রমের সঙ্গে কোনো আশা পোষণ করা মন্দ নয়- আশায় মানুষ পর্বত লঙঘন করে। মানুষ অনেক সময় বলে থাকে, সময় নাই- প্রকৃত কথা তাদের প্রাণ নাই। প্রাণের ইচ্ছা না থাকলে কোনো কাজ সুসিদ্ধ হয় না। যে কাজে প্রাণের যোগ আছে, তা অতি সহজে এবং অল্প সময়ে সম্পন্ন করা যায়।

জীবনের মূলধনটিকে যত খাটাবে, ততই তোমার নিজের কল্যাণের মুদ্রা লাভ হবে; সে মুদ্রা তুমি নিজেই ব্যবহার কর অথবা পরকে দাও। লোহার বাক্সে টাকা আটকিয়ে রেখে লাভ কী? সেগুলি নিজে খাটাও, না হয় পরকে খাটাতে দাও। পরীক্ষায় পাস করেছ বলেই কি তোমার জীবনের সকল কাজ শেষ হয়েছে?

শারীরিক পরিশ্রম করবার ক্ষমতা যদি তোমার বাহুতে না থাকে, জ্ঞানার্জন দ্বারা জীবনের দিনগুলি সার্থক কর। নিরক্ষর দেশবাসীকে তোমার চিন্তায় দীক্ষিত কর, এর চেয়ে বড় কাজ কী আর জীবনে আছে? বুদ্ধির দ্বারা মানুষের মঙ্গল করা মহাজনের কাজ। অর্থ অপেক্ষা জ্ঞানের দানই সমধিক মূল্যবান।

জীবনে কোনো পথ হচ্ছে না- পথ একটা তৈরি করে নাও ফিলিপ সিডনী বলেছেন- জীবনের সকল পথ যদি রুদ্ধ হয়, তবু আমি একটা তৈরি করে নিতে পারি- পুরুষের জন্য মুক্তির পথ আছেই। অবিশ্বাসী, পরমুখাপেক্ষী, বিশ্বাসহীন মানুষের জন্য মুক্তির পথ নাই।

বিশ্বাস কর, তুমি ছোট হয়ে থাকবে না, না খেয়ে মরবে না- আল্লাহর নামে সহিষ্ণু হয়ে পরিশ্রম কর, তোমার সম্মুখে মুক্তির পথ খুলে যাবে। সন্দেহ ও। আত্মবিশ্বাসের অভাবে মানুষ মৃত্যু লাভ করে। বিশ্বাসের বলে বাবর শাহ রাজ্য লাভ করেছিলেন, ভিখারী শিবাজী রাজা হয়েছিলেন।

মানুষ ইচ্ছা করে ছোট ও দরিদ্র হয়। তার ছোট ও দরিদ্র হবার কোনো কথাই নাই। তার শুধু সহিষ্ণু পরিশ্রম চাই। জয়ের জন্য শুধু আল্লাহর দিকে চেয়ে থেকো না। তোমার বাহুতে শক্তি আছে, তোমার মাথায় যে বুদ্ধি আছে, তার ব্যবহার তুমি কর।

নিজের শক্তিকে অবিশ্বাস করে মানুষের কাছে যে দয়া ভিক্ষা করে, সে অপদার্থ। মানুষের কাছে কেন ভিক্ষা করবে? আল্লাহ তোমার দুখানি শক্তিশালী হাত, দুখানি পা, আর মুখে ভাষা দিয়েছেন,- এই তো যথেষ্ট।

যে কাজে প্রাণ ঢেলে দেওয়া যায় না, তাতে বিশেষ লাভ হয় না। কাজ করতে যদি মনে আনন্দ অনুভব না হয়, তাতেও বিশেষ ফল হয় না। তুর্কী জাতির সম্মুখে ইউরোপের সমস্ত শক্তি বিধ্বস্ত হতো কেমন করে? তুর্কীরা প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করতো!

দেশের মমতায় যারা যুদ্ধ করে, আর যারা টাকার জন্য যুদ্ধ করে- এদের মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি! পারস্যের সৈন্যকে কী করে মুষ্টিমেয় রোম সৈন্য হারিয়ে দিয়েছিল? রোম প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করেছিল, তাই সে জয়লাভ করেছিল। প্রাণ-মন ঢেলে না দিয়ে অনিচ্ছায় সারারাত্রি পড়, কোনো লাভ হবে না।

শরীর কোনো কাজ করে না, কাজ করে মন। পরিশ্রমের সঙ্গে কোনো আশা পোষণ করা মন্দ নয়- আশায় মানুষ পর্বত লঙঘন করে। মানুষ অনেক সময় বলে থাকে, সময় নাই- প্রকৃত কথা তাদের প্রাণ নাই। প্রাণের ইচ্ছা না থাকলে কোনো কাজ সুসিদ্ধ হয় না। যে কাজে প্রাণের যোগ আছে, তা অতি সহজে এবং অল্প সময়ে সম্পন্ন করা যায়।

(চলবে…)

<<কাজ : পর্ব এক ।। কাজ : পর্ব তিন>>

………………..
মহৎ জীবন -লুৎফর রহমান।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

………………….
আরও পড়ুন-
মহৎ জীবন : পর্ব এক
মহৎ জীবন : পর্ব দুই
মহৎ জীবন : পর্ব তিন
কাজ : পর্ব এক
কাজ : পর্ব দুই
কাজ : পর্ব তিন
কাজ : পর্ব চার
ভদ্রতা : এক
ভদ্রতা : দুই

……………………
আরও পড়ুন-
মহামানুষ … মহামানুষ কোথায়
মহিমান্বিত জীবন
মহামানুষ
যুদ্ধ
স্বাধীন গ্রাম্যজীবন
আত্মীয়-বান্ধব
সত্য প্রচার
নিষ্পাপ জীবন
উপাসনা
নমস্কার
তপস্যা
তীর্থ-মঙ্গল
আত্মার স্বাধীনতার মূল্যবোধ
মনুষ্য পূজা
মন্দতাকে ঘৃণা

……………………….
আরও পড়ুন-
মানব-চিত্তের তৃপ্তি
আল্লাহ্
শয়তান
দৈনন্দিন জীবন
সংস্কার মানুষের অন্তরে
জীবনের মহত্ত্ব
স্বভাব-গঠন
জীবন সাধনা
বিবেকের বাণী
মিথ্যাচার
পরিবার
প্রেম
সেবা
এবাদত

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!