কারবালার আগে

কারবালার আগে

ইমাম হোসাইন (আ) ওয়ালিদের দরবার থেকে আপনজনদের কাছে ফিরে আসলেন এবং সবাইকে একত্রিত করে বললেন, আমার প্রিয়জনরা! যদি আমি মদীনা শহরে অবস্থান করি, আমাকে ইয়াজিদের হাতে বায়াত করার জন্য বাধ্য করবে। কিন্তু আমি কখনও বায়াত হতে পারব না।

বাধ্য করলে নিশ্চয় যুদ্ধ হবে, ফ্যাসাদ হবে, কিন্তু আমি চাই না আমার কারণে মদীনায় লড়াই বা ফ্যাসাদ হোক। আমার মতে, এটাই সমীচীন হবে যে, এখান থেকে হিজরত করে মক্কায় চলে যাওয়া।

আপন জনেরা সকলেই বলল, আপনি আমাদের নেতা যা হুকুম করবেন তা মেনে নেব।

অতপর ইমাম হুসাইন মদীনা থেকে মক্কায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

আহ! অবস্থা কেমন সঙ্গীন হয়ে গিয়েছিল যে, ইমাম হুসাইন সেই মদীনা ত্যাগ করতে হচ্ছিল যে, মদীনায় তাঁর নানা জান দো- জাহানের বাদশা জগতের সকলের পারের কাণ্ডারী যার শাফায়াত ভিন্ন কেউ পার হতে পারবে না সেই মহানবীর পবিত্র রওজা মোবারক।

কিন্তু আফসোস আজ সেই মদীনা তিনি ত্যাগ করছেন, যে মদীনা তারই ছিল। তিনি মহানবীর দু-নয়নের তারা ছিলেন। যেখানে নবীজীর স্নেহ মমতা পেয়ে বড় হয়েছেন যেখানে জগৎ জননী নবী নন্দীনী মা-ফাতেমা শুয়ে আছেন আর শুয়ে আছেন বড় ভাই বেহেস্তের যুবকদের আরেক নেতা ইমাম হাসান।

আজ নিয়তির খেলার কারণে তাকে সেই পবিত্র মদীনা ত্যাগ করে মক্কায় চলে যেতে হচ্ছে। অতপর ক্রন্দন অবস্থায় তিনি নানাজানের পবিত্র রওজা পাকে উপস্থিত হয়ে বিদায়ী সালাম পেশ করলেন এবং অশ্রু-সজল নয়নে নানাজানের অনুমতি নিয়ে আত্মীয়-স্বজন সহ মদীনা থেকে মক্কায় চলে গেলেন।

মক্কায় ইমাম হুসাইনের আগমনের সাথে কুফা থেকে লাগাতার চিঠিপত্র এবং সংবাদ-বাহক আসতে শুরু করল। অল্প সময়ের মধ্যে ইমাম হুসাইনের কাছে দেড়শ চিঠি এসে পৌঁছাল। অপর এক বর্ণনায় বারশ চিঠি এসেছিল। তবে অধিকাংশ গ্রন্থে দেড়শ চিঠির কথা উল্লেখ আছে, আর এই দেড়শ চিঠিই বিশেষ নির্ভর যোগ্য।

প্রত্যেক চিঠির সারসংক্ষেপ হচ্ছে, হে ইমাম হুসাইন! আমরা আপনার পিতা হজরত আলীরই অনুসারী এবং আহলে বাইতের ভক্ত। আমরা মুয়াবিয়াকে সমর্থন করিনি, আর তাঁর অনুপযুক্ত ছেলে ইয়াজিদকে মানার প্রশ্নই উঠতে পারে না।

আমরা আপনার পিতা আমীরুল মুমেনীন হজরত আলী (আ) ও আপনার ভাই হজরত ইমাম হাসান (আ) এর সমর্থনকারী। আমরা ইয়াজিদের অনুসারী নই। ইয়াজিদ এখন তখতারোহন করছে, কিন্তু আমরা ইয়াজিদকে খলিফা বা ইমাম মানতে পারি না। আপনাকেই বরহক ইমাম, বরহক খলিফা মনে করি।

আপনি মেহেরবাণী করে কুফায় তশরীফ নিয়ে আসুন। আমরা আপনার হাতে বায়াত করবো এবং আপনাকে খলিফা হিসাবে গ্রহণ করবো। আপনার জন্য আমাদের জান-মাল কোরবান করতে প্রস্তুত এবং আপনার হাতে বায়াত করে আপনার অনুস্মরণে জীবন অতিবাহিত করতে ইচ্ছুক।

তাই আপনি আমাদের কাছে চলে আনুন, আমাদের প্রতি মেহেরবাণী করুন, এবং আমাদেরকে আপনার সহচর্যে রেখে আপনার ফয়েজ-বরকত দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত করুন।

সমস্ত কাবিলা-খান্দানের পক্ষ থেকে ইমাম হুসাইনের কাছে এ ধরনের চিঠি এসেছিল।

অনেকেই এই ধরনের চিঠি লিখেছিলেন- হে মহান ইমাম! আপনি যদি আমাদের কাছে না আসেন, আমাদেরকে বাধ্য হয়ে ইয়াজিদের হাতে বায়াত করতে হবে। কারণ ইয়াজিদের মোকাবেলা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

কাল কেয়ামতের মাঠে আল্লাহ যখন জিজ্ঞাস করবেন কেন আমরা নালায়েক ইয়াজিদের হাতে বায়াত গ্রহণ করলাম, তখন আমরা পরিষ্কার বলব, হে মওলা! আমরা আপনার মহানবীর দৌহিত্রের কাছে চিঠি লিখেছিলাম, সংবাদ পাঠিয়ে ছিলাম, জান-মাল কোরবাণী করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি যেহেতু আসেন নি এবং আমরা ইয়াজিদের বিরোধীতা করতে পারি নি, সেহেতু আমরা বাধ্য হয়ে ইয়াজিদের হাতে বায়াত করেছি।

তাই হে ইমাম! আপনি স্মরণ রাখবেন, আমাদের এ বায়াতের জন্য আপনিই দায়ী হবেন।

……………………………………
সূত্র
কারবালা প্রান্তরে : হজরত মাওলানা মুহাম্মদ শফী ওকাড়বী।

…………………………
আরো পড়ুন:
১০ মহররম বিশ্ব শহীদ দিবস: পর্ব-১
১০ মহররম বিশ্ব শহীদ দিবস: পর্ব-২

কারবালার আগে
কারবালায় মাওলা ইমাম হুসাইনের শেষ প্রশ্ন
কারবালায় ইমাম কাসেম (আ) মর্মান্তিক ইতিহাস
কারবালায় আব্বাস আলমদারের মাজারে অলৌকিক পানি

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!