লাঙ্গলবন্দের মহাষ্টমী স্নান

লাঙ্গলবন্দের মহাষ্টমী স্নান

-মূর্শেদূল মেরাজ

আমাদের এই দেহ যন্ত্রকে সতেজ-সবল-সুস্থ্য রাখতে প্রতিদিন কত কিছুই না করতে হয়। সময় মতো আহার দেয়া। সেই খাবার আবার কখন কি হবে। কোন ঋতুতে কি হবে। কার জন্য কি হবে। কত শত আচার-আচরণ বিধি-বিধান। আবার সেই খাবার যথাযথ ভাবে হজম হলো কিনা। সে দিকে রাখতে হয় নজর।

খাবার দেহে যথাযথভাবে ব্যবহৃত হওয়ার পর অতিরিক্তগুলো যর্থাথভাবে ত্যাগ হচ্ছে কিনা সেদিকেও সজাগ থাকতে হয়। দেহকে সুস্থ্য রাখতে যেমন দিতে হয় পর্যাপ্ত বিশ্রাম। তেমনি করতে হয় পরিশ্রম। প্রতিদিন প্রয়োজন হয় পর্যাপ্ত ঘুম। আবার কেবল ঘুমিয়ে থাকলেই চলবে না। জেগে থাকাও প্রয়োজন।

দেহের অভ্যন্তরে সতেজ-শীতল রাখবার জন্য যেমন প্রতিদিন নিয়ম করে করতে হয় জল পান। তেমনি দেহের বহিরাঙ্গকে সতেজ রাখতে তাকে দিতে হয় জল। সেই জল বহিরাঙ্গ হয়ে অন্তরাঙ্গকেও স্পর্শ করে। কেবল হাত-মুখ ধোয়া নয়। রীতিমতো সর্বদেহ ধুয়ে নিতে হয়। যার পরিচিত শব্দ ‘গোসল’ বা ‘স্নান’।

শাস্ত্রে বলা হয়েছে, ‘মলিনীকরণাৎ ইতি মলঃ’ অর্থাৎ যা দেহকে মলিন করে রাখে, তাই মল। এখানে ‘ঘাম, মল ও মূত্র’ এই তিন রকমের মলের কথা বলা হয়েছে। দেহ থেকে এই মলসমূহ নির্গত করতে স্নানের ভূমিকা অপরিহার্য।

চরক সংহিতায় বলা হয়েছে-

‘পবিত্রং বৃষ্যম্‌ আয়ুষ্যং শ্রমস্বেদমলাপহম্‌
শরীর বলসন্ধানং স্না্নম্‌ ওজষ্করং পরম্‌।’

অর্থাৎ- স্নান অত্যন্ত পবিত্র ও আয়ুবর্ধক। স্নান ক্লান্তি দূর করে দেহের বল বাড়ায়। রোগ প্রতিরোধ করে। যথাযথ নিয়মে স্নান করলে ইন্দ্রিয় সতেজ হয়ে ওঠে। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।

এই স্নান নিয়েই আজকের আলোচনা। কারণ এই স্নান কেবল প্রতিদিনের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বা দেহ-মন চাঙ্গা রাখাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই স্নানেরও আছে নানা বিধ নিয়মনীতি। কোন জল-হাওয়ায় কার কখন স্নান করা উচিত বা না করা উচিত। কোন জলে স্নান করা উচিত। কিভাবে স্নান করা উচিত। তারও আছেন নির্দিষ্ট বিধিমালা।

এসবতো গেলো একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে। আবার এই রীতিনীতি পাল্টে যেতে পারে শিশু বা অসুস্থ্য মানুষের ক্ষেত্রে। পরিবর্তন ঘটতে পারে ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন জল-হাওয়ায়। এরূপ নানারূপ নিয়ম আছে। যা জেনে রাখলে অনেক রোগবালাই থেকে মুক্তির পথ পাওয়া যায়।

ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে স্নানের নানাবিধ উপকারিতার বিষদ বিবরণ পাওয়া যায়। স্নান না করলে দেহে যেমন নানারূপ রোগ প্রবেশের সুযোগ পায়। তেমনি নিয়মিত ও নির্দিষ্ট বিধিমালা মেনে স্নান করলে অনেক রোগ থেকে নিষ্কৃতিও পাওয়া যায়।

আবার ভুলভাল নিয়মে স্নান করলে ঘটতে পারে বিপত্তি। যেমন প্রচণ্ড গরম পরিবেশ থেকে বা দেহের তাপমাত্রা বেশি থাকলে। কিংবা উচ্চরক্তচাপের সময় হুট করে মাথায় জল ঢাললে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের মতো ঘটনা ঘটে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

তাই প্রাচীন শাস্ত্রে বলা হয়েছে, যে জল দিয়ে স্নান করা হবে। সেই জলকে প্রথমে স্পর্শ করতে হবে। তার তাপমাত্র নিতে হবে। তারপর তা ক্রমশ ধীরে ধীরে পা থেকে পর্যায়ক্রমে উপরের দিকে উঠতে হবে। যেমন আগে জলে পা ডুবিয়ে তার পর জলে নামা।

দেহ আর জলের তাপমাত্রা কাছাকাছি হলে তারপর জল দিয়ে হয় ব্রহ্মতালুতে। তাতে বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। আবার ভরপেটে স্নান করতে আছে মানা। স্নান করার আগে আনুমানিক আধঘণ্টা আগে আধ গেলাস জল খেয়ে নিলে তাপমাত্রার সমতা তৈরি হয়।

এসবতো গেলো একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে। আবার এই রীতিনীতি পাল্টে যেতে পারে শিশু বা অসুস্থ্য মানুষের ক্ষেত্রে। পরিবর্তন ঘটতে পারে ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন জল-হাওয়ায়। এরূপ নানারূপ নিয়ম আছে। যা জেনে রাখলে অনেক রোগবালাই থেকে মুক্তির পথ পাওয়া যায়।

আবার এই স্নানের আছে নানান প্রকারভেদ। মোটাদাগে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে প্রতিদিনের স্নানকে সময়ভেদে তিন ভাগে উপস্থাপন করতে দেখা যায়। এগুলো হলো- ব্রহ্ম স্নান, দেব স্নান ও ঋষি স্নান।

ব্রহ্ম স্নান-

ভোর ৪-৫টা পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘ব্রহ্ম মূহূর্ত’। বলা হয়ে থাকে, এই সময় সমস্ত পবিত্র আত্মারা জলে বাস করে। তাই এই সময়কালে নিজ নিজ বিশ্বাসকে স্মরণে নিয়ে স্নান করলে তাকে ‘ব্রহ্ম স্নান’ বলে। বিশ্বাসীরা বলেন, এই সময় স্নানে সমস্ত তীর্থ যাত্রার পুন্য লাভ হয় এবং পাপ ধুয়ে যায়। জীবনের সংকট দূর হয়।

দেব স্নান-

সূর্যোদয়ের ঠিক পরপরই পবিত্র জলাশয়ে বা নদীতে নিজ নিজ বিশ্বাসের নাম স্মরণ করতে করতে যে স্নান করা হয় তাকেই ‘দেব স্নান’ বলা হয়। বিশ্বাসীরা বলেন, এই সময় স্নান করলে আসন্ন সমস্যা দূর হয়।

ঋষি স্নান-

সূর্য উঠে গেছে অথচ ভোরের আকাশে তারারা মিলিয়ে যায়নি এমন মুর্হূতে তারা দেখতে দেখতে স্নান করাকে বলা হয় ‘ঋষি স্নান’। বিশ্বাসীরা বলেন, এই সময় স্নান করলে সমস্ত কাজে বাধা দূর হয়।

এছাড়াও দিনের বিভিন্ন সময় স্নানের নানাবিধ নামধাম রয়েছে। তবে বিশ্বাসীদের মতে, তাতে আধ্যাত্মিক গুরুত্ব তেমন নেই। তবে দেহ-মন সুস্থ্য-স্বাভাবিক ও সতেজ রাখতে স্নানের তুলনা হয় না। চিকিৎসা শাস্ত্র বলে, স্নান হলো এক ধরনের থেরাপি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এই বিধি জল চিকিৎসা নামে পরিচিত।

প্রচলিত নিয়মে স্নান দুই ধরনের-

১. অবগাহন স্নান: নদ-নদী, পুকুর বা জলাশয়ে গা ডুবিয়ে স্নান করাকে বলা হয় অবগাহন স্নান।
২. ধারা স্নান: বালতি বা ঝর্ণা থেকে স্নান করাকে বলা হয় ধারা স্নান।

এসকল স্নান ছাড়াও আছে বিশেষ স্নান। যা তিথি, লগ্ন, ক্ষণ হিসেব করে নির্দিষ্ট জলে নির্দিষ্ট নিয়মে নির্দিষ্ট স্থানে করতে হয়। নানা বিশ্বাসে, নানা শাস্ত্রে এরূপ নানান সব স্নানের কথা উল্লেখ আছে। আমাদের দেশেও বহু তীর্থ আছে যাতে বিশ্বাসীরা দিন-ক্ষণ মেনে যথাযথ নিয়মে স্নানে অংশ নেয়।

এসকল স্নানের মধ্যে অন্যতম হলো- অষ্টমীর স্নান, বারুণীর স্নান, কুম্ভের স্নান, মকরসংক্রান্তির স্নান প্রভৃতি। এ ছাড়াও আরো অনেক স্নানের প্রচলন আছে। আবার একই স্নান ভিন্ন ভিন্ন জলে, ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসে, ভিন্ন ভিন্ন রীতিনিতিতে পালিত হয়।

আজ তেমনি এক উল্লেখযোগ্য স্নানের কথা। তার সাথে সম্পর্কিত মহিমান্বিত এক তীর্থের কথা বলতে চলেছি। যা কেবল বাংলাদেশ নয়। ভারতবর্ষের অন্যতম তীর্থ। যেটি প্রচলিত ‘লাঙ্গলবন্দের মহাষ্টমীর স্নান’ নামে।

লাঙ্গলবন্দের মহাষ্টমী স্নানের পৌরাণিক  গাঁথা

লাঙ্গলবন্দের মহাষ্টমী স্নান সম্পর্কে পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে। কালিকা পুরাণ ৮৪/৮৫ অধ্যায়ে উল্লেখ আছে- শান্তনু মুণির পত্নী অমোঘা দেবী ব্রহ্মার তেজ গর্ভে ধারণ করে গর্ভবতী হন। তখন শান্তনু মুণি উত্তরে কৈলাস, পূর্বে সম্বর্তক, দক্ষিণে গন্ধমাদন ও পশ্চিমে জারুধি এই চার পর্বতের মাঝখানে একটি কুণ্ড খনন করেন।

যথা সময়ে অমোঘা দেবী জলপিণ্ড রূপী এক পুত্র সন্তান প্রসব করেন। শান্তনু মুণি পুত্রকে সেই চার পর্বতের মাঝে কুণ্ডে রেখে আসেন। সেখানে এই জলপিণ্ড হ্রদে পরিণত হয়। যার নাম হয় ‘ব্রহ্মকুণ্ড’। স্বয়ং ব্রহ্মা এসে ঐ পুত্রকে দেখে তার নাম রাখেন ‘লোহিত্য’।

পরবর্তী ত্রেতা যুগের প্রথম দিকে মগধ রাজ্যে ভাগীরথী নদীর কৌশিকী তীরে ভোজকোট নামক নগরীর অধিপতি হন চন্দ্রবংশীয় রাজর্ষি গাধি। রাজর্ষি গাধির বিশ্বামিত্র নামে পরিচিত এক পুত্র ও সত্যবতী নামে সুন্দরী এক কন্যা ছিল। সত্যবতীর বিয়ে হয় ভৃগুমুণি নামে পরিচিত ভৃগুবংশীয় ব্রাহ্মণ কুমার রিচিকের সাথে।

সত্যবতী আর রিচিকের ঘর আলো করে জন্ম নেয় জমদগ্নি নামের মহামুণি। জমদগ্নি বয়ঃপ্রাপ্ত হলে প্রসেনজিং রাজার কন্যা পরমাসুন্দরী রেনুকা সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। রেনুকার গর্ভে জমদগ্নির পাঁচটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। এই পাঁচ পুত্রের নাম যথাক্রমে- রুষন্নন্ত, সুষেণ, বসু, বিশ্বাসুর এবং সর্বকনিষ্ঠের পরশুরাম।

এই পরশুরাম ছিলেন বিষ্ণুর দশম অবতারের মধ্যে ষষ্ঠ অবতার। জন্মলগ্নে এই পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল রাম। ইনি কুঠার দ্বারা একুশবার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় করেন। কুঠার ধারণের জন্য তার নাম কুঠারধারী রাম নামে খ্যাত হয়। ভৃগুবংশের সন্তান এজন্য তাকে ভার্গব; জমদগ্নির পুত্র বলে তাকে জামদগ্ন্য নামেও সম্বোধন করা হয়।

নিজ মাতাকে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানান অগ্নিশর্মা জমদগ্নি মুণির প্রথম চার পুত্র। কিন্তু কনিষ্ঠপুত্র পরশুরাম পিতার আদেশে নিজ মাতা এবং আদেশ পালন না করায় নিজের চার ভাইদের কুঠার দিয়ে তৎক্ষণাৎ হত্যা করেন।

একদিন জমদগ্নির পাঁচপুত্র ফল সংগ্রহ করতে বনে গেলে; মা রেণুকা দেবী নদী তীরে যান জল আনতে। সেখানে পদ্মমালী (মতান্তরে চিত্ররথ) নামক গন্ধবরাজ স্ত্রীসহ জলবিহার করছিলেন (মতান্তরে অপ্সরীদের সাথে)।

পদ্মমালীর রূপ ও জলবিহারের নয়নাভিরাম দৃশ্য রেণুকা দেবীকে এমনভাবে মোহিত করে যে, তিনি তন্ময় হয়ে তা দেখতে থাকেন। দেখতে দেখতে আশ্রমবাসিনী রেণুকা কামস্পৃহ হয়ে পড়েন এবং নিজের পূর্ব-রাজকীয় জীবন সম্পর্কে স্মৃতিবিষ্ট হন।

জমদগ্নি মুণির হোমবেলা যে পেরিয়ে যাচ্ছে সেই খেয়ালও তার রইলো না। সম্বিত ফিরে পেয়ে রেণুকা দেবী ভরা কলস নিয়ে দ্রুত আশ্রমে ফিরে ঋষি জমদগ্নির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ান। জমদগ্নি মুণি তার বিলম্ব হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি নির্বাক রইলেন।

তখন জমদগ্নি মুণি যোগবলে রেণুকা দেবীর পূর্বাপর সকল ঘটনা অবগত হন। জমদগ্নি স্ত্রীর এইরূপ মানসিক বিকৃতিতে ক্রোধাম্বিত হয়ে পড়েন। ক্রোধান্বিত জমদগ্নি নিজ পুত্রদেরকে তাদের মাকে হত্যা করার নির্দেশ করেন।

নিজ মাতাকে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানান অগ্নিশর্মা জমদগ্নি মুণির প্রথম চার পুত্র। কিন্তু কনিষ্ঠপুত্র পরশুরাম পিতার আদেশে নিজ মাতা এবং আদেশ পালন না করায় নিজের চার ভাইদের কুঠার দিয়ে তৎক্ষণাৎ হত্যা করেন।

আদেশ পালন করায় জমদগ্নি মুণি খুশি হয়ে পুত্র পরশুরামের কাছে জানতে চান- সে কি বর চায়। ততক্ষণে অনুশোচনায় দগ্ধ পরশুরাম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে পিতাকে বললেন-

১. আমাদের মা যে আবার জীবিত হয়ে আমাদের সাথে বসবাস করেন।
২. হত্যার ঘটনা যেনো মায়ের স্মরণে না থাকে।
৩. বড় ভাইরাও যেন মনুষ্য জীবন ফিরে পান।
৪. এই হত্যাকাণ্ডে তাঁর যেন পাপস্পর্শ না হয়।

পুত্রের কথা জমদগ্নি মুণি রাজি হন। সবকিছু পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। কিন্তু পরশুরাম লক্ষ্য করে তার হাতের কুঠার হাতেই লেগে আছে। কিছুতেই সেই কুঠার হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না। পিতার কাছে এর কারণ জানতে চাইলে জমদগ্নি মুণি বললেন ‘তুমি মাতৃহত্যা’র গুরুপাপে আক্রান্ত হয়েছো। জেনে রেখো, পাপ ছোট-বড় যাই হোক না কেন কৃতকর্মীকে তা স্পর্শ করবেই।’

যেই কথা সেই কাজ। তিনি হাত থেকে খসে পড়া কুঠার দিয়ে পাহাড়ের একপাশ ভেঙে দিলেন। এতে হ্রদের জল হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে শুরু করে। এরপর খসে যাওয়া কুঠারকে লাঙ্গলে রূপান্তর করে পাথর কেটে মাটি কর্ষণ করে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে মর্ত্যলোকের সমভূমিতে সেই জলধারাকে প্রবাহিত হওয়ার পথ গড়ে দিতে থাকেন।

তারপর জমদগ্নি মুণি ব্যাকুল পুত্রকে আশ্বস্ত করে তীর্থ পরিভ্রমণের উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘যে তীর্থ গমনে বা স্নানে তোমার হাতের কুঠার স্খলিত হবে, জানবে যে ঐ পুণ্যস্থানই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্র।’

পাপমোচনের উদ্দেশ্যে পিতার কথামত পরশুরাম জগৎজুড়ে তীর্থে তীর্থে ঘুরতে লাগলেন। তীর্থে ঘুরতে ঘুরতে একপর্যায়ে তিনি হিমালয়ের উত্তর-পূর্ব কোণে, মানস সরোবরের সন্নিকটে সেই ‘ব্রহ্মকুণ্ড’ হ্রদের সামনে উপস্থিত হন। সেখানে স্নান করার সাথে সাথে তার হাতের কুঠার স্খলিত হয় এবং সর্বপাপ থেকে মুক্তি লাভ করেন। ধারণা করা হয়, সেই তিথিটি ছিল চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথি বুধবার পুণর্বসু নক্ষত্র।

আবার এমনটাও বলা হয়, তীর্থ পরিভ্রমণের এক পর্যায়ে পরশুরাম দৈবক্রমে জানতে পারেন, দেবতা ব্রহ্মপুত্র হিমালয়ের বুকে হ্রদরূপে লুকিয়ে আছেন। জানতে পারেন ব্রহ্মপুত্রের মাহাত্ম্য কথা। এরপর থেকেই শুরু হয় তার তিনি হিমালয়ে লুকায়িত ব্রহ্মপুত্র হ্রদকে খুঁজে বের করার যাত্রা। সেখানে পৌঁছে তিনি তিনি ব্রহ্মপুত্রের কাছে প্রার্থনা জানান যেন এই পবিত্র জলে তার পাপ মুক্ত ঘটে।

তারপর হ্রদের জলে ঝাঁপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতে আটকে থাকা কুঠারখানা খসে যায়। সাথে সাথে তিনি মুক্ত হন মাতৃহত্যার প্রায়শ্চিত্ত থেকে। এ ঘটনার পর তিনি মনে মনে স্থির করেন, এমন সুমহান স্বর্গীয় অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন পাপহরণকারী পুণ্যজলকে সকলের সহজলভ্য করতে এর জলধারাকে সমতল ভূমিতে প্রবাহিত করবেন।

যেই কথা সেই কাজ। তিনি হাত থেকে খসে পড়া কুঠার দিয়ে পাহাড়ের একপাশ ভেঙে দিলেন। এতে হ্রদের জল হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে শুরু করে। এরপর খসে যাওয়া কুঠারকে লাঙ্গলে রূপান্তর করে পাথর কেটে মাটি কর্ষণ করে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে মর্ত্যলোকের সমভূমিতে সেই জলধারাকে প্রবাহিত হওয়ার পথ গড়ে দিতে থাকেন।

ঐদিকে পরশুরাম পবিত্র ব্রহ্মপুত্র নদের অলৌকিক শক্তি ও মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন তীর্থস্থান ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তীর্থভ্রমণ শেষে ফিরে এসে দেখেন, যে ব্রহ্মপুত্রকে তিনি মানুষের উপকারার্থে সমতল ভূমিতে নিয়ে এসেছিলেন, যাকে তিনি জগতের শ্রেষ্ঠ ও পবিত্রতম নদরূপে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, সে শীতলক্ষ্যার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পরশুরাম ক্রোধান্বিত দুই নদ-নদীকেই অভিশাপ দেন।

লাঙ্গল দিয়ে সমভূমির বুক চিরে কর্ষণ করতে করতে তিনি দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। এভাবে সুদূর হিমালয় থেকে হাল টানতে টানতে ক্রমাগত ভূমি কর্ষণজনিত শ্রমে একসময় তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আর এই ক্লান্ত হয়ে যেখানে তিনি তার লাঙ্গল টানা বন্ধ করেন। সেই জায়গার নামই পরবর্তীতে পরিচিতি পায় ‘লাঙ্গলবন্দ’ নামে।

ক্লান্ত পরশুরাম বিশ্রাম করার জন্য যেখানে লাঙ্গল থামান বর্তমানে সেটি বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা অন্তর্গত সোনারগাঁয়ে অবস্থিত। এটি সোনারাগাঁও মহেশ্বরদি পরগনাকে দু’ ভাগে বিভক্ত করে ব্রহ্মপুত্রের ধারা হয়ে ধলেশ্বরী নদীতে পতিত হয়েছে। এই মিলিত ধারা পরবর্তীতে মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে।

যেখানে এসে ব্রহ্মপুত্র থেমে যায় তার কাছাকাছি দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল আরেক নদী সুন্দরী শীতলক্ষ্যা। শীতলক্ষ্যার রূপ-যৌবনের কথা জেনে ব্রহ্মপুত্র প্রচণ্ড বেগে তার দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। ব্রহ্মপুত্রের ভয়ঙ্কর ও বিশাল মূর্তি দেখে সুন্দরী শীতলক্ষ্যা তার সমস্ত সৌন্দর্য আড়াল করে বৃদ্ধার রূপ গ্রহণ করেন এবং নিজেকে বুড়িগঙ্গারূপে উপস্থাপন করে।

ব্রহ্মপুত্র শীতলক্ষ্যার বুড়িগঙ্গারূপী রূপ দেখে মর্মাহত হন, রেগে গিয়ে তার অবগুণ্ঠন উন্মোচনের পর লক্ষ্যার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন ও তার সঙ্গে মিলিত হন। এরপর দুজনের মিলিত স্রোতধারা একই সঙ্গে প্রবাহিত হতে থাকে।

ঐদিকে পরশুরাম পবিত্র ব্রহ্মপুত্র নদের অলৌকিক শক্তি ও মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন তীর্থস্থান ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তীর্থভ্রমণ শেষে ফিরে এসে দেখেন, যে ব্রহ্মপুত্রকে তিনি মানুষের উপকারার্থে সমতল ভূমিতে নিয়ে এসেছিলেন, যাকে তিনি জগতের শ্রেষ্ঠ ও পবিত্রতম নদরূপে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, সে শীতলক্ষ্যার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পরশুরাম ক্রোধান্বিত দুই নদ-নদীকেই অভিশাপ দেন।

নিরুপায় ব্রহ্মপুত্র তখন পরশুরামের যে উপকার করেছিলেন সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ক্ষমা চাইলে লাগলো। এতে পরশুরামের মনে কিছুটা দয়ার উদ্রেক হলে তিনি ব্রহ্মপুত্রের পাপ মোচনের অলৌকিক শক্তি হরণ করে নিয়ে শুধু বৎসরের একটি দিনেই তার অলৌকিক শক্তি অক্ষুন্ন রাখেন।

সেই থেকে বিশ্বাসীদের কাছে লাঙ্গলবন্দ পরম পুণ্যস্থান আর ব্রহ্মপুত্রের জল অত্যন্ত পবিত্র বলে গণ্য হলেও; তা কেবল চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতেই পূজিত হয়। তাই প্রতিবছর চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে লাঙ্গলবন্দে স্নান অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বাসীরা পাপমোচনের জন্য সমাগত হয় ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে লাঙ্গলবন্দে।

তিব্বতিদের বিশ্বাস, পৃথিবীর বুকে মানুষের বসতি শুরু হওয়ার বহু বছর আগে চাং টান নামক একটি মালভূমিতে এক সুবিশাল হ্রদের অস্তিত্ব ছিল। তখন বোধিসত্ত্ব নামক এক স্বর্গীয় অস্তিত্ব এই অঞ্চলের সকল মানুষের জন্য এই জলের সহজলভ্যতা করতে হিমালয় দিয়ে এই জল নির্গমনের পথ তৈরি করে দেন।

যতদূর জানা যায়, ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তিস্থল হিমালয়ের কৈলাস শৃঙ্গের জিমা ইয়ংজং হিমবাহ। এই হিমবাহের অবস্থান তিব্বতের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে। এখান থেকে জন্ম নেওয়া নদের জলধারা শৃঙ্গ থেকে নেমে প্রায় এগাড়’শ কিলোমিটার পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে।

তিব্বতের রাজধানী লাসা পেড়িয়ে এই প্রবাহ চুশুর অঞ্চলে সাংপো নদী হিসেবে প্রবাহিত হয়। তিব্বত পেরিয়ে এই নদীর গতিপথ পূর্ব থেকে উত্তর দিকে বদলে যায়। নামচা বারওয়া নামক পাহাড়ি অঞ্চলে আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হয়ে পুনরায় দিক পরিবর্তন করে দক্ষিণে প্রবাহিত হতে থাকে।

তিব্বতি সাংপো নদী উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে। এখানে সাংপো নাম বদলে হয় দিহাং বা সিয়াং নদী। পাহাড়ি অঞ্চল থেকে বের হয়ে আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে আসামের নিচু অববাহিকায় প্রবেশ করে। আসামের সাদিয়া শহরের পশ্চিমে নদীর গতিপথ ফের বদলে দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হয়ে যায়।

এখানে দিবাং ও লোহিত নামে দুটি পাহাড়ি নদীর সাথে মিলিত হয় দিহাং। এই মিলনস্থল থেকেই দিহাং নদী বদলে হয় ব্রহ্মপুত্র নদ।

তিব্বতিদের বিশ্বাস, পৃথিবীর বুকে মানুষের বসতি শুরু হওয়ার বহু বছর আগে চাং টান নামক একটি মালভূমিতে এক সুবিশাল হ্রদের অস্তিত্ব ছিল। তখন বোধিসত্ত্ব নামক এক স্বর্গীয় অস্তিত্ব এই অঞ্চলের সকল মানুষের জন্য এই জলের সহজলভ্যতা করতে হিমালয় দিয়ে এই জল নির্গমনের পথ তৈরি করে দেন।

সেই পথ দিয়ে হ্রদের জল সাংপো নদী হয়ে ভূমিতে প্রবাহিত হতে থাকে। তারা এই নদীর জলকে অত্যন্ত পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করে।

লাঙ্গলবন্দ তীর্থের অবস্থান

ঢাকা থেকে প্রায় ২০ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘেঁষে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে; নারায়ণগঞ্জের জেলা সদর থেকে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর কোণে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ে দাসের গাঁও গ্রাম পেরিয়ে আর বন্দর থনার অন্তর্গত ঢাকা মহানগরী থেকে একুশ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে বর্তমান মুছাপুর ইউনিয়ন আদি ব্রহ্মপুত্রের তীরে প্রায় ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে লাঙ্গলবন্দ পুণ্যস্থানটির অবস্থান।

জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বর্তমান ‘সোনালী পেপার এন্ড পাল্প মিলস্ লি’-এর সামনে থেকে দীর্ঘ দেড় কিলোমিটার এলাকা নিয়ে তৎকালীন ৭জন জমিদারের যৌথ সম্পত্তির উপর এই তীর্থস্থানটির বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠে।

প্রতিবছর চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে আদি ব্রহ্মপুত্র নদের এই স্থানে পুণ্য স্নানের এই রীতি চলে আসছে বহু কাল থেকে। অষ্টমী তিথির এই স্নান অনুষ্ঠিত হয় বলে এটি ‘অষ্টমী স্নান’ নামে অভিহিত। বিশ্বাসীরা বলে, চৈত্রের শুক্লাষ্টমীতে জগতের সকল পবিত্র স্থানের পুণ্য ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হয়।

তখন নদীর জল স্পর্শমাত্রই সকলের পাপ মোচন হয় এবং ব্রহ্মার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। এই পবিত্র জলে স্নান করলে চিরমোক্ষ লাভ হয়। এই অষ্টমীর স্নান উপলক্ষে লাঙ্গলবন্দের ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে মেলা বসে।

ব্রহ্মপুত্র স্নান মন্ত্র-

ওঁ ব্রহ্মপুত্র মহাভাগ শান্তনোঃ কুলনন্দন।
অমোঘ-গর্ভসম্ভূত পাপং লোহিত্য মে হর। ।

অর্থ- হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র! তুমি শান্তনু মুণির কুলতিলক, তুমি অমোঘা দেবির গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছ। হে লৌহিত্য, তুমি আমার পাপ হরণ কর।

মন্ত্র-

ত্বং ব্রহ্মপুত্র ভূবনতারণ তীর্থরাজ।
গম্ভীর-নীর পরিপুরত সর্বদেহ। ।
ত্বদ্দর্শনাদ্ হরতু মে ভব ঘোর-দুঃখং।
সংযোগতঃ কালিযুগে ভগবন নমহস্তুতে। ।

অর্থ- হে ব্রহ্মপুত্র! তুমি ভুবন পরিত্রাণকারী তীর্থরাজ, তোমার সর্বদেহ গভীর সলিল রাশিদ্বারা পরিপূরিত। তোমার দর্শন ও সংযোগ দ্বারা এ কলিযুগে আমার ভবব্যাধিজনিত ঘোর দুঃখ হরণ কর। হে ভগবান! তোমাকে প্রণাম।

সমাগত ভক্তবৃন্দের জন্য স্নান সম্পন্ন করাকে সহজ করার জন্য বিভিন্ন দানশীল ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকটি ঘাট নির্মাণ করেন। বর্তমানে এমন ১৩টি বাঁধানো ঘাট আছে। লাঙ্গলবন্দে ১৩টি স্নানঘাট, ১০টি মন্দির, ৬টি আশ্রম ও ৩টি আশ্রয় স্থল। ১৩টি স্নানঘাটের মধ্যে ১টি মাত্র ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব পারে অবস্থিত আর বাকি ১টি ঘাটি বা সব প্রতিষ্ঠানগুলোই পশ্চিম পারে অর্থাৎ স্নান স্থলে।

পুন্যার্থীরা স্নানমন্ত্র পাঠপূর্বক নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী ফুল, বেলপাতা, ধান, দুর্বা, হরতকী, ডাব, আম্রপল্লব ইত্যাদি দিয়ে পবিত্র নদ ব্রহ্মপুত্রে পিতৃকূলের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে থাকে। পুন্যস্নান শেষে পুন্যার্থীরা সাথে নিয়ে আসা চাল-ডাল, টাকা-পয়সা পথের দুই পাশে লাইন করে বসে থাকা সাধক-যোগী-পাগল-মস্তান-ভিক্ষাপ্রার্থী-সং সহ স্থায়ী-অস্থায় মন্দিরে দিতে দিতে এগিয়ে যায়।

পাপমোচনের প্রার্থনায় রত পুন্যার্থীদের জন্য পথের দুই পাশে দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সেবা সংগঠনগুলো ক্যাম্প স্থাপন করে প্রতিবছর। যেখানে পুন্যার্থীদের জন্য আয়োজন করা হয় আহারের। মুড়ি-মুড়কি, চিড়া-দই, দুধ-কলা, খিচুড়ি, ভাত-সবজি-ডাল, শরবত, ঘোল, মাঠা, জল সব সকল কিছুই বিনামূল্যে প্রধান করা হয়।

এই সেবা কার্যক্রম চলে লগ্ন যতক্ষণ চলে ততক্ষণ। রাস্তা খুব একটা প্রসস্থ না হওয়া সত্যেও রাস্তার দুই পাশেই মেলার দোকানপাট বসে। আর খোলা জায়গাতে ঘটা করে বসে মেলা। পুন্যার্থীদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পাশাপাশি মেলে নানান সব বাহারি পণ্য।

লাঙ্গলবন্দের স্নানঘাট-

১. অন্নপূর্না ঘাট।
২. রাজ ঘাট।
৩. শংকর (সাধুর) ঘাট।
৪. মাকরী (শান্তি) ঘাট।
৫. গান্ধী ঘাট বা মহাশ্মশান ঘাট।
৬. ভদেশ্বরী ঘাট।
৭. জয় কালী ঘাট।
৮. রক্ষা কালী ঘাট।
৯. পাষাণ কালী ঘাট।
১০. প্রেমতলা ঘাট।
১১. চর শ্রীরামপুর ঘাট।
১২. দক্ষিণেশ্বরী কালীবাড়ী ঘাট এবং
১৩. কালিগঞ্জ ঘাট।

এছাড়াও রয়েছে ললিত সাধুর ঘাট, অর্ণপূর্ণ ঘাট, সাবদি ঘাট, বাসনকালী ও জগৎবন্ধু ঘাট।

লাঙ্গলবন্দ মন্দির-

১. অন্নপূর্ণা মন্দির।
২. রক্ষা কালী মন্দির।
৩. গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মন্দির।
৪. আদি ব্রহ্মপুত্রের মন্দির।
৫. শ্মশানকালী মন্দির।
৬. জয় কালী মন্দির।
৭. শিব মন্দির।
৮. পাষান কালী মন্দির।
৯. প্রেমতলা রক্ষা কালী মন্দির।
১০. দক্ষিণেশ্বরি কালী মন্দির।

লাঙ্গলবন্দ স্নানে অধিক পুণ্যতিথি

চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী বুধবার ও পুনর্বসু নক্ষত্র যোগ হলে তাকে ‘বুধাষ্টমী’ বলে। প্রতি ১২ বছর পরপর এ তিথি একত্রে মিলিত হয়। আর এ সময় ব্রহ্মপুত্রে সর্বতীর্থের সমাগম হয় এবং তীর্থরাজে পরিণত হয়। এই ‘বুধাষ্টমী’ যোগে ব্রহ্মপুত্র স্নানে সর্বপাপ থেকে মুক্তি লাভ হয়।

১৯০১ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র ‘বুধাষ্টমী’ যোগে জননী ভুবনেশ্বরী দেবীকে নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ, নেপালের রাজা, মহাত্মাগান্ধীসহ বহু সাধু-সন্ন্যাসী এ তীর্থ স্নান করেন।

বিশ্ববরেণ্য দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক ধর্মগুরু ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারীজীর তথ্যমতে ‘মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণ-চৈতন্যদেব লাঙ্গলবন্দে এসে স্নান ও তর্পণ করেছিলেন।

এবারের লাঙ্গলবন্দের অষ্টমীস্নানের লগ্ন-

২৫ চৈত্র/৮ এপ্রিল রোজ শুক্রবার রাত্রি ৯/১১/৫৬ এরপর থেকে ২৬ চৈত্র/৯ এপ্রিল রোজ শনিবার ১১/০৮/৪৭ পর্যন্ত অষ্টমী।

করোনা মহামারীর নিষেধাজ্ঞার কারণে ২ বছর পর এবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে লাঙ্গলবন্দ মহাষ্টমী স্নান। আগামী ৮ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টা থেকে ৯ এপ্রিল রাত ১১টা পর্যন্ত পূর্ণ্যস্নান অনুষ্ঠিত হবে।

প্রতিবছরের ন্যায় এবারো ‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য আমার পাপ হরণ কর’ মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে পুন্যার্থীরা ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান শুরু করবে। কেবল ব্যক্তিগত পাপমোচনই নয়। জগতের যাবতীয় সংকীর্ণতা ও পঙ্কিলতার আবরণে ঘেরা জীবন থেকে পাপমুক্তির বাসনায় পুন্যার্থীরা ডুব দিবে ব্রহ্মপুত্রের জলে।

………………
সূত্র-
ব্রহ্মপুত্র নদ।
বাংলাপিডিয়া।

…………………….
আপনার গুরুবাড়ির সাধুসঙ্গ, আখড়া, আশ্রম, দরবার শরীফ, অসাম্প্রদায়িক ওরশের তথ্য প্রদান করে এই দিনপঞ্জিকে আরো সমৃদ্ধ করুন-
voboghurekotha@gmail.com

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

<<মার্চ’২২ দিনপঞ্জি (ফাল্গুন-চৈত্র)

…………………..
আরও পড়ুন-
জানুয়ারি’২২ দিনপঞ্জি (পৌষ-মাঘ)
ফেব্রুয়ারি’২২ দিনপঞ্জি (মাঘ-ফাল্গুন)
মার্চ’২২ দিনপঞ্জি (ফাল্গুন-চৈত্র)
এপ্রিল’২২ দিনপঞ্জি (চৈত্র-বৈশাখ)
মে’২২ দিনপঞ্জি (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ)
জুন’২২ দিনপঞ্জি (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়)
জুলাই’২২ দিনপঞ্জি (আষাঢ়-শ্রাবণ)
আগস্ট’২২ দিনপঞ্জি (শ্রাবণ-ভাদ্র)
সেপ্টেম্বর’২২ দিনপঞ্জি (ভাদ্র-আশ্বিন)
অক্টোবর’২২ দিনপঞ্জি (আশ্বিন-কার্তিক)
নভেম্বর’২২ দিনপঞ্জি (কার্তিক-অগ্রহায়ণ)
ডিসেম্বর’২২ দিনপঞ্জি (অগ্রহায়ণ-পৌষ)

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!