মনসুর হাল্লাজ ফকির

মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: এক

-মূর্শেদূল মেরাজ

মনসুর হাল্লাজকে অনেকে অদ্যাবধি সুফিদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিতর্কিত সাধক হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। তার কার্যকলাপ বিশ্লেষণে অনেক সুফি গবেষকই তাকে একই সাথে সাহসী এবং নির্বোধ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে শরিয়তি গবেষকরা তাকে সাধক মানতেই নারাজ। তারা তাকে চিহ্নিত করে বিপথগামী হিসেবে।

যতদূর জানা যায়, মনসুর হাল্লাজের পুরো নাম আবু আল-মুজিদ আল-হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজ। উপনাম আবু মুগীস। অনেকের মতে, আবু আব্দিল্লাহ। তবে তিনি আনাল হক নামেই সর্বাধিক পরিচিত। সুফি ইতিহাসে তাকে ‘মরমী প্রেমের শহীদ’ বলে অভিহিত করা হয়।

সুফিধারায় তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন সাধক। তাকে না জানলে সুফিবাদ সম্পর্কে জানাই অসম্পূর্ণ থেকে যায় বলেও মনে করা হয়।

তাকে ঘিরে সারা পৃথিবী জুড়ে যে কতশত গল্প-কাহিনী, কল্প-কাহিনী রচিত হয়েছে তা গুণে বলা মুশকিল। সুফিবাদ, সুফিবাদের ইতিহাস, সুফি সাহিত্য-মোটকথা সুফি বিষয়ক যে কোনো রচনায় কোনো না কোনো ভাবে তার প্রসঙ্গ চলে আসেই। সুফিবাদের সাথে তিনি এমনিভাবে জড়িয়ে আছেন হাজার বছর পরেও।

তাকে যে নির্মমতার সাথে হত্যা করা হয়েছিল সে বর্ণনা আজো মানুষকে নাড়া দেয়। মতাদর্শ প্রচারের কারণে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রকাশ্যে এমন নির্মমতা-বর্বরতার সাথে হত্যা করার ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না। যদিও নতুন মতাদর্শ প্রচারের জন্য সর্বকালেই সাধকদের সহ্য করতে হয়েছে এবং হয় চরম নির্যাতন-নিপীড়ন।

আধ্যাত্মবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধানই হলো উপযুক্ত পাত্র ব্যতীত ভেদের কথা প্রকাশ না করা। কিন্তু মনসুর হাল্লাজ সেই প্রথা ভাঙেন। সুফিবাদের ধারায় সর্বপ্রথম তিনিই চিৎকার করে সকলের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করেন, সাধনবলে খোদার সান্নিধ্য লাভ করা যায়। লীন হওয়া যায় খোদার সত্তায়।

পারস্যের সুফি কবি ফরিদউদ্দিন আত্তার হাল্লাজের শহীদত্বকে বলেছিলেন সুফিবাদের ‘শিখর’। আর হাল্লাজের জীবন ও কর্মকে স্মরণ করে কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল তার ‘জাবিদ-নামা’য় তাকে উল্লেখ করেছিলেন ‘প্রমিথিয়ান ব্যক্তিত্ব’ বলে।

এ বিষয়টি শরিয়তপন্থীরা সহজে গ্রহণ করেন নি। তারা তাকে বিচারের মুখোমুখি করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। সে ঘটনাও ঘটে গেছে আজ থেকে হাজার বছরের বেশি সময় আগে। কিন্তু তাকে ঘিরে তর্ক-বিতর্কের অবসান আজও হয়নি।

কারো কারো কাছে তিনি মহান সুফি সাধক। আবার কারো কারো কাছে তিনি মূল ধারা থেকে বিচ্যুত বা পথভ্রষ্ট সাধক। পৃথিবীর বহু স্থানে আজো তার নাম সরাসরি উচ্চারণ করা বা তার মতকে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তিনি এমনি রহস্যে ঘেরা এক সুফি সাধক।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর তার সকল রচনা পুড়িয়ে ফেলা হলেও একটি গ্রন্থ এখনো অবশিষ্ট আছে। যদিও তিনি তার ‘আনাল হক’ বা ‘আমিই সত্য’ শব্দগুলো জন্যই সর্বাধিক প্রচারিত।

পারস্যের সুফি কবি ফরিদউদ্দিন আত্তার হাল্লাজের শহীদত্বকে বলেছিলেন সুফিবাদের ‘শিখর’। আর হাল্লাজের জীবন ও কর্মকে স্মরণ করে কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল তার ‘জাবিদ-নামা’য় তাকে উল্লেখ করেছিলেন ‘প্রমিথিয়ান ব্যক্তিত্ব’ বলে।

বিশ শতকের সিরিয় কবি এডোনিস হাল্লাজকে স্মরণ করে লিখেছিলেন, ‘তোমার সবুজ বিষভরা পালকই আমাদের ইতিহাস এবং আমাদের ভূমিতে- আমাদের পুনঃ পুনঃ মৃত্যুতে আসন্ন পুনরুত্থান…’

মনসুর হাল্লাজের শৈশবকাল

২৬ মার্চ ৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে (২৪৪ হিজরি) প্রাচীন পারস্যের ফার্স প্রদেশের মদিনা-আল-বাইদা নামে এক গ্রামে তার জন্ম হয়। তার পিতামহের নাম ছিল মাহমী। তিনি ছিলেন পারস্যের জরথুস্ত্র ধর্মালম্বী। পরে ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন।

নামের উপাধির ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, মনসুর হাল্লাজের পিতা … ছিলেন পশমের কারবারী বা সুতা প্রস্তুতকারক। কারণ আরবি ‘হাল্লাজ” শব্দটি মূলত তুলাধূণী বা সুতা প্রস্তুতকারক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেই সূত্রেই সম্ভবত এই পেশাদারী পদবী হাল্লাজ শব্দটি তাদের পরিবারে ব্যবহৃত হয়।

পবিত্র কোরানকে তিনি সুফি ও মরমী উপলব্ধির ভিত্তিতে বুঝবার চেষ্টা করেন। প্রবেশ করতে শুরু করেন সুবিধারার গূঢ় তত্ত্বে। মেতে ওঠেন খোদাকে পাওয়ার সাধনায়। অনুসন্ধান শুরু করেন উপযুক্ত গুরুর।

যতদূর জানা যায়, মনসুর হাল্লাজের পিতা ২৪৯-২৫৩ হিজরির কোন এক সময় তার পুরো পরিবার নিয়ে ইরাকের বস্ত্র শিল্প নগরী ওয়াসিতের আরব কলোনীতে আবাস গড়ে তোলেন। শিশুকাল থেকেই হাল্লাজ লেখাধুলা অপেক্ষা পড়াশোনা এবং সুফিদের সহচার্য পছন্দ করতো।

সে সময় চারদিকে সুফিধারা বেশ প্রসার লাভ করেছিল। পিতার সাধারণ জীবন যাপন শিশু হাল্লাজকে বেশ প্রভাবিত করে। সুফিদের মাঝেও সেই সহজতা তাকে মুগ্ধ করে। এতে খুব অল্প বয়স থেকেই হাল্লাজ সুফিবাদে আগ্রহী হয়ে উঠে।

জীবিত অবস্থাতেও যে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করা সম্ভব সুফিবাদের এই সাধনা তাকে আলোড়িত করে। স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের জন্য তিনিও ধীরে ধীরে সুফিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

পবিত্র কোরানকে তিনি সুফি ও মরমী উপলব্ধির ভিত্তিতে বুঝবার চেষ্টা করেন। প্রবেশ করতে শুরু করেন সুফিধারার গূঢ় তত্ত্বে। মেতে ওঠেন খোদাকে পাওয়ার সাধনায়। অনুসন্ধান শুরু করেন উপযুক্ত গুরুর।

মনসুর হাল্লাজের শিক্ষাজীবন

জানা যায়, হাল্লাজ মাত্র ১২ বছর বয়সে ওয়াসিতের এক মাদ্রাসা থেকে কোরানে হাফেজ হন। তার বেশিভাগ সময় কাটতো সুফি সাধদের সাথেই। ১৮ বছর বয়সে তিনি তুস্তার শহরে যান। সেখানে সুফি সাধক শাহল আল-তুস্তারীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

তুস্তারী বিখ্যাত উক্তি ছিল- ‘আমিই সৃষ্ট প্রাণীর মধ্যে ঈশ্বরের প্রমাণ এবং আমিই আমার সময়কালের সাধুদের প্রমাণ।’

তুস্তারী কাছে বছর দুয়েক সুফিবাদের উপর শিক্ষা নেয়ার পর হাল্লাজ বাগদাদ হয়ে বসরায় যান। বসরাতে তিনি আমর ইবনে ওসমান আল-মক্কী নামে আরেক খ্যাতিমান সুফি সাধকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

ঐতিহাসিকরা বলেন, হাল্লাজ তার তপস্যা, ধ্যান ও সাধনায় এতোটাই এগিয়ে ছিলেন যে তার গুরুরাও তার জ্ঞানের কাছে ম্লান হয়ে যান। সে কারণেই মনসুর হাল্লাজ সাধনার বিভিন্ন সময় তাদের পরিত্যাগ করে আরো উচ্চ জ্ঞানের সন্ধান করতে থাকেন।

বসরাতেও তিনি গুরু আমরের সাহচর্যে প্রায় দুই বছর (৮৭৪-৭৬ খ্রি/২৬০-৬২ হি) সময় অতিবাহিত করেন। ঐ সময় তিনি সুফি ইয়াকুব আল-আকতা কার্নাবাইয়ের কন্যা উম্মুল হুসনাইনকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তার নাম আহম্মদ ইবনে হুসাইন ইবনে মনসুর।

অনেকের মতে, এই বিয়ের কারণে তার গুরু আমর তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং তাকে পরিত্যাগ করেন।

তবে অনেকে মনে করেন হাল্লাজের সাথে তার গুরুর অসন্তুষ্টির কারণটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কথিত আছে, একবার হাল্লাজ তার গুরু আমরের কোরান পাঠ শুনে বলেন- ‘আমিও ঐ রকম লিখতে পারি।’ একথা শোনা মাত্রই আমর তাকে ত্যাগ করেন।

তবে বিশ্লেষকরা বলেন, মনসুর বলেছিলেন- ‘আমি আপনার চেয়ে ভালোভাবে কোরান পাঠ করতে পারি।’ একথা শুনেই আমর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ত্যাগ করেন। মূলত মনসুর জ্ঞানে তার গুরু আমরের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন।

পরবর্তীতে বাগদাদের বিখ্যাত সুফি জুনায়েদ বাগদাদীর কাছে দীক্ষা নেন হাল্লাজ। তিনি কিছু সময় গুরু জুনায়েদের সঙ্গ লাভ করেন। এরপর তিনি হেজাজ চলে যান।

ঐতিহাসিকরা বলেন, হাল্লাজ তার তপস্যা, ধ্যান ও সাধনায় এতোটাই এগিয়ে ছিলেন যে তার শিক্ষকরাও তার জ্ঞানের কাছে ম্লান হয়ে যান। সে কারণেই মনসুর হাল্লাজ সাধনার বিভিন্ন সময় তাদের পরিত্যাগ করে আরো উচ্চ জ্ঞানের সন্ধান করতে থাকেন।

(চলবে…)

<<মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: পাঁচ ।। মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: এক>>

…………………
আরো পড়ুন:

মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: এক
মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: দুই
মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: তিন
মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: চার
মনসুর হাল্লাজ ফকির সে তো: পাঁচ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!