শেরে খোদা মাওলা আলী

শেরে খোদা মাওলা আলী

-নূর মোহাম্মদ মিলু

মহানবী হযরত মুহাম্মদ স্বয়ং নাম রাখেন ‘আলী’
কথিত আছে, জন্মের পর পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম হযরত আলী (রা)-কে কোলে তুলে নেন স্বয়ং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর নাম আলী বলে ঘোষণা করেন, যার অর্থ সম্মানিত বা মহিমান্বিত। এখানে উল্লেখ্য, কুরাইশ বংশের নেতা আবদুল মুতালিবের সন্তানদের মধ্যে তাঁর এক পুত্র আবু তালিবের ঘরে হযরত আলীর জন্ম।

আর অপর পুত্র আবদুল্লাহর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন স্বয়ং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)। তাই জন্মসূত্রে হযরত আলী ছিলেন হযরত মুহাম্মদের চাচাতো ভাই, মাতৃগর্ভে থাকাকালে বাবার মৃত্যু এবং মাত্র ৬ বছর বয়সে মাকে হারানোর ফলে দাদা আবদুল মোতালিবের কাছে বড় হন হযরত মুহাম্মদ।

দাদাকে হারানোর পর তাঁর ঠাঁই হয় চাচা আবু তালিবের ঘরে, যেখানে জন্ম নেন হযরত আলী। অন্যদিকে আলী বিভিন্ন কারণে হযরত মুহাম্মদের ঘরে বড় হন। মুহাম্মদ এবং তাঁর স্ত্রী খাদিজা ৫ বছর বয়স থেকে আলীকে পরম যত্নে লালন করেন।

পবিত্র কাবাঘরে জন্ম
মহানবী হযরত মুহাম্মদকে যেসব অনুসারী স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেতাব পেয়েছিলেন হযরত আলী বিন আবু তালিব (রা)। তাঁর জন্ম তৎকালীন আরব বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ কুরাইশ বংশের বানু হাশিম গোত্রে। তাঁর মা ফাতিমা বিনতে আসাদও ছিলেন বানু হাশিম গোত্রীয়।

তাই গোত্র সূত্রে তিনি ছিলেন কাবাঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইব্রাহিম (আ) এবং তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ)-এর ধারক ও বাহক। বংশ মর্যাদাগুণে আলীর পিতা আবু তালিব ছিলেন কাবাঘরের সংরক্ষক। এই কাবাঘরে তখন মূর্তিপূজা হলেও ছোটবেলা থেকেই আলী মূর্তিবিমুখ ছিলেন।

পরবর্তীতে তাঁর হাতেই কাবাঘরের মূর্তি অপসারিত হয় এবং কোরাইশ বংশ ও বানু হাশিম গোত্র ইসলামের ইতিহাসে মর্যাদার আসনে আসীন হয়। এই কাবাঘর চত্বরেই ৬০১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর আলীর জন্ম, যা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ বলে মনে করে ‘শিয়া সম্প্রদায়’। তাই তাঁর একটি খেতাব হলো ‘আওলাদ আল কাবা’ অর্থাৎ ‘কাবার শিশু’ বা ‘কাবার সন্তান’।

পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইমান আনেন
হযরত মুহাম্মদ ৪০ বছর বয়সে হেরা পর্বতের গুহায় নবুয়তপ্রাপ্ত হন এবং ৪৩ বছর বয়স থেকে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। নবুয়তপ্রাপ্তির অলৌকিক ঘটনা বিশ্বাস করে বিনা প্রশ্নে সর্বপ্রথম ইমান আনেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা। তাঁর পরপরই ইমান আনেন আলী।

ইতিহাসবিদ সৈয়দ আলী আসগর রাজী তাঁর ‘এ রিজস্টেটমেন্ট অব ইসলাম অ্যান্ড মুসলিমস’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, পবিত্র কোরআন এবং হযরত আলী সমান্তরালভাবে হযরত মুহাম্মদ এবং মা খাদিজাতুল কুবরার ঘরে পরিপূর্ণতা লাভ করেন।

মুহাম্মদ যখন ইসলাম প্রচার শুরু করেন, তখন আলীর বয়স মাত্র নয় বছর। এ সময় মুহাম্মদ তাঁর নিজ গোত্র বানু হাশিমের একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে মূর্তিপূজার বদলে এক আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের প্রতি ইমান আনার আহ্বান জানান।

এতে কেউ সাড়া না দিয়ে বরং বিরোধিতা করে। একে একে এমন তিনটি আহ্বানে কেউ সাড়া না দিলেও একমাত্র আলী সাড়া দেন এবং বিনা প্রশ্নে ইসলাম গ্রহণ করেন। ফলে আবেগাপ্লুত মুহাম্মদ তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং তাঁর উত্তরসূরি ও প্রতিনিধি (উজির) ঘোষণা করেন। পরিবার এবং নিজ গোত্র থেকে প্রবল বাধা এলেও আলী ছিলেন অনড়।

হযরত ফাতেমা (রা)-এর সঙ্গে বিবাহ
মহানবী মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করার পর মক্কায় অবস্থানকারী তাঁর নিকটাত্মীয়দের জীবনেও ঝুঁকি নেমে আসে। এ সময় আলী হযরত মুহাম্মদের পরিবারের পাশে থাকেন। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি তাঁর মা ফাতেমা, হযরত মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ এবং অপর দুজন নারীসহ মদিনায় গমন করেন।

মদিনায় পৌঁছার পর নবীজির মধ্যস্থতায় এবং তাঁর অপর দুজন স্ত্রী মা আয়েশা ও মা উম্মে সালমার আতিথেয়তায় আলী এবং ফাতেমার বিয়ে সম্পন্ন হয়। মুসলমানদের কাছে উভয়েই পবিত্র এবং স্বর্গীয় মহিমার প্রতীক। তাদের দুই পুত্র ইমাম হাসান (রা) ও ইমাম হোসেন (রা) পরবর্তীতে শাহাদাতবরণ করেন।

আলী এবং ফাতেমার বিবাহিত জীবন প্রায় ১০ বছর স্থায়ী হয় এবং নবীকন্যা ফাতেমার অকাল মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়।

মহানবী (সাঃ) এর নিরাপত্তা বিধানে জীবনের ঝুঁকি
মহানবী দীর্ঘ প্রায় নয় বছর মক্কাবাসীকে ইসলামের পথে ও সত্যের পথে আহ্বান জানান। কিন্তু বংশগত ঐতিহ্য এবং গোঁড়ামি ছেড়ে তাদের অধিকাংশই এই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বরং তাঁকে প্রতিহত করে। ৬২২ সালে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, মক্কায় অবস্থান নবীজির জীবনের প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ফলে তিনি মক্কা ছেড়ে মদিনায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যা ইতিহাসে ‘হিযরত’ নামে পরিচিত। সত্যবাদিতার জন্য ‘আল আমিন’ বা বিশ্বাসী হিসেবে পরিচিত হযরত মুহাম্মদের কাছে এ সময় অনেক সম্পদ আমানত রেখেছিল মক্কাবাসী।

মহানবী জমাকারীদের কাছে তা ফেরত দেওয়ার জন্য তাঁর আস্থাভাজন আলীকে বুঝিয়ে দেন, যা যথাযথভাবে প্রাপকের কাছে বুঝিয়ে দেন আলী। নির্দিষ্ট রাতে শত্রুর চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য হযরত মুহাম্মদের বিছানায় চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়েছিলেন আলী।

শত্রুদের পরিকল্পনা মোতাবেক রাতে কাউকে হত্যা করা কাপুরুষোচিত হবে বিধায় রাত পোহানো মাত্র বিছানা বা ঘরে থাকা হযরত মুহাম্মদকে হত্যার কথা ছিল। নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি সত্ত্বেও হযরত আলী শত্রুকে ফাঁকি দিয়ে মুহাম্মদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য ঘরে অবস্থান করেন এবং চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকেন।

তফসিরবিদদের মতে, আলীর এই আত্মত্যাগের প্রতি ইঙ্গিত করে সূরা বাকারার ২০৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, আর এমন লোকও আছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন সমর্পণ করে দেয়। আর আল্লাহ তো তাঁর বান্দাদের অনেক দয়া করেন।

জুলফিকার, আলী ও হায়দার
জুলফিকার আলী হায়দার উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে একটি জনপ্রিয় নাম। ইতিহাস মতে, বিভিন্ন যুদ্ধে আলী একটি বিশেষ তরবারি ব্যবহার করতেন। যা জুলফিকার নামে পরিচিতি পায়। একটি হাতলের সঙ্গে সংযুক্ত দুটি ধারালো তরবারি ব্যবহার করতেন আলী, যা আজও জুলফিকার নামে সমাদৃত।

মহররমের সময় শিয়া সম্প্রদায় আজো এই তরবারির প্রতিকৃতি বহন করে এবং পতাকার মাঝে এই তরবারি আঁকে। হযরত আলীর আরেকটি খেতাব হলো ‘হায়দার’। আরবিতে সিংহের একাধিক নামের একটি হলো হায়দার।

তাছাড়াও সাহসী বা সাহসী হৃদয় বোঝাতেও হায়দার শব্দটি ব্যবহৃত হয়। মুসলিম সৈন্যরা যুদ্ধ শুরুর আগে রণহুঙ্কার হিসেবে অথবা সম্মুখযুদ্ধে শত্রুর ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানার আগে উচ্চস্বরে ‘হায়দার’ শব্দটি উচ্চারণ করে নিজেদের মনোবল বৃদ্ধি ও শত্রুর মনে ভয় ধরানোর উদ্দেশ্যে।

৫ বছরের শাসনকাল
৬৫৬ সালে মদিনা তথা আরববিশ্বে নানা বিষয়ে মতভেদ দেখা দেয় এবং বেশ কিছু বিদ্রোহী দল ও উপদল সৃষ্টি হয়। এসব দল বা উপদলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ একটি নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়। এমনি এক প্রেক্ষাপটে ৬৫৬ সালের ১৭ জুন ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান ইবনে আফফান তাঁর নিজ কক্ষে একদল বিদ্রোহী মিসরীয় সেনার হাতে শাহাদাতবরণ করেন।

এ সময় মসজিদে নববীতে মুসলিমদের সমাবেশে পরামর্শক্রমে হযরত আলীকে ইসলামের চতুর্থ খলিফার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর শাসনকাল ছিল রাজনৈতিক ও সামরিক দুর্যোগপূর্ণ। পদে পদে তাঁকে যুদ্ধ, বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র, উগ্রবাদ, হানাহানি, দুর্নীতিসহ নানাবিধ জটিলতা মোকাবিলা করতে হয়।

মুসলিমদের মাঝে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে তিনি আপ্রাণ চেষ্ট করেন। মালিক আল আস্তারকে মিসরের শাসক নিয়োগ করে হযরত আলী প্রশাসন পরিচালনায় রীতি-নীতি বিষয়ে একটি নির্দেশনামূলক চিঠি প্রদান করেন। এই চিঠি যুগে যুগে প্রশাসন পরিচালনার মূলমন্ত্র বা সংবিধান হিসেবে বিবেচিত হয়। আজও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রশাসনিক একাডেমিতে এই চিঠি নিয়ে আলোচনা হয়।

রণাঙ্গনে বীরত্ব ও ‘আসাদুল্লাহ’ খেতাব লাভ
ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক দিনগুলোতে তাবুকের যুদ্ধ ব্যতীত অবশিষ্ট সব যুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন আলী। তবে তাঁর বীরত্বের কথা সর্বাধিক প্রচারিত হয় বদরের যুদ্ধে। এ সময় মূল যুদ্ধ শুরুর আগে প্রচলিত প্রথা মোতাবেক মুসলিমদের পক্ষে তিনজন এবং অমুসলিমদের পক্ষের তিনজন সেরা যোদ্ধা একে অপরকে ঘায়েলে সচেষ্ট হন।

মুসলিমদের পক্ষে এ সময় হযরত আলী মাত্র ২৩ বছর বয়সে মক্কা বাহিনীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ওয়ালিদ ইবনে উৎবাকে পরাজিত করেন। শুরুতেই আলীর বীরত্ব ও জয়লাভ সমগ্র যুদ্ধ জয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাই আলীর সম্মুখযুদ্ধে জয়কে ইসলামের জয়যাত্রার শুভ সংকেত গণ্য করা হয়।

বদরের যুদ্ধের পরের বছর (৬২৫ সাল) মদিনার নিকটবর্তী ওহুদের ময়দানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এ ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত যুদ্ধের পূর্বে সেরা যোদ্ধাদের দ্বৈরথে আলী শুরুতেই তরবারির আঘাতে মক্কা বাহিনীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও পতাকাবাহী তালহা ইবনে আবি তালহা আল আবদারিকে হত্যা করেন।

পরবর্তীতে দুই বাহিনীর সরাসরি যুদ্ধে আলী বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিশেষত যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলমানদের একটি অংশ মহানবীর আদেশের অপেক্ষা না করে তাদের অবস্থান ত্যাগ করলে শত্রুরা দ্রুত মুসলিম বাহিনীর অবস্থানে ঢুকে পরে এবং যে কোনো মূল্যে নবীজিকে হত্যার চেষ্টা চালায়।

এ সময় আলী জীবন বাজি রেখে অসীম সাহসিকতায় সব আক্রমণ রুখে দেন এবং মহানবীর জীবন রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। ওহুদের যুদ্ধের দুই বছর পর সংঘটিত হয় খন্দকের যুদ্ধ (৬২৭ সাল)। এই যুদ্ধেও আলী মুসলিম বাহিনীর পক্ষে মূল যুদ্ধ শুরুর আগে সেরাদের দ্বৈরথে অংশ নেওয়ার দায়িত্ব পান।

তাঁকে দায়িত্ব দিয়ে মহানবী আলীর প্রশংসা করেন এবং দোয়া করেন। অন্যদিকে মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করতে তখন মরিয়া ছিলেন সেনাপতি আমির ইবনে আব্দাল উদ। কথিত আছে, যুদ্ধে পারদর্শিতাঁর জন্য আমির ইবনে আব্দালকে ১০০০ সৈন্যের সমতুল্য মনে করতেন।

তাঁকে মোকাবিলার জন্য আলী এগিয়ে এলে আমির ইবনে আব্দাল তাচ্ছিল্য করে তাঁকে ফিরে যেতে বলেন। কিন্তু আলী ছিলেন অকুতোভয় এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি তাঁকে ইসলাম গ্রহণ অথবা যুদ্ধ করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। ফলে যুদ্ধ শুরু হয়।

মরুভূমির বালু ওড়ার কারণে যুদ্ধের জয়-পরাজয় বোঝার উপায় ছিল না। এই ধূলিময় অস্পষ্ট স্থানে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিত হলে সবাই নিশ্চিত হয় ১০০০ যোদ্ধার সমান বিবেচিত আমির ইবনে আব্দাল পরাজিত তথা মৃত্যুবরণ করেছেন আলীর হাতে। এতে ভীতসন্ত্রস্ত শত্রুরা পিছু হটে।

এই যুদ্ধের পরই মহানবী স্বয়ং আলী কে ‘আসাদুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর সিংহ উপাধি দেন। তিনি আরও বলেন যে, আলী কর্তৃক আমির ইবনে আব্দাল উদকে আঘাতের মূল্য সমগ্র মানব ও জিন জাতির কেয়ামত পর্যন্ত এবাদতের মূল্যের চেয়েও বেশি।

খন্দকের যুদ্ধের তিন বছর পর ৬৩০ সালে হুনায়নের যুদ্ধ হয়। মক্কা থেকে তায়েফগামী রাস্তার পাশে ইসলামের দীর্ঘদিনের শত্রু একদল বেদুইন উপজাতির সঙ্গে এই যুদ্ধের এক পর্যায়ে লুকিয়ে থাকা শত্রুরা অতর্কিতে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল হযরত মুহাম্মদ।

তাই মহানবীকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো পাথর ছুড়তে থাকে শত্রুরা। এ সময় অন্য কয়েকজনের সঙ্গে আলী হযরত মুহাম্মদর নিরাপত্তায় নিজ শরীর দিয়ে বর্ম তৈরি করেন। এভাবে ইসলামের সুরক্ষা, প্রচার ও প্রসারে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখেন আলী।

পতাকা বহনের গৌরব
ইসলামের ইতিহাস এবং প্রাচীন ঐতিহ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে পতাকা বহন করা যে কোনো যোদ্ধা বা সেনাপতির জন্য অনন্য গৌরবের বিষয়। একটি দেশ বা সম্প্রদায়ের প্রধান তাঁর সবচেয়ে আস্থাভাজন এবং তাঁর বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ সেনাপতির হাতে তাঁর দেশ বা সম্প্রদায়ের পতাকা তুলে দিয়ে যুদ্ধে পাঠান।

খন্দকের যুদ্ধের আগে ইসলামের পতাকা আলীর হাতে তুলে দেওয়ার আগে মহানবী মন্তব্য করেন যে, আমি এমন একজনের হাতে পতাকা তুলে দেব, যিনি আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে ভালোবাসেন এবং আল্লাহ ও রসুল যাকে ভালোবাসেন। তিনি বিজয়ী হয়ে ফিরে আসবেন। রসুলুল্লাহর এই বাণী সার্থকভাবে প্রমাণিত হয় খন্দকসহ পরবর্তী বহু যুদ্ধে।

রমজান মাসে শাহাদাতবরণ
হিজরি ৪০ সালের ১৯ রমজান অর্থাৎ ২৬ জানুয়ারি ৬৬১ সালে আলী ইরাকের কুফা মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করছিলেন। এ সময় আব্দাল রহমান ইবনে মুলজাম নামক এক ভিন্নমতাবলম্বী বিষ মাখানো তরবারি দিয়ে আলীকে আঘাত করেন।

ফলে মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি এবং তীব্র বিষক্রিয়া ও যন্ত্রণায় ভুগতে থাকেন। এ অবস্থায়ও আলী তাঁর পুত্র এবং অনুসারীদের আঘাতকারীকে ক্ষমা করে দিতে বলেন এবং তাঁর মৃত্যু হলেই কেবল আঘাতকারীকে শাস্তি হিসেবে একইভাবে আঘাতের নির্দেশ দেন।

এ ঘটনার ২ দিন পর অর্থাৎ রমজান মাসের ২১ তারিখে হযরত আলী শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর কবর নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একদল গবেষকের মতে, হযরত আলী তাঁর মৃতদেহ ও কবরকে শত্রুরা অপমান করতে পারে বলে আশঙ্কা করেন।

ফলে নিকটজনদের প্রতি তাঁর নির্দেশ ছিল মৃত্যুর পর তাঁকে যেন গোপনে কবর দেওয়া হয়। তাই তাঁর কবরের সঠিক অবস্থান দীর্ঘদিন অজানা ছিল। পরবর্তীতে একদল গবেষক ইরাকের নাজাফ শহরে তাঁর কবর রয়েছে বলে দাবি করেন, যেখানে এখনো ইমাম আলী মসজিদ রয়েছে। অপর দিকে আরেক দল দাবি করেন যে, হযরত আলীর দেহ আফগানিস্তানে নিয়ে কবর দেওয়া হয়।

অন্যান্য খেতাব
আওলাদ আল কাবা (কাবার সন্তান), আসাদুল্লাহ (আল্লাহর সিংহ) এবং হায়দার (সাহসী) ছাড়াও আরও কিছু খেতাবে ভূষিত হন হযরত আলী (রা)। মহানবীর প্রিয়ভাজন এবং তাঁর বর্ণনায় আল্লাহর প্রিয়ভাজন হিসেবে আলীকে আল মুরতাজা বা পছন্দের একজন বলে আখ্যায়িত করা হয়।

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হিসেবে অন্য খলিফাদের মতো আলীকে আমির উল মোমেনিন বা বিশ্বাসীদের দলপতি হিসেবে সম্বোধন করা হতো। হযরত আলী নানা বিষয়ে অত্যন্ত জ্ঞানী ছিলেন। বিশেষত আরবি সাহিত্য এবং আরবি ব্যাকরণে তাঁর পণ্ডিত্য ছিল।

মহানবীর কাছে প্রেরিত কোরআনের বাণী লেখকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আলী। মুহাম্মদের সঙ্গী হিসেবে ইসলামী বিষয়েও তাঁর জ্ঞানের সীমা ছিল না। একদল গবেষক বলেন, জীবদ্দশায় মহানবীকে নিজেকে জ্ঞানের শহর এবং আলীকে সেই জ্ঞানের শহরে প্রবেশের দরজা বলে অভিহিত করেন।

এ ক্ষেত্রে তাঁর উপাধি ‘বাবে মদিনাতুল ইলম’ অর্থাৎ জ্ঞানের শহরের দরজা। কোনো এক বিশেষ মুহূর্তে সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত হযরত আলী মাটির ওপর ঘুমিয়ে পরেন এবং তাঁর শরীর ধুলাবালু বা মাটিতে ঢেকে যায়। সেই দৃশ্য দেখে মহানবী আলীকে মাটির বাবা বা ‘আবু তুরাব’ উপাধি দেন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসলামে শিয়া-সুন্নি বিভক্তিসহ নানাবিধ কারণে আলীকে নিয়ে বহু মতামত পাওয়া যায়। তবে সব মতামতের ঊর্ধ্বে বাস্তবতা হলো আলী নিঃসন্দেহে আল্লাহকে ভয় করতেন, মহানবীকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন, ভোগ-বিলাসের পরিবর্তে একান্তে ধর্মচর্চা করতেন, সত্য কথা বলতেন ও ন্যায় বিচার করতেন।

তাই ইসলামের ইতিহাসে তিনি অনুকরণীয় বলে চিহ্নিত হয়েছেন। ১৯৯৭ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আলী প্রশাসনের যে অবয়ব তুলে ধরেছেন তাঁর উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়াও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে হযরত আলীর দর্শন মানব ইতিহাসে অমূল্য সম্পদ।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!