ঈর্ষা

মিথ্যাচার

-লুৎফর রহমান

যে জাতির লক্ষ্য ‘সত্য নহে, সে জাতির কোনো সাধনাই সফল হবে না। সত্যবর্জিত জাতির জীবন অন্ধকার। জাতির উন্নতির জন্য তারা বৃথাই শরীরের রক্ত ক্ষয় করে।

সত্যই শক্তি। ইহা সকল কল্যাণের মূল। ইহাতে মানুষের সর্বপ্রকার দুঃখের মীমাংসা হয়। সত্যকে ত্যাগ করে কোনো জাতি বড় হয় নাই, হবে না। মানব-জীবনের লক্ষ্যই সত্য। ইহাই শান্তি ও ঐক্যের পথ। সত্যের অভাব- বিরোধী ও দুঃখ সৃষ্টি করে। মানুষে মানুষে, বন্ধুতে বন্ধুতে, আত্মীয়ে আত্মীয়ে, পরস্পরে মনান্তর উপস্থিত হয়। সত্য বর্জন করে তোমরা কোনো কাজ করতে যেও না- এর ফল পরাজয়।

জনৈক কোম্পানির ডিরেক্টরকে জানি, তিনি মনুষ্যত্ব ও দেশসেবার নামে, মানুষের সঙ্গে কেবলই মিথ্যা ব্যবহার করতেন। মনুষ্যত্বের নামে দেশ-সেবককে সর্বপ্রকার মিথ্যা পরিহার করেই চলতে হবে। যদি মিথ্যাকে পরিহার করে না চলতে পার, তবে দেশসেবকের আসন ত্যাগ করে বরং পল্লীর একজন অজ্ঞাত মানুষ হও।

ছোট জীবনের ক্ষুদ্র কর্তব্যগুলি পালন কর। মিথ্যার সাহায্যে যদি কোনো বড় কাজ করতে অগ্রসর হয়ে থাক, বুঝতে হবে তুমি সে কাজের যোগ্য নও। সবিনয়ে সরে যাও। (গ্রন্থকার এক সময় তার উন্নত জীবন’ বইখানি নিয়ে কোনো এক সম্পাদকের কাছে গিয়ে সমালোচনা বের করতে অনুরোধ করেছিলেন।

তিনি স্বীকার করলেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় কোনোদিন সে পুস্তকের সমালোচনা বের হয় নাই। আর এক প্রবীণ সম্পাদকের কাছে তিনি দু’মাস ঘুরেছিলেন, প্রত্যেক বারই তিনি বলতেন, এইবার সমালোচনা বের হবে- তার সে কথা মিথ্যা।

এই সমস্ত কথা লেখবার উদ্দেশ্য দেশের ছোট বড় (?) কারো সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা নেই। তাঁদের প্রাণ দেশ প্রেমে এত পরিপূর্ণ (?) যে জীবনের ছোট ছোট কাজে তারা সত্য লক্ষ্য করতে পারেন না। অনেক সময় সাধারণ মনুষ্যের স্তর থেকে তারা এত ঊর্ধ্বে (?) উঠে যান যে, জীবনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্তব্যের কথা তাঁদের মনেই থাকে না। সত্য বলছি আদর্শ জীবনের ভাব ইহা নয়। জগৎ এই শ্রেণীর লোককে অশ্রদ্ধায় আসন ছেড়ে উঠে যেতে বলবেই।

জনৈক ইসলামের সেবক তিন বৎসর ধরে প্রতি সপ্তাহে লিখতেন, আগামী বারে আপনার কাজ হবে, কোনো দিন কাজ হয় নাই। এরূপ অনেক দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। কিন্তু তা দিয়ে কী হবে?

যদি জীবনকে সার্থক করে তোলবার ইচ্ছা হয়, মানুষের সাধুবাদ ও প্রশংসা অপেক্ষা যদি নিজের বিবেক ও মনকে তৃপ্ত করবার বাসনা থাকে যদি সত্যই মানব-সমাজের কল্যাণ করতে চাও, যদি যথার্থ মানুষ হয়ে জগতের সামনে আসন নিতে চাও, তবে সত্যকে শ্রদ্ধা করতে শেখ।

জাতির বড় কাজে বরং মিথ্যাকে সমর্থন করা যায়, কিন্তু জীবনের ছোট ছোট কাজে মিথ্যাচারণ কখনও সমর্থনযোগ্য নহে। জলো দুধ বিক্রয় করা, ভেজাল দ্রব্য বিক্রয় করা, মিথ্যা বিজ্ঞাপনে লোক ভুলিয়ে পয়সা উপায় করা, ঘৃতের নামে চর্বি বিক্রয় করা, স্টেশনে জন-সাধারণের কাছ থেকে কৌশলে টাকাটা-সিকিটা আদায় করা,

ইহাই ব্যক্তি এবং জাতির সিদ্ধি ও সফলতার পথ, ইহা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নাই। শ্রীরামকে ১৪ বৎসরের জন্য বনে পাঠিয়ে ঋষি বাল্মিকী জানাতে চেয়েছেন কথার মূল্য কী? সত্য রক্ষার জন্য রামকে সিংহাসন ত্যাগ করে কী কঠিন দুঃখই না বরণ করতে হয়েছিল; বস্তুত সত্য পালনের জন্য এইভাবে কঠিন দুঃসহ দুঃখই বরণ করতে হবে।

কথায় কথায় মিথ্যাচারণ, বাক্যের মূল্যকে অশ্রদ্ধা করা, এসব সত্যনিষ্ঠ জাতির লক্ষণ নয়। স্বাধীনতা পাবার জন্যে সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধহীন জাতি যতই চেষ্টা করুক, তাদের স্বাধীনতার মন্দির দ্বার থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হবে। যে জাতির অধিকাংশ ব্যক্তি মিথ্যাচারী, সেখানে দু-একজন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিকে জীবনে বহু বিড়ম্বনা সহ্য করতে হবে, কিন্তু মানব কল্যাণের জন্য, সত্যের জন্য সে বিড়ম্বনা ও নিগ্রহ সহ্য করতেই হবে।

ক্রয়-বিক্রয়ে, পারিবারিক কার্যে, অফিস-আদালতে, কাজ-কারবারে, পরস্পর বাক্যালাপে, রেল স্টীমারে সর্বত্রই জাতির মুক্তির জন্য যতই চিৎকার করি না কেন, জাতি যতক্ষণ না জাতির সর্ব প্রকার গ্লানি-মুক্ত হতে চেষ্টা করে, তাবৎ তার কল্যাণের কোনো আশা নাই। জাতির ও দেশের বড়াই যতই করি জগৎ সে বড়াই-এর দিকে ফিরে তাকাবে না।

সত্য মনুষ্যত্ব, মহানুভবতা ও ত্যাগই জাতীয় শক্তির মূল উপাদান। কার্থেজ যুদ্ধের বন্দি রেগুলাস (Regulus) তার বাক্যের মর্যাদা রক্ষা না করলেও পারতেন। তিনি সন্ধির জন্য কার্থেজ হতে রোমে এসে সিনেটরকে (Senator) বললেন, কার্থেজবাসীদের সঙ্গে কখনও নত হয়ে সন্ধি করো না।

রোম সন্ধি না করলে তিনি আবার কার্থেজে ফিরে যাবেন, এই প্রতিজ্ঞা করে এসেছিলেন। তিনি যখন প্রত্যাবর্তন করতে প্রস্তুত হলেন, তখন। সিনেটরেরা বললেন- শত্রুর কাছে প্রতিজ্ঞার কোনো মূল্য নাই। রেগুলাস (Regulus) বললেন, তোমরা আমার আত্মাকে অপমান করতে চাও?

কার্থেজে ফিরে গেলে আমার দণ্ড হবে, কিন্তু কোনোমতে আমি নীচ হতে পারব না। যে জাতির মধ্যে এই ধরনের মানুষ জন্মে, তারাই প্রাতঃস্মরণীয় জাতি। অট্টালিকা বিলাস-বাসনাশক্তি সভ্যতার নিদর্শন নয়। ত্যাগ, দুঃখবরণ এবং সত্যনিষ্ঠাই জাতির মুক্তির পথ প্রস্তুত করে। ধাপ্পাবাজিতে জগৎ টিকে নাই। ফাঁকি দিয়ে জয়লাভ সম্ভবপর নয়।

জাতির বড় কাজে বরং মিথ্যাকে সমর্থন করা যায়, কিন্তু জীবনের ছোট ছোট কাজে মিথ্যাচারণ কখনও সমর্থনযোগ্য নহে। জলো দুধ বিক্রয় করা, ভেজাল দ্রব্য বিক্রয় করা, মিথ্যা বিজ্ঞাপনে লোক ভুলিয়ে পয়সা উপায় করা, ঘৃতের নামে চর্বি বিক্রয় করা, স্টেশনে জন-সাধারণের কাছ থেকে কৌশলে টাকাটা-সিকিটা আদায় করা,

জমিদারি সেরেস্তায় ৫ টাকা বেতনে চাকরি করে কৌশলে মাসিক ১০০ টাকা উপায় করা, ৫০ টাকা বেতনের কেরানি হয়ে মাসিক ২০০ টাকা উপায় করা, এ সব কাজ জীবনের লজ্জা এবং হীনতার সূচনা করে। ধার্মিকতা শুধু মুখের কথা নয়, জীবনের কাজ।

(চলবে…)

<<মিথ্যাচার ।। প্রেম>>

………………..
মহৎ জীবন -লুৎফর রহমান।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………………….
আরও পড়ুন-
মানব-চিত্তের তৃপ্তি
আল্লাহ্
শয়তান
দৈনন্দিন জীবন
সংস্কার মানুষের অন্তরে
জীবনের মহত্ত্ব
স্বভাব-গঠন
জীবন সাধনা
বিবেকের বাণী
মিথ্যাচার
পরিবার
প্রেম
সেবা
এবাদত

………………….
আরও পড়ুন-
মহৎ জীবন : পর্ব এক
মহৎ জীবন : পর্ব দুই
মহৎ জীবন : পর্ব তিন
কাজ : পর্ব এক
কাজ : পর্ব দুই
কাজ : পর্ব তিন
কাজ : পর্ব চার
ভদ্রতা : এক
ভদ্রতা : দুই

……………………
আরও পড়ুন-
মহামানুষ … মহামানুষ কোথায়
মহিমান্বিত জীবন
মহামানুষ
যুদ্ধ
স্বাধীন গ্রাম্যজীবন
আত্মীয়-বান্ধব
সত্য প্রচার
নিষ্পাপ জীবন
উপাসনা
নমস্কার
তপস্যা
তীর্থ-মঙ্গল
আত্মার স্বাধীনতার মূল্যবোধ
মনুষ্য পূজা
মন্দতাকে ঘৃণা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!