ভক্তের প্রকার ভক্তি ভক্ত

মহৎ জীবন : পর্ব এক

-লুৎফর রহমান

সমুদ্রগর্ভে মালোকাই দ্বীপে কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত নর-নারীকে নির্বাসনে দেওয়া হতো। কেউ তাদের দেখবার ছিল না, ব্যাধি যন্ত্রণায়, দুঃখে তাদের জীবন শেষ হতো। চারিদিকে সমুদ্র, তার মাঝে আর্ত নর-নারী, বালক-বালিকা নিজেদের দুর্ভাগ্য ও আশাহীন, সান্ত্বনাহীন জীবন নিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় কাল কাটায়।

তারা আল্লাহকে ডাকত না, তাদের কোনো ধর্মজীবন ছিল না। তারা নিরন্তর ব্যাধি যন্ত্রণায় হা-হুঁতাশ করতো, আর অদৃষ্টকে অভিশাপ দিত। যাদের জীবনে কোনো আশা নাই, যারা আত্মীয়-পরিজন হতে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, যাদের কোনো সমাজ নাই, যাদের কেউ শ্রদ্ধা করবার নাই, যাদের দুঃখ-ব্যাথার কথা কেউ চিন্তা করে না- তাদের জীবন কত ভয়ানক, কত দুঃখময়, কত শোচনীয়!

এই অভিশপ্ত ও নির্বাসিত নর-নারীর জন্য কার প্রাণ অস্থির হয়েছিল? তাদের দুঃখের জীবন কার প্রাণে চিন্তা সৃষ্টি করেছিল? কে এই নির্বাসিতদের মাঝে যেয়ে তাদের সেবা করবে? তাদিগকে সান্ত্বনা দেবে? তাদেরকে আল্লাহ্ ও মহৎ জীবনের কথা শোনাবে?

তারা যে অভিশপ্ত! কে যাবে সেই দুঃসহ ব্যাধির সংস্পর্শে? তাদের কাছে যাওয়ার অর্থ- নিজের জীবনের সকল আশা-ভরসা জলাঞ্জলি দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে কুষ্ঠব্যাধিকে বরণ করে নেওয়া।

এ জগতে মানুষ নিজের সুখের জন্য কত লালায়িত, মানুষের সহানুভূতি ও বেদনাবোধ কত সুন্দর, কত মহৎ- মানুষ তা কবে বুঝবে? প্রকৃত সুখ কোথায়? পরকে ফাঁকি দিয়ে নিজেই সুখটুকু ভাগ করে নেওয়াতে কি সত্যিকারে সুখ আছে? আত্মার সাত্ত্বিক তৃপ্তির কাছে জড় দেহের ভোগ-সুখের মূল্য কিছুই না।

দামিয়ান নামক এক যুবক বহুদিন হতে এই নির্বাসিতদের কথা চিন্তা করেছিলেন। এই সুন্দর আকাশ, এই আলো গন্ধভরা মানব-সমাজ, জীবনের সহস্র ভোগ-আকর্ষণ একদিকে, অন্যদিকে রোগপীড়িত নর-নারীর করুণ মুখ- আতুরের গগনবিদারী চিৎকার- আর সীমাহীন আঁধারে ব্যথিতের করুণ মুখেরই জয় হল।

জীবনের সকল আশা কামনাকে বিসর্জন দিয়ে যুবক দামিয়ান নির্বাসিত কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্তদের সেবার জন্য প্রস্তুত হলেন, বন্ধু প্রতিবেশীদের সমালোচনা, আত্মীয়-স্বজনের মিনতি তার সঙ্কল্পকে দমাতে পারলো না। দামিয়ান একদিন ফরাশি দেশের উপকূলকে শেষ নমস্কার করে একখানি বাইবেল আর একটা সাগরের মতো বিরাট আত্মা নিয়ে আর্তের সেবায় সমুদ্রপথে যাত্রা করলেন।

আহা! বিরাট মনুষ্যত্ব! যে জীবন সহস্র ভোগের শিক্ষা দিয়ে উজ্জ্বল করে তোলা যেতো সীমাহীন সুখ দিয়ে যাকে ভরে দেওয়া যেতো, তা এখন দুস্থ নর-নারীর চিৎকার ক্রন্দনের মাঝে ব্যয়িত হতে লাগলো। দামিয়ান পিতার মতো, মায়ের মতো, বন্ধুর মতো ব্যাধিগ্রস্ত মানুষগুলিকে সেবা করতে লাগলো।

তিনি যখন তাদিগকে নিয়ে সাগরকূলে বসে। আল্লাহর স্নেহের কথা বর্ণনা করতেন- যখন তিনি বলতেন, মানুষের জন্য এক অফুরন্ত আনন্দের রাজ্য আছে, আমরা সেই দিকে যাচ্ছি- ব্যাধিপীড়া দিয়ে খোদা আমাদেরকে তার অসীম স্নেহের পরিচয় দিচ্ছেন, তখন সবাই কাঁদতো, আকাশ থেকে ফেরেস্তা আশীর্বাদের অশ্রু দিয়ে তাদের সংবর্ধনা করতো, স্তব্ধ সমুদ্রের বুকের উপর দিয়ে বাতাস তাদের শোক গৌরব গেয়ে ফিরতো।

কী মহৎ এই মহাপুরুষের জীবন- কত বড় তিনি ছিলেন।

ঊনিশ বছরের সেবার পর দামিয়ান একদিন বুঝতে পারলেন- কাল ব্যাধি তাকেও ধরেছে। তিনি সেদিন সকলকে এক জায়গায় করে বললেন, আজ আমার আনন্দের সীমা নাই। আজ তোমাদেরই মতো আমি একজন হয়েছি। এতদিন তোমাদের সঙ্গে আমার ভালো করে আত্মীয়তা হয় নাই, একটু বিভেদ ছিল,- আজ খোদা সে বিভেদটুকু তুলে নিয়ে তোমাদের সঙ্গে আমায় এক করে দিয়েছেন। আজ তাঁর স্নেহের কথা স্মরণ করে

আমাদের চোখে পানি আসছে। আজ আমাদের উপাসনা বড় মধুর, বড় সুন্দর হবে।

ক্রমে দামিয়ানের সোনার শরীর ভেঙ্গে এল। অবশেষে এই মহাপুরুষ মানব-সমাজে তার মহৎ জীবনের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে একদিন প্রাণত্যাগ করলেন। দামিয়ান মরেন নি- মানুষ চিরকাল তাঁর স্মৃতির সম্মান করবে।

এ জগতে মানুষ নিজের সুখের জন্য কত লালায়িত, মানুষের সহানুভূতি ও বেদনাবোধ কত সুন্দর, কত মহৎ- মানুষ তা কবে বুঝবে? প্রকৃত সুখ কোথায়? পরকে ফাঁকি দিয়ে নিজেই সুখটুকু ভাগ করে নেওয়াতে কি সত্যিকারে সুখ আছে? আত্মার সাত্ত্বিক তৃপ্তির কাছে জড় দেহের ভোগ-সুখের মূল্য কিছুই না।

যতদিন না মানুষ পরকে সুখ দিতে আনন্দ বোধ করবে, ততদিন তার যথার্থ কল্যাণ নাই। আর্তক্ষুধিত আমার সামনে আঁখিজলে ভেসে বেড়াচ্ছে, আমি কোন প্রাণে আনন্দ-উৎসবে যোগ দেব? আর্তের দুঃখের মীমাংসা চাই, ক্ষুধিতের শান্তি চাই।

আলো বাঁশরীর রাগিণী, মানবকণ্ঠের সঙ্গীতধ্বনি, আর্তের অশ্রু মানুষকে কেবলই মহত্ত্বের পথে ডাকছে। মিথ্যা এ জীবন, এ সুখ, এ বিষয়-বৈভব। জীবনে যে সকার্য করা যায়, তাই মানুষকে তৃপ্তি দিতে সক্ষম। দালান-কোঠা, হাতি-ঘোড়া, শত শত বিলাস উপহার কিছুরই মাঝে মানুষের তৃপ্তি নাই।

মানুষের জড়দেহের ব্যথার জন্য যে বেদনাবোধ, এ ছাড়া আর এক প্রকার বেদনাবোধ আছে। জ্ঞান ও অজ্ঞানে মানুষের আত্মার যে অবনতি ঘটে, তা দেখে মহাপ্রাণ ব্যক্তিরা যে বেদনাবোধ করেন, তাও সমান মহত্ত্বের পরিচায়ক। আত্মার দারিদ্র্য ও মানুষের শরীর-মন উভয়কেই ধ্বংস করে।

মানুষের পাপ মানব-সমাজকে মৃত্যুর পথে টেনে নিয়ে যায়। তার জন্য অসীম দুঃখ সৃষ্টি করে। পাপী শুধু নিজে পাপ করে না, তার অত্যাচারের আঘাত সহ্য করতে যেয়ে মানব-সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যায়। যে মানুষের চোখ থেকে রক্ত টেনে বের করে মানব হৃদয়ে চিতার আগুন জ্বেলে দেয়, সে জীবন্ত অভিশাপ হয়ে এ জগতে বাস করে। সে নিজের বুকে ছুরির আঘাত করে অথচ সে বুঝতে পারে না, সে কি করছে।

মানব-সমাজকে বাঁচাবার জন্যে অসীম প্রেমে, অনন্ত ব্যথা-অনুভূতিতে মহাপুরুষেরা পাগল হয়ে যান। তাদের বিরাট স্নেহের কল্যাণ আহ্বানে যারা সাড়া দেয়; তারা সৌভাগ্য লাভ করে।

আরব সমাজের পাপ- আর ব্যথিতের মর্মপীড়া মহাপুরুষ মোহাম্মদ (স)-কে কাঁদিয়েছিল- তিনি মানুষ মানুষ বলে পথে বের হয়েছিলেন।

যুবক বুদ্ধের প্রাণে মানুষের দুঃখ ও ব্যথা কী অসীম বেদনা সৃষ্টি করেছিলে- কত সুখ, কত বিলাস ত্যাগ করে ঘর ছেড়ে মানুষের দুঃখ ব্যথার মীমাংসার জন্য তিনি বনে বনে ছয় বৎসর তপস্যা করেছিলেন। তাঁর শরীরের উপর দিয়ে গাছ হয়ে গিয়েছিল। কী বিরাট মনুষ্যত্বের গৌরব দিয়ে খোদা তাঁকে এ জগতে পাঠিয়েছিলেন।

মানুষ যখন মহামানবতার পরিচয় দেন, তখন কেউ কেউ তাকে খোদার আসন দিয়ে থাকে। এতে মহামানুষদিগকে অপমান করা হয়। নারায়ণ হয়ে মহাপুরুষদের মোটেই তৃপ্তি। হয় না, তাঁরা চান মানব দুঃখের অবসান, অসত্য ও মিথ্যার বিরুদ্ধে মানব-সমাজের বিদ্রোহ। মহাপুরুষেরা যদি মানবসাধারণের কাছ থেকে নারায়ণ উপাধি পান, তাতে তাদের জীবনের বিশেষত্ব নষ্ট হয়।

জীবনে মহৎ হয়ে লাভ কী? কেননা আমরা মানুষ। রাজা হবার দাবি একমাত্র মানুষেরই আছে। দুঃখ, পাপ ও অজ্ঞানের আঁধারকে দুই হাত দিয়ে ঠেলে ফেলে। আমাদিগকে উধ্ব হতে ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। কী বিরাট আলোক, কী অফুরন্ত আনন্দের রাজ্য মানুষের সামনে, মানুষ তার গৌরব ভুলে কী করে আঁধার ও মৃত্যুর পথে হাঁটবে?

মানুষকে। মহৎ করতে হবে কারণ মহৎ হবার জন্যই সে এ জগতে এসেছিল। দুঃখ-ব্যথা, মায়া প্রলোভনের ভিতর দিয়ে, সে যে কত বড়, তাই সে প্রমাণ করবে। মানুষ কত বড়, সে কী বিরাট, তার পক্ষে দুর্বলতার পরিচয় দেওয়া কত বড় বোকামি, তার কতখানি অপমান হয়। সারা প্রকৃতি মানুষকে কত বড় হবার জন্যে ডাকছে, উদার আকাশ, উষা।

আলো বাঁশরীর রাগিণী, মানবকণ্ঠের সঙ্গীতধ্বনি, আর্তের অশ্রু মানুষকে কেবলই মহত্ত্বের পথে ডাকছে। মিথ্যা এ জীবন, এ সুখ, এ বিষয়-বৈভব। জীবনে যে সকার্য করা যায়, তাই মানুষকে তৃপ্তি দিতে সক্ষম। দালান-কোঠা, হাতি-ঘোড়া, শত শত বিলাস উপহার কিছুরই মাঝে মানুষের তৃপ্তি নাই।

তিনি নিজের আসনের অবমাননা করে বাদশাহের জামাতাকে বিশেষ কিছু শাস্তি দিলেন না। আহম্মদ শাহ যখন শুনলেন- তার দরিদ্র প্রজা ন্যায় বিচার পায় নি, তখন তার ভিতরকার মানুষ করুণ ঘৃণায় উত্তেজিত হয়ে উঠলো। তিনি বিচারককে ডেকে বল্লেন- সাহেব, বিবেক-বুদ্ধিকে অবহেলা করে ন্যায় বিচারকে অবমাননা করে আপনি কী করে আমার নরহন্তা জামাতাকে মুক্তি দিলেন?

রানী ভিক্টোরিয়া একবার একখানা মৃত্যুদণ্ডের আদেশপত্রে স্বাক্ষর করতে যেয়ে সজল নয়নে ডিউক অব ওয়েলিংটনকে জিজ্ঞাসা করেন- ডিউক সত্যই কি এই ব্যক্তির প্রাণদণ্ডের আদেশ দিতে হবে? একে কি কিছুতেই রক্ষা করা যায় না?

ডিউক অপ্রস্তুত হয়ে বল্লেন- না মহারানী, এই ব্যক্তি তিনবার আইন অমান্য করেছে।

যার মৃত্যুর আদেশ দিতে হবে, সে ছিল একজন সৈনিক, সে তিনবার যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়েছিল। সৈনিকের পক্ষে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পালিয়ে যাওয়া গুরুতর অপরাধ, এতে প্রাণদণ্ড হয়।

মহারানী আবার জিজ্ঞাসা করলেন- তা হলে এই ব্যক্তির সপক্ষে কিছুই আপনার বলবার নাই? ডিউক বল্লেন- লোকটি সামরিক আইন অমান্য করলেও এর স্বভাব বড় ভালো।

দয়াবতী রানী তখনই কাগজের উপর লিখলেন এর প্রাণদণ্ডের আদেশ প্রত্যাহার করা গেল।

হযরত আলীর (রা) সঙ্গে এক ব্যক্তির লড়াই হয়েছিল। লোকটির গায়ে অসীম শক্তি ছিল, মুসলমান সাম্রাজ্যের খলিফাও কম শক্তিশালী ছিলেন না। হযরত আলী তাকে যখন মাটির উপর ফেলে হত্যা করবেন তখন সে হঠাৎ খলিফার মুখে থুতু ফেলে দিল। খলিফা তৎক্ষণাৎ তাকে ছেড়ে দিয়ে বল্লেন- এখন যেতে পার, তোমায় আর আমি কিছুই করব না।

লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, আপনার এই ব্যবহারের কারণ কী? হযরত আলী (রা) বল্লেন-ঘৃণা-বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে আমি তোমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করি নি। তুমি দুষ্ট, মানব সমাজের সমূহ অকল্যাণ করছিলে, তাই তোমাকে শাস্তি দিতে প্রস্তুত হয়েছিলাম।

যখন আমার মুখে তুমি থুতু দিয়েছিলে তখন আমার মনে ক্রোধ হয়েছিল। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে আল্লাহ্র মানুষ আমি হত্যা করি নি। হযরত আলীর এই চরিত্র মহিমা মানুষের মনকে কত পবিত্র করে দেয়; আত্মবুদ্ধি কত উপরে টেনে তোলে।

গুজরাটের রাজা আহমদ শাহের জামাতা এক সময় একটা মানুষ খুন করেছিল। হত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনেরা যখন বিচারকের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনয়ন করলো, তখন বিচারক ভাবলেন- জামাতার অপরাধের শাস্তি দিলে সম্রাট আমার উপর রুষ্ট হতে পারেন। এই চিন্তা তার বিবেক-বুদ্ধিকে দুর্বল করে দিল।

তিনি নিজের আসনের অবমাননা করে বাদশাহের জামাতাকে বিশেষ কিছু শাস্তি দিলেন না। আহম্মদ শাহ যখন শুনলেন- তার দরিদ্র প্রজা ন্যায় বিচার পায় নি, তখন তার ভিতরকার মানুষ করুণ ঘৃণায় উত্তেজিত হয়ে উঠলো। তিনি বিচারককে ডেকে বল্লেন- সাহেব, বিবেক-বুদ্ধিকে অবহেলা করে ন্যায় বিচারকে অবমাননা করে আপনি কী করে আমার নরহন্তা জামাতাকে মুক্তি দিলেন?

বিচারক লজ্জিত হয়ে বল্লেন- সম্রাট, আপনার জামাতা বলেই তাকে কিছু বলি নি, অন্য কেউ হলে তাকে কঠিন শাস্তি দিতাম।

সম্রাট বল্লেন- এর নাম কি বিচার? আমি যদি অন্যায় করতাম তা হলে আমাকেও কি – আপনি আইন অমান্য করে মুক্তি দিতে পারতেন? আপনি আপনার সুবুদ্ধিকে-ভয় করুন, আমাকে ভয় করবেন না। পাছে আমি কী মনে করি, এই ভয়েই হয়তো অপরাধীকে শাস্তি দিতে আপনি কুণ্ঠিত হয়েছেন। আমি কাপুরুষ বা অত্যাচারী রাজা নই। যার স্নেহের ধনকে আমার জামাতা হত্যা করেছে- তার অশ্রুর কি কোনো মূল্য নাই?

শত্রুরা হোরেশিওকে শত শত অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করলো। দুই হাত দিয়ে দীর্ঘ কুড়ুলের বাঁট ধরে হোরেশিও শক্রদলকে আঘাত করতে লাগলেন। সে কী ভীষণ দৃশ্য! কী অমানুষিক শক্তি-পরীক্ষা! সিংহের সামনে মেষপালের যেমন অবস্থা হয়, বিক্রম-উন্নত বীরবর হোরেশিওর সামনেও শত্রুদের তেমনি অবস্থা হতে লাগলো।

আহম্মদ শাহ অবিলম্বে জামাতার পুনর্বিচার করে তার প্রাণদণ্ডের আদেশ দিলেন।

মহৎ ব্যক্তির কাছে সকলেই সমান, আপন-পর নাই। অন্যায় যে করেছে, সে আপন রক্তের কেউ হলেও তিনি তাকে শাস্তির হাত হতে রক্ষা করতে পারেন না।

তুমি অত্যাচারী বড় মানুষ আছ, তুমি গোপনে কোনো দরিদ্রের সর্বনাশ করেছ, তুমি আমার মিত্র, তোমার পত্নীর সঙ্গে আমার পত্নীর আলাপ আছে, তাই বলে কি তোমার সপক্ষে আমি কোনো কথা বলতে পারি? আমি আঁখিজলে তোমার ধ্বংসের ব্যবস্থা করবো। তুমি মিত্র বলে আমার বেশি আত্মীয় নও, মানব মাত্রেই আমার আত্মীয়। যে অত্যাচারী, যে মিথ্যার উপাসক, যে হীন দুবৃত্ত, সে আমার আত্মীয় হলেও কেউ নয়।

যে মহৎ, যে বড়, তাকে প্রশংসার লোভ না করেই বড় ও মহৎ হতে হবে। জাতির মধ্যে যখন বড় চরিত্র ও উন্নত জীবনের অভাব পরিলক্ষিত হয়, তখন জাতির দুরবস্থার কথা ভেবে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলতে হয়। কতকগুলি কাপুরুষ, মূর্খ ও হীন মানুষের জীবন জাতির দেহে শক্তি সঞ্চার করতে সক্ষম নয়। জাতির শক্তির পরিচয় পাওয়া যাবে তখন, যখন তার সন্তানগুলি মহত্ত্বকে সম্মান করতে শিখবে- যখন তারা ন্যায় ও সত্যকে সমাদর করতে জানবে।

জীবনের সব সময় ছোট বড় সকল কাজে মহত্ত্ব ও সুন্দর চরিত্রের পরিচয় দিতে হবে।

শত্রু রোমের দুয়ারে হামলা করেছে। তখনই তারা পঙ্গপালের মতো এসে রোম নগর ধ্বংস করে। আর তো সময় নাই। নদীর ব্রীজ ভেঙ্গে দিতে পারলে রক্ষা পাওয়া গেল নইলে আর কোনো উপায় নাই। যুবক হোরেশিও বল্লেন, দেশের সম্মান রক্ষা করবার জন্য কে কে প্রাণ দিবার জন্যে আমার সঙ্গে যাবে- মৃত্যু অবধারিত; কারণ পেছন থেকে ব্রীজ ভেঙ্গে দিলে আমরা আর কিছুতেই ফিরতে পারবো না।

মরতে আমাদিগকে হবেই। দুজন। বীর যুবক হোরেশিওর সঙ্গে গেল ব্রীজ ভাঙ্গার জন্য আরও মানুষ তাদের সঙ্গে গেল। পেছনের লোকদিগকে হোরেশিও চিৎকার করে বললেন, আমরা সম্মুখে দাঁড়িয়ে শত্রুদের গতিরোধ করছি, তোমরা পিছন থেকে ব্রীজ ভেঙ্গে দাও।

শত শত লোক মুহুর্মুহু ব্রীজের উপর আঘাত করতে লাগলো। সম্মুখের অগণিত সৈন্যের সামনে তিন বীর যুবক কুড়ুল তুলে দাঁড়িয়ে রইলেন। শত্রুর বজ্র-ভীষণ আক্রমণের অপেক্ষা করতে লাগলেন। পেছনের লোকগুলি প্রাণপণ শক্তিতে ব্রীজকে ভেঙ্গে দেবার চেষ্টা করতে লাগলো।

শত্রুদল ব্রীজের সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়ে দেখলো, ব্রীজ ভেঙ্গে দেবার চেষ্টা হচ্ছে- রোম নগরে প্রবেশ করবার এই একমাত্র পথ। ব্রীজ ভেঙ্গে গেলে তাদের অভিযান ব্যর্থ হয়ে যাবে। কোনো রকমে নগরে প্রবেশ করা সম্ভব হবে না। সেনা নায়ক হুকুম দিলেন- আর বিলম্ব নয়। হোরেশিও আর তার দুই সহযোগীর কুঠারকে ভয় করো না। ব্রীজ ভেঙ্গে গেলে আমাদের অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে না।

হোরেশিওর দুঃসাহস দেখে মুহূর্তের জন্য শত্রুরা একটু হেসে নিলে, এতবড় সৈন্যবাহিনীর সামনে মাত্র তিনটি বীর। কী উন্মত্ততা!

শত্রুরা হোরেশিওকে শত শত অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করলো। দুই হাত দিয়ে দীর্ঘ কুড়ুলের বাঁট ধরে হোরেশিও শক্রদলকে আঘাত করতে লাগলেন। সে কী ভীষণ দৃশ্য! কী অমানুষিক শক্তি-পরীক্ষা! সিংহের সামনে মেষপালের যেমন অবস্থা হয়, বিক্রম-উন্নত বীরবর হোরেশিওর সামনেও শত্রুদের তেমনি অবস্থা হতে লাগলো।

মানুষের জীবনের দুঃখ দেখলে তিনিও দুঃখ বোধ করেন, তখন তিনি ব্যথা পেয়েও কিছু করেন না। মানুষ ইচ্ছা করে পাপ বরণ করে নেয়, খোদা তার গতিকে রোধ করেন না। এরূপ করলে তার সৃষ্টির আইন-শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যায়। খোদা কতবার আঁখিজলে মানুষকে ‘আয়’ ‘আয়’ করে ডাকছেন, অবোধ মানুষ তা দেখে না। খোদা জলে, স্থলে, সারা পৃথিবীর পথে পথে মানুষের জন্যে কেঁদে বেড়াচ্ছেন। মানুষ তা জানে না

আর কিছুক্ষণ লড়তে পারলেই কাজ হাসিল হয়; আর পনেরো মিনিটেই ধ্বংসকার্য শেষ হবে। হোরোশিও প্রাণপণ শক্তিতে লড়তে লাগলেন, যায় প্রাণ যাবে, দেশের লক্ষ নর-নারীর স্বাধীনতা সম্মান তার হাতে। এত বড় মহত্ত্বের পরিচয় দিবার সুযোগ আর আসবে না।

পার্শ্বেই দুই ব্যক্তি অবসন্ন হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। আর পাঁচ মিনিট হলেই কাজ হাসিল হয়।

এইবার ব্রীজ বজ্রের শব্দে নদীর মধ্যে ভেঙ্গে পড়লো। হোরেশিও কুড়ুল দূরে নিক্ষেপ করে খরস্রোতা স্রোতোস্বিনীর মাঝে ঝাঁপ দিলেন। দশকে রক্ষা করা হয়েছে, এইবার মরণেও আনন্দ।

তীরে দাঁড়িয়ে অসংখ্য নরনারী আনন্দ-চিৎকার গগন কাঁপিয়ে তুলছিল। রোমবাসীরা তীর হতে নৌকা নিয়ে অগ্রসর হল। শত্রুরা অবাক হয়ে এই দৃশ্য দেখতে লাগলো।

মহত্ত্বের পরিচয় দেওয়া মানুষের পক্ষে যদি অসম্ভবও হয়, তবু সে নীচতার পরিচয় কেন নেয়? জীবনকে পাপ ও অন্যায়ে কলঙ্কিত কেন করে? দিনে-দুপুরে মানুষের মাথায় বাড়ি দেওয়া, পত্নীর উপর অত্যাচার করা, ব্যভিচার-স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া, পত্নীর দাবিকে অগ্রাহ্য করে চরিত্রহীন হওয়া- এইগুলিকেই শুধু পাপের পূর্ণ চিত্র বলা যায় না।

মানুষের শত রকমে পতন হয়, শত রকমে সে তার মানুষ্যত্বের অপমান করে। নিজেকে অপমান করবার মতো লজ্জা মানব-জীবনে আর কি আছে? আত্মসর্বস্ব হয়ে জীবন কাটানো, জ্ঞানাবদ্ধ মানুষের দুঃখ পাপকে সহ্য কর, নিজের ও জাতির মূর্খতায় কিছুমাত্র কষ্ট বোধ না করা- নিকৃষ্ট মানুষের স্বভাব।

এক সময়ে এক বালক কোনো শহরের পথে বসে কাঁদছিল। সে বাড়ি হতে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে বেরিয়ে এসেছিল, হাতে তার একটা পয়সাও ছিল না- তখন শীতকাল, শীতের কাপড়ও সঙ্গে ছিল না।

এর উপর বালকের গায়ে জ্বর এসেছিল, সে সেই অপরিচিত দেশে কাকেও চিনতো না, কারো কাছ থেকে কেমন করে সাহায্য চাইতে হয় তাও সে। জানত না। পথিকেরা কয়েকবার তার কাঁদবার কারণ জিজ্ঞাসা করেছিল- কিন্তু বালক উত্তরে কিছুই বলতে পারে নি।

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল। শীত আর শারীরিক কষ্টে বালকটি মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হল- মায়ের মুখোনি মনে করে তার চোখ দুটি পানিতে ভরে উঠেছিল। কাছে কিনারে লোকজনের বিশেষ বসতি ছিল না। খোদা সব জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন এ তোমরা বিশ্বাস। কর।

মানুষের জীবনের দুঃখ দেখলে তিনিও দুঃখ বোধ করেন, তখন তিনি ব্যথা পেয়েও কিছু করেন না। মানুষ ইচ্ছা করে পাপ বরণ করে নেয়, খোদা তার গতিকে রোধ করেন না। এরূপ করলে তার সৃষ্টির আইন-শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যায়। খোদা কতবার আঁখিজলে মানুষকে ‘আয়’ ‘আয়’ করে ডাকছেন, অবোধ মানুষ তা দেখে না। খোদা জলে, স্থলে, সারা পৃথিবীর পথে পথে মানুষের জন্যে কেঁদে বেড়াচ্ছেন। মানুষ তা জানে না।

(চলবে…)

মহৎ জীবন : পর্ব দুই>>

………………..
মহৎ জীবন -লুৎফর রহমান।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

………………….
আরও পড়ুন-
মহৎ জীবন : পর্ব এক
মহৎ জীবন : পর্ব দুই
মহৎ জীবন : পর্ব তিন
কাজ : পর্ব এক
কাজ : পর্ব দুই
কাজ : পর্ব তিন
কাজ : পর্ব চার
ভদ্রতা : এক
ভদ্রতা : দুই

……………………
আরও পড়ুন-
মহামানুষ … মহামানুষ কোথায়
মহিমান্বিত জীবন
মহামানুষ
যুদ্ধ
স্বাধীন গ্রাম্যজীবন
আত্মীয়-বান্ধব
সত্য প্রচার
নিষ্পাপ জীবন
উপাসনা
নমস্কার
তপস্যা
তীর্থ-মঙ্গল
আত্মার স্বাধীনতার মূল্যবোধ
মনুষ্য পূজা
মন্দতাকে ঘৃণা

……………………….
আরও পড়ুন-
মানব-চিত্তের তৃপ্তি
আল্লাহ্
শয়তান
দৈনন্দিন জীবন
সংস্কার মানুষের অন্তরে
জীবনের মহত্ত্ব
স্বভাব-গঠন
জীবন সাধনা
বিবেকের বাণী
মিথ্যাচার
পরিবার
প্রেম
সেবা
এবাদত

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!