মহাতাপস শ্রীশ্রী বালানন্দ ব্রহ্মচারী

বাবা মহারাজের ঝুলিতে তখন ছিল কিছু কাঁচা তরি-তরকারি। আঙ্গুর বা কোন ফল ছিল না। কিন্তু ব্রহ্মানন্দ মহারাজ ঝুলির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তৎক্ষণাৎ একথোকা আঙ্গুর বার করে দিলেন মহারাণীকে। মহারাণী তা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর গুরুজীর যোগবিভূতির ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

এই পরিহাসরসিকতা ও রঙ্গব্যঙ্গের অন্তরালে তাঁর অসাধারণ যোগশক্তিকে গোপন রাখতেন মহারাজ।

এই সময় কিশোর সাধক বালানন্দজী পরিব্রাজনে বার হতে চান। সাত আট মাস গঙ্গোনাথ আশ্রমে থাকার পর একদিন গুরুর কাছে অনুমতি নিয়ে নর্মদার তীর ধরে হাঁটতে লাগলেন। শুরু হলো প্রথম সাধক জীবনের পরিব্রাজন।

যাত্রাপথে একদিন শক্তিমান সাধক গৌরীশংকর মহারাজের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল বালানন্দজীর। গৌরীশংকর মহারাজ তখন বহু শিষ্য ও ভক্তবৃন্দকে নিয়ে সঙ্গে নিয়ে নর্মদা পরিক্রমা করে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে অসামান্য যোগশক্তির অধিকারী এবং শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত।

এই গৌরীশংকর মহারাজকে তাঁর শিক্ষাগুরু হিসাবে বরণ করে নেন বালানন্দজী। এবং তাঁর কাছে সাত আট বছর অবস্থান করেন। নর্মদা নদীর তীর ধরে যেতে যেতে মাঝে মাঝে যখনি এক একটি ঘাটে দু’চার দিনের মত অবস্থান করতেন গৌরীশংকর মহারাজ তখন সেখানে সাধু জমায়েত হত এবং ভাণ্ডারার অনুষ্ঠান হত।

কিছুদিন গৌরীশংকর মহারাজের কাছে থাকার পর বালানন্দ একাই বেরিয়ে পড়লেন পরিব্রাজনে। তবে যখন যেখানে থাকুন না কেন, মাঝে মাঝে গুরুজী ব্রহ্মানন্দ যতদিন জীবিত ছিলেন গঙ্গোনাথ আশ্রমে তাঁর কাছে ছুটে যেতেন। যোগসাধনার নিগূঢ় পদ্ধতিগুলি শিখে নিতেন গুরুজীর কাছে।

নর্মদা পরিক্রমণ তখনো শেষ হয়নি বালানন্দজীর। একবার তিনি একা একাই পরিক্রমা করে বেড়াচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিল কমবয়সী এক সাধু। পথেই সঙ্গী হয় সে। পথে মাঝে মাঝে দুর্ভোগের মধ্যেও পড়তে হত।

একবার নর্মদার তীরে মাণ্ডানা নামে এক জায়গায় উপস্থিত হন‌। তাঁর সঙ্গে সেই নবীন সন্ন্যাসীটিও ছিল। তাঁদের দু’জনের কাঁধেই ছিল একটা করে ঝোলা আর একটা করে কম্বলের পুঁটলি।

সেই সময় মাণ্ডানা অঞ্চলে খুব চুরি ডাকাতি হচ্ছিল। এজন্য বিভাগীয় কমিশনার সাহেব নিজে পরিদর্শন করতে এসেছেন। তিনি যে বাংলোয় অবস্থান করছিলেন, একদিন ঘুরতে ঘুরতে‌ বালানন্দজী ও সেই সাধু সেই বাংলোর উঠোনে এসে বসেন কিছুক্ষণের জন্য। এমন সময় কমিশনার তাঁদের দেখতে পান।

দুজন যুবক সাধুকে দেখে সন্দেহ হলো সাহেবের। তিনি ভাবলেন, এরা প্রকৃত সাধু নয়, ভণ্ড, চুরি ডাকাতি করে বনে পালিয়ে যায়। তাই তিনি তখনি তার চাপরাশীদের হুকুম দিলেন, ঐ সাধু দুজনকে ধরে আন।

সাধু দুজনকে সাহেবের সামনে আনা হলে তাঁদের বললেন, তোমরা সাধু না, চোর আছ।

এই বলে তাঁদের ঝোলা পুঁটলি সব তল্লাসী করতে হুকুম দিলেন। ঝোলার মধ্যে দুটি ছোট আকারের শাবল আর টাঙ্গি পাওয়া গেল। এই শাবল দিয়ে তাঁরা বনে কন্দমূল খুঁড়ে খেতেন আর টাঙ্গি দিয়ে গাছপালা কেটে কুঁড়ে নির্মাণ করতেন।

শাবল আর টাঙ্গি দেখে সন্দেহ আরও বেড়ে গেল সাহেবের। একটি মোড়কে কিছু গাঁজা আর এক মোড়কে কিছু শঙ্খবিষ পাওয়া গেল। তীব্র শীতের সময় এই শঙ্খবিষ কিছু কিছু খেয়ে গা গরম করে সাধুরা। কিন্তু সাধুদের ঝুলির মধ্যে এ সব দেখে রাগে আগুন হয়ে উঠলেন কমিশনার সাহেব।

ভদ্রলোকের কথায় সাহেবের চৈতন্য হলো। তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ডাক্তার ডাকলেন। ডাক্তার এসে ওষুধ দিয়ে বালানন্দজীকে বমি করালো। বমির সঙ্গে বিষ উঠে যেতে তিনি সুস্থ হলেন। সাহেব তখন সাধু দুজনকে মুক্তি দিলেন। সেই সময়ে ভদ্রলোকটি বালানন্দজী ও তাঁর সঙ্গী সাধুকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তাঁদের সেবা করলেন। সেখানে দিনকতক থেকে আবার পরিব্রাজনে বেরিয়ে পড়লেন বালানন্দজী।

সাহেব বললেন, দেখছি, তোমরা শুধু চোর ডাকাতই নও, খুনী ও দস্যু। এত বেশী শঙ্খবিষ নিয়ে কি করো? নিশ্চয় এই বিষ মানুষকে খাইয়ে খুন করো। দাঁড়াও, তোমাদের তিন বছর জেল খাটাচ্ছি।

বালানন্দ সাহেবকে অনেক করে বোঝালেন, শাবল দিয়ে আমরা কন্দমূল তুলে খাই। টাঙ্গি দিয়ে কুটির নির্মাণ করি। গাঁজা ও শঙ্খবিষ পরিব্রাজনরত সাধুদের দরকার হয়। শীতের রাতে শীত নিবারণে শঙ্খবিষের দরকার হয়। সাহেব কিন্তু কোন কথা শুনলেন না। বললেন, আমার সামনে শঙ্খবিষ খেয়ে দেখাতে পার ভাল। তা না হলে জেল খাটতে হবে।

মহাবিপদে পড়লেন বালানন্দজী। জেল খাটতে গিয়ে কয়েদখানায় নানা অত্যাচার সহ্য করে জীবন্মৃত অবস্থায় বাঁচার থেকে শঙ্খবিষ খেয়ে প্রাণত্যাগ করাও ভাল। এই ভেবে মোড়কের মধ্যে যে শঙ্খবিষ ছিল তা সবটা সাহেবের সামনে খেয়ে ফেললেন তিনি। তিনি বুঝতে পারলেন এই বিষে মৃত্যু তাঁর অনিবার্য।

তাই তিনি তাঁর সঙ্গী সাধুটিকে বললেন, ভাই! আমার কণ্ঠতালু শুকিয়ে আসছে, চোখে অন্ধকার দেখছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মৃত্যু হবে। আমার মৃত্যুর পর তুমি আমার দেহটি নর্মদার জলে ফেলে দেবে। তারপর যেখানে ইচ্ছা চলে যাবে।

এমন সময় তাঁর চোখের সামনে নর্মদা মাতার মূর্তিটি ভেসে উঠল। তিনি তাঁকে অভয় দিয়ে অন্তর্হিতা হয়ে গেলেন। এদিকে বালানন্দজী চেতনা হারিয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।

এমন সময় সাহেবের বাংলোয় এক কাণ্ড ঘটে গেল। সাহেবের অল্পবয়স্ক একটি ছেলে শিকার থেকে ফিরে এসেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রবল ভেদবমি হতে থাকে। শহর থেকে ডাক্তার ডেকে আনার আগেই ছেলেটির মৃত্যু হয়।

এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় সাহেব হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। এমন সময় স্থানীয় এক সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোক সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসে সাধুদের ব্যাপারটি শোনেন। তিনি দেখেন সাহেবের ভয়ে বিষপান করে একটি সাধু মরার মত পড়ে আছে।

ভদ্রলোক তখন সাহেবকে বললেন, সর্বত্যাগী সাধু সন্ন্যাসীকে এভাবে নির্যাতন করা উচিত হয়নি। কিসের থেকে কি হয় বলা যায় না। যে ভুল আপনি করেছেন তার মাশুল আপনাকেই গুনতে হবে। আপনি অবিলম্বে ডাক্তার ডেকে সাধুকে সুস্থ করে তাকে মুক্তি দিন।

ভদ্রলোকের কথায় সাহেবের চৈতন্য হলো। তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ডাক্তার ডাকলেন। ডাক্তার এসে ওষুধ দিয়ে বালানন্দজীকে বমি করালো। বমির সঙ্গে বিষ উঠে যেতে তিনি সুস্থ হলেন। সাহেব তখন সাধু দুজনকে মুক্তি দিলেন। সেই সময়ে ভদ্রলোকটি বালানন্দজী ও তাঁর সঙ্গী সাধুকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তাঁদের সেবা করলেন। সেখানে দিনকতক থেকে আবার পরিব্রাজনে বেরিয়ে পড়লেন বালানন্দজী।

সকলকে দুধ খাইয়ে গরুটি নিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল সেই ভীল রমণী। সাধুরা এবার বিস্মিত হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল না, কে এই রমণী? কোন দিকেই কোথাও কোন গ্রাম বা জনপদ দেখতে পায়নি তাঁরা। তবে কোথা হতে এই সন্ধ্যাকালে এল এই রমণী? তার গরুটিই বা কেমন? একটি গরুর দুধ থেকে এতগুলি লোকের ক্ষুধা পিপাসা কিভাবে মিটে গেল?

কিছুদিন পর নর্মদা নদীর ধারে এক বনের প্রান্তে সেই সাহেবের সঙ্গে বালানন্দজীর হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। বালানন্দজী তখন শাবল দিয়ে কন্দমূল তুলছিলেন। দুজনেই দুজনকে চিনতে পারলেন।

বালানন্দজী সাহেবকে বললেন, সাহেব নিজের চোখে এবার দেখছো ত। আমরা শাবল দিয়ে সিঁধ কেটে চুরি করি না। কন্দমূল তুলে খাই। সাহেব তখন হাসতে লাগলেন। তাঁর ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি তখন কিছু টাকা বালানন্দজীকে দিতে গেলেন। কিন্তু বালানন্দজী‌ তা কিছুতেই নিলেন না। তিনি বললেন, আমরা সর্বত্যাগী সাধু। আমাদের ঘর-সংসার নেই, টাকা নিয়ে কি করব?

সাহেব তখন টুপি উঠিয়ে সম্মান দেখিয়ে চলে গেলেন সেখান থেকে।

যে সব সাধু নর্মদা পরিক্রমা করতেন তাঁদের বিশ্বাস ছিল নর্মদা শুধু এক পবিত্র নদী নয়, এক জাগ্রত দেবী। বিপদকালে এই নর্মদা মাঈ সাধু সজ্জনদের অলৌকিক শক্তির দ্বারা রক্ষা করেন। বালানন্দজী বহুদিন ধরে নর্মদা পরিক্রমা করেন। প্রথমে গৌরীশংকর মহারাজের সঙ্গে ও পরে অন্য সাধুদের সঙ্গে, আবার কখনো একা একা নর্মদা পরিক্রমা করে বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন।

একদিন বালানন্দজী একদল সাধুর সঙ্গে নর্মদা নদীর তীর ধরে এক বনপথ দিয়ে হাঁটছিলেন। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে বনমধ্যে। সাধুরা পথক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে পড়েছে। তার উপর ক্ষুধার জ্বালায় কাতর হয়ে পড়েছে তারা। অথচ সঙ্গে খাবার বলতে কিছু নেই।

এমন সময় তাঁরা সকলে দেখতে পেলেন, একটি গাছের তলায় এক ভীল রমণী একটি দুগ্ধবতী গাভী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বালানন্দজী সেই ভীল রমণীর কাছে গিয়ে বললেন, মাঈ! আমরা সবাই ক্ষুধাতৃষ্ণায় বড়ই কাতর। আজ রাত্রির মত এখানেই বিশ্রাম করব আমরা। তুমি তোমাদের গ্রাম থেকে কিছু খাবার নিয়ে এসে আমাদের প্রাণ বাঁচাও।

ভীল রমণী বলল, তোমাদের ভাবনার কোন কারণ নেই। তোমরা এক একটি পাত্র নিয়ে দাঁড়াও। আমি এই গরুটির দুধ দুইয়ে তোমাদের সকলকে দেব। তাতেই তোমাদের ক্ষুধা পিপাশা সব মিটে যাবে।

সাধুদের সবার কাছে জল খাবার জন্য একটি করে লাউয়ের খোল বা তুম্বা থাকত। সেই তুম্বাটি নিয়ে তাঁরা দাঁড়াল। রমণী দুধ দুইয়ে একে একে সব সাধুকে দিল। তাই খেয়ে তাঁদের সব ক্ষুধা পিপাসা মিটে গেল। প্রত্যেকেই দেহে নতুন বল পেল।

সকলকে দুধ খাইয়ে গরুটি নিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল সেই ভীল রমণী। সাধুরা এবার বিস্মিত হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল না, কে এই রমণী? কোন দিকেই কোথাও কোন গ্রাম বা জনপদ দেখতে পায়নি তাঁরা। তবে কোথা হতে এই সন্ধ্যাকালে এল এই রমণী? তার গরুটিই বা কেমন? একটি গরুর দুধ থেকে এতগুলি লোকের ক্ষুধা পিপাসা কিভাবে মিটে গেল?

কামাখ্যা থেকে আবার তীর্থ পর্যটনে বেরিয়ে পড়েন বালানন্দজী। তিনি একবার তারকেশ্বর মন্দির দর্শনের পর হুগলি জেলায় ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় শুনতে পান জলেশ্বর নামে এক গাঁয়ে এক ভগ্ন মন্দিরে এক প্রাচীন জাগ্রত শিবলিঙ্গ আছে। স্থানীয় লোকদের কাছে জলেশ্বর শিব নামে পরিচিত।

তখন বয়োপ্রবীণ সাধুরা বললেন, আসলে নর্মদা মাঈ এই ভীল রমণীর বেশ ধরে এসে তাদের ক্ষুধা পিপাসা মিটিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন।

একবার কামাখ্যা তীর্থ পর্যটনে গিয়ে দেবীবিগ্রহ দর্শনের পর একটি পাহাড়ের উপর দিনকতক সাধনা ভজন করতে থাকেন বালানন্দজী। তারপর সেখান থেকে নেমে একটি বনের মধ্যে পথ চলতে চলতে হঠাৎ কলেরার দ্বারা আক্রান্ত হন তিনি।

নির্জন বনভূমির মধ্যে রোগ নিরাময়ের কোন উপায় না দেখে পরমাত্মার ধ্যান করতে করতে নিস্পন্দভাবে শুয়ে থাকেন। সহসা এক দেবীমূর্তি তাঁর সামনে আবির্ভূতা হয়ে তাঁকে বলেন, ব্রহ্মচারী! তুই ভাবিস না। এখন তোর মরা হবে না। তুই বেঁচে উঠবি। এখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে যাস।

এই বলে দেবীমূর্তিটি অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়েন বালানন্দজী।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গলে তিনি দেখেন রাত্রির মধ্যেই তাঁর সব রোগ সেরে গেছে। তবে ক্ষুধা তৃষ্ণায় বড় কাতর হয়ে উঠলেন তিনি। কোনরকমে দুর্বল দেহটি নিয়ে বনের প্রান্তে একটি গ্রামের কাছে এক কূয়োর ধারে চলে গেলেন। সেখানে গ্রামের মেয়েরা জল তুলছিল।

তখন তাঁর অনুরোধে মেয়েরা তাঁর মাথার উপর জল ঢেলে দিল। তাতে তিনি সুস্থবোধ করলেন। তাঁর দেহ নির্মল হলো। কিন্তু ক্ষুধায় পেট জ্বলে যাচ্ছিল তাঁর। অথচ তিনি স্বপাক অন্ন ছাড়া গ্রহণ করেন না।

তখন একটি লোক ইঁটের চুলার উপর তাঁর লোটায় খিচুড়ি চড়িয়ে দেয়। বালানন্দজী নিজের হাতে তা নামিয়ে নিয়ে তৃপ্তির সঙ্গে ভোজন করেন। স্নান ও আহারের পর একেবারে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।

কামাখ্যা থেকে আবার তীর্থ পর্যটনে বেরিয়ে পড়েন বালানন্দজী। তিনি একবার তারকেশ্বর মন্দির দর্শনের পর হুগলি জেলায় ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় শুনতে পান জলেশ্বর নামে এক গাঁয়ে এক ভগ্ন মন্দিরে এক প্রাচীন জাগ্রত শিবলিঙ্গ আছে। স্থানীয় লোকদের কাছে জলেশ্বর শিব নামে পরিচিত।

কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সেই মন্দিরে চলে গেলেন বালানন্দজী। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। প্রাচীন মন্দিরটির মধ্যে প্রবেশ করে শিবলিঙ্গটি দর্শন করলেন তিনি। দেখলেন গোরীয়াট্টের উপর আধ হাত পরিমাণ এক শিবলিঙ্গ স্থাপিত আছে। তার কাছে একটা উঁচু জায়গায় এক পঞ্চমুণ্ডীর আসন রয়েছে।

এই শক্তিমান মহাত্মার সঙ্গে ভালভাবে আলাপ পরিচয় না করার জন্য আক্ষেপ করতে লাগলেন বালানন্দজী। তিনি তখন তাঁর সম্বন্ধে গোমতীস্বামীকে জিজ্ঞাসা করাতে গোমতীস্বামী বললেন, এঁর সঙ্গে আমারও বিশেষ পরিচয় নেই।

মন্দিরসংলগ্ন কূয়োর জলে হাত মুখ ধুয়ে মন্দিরের ভিতরে গিয়ে ধ্যানে বসলেন। কিছুক্ষণ ধ্যান করার পরেই তিনি দেখলেন এক প্রবল ঝড় উঠল। মনে হলো চারিদিকের দেওয়ালগুলো তাঁকে চেপে ধরছে। আকাশে বাতাসে কারা যেন অট্টহাসি হাসছে।

হঠাৎ পিছন থেকে এক দৈববাণী শুনতে পেলেন- বালানন্দজী, তুই পঞ্চমুণ্ডীর আসনে বসে অঘোর মন্ত্র জপ কর। কোন ভয় নেই।

সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চমুণ্ডীর আসনে বসে জপ করতেই সব শান্ত হয়ে উঠল। অন্তরে এক দিব্য আনন্দের স্রোত বয়ে যেতে লাগল যেন। তিনি বুঝলেন দেবাদিদেব মহাদেবের কৃপা লাভ করেছেন তিনি।

পরদিন সকালে তিনি মন্দির হতে বার হয়ে এলে গ্রামের লোকরা আশ্চর্য হয়ে গেল। তারা সবাই বলাবলি করতে লাগল, ইনি নিশ্চয় একজন শক্তিমান সাধক কারণ এই মন্দিরে রাত্রিবাস করা যার তার পক্ষে সম্ভব নয়।

একবার বালানন্দজী যখন উত্তরবঙ্গে ভ্রমণ করছিলেন তখন একসময় গোমতীস্বামী নামে এক শক্তিমান যোগী পুরুষের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়ে যায়। কাঙড়া উপত্যকায় ভাকসূতে গোমতীস্বামীর কাছে কিছুদিন অবস্থান করেন তিনি।

একদিন গোমতীস্বামী ও বালানন্দজী আপন আপন আসনে বসে আছেন, এমন সময় এক সাধক এসে তাঁদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলেন। তারপর বিদায় নেন। কিছুদূর গিয়েই তিনি ‘জয় গুরুদেব, জয় গুরুদেব’ বলে চীৎকার করতে করতে হাততালি দিতে থাকেন।

এই চীৎকার শুনে বালানন্দজী ও গোমতীস্বামী দুজনে বাইরে এসে দেখেন ‘জয় গুরুদেব’ বলে হাততালি দিতে দিতে সেই সাধুটির পা দুটি শূন্যে উঠছে। এইভাবে শূন্যমার্গে উঠে আকাশপথে একটি পাহাড়ের চূড়ার উপর উঠে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

এই শক্তিমান মহাত্মার সঙ্গে ভালভাবে আলাপ পরিচয় না করার জন্য আক্ষেপ করতে লাগলেন বালানন্দজী। তিনি তখন তাঁর সম্বন্ধে গোমতীস্বামীকে জিজ্ঞাসা করাতে গোমতীস্বামী বললেন, এঁর সঙ্গে আমারও বিশেষ পরিচয় নেই।

তবে এঁকে মাঝে মাঝে পাহাড় থেকে নিচে এসে আবার এইভাবে উঠে যেতে দেখেছি। তিনি কোথায় কোন্ পাহাড়ের শিখরদেশে থাকেন এবং কেনই বা মাঝে মাঝে নিচে নেমে আসেন তা জিজ্ঞাসা করা হয়নি‌।

বালানন্দজী তখন জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে খেচরগামী হয়ে শূন্যমার্গে ওঠানামা করা সম্ভব হয়?

(চলবে…)

…………………….
আরো পড়ুন:
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: এক

মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: দুই
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: তিন

…………………….
ভারতের সাধক ও সাধিকা : সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ

………………….
পুনপ্রচারে বিনীত: প্রণয় সেন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

………………….
আরও পড়ুন-
স্বামী অড়গড়ানন্দজী
ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব
শিরডি সাই বাবা
পণ্ডিত মিশ্রীলাল মিশ্র
নীলাচলে মহাপ্রভুর অন্ত্যলীলার অন্যতম পার্ষদ ছিলেন রায় রামানন্দ
ভক্তজ্ঞানী ধর্মপ্রচারক দার্শনিক রামানুজ
সাধক ভোলানন্দ গিরি
ভক্ত লালাবাবু
লাটু মহারাজ শ্রীরামকৃষ্ণের অদ্ভুত সৃষ্টি
কমলাকান্ত ভট্টাচার্য
ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন
পরিব্রাজকাচার্য্যবর শ্রীশ্রীমৎ দূর্গাপ্রসন্ন পরমহংসদেব
আর্যভট্ট কাহিনী – এক অজানা কথা
গিরিশচন্দ্র ঘোষ
কঠিয়াবাবা রামদাস
সাধু নাগ মহাশয়
লঘিমাসিদ্ধ সাধু’র কথা
ঋষি অরবিন্দ’র কথা
অরবিন্দ ঘোষ
মহাত্মাজির পুণ্যব্রত
দুই দেহধারী সাধু
যুগজাগরণে যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজ
শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর
বাচস্পতি অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে
মুসলমানে রহিম বলে হিন্দু পড়ে রামনাম
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : প্রথম খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব: দ্বিতীয় খণ্ড
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্র দেব : অন্তিম খণ্ড
মহামহোপাধ্যায় কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ
শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর
শ্রীশ্রী ঠাকুর সত্যানন্দদেব
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: এক
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: দুই
মহাতাপস বালানন্দ ব্রহ্মচারী: তিন
সাধক তুকারাম
সাধক তুলসীদাস: এক
সাধক তুলসীদাস: দুই
সাধক তুলসীদাস: তিন
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: এক
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: দুই
শ্রীশ্রী মোহনানন্দ স্বামী: তিন

প্রাসঙ্গিক লেখা

2 Comments

  • md, Kamaluddin apple , বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২০ @ ৩:৪০ অপরাহ্ন

    খুব সুন্দর লেখনী পড়তে পড়তে ভাবতন্ময়তা গভীর তলদেশে ডুবে যাচ্ছিলাম

    • ভবঘুরে , শুক্রবার ৩ জুলাই ২০২০ @ ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

      জয়গুরু

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!