সৃষ্টিতত্ত্ব রহস্য ব্রহ্মাণ্ড জগৎ মহাজগত মহাবিশ্ব

৩১. সপ্তমনু পূর্ব্বাসৃষ্ট দেবতা, দেবতার বাসস্থান ও মহর্ষি সৃষ্টি

এতে মনূংস্তু সপ্তান্ যানসৃজন্ ভূরিতেজসঃ।
দেবান্ দেবনিকাযাংশ্চ মহর্ষীংশ্চামিতোজসঃ।।৩৬

এই মারীচ্যাদি দশ প্রজাপতি মহাতেজস্বী অপর সপ্ত মনু সৃষ্টি করিলেন এবং যে দেবতাদিগকে ব্রহ্মা পূর্ব্বে সৃষ্টি করেন নাই, এমন দেবতা ও দেবতাদিগের বাসস্থান এবং কতিপয় মহর্ষির সৃষ্টি করিলেন। ৩৬

৩২. যক্ষ রাক্ষস প্রভৃতি, সর্পাদি, গরুড়াদি পক্ষিগণ, আজ্যপাদি পিতৃগণ, বিদ্যুৎ প্রভৃতি, এবং নানা প্রকার জ্যোতিঃ সৃষ্টি

যক্ষরক্ষঃ পিশাচাংশ্চ গন্ধর্বাপ্সরসোঽসুরান্।
নাগান্ সর্পান্ সুপর্ণাংশ্চ পিতৄণাংশ্চ পৃথগ্গণম্।।৩৭

ইঁহারা যক্ষ, রাক্ষস, পিশাচ, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা, অসুর, অজগরাদি নাগ ও সর্প, গরুড়াদি পক্ষিগণ, আজ্যপাদি-নামক পিতৃগণকে পৃথক পৃথকরূপে সৃষ্টি করিলেন। ৩৭

৩৩. জন্তু সৃষ্টি

কিন্নরান্ বানরান্ মত্স্যান্ বিবিধাংশ্চ বিহঙ্গমান্।
পশূন্ মৃগান্ মনুষ্যাংশ্চ ব্যালাংশ্চোভযতোদতঃ।।৩৯

কিন্নর, বানর, মৎস্য, নানাপ্রকার পক্ষী, গবাদি পশু, নানাপ্রকার মৃগ, মনুষ্য ও দুই পঙ্‌ক্তি দন্তবিশিষ্ট অশ্বাদি জন্তু এবং সিংহাদি হিংস্র জন্ত সকল সৃষ্টি করিলেন। ৩৯

কৃমিকীটপতঙ্গাংশ্চ যূকামক্ষিকমত্কুণম্।
সর্বং চ দংশমশকং স্থাবরং চ পৃথগ্বিধম্।।৪০

কৃমি, কীট, শলভ, কেশকীট (উকুন), মক্ষিকা, মৎকুণ (ছারপোকা), দংশ, মশক প্রভৃতি জন্তু ও বৃক্ষলতাদি স্থাবর, পৃথক পৃথকরূপে সৃষ্টি করিলেন। ৪০

৩৪. কর্ম্মানুরূপ দেবমনুষ্যাদি সৃষ্টি

এবমেতৈরিদং সর্বং মন্নিযোগান্ মহাত্মভিঃ।
যথাকর্ম তপোযোগাত্ সৃষ্টং স্থাবরজঙ্গমম্।।৪১

তাঁহারা আমার অনুমতিক্রমে তপোবলে যাহার কর্ম্ম, তদনুরূপ দেব, মনুষ্য, পশু, পক্ষী প্রভৃতি স্বাবর জঙ্গম সমুদয় সৃষ্টি করিলেন। ৪১

৩৫. কর্ম ও জন্মক্রম কথন

যেষাং তু যাদৃশং কর্ম ভূতানামিহ কীর্তিতম্।
তত্ তথা বোঽভিধাস্যামি ক্রমযোগং চ জন্মনি।।৪২

হে মহর্ষিগণ! পূর্ব্বাচার্য্যেরা যে যে জাতির যে-যে প্রকার কর্ম্ম ও যে প্রকারে জন্ম কহিয়াছেন, আমিও ঐরূপ কর্ম্ম ও জন্মক্রম আপনাদিগকে বলিতেছি, শ্রবণ করুন। ৪২

৩৬. জরায়ুজ

পশবশ্চ মৃগাশ্চৈব ব্যালাশ্চোভযতোদতঃ।
রক্ষাংসি চ পিশাচাশ্চ মনুষ্যাশ্চ জরাযুজাঃ।।৪৩

পশু, মৃগ, দুই পঙ্‌ক্তি দন্তবিশিষ্ট হিংস্রজন্তু, রাক্ষস, পিশাচ, মনুষ্য ইহারা সকলে জরায়ুনামক গর্ভাবরণ চর্ম্মে প্রাদুর্ভূত হয় ও তাহা হইতে মুক্ত হইয়া ভূমিষ্ঠ হয়। ৪৩

৩৭. অণ্ডজ

অণ্ডজাঃ পক্ষিণঃ সর্পা নক্রা মত্স্যাশ্চ কচ্ছপাঃ।
যানি চৈবং.প্রকারাণি স্থলজান্যৌদকানি চ।।৪৪

পক্ষী, সর্প, কুম্ভীর, মৎস্য, কচ্ছপ, স্থলজ কৃকলাসাদি ও জলজাত শঙ্খাদি জন্তু সকল অণ্ডে উৎপন্ন হইয়া তাহা হইতে প্রাদুর্ভূত হয়। ৪৪

৩৮. স্বেদজ

স্বেদজং দংশমশকং যূকামক্ষিকমত্কুণম্।
ঊষ্মণশ্চোপজাযন্তে যচ্চান্যত্ কিং চিদীদৃশম্।।৪৫

দংশ, মশক, কেশকীট (উকুণ), মক্ষিকা, মৎকুণ (ছারপোকা) ইহারা ক্লেদ হইতে উৎপন্ন হয়, এতদ্ভিন্ন পুত্তিকাপিপীলিকাদিও উম্মা হইতে উৎপন্ন হইয়া থাকে। ৪৫

৩৯. উদ্ভিজ্জ

উদ্ভিজ্জাঃ স্থাবরাঃ সর্বে বীজকাণ্ডপ্ররোহিণঃ।
ওষধ্যঃ ফলপাকান্তা বহুপুষ্পফলোপগাঃ।।৪৬

যাহারা বীজ ও ভূমি উদ্ভেদ করিয়া উত্থিত হয়, তাহাদিগকে উদ্ভিজ্জ অর্থাৎ বৃক্ষ বলে। বৃক্ষ দুই প্রকার;–কতকগুলি বীজ হইতে জন্মে, কতকগুলি রোপিতশাখা হইতে উৎপন্ন হইয়া থাকে। যাহারা বিবিধ পুষ্পফলে সুশোভিত হইয়া ফল পরিপক্ক হইলেই বিনাশ পায়, তাহাদিগকে ঔষধি বলা যায়; যেমন ধান্য-যবাদি। ৪৬

৪০. অপুষ্প বৃক্ষ

অপুষ্পাঃ ফলবন্তো যে তে বনস্পতযঃ স্মৃতাঃ।
পুষ্পিণঃ ফলিনশ্চৈব বৃক্ষাস্তূভযতঃ স্মৃতাঃ।।৪৭

যাহারা পুষ্পিত না হইয়াই ফলবান হয়, তাহাদিগকে বনস্পতি কহে; আর যাহাদিগের পুষ্প হইতে ফল জন্মে, তাহাদিগকে বৃক্ষ বলে। এইরূপে বৃক্ষ দুই প্রকার বলা যায়। ৪৭

৪১. গুচ্ছ, গুল্ম, প্রতান ও বল্লী

গুচ্ছগুল্মং তু বিবিধং তথৈব তৃণজাতযঃ।
বীজকাণ্ডরুহাণ্যেব প্রতানা বল্ল্য এব চ।।৪৮

যাহার মূল হইতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক লতা উৎপন্ন হয়, তাহাকে গুচ্ছ বলে; যেমন মল্লিকা প্রভৃতি। যাহার এক মূলে অনেক অঙ্কুর জন্মে, তাহাকে গুল্ম বলে; যেমন ইক্ষু, শর প্রভৃতি। উলু প্রভৃতিতে তৃণ বলে। তন্ত্রযুক্ত লতা প্রভৃতিকে প্রতান বলে; যথা–শশা, অলাবু প্রভৃতি; এবং যাহারা ভূমি হইতে বৃক্ষে আরোহণ করে, তাহাদিগকে বল্লী বলে, যেমন গুড়ূচ্যাদি। ইহাদিগের মধ্যে কেহ বীজ হইতে উৎপন্ন হয়, কেহ বা কাণ্ড হইতে জন্মিয়া থাকে। ৪৮

৪২. বৃক্ষাদির চৈতন্য ও সুখ-দুঃখ

তমসা বহুরূপেণ বেষ্টিতাঃ কর্মহেতুনা।
অন্তস্সংজ্ঞা ভবন্ত্যেতে সুখদুঃখসমন্বিতাঃ।।৪৯

ইহারা বহুবিধ কর্ম্মফলে তমোগুণে আক্রান্ত হইয়া অবস্থান করে, বহির্ব্যাপার থাকে না, কেবলমাত্র অন্তরে চৈতন্যবিশিষ্ট থাকে। কোন কোন সময়ে ইহাদিগের সুখদুঃখের বিলক্ষণ অনুভব হয়। ৪৯

৪৩. সৃষ্টিবর্ণন সমাপ্তি

এতদন্তাস্তু গতযো ব্রহ্মাদ্যাঃ সমুদাহৃতাঃ।
ঘোরেঽস্মিন্ ভূতসংসারে নিত্যং সততযাযিনি।।৫০

এই জন্মমরণসমাকূল অনিত্য অতিভয়ানক সংসারে ব্রহ্মাদি স্থাবর পর্য্যন্ত সমুদয় জীব যেরূপে উৎপন্ন হইয়াছে, তাহা অদ্যোপান্ত বর্ণিত হইল। ৫০

৪৪. প্রজাপতি পরমাত্মাতে অন্তর্হিত

এবং সর্বং স সৃষ্ট্বৈদং মাং চাচিন্ত্যপরাক্রমঃ।
আত্মন্যন্তর্দধে ভূযঃ কালং কালেন পীডযন্।।৫১

হে মহর্ষিগণ! অচিন্ত্যশক্তিসম্পন্ন প্রজাপতি এই প্রকারে স্থাবর জঙ্গম সমুদয় জগৎকে ও আমাকে সৃষ্টি করিয়া প্রলয়কাল দ্বারা সৃষ্টিকালের নাশ করত পরমাত্মাতেই অন্তর্হিত হইলেন। ৫১

৪৫. প্রলয় কথন

যদা স দেবো জাগর্তি তদেবং চেষ্টতে জগত্।
যদা স্বপিতি শান্তাত্মা তদা সর্বং নিমীলতি।।৫২

যখন সেই পরমপুরুষ ব্রহ্মা জাগরিত হয়েন অর্থাৎ সৃষ্টি-স্থিতির ইচ্ছা করেন, তখন এই জগৎ নিশ্বাসপ্রশ্বাসাদি চেষ্টা করে; আর যখন তিনি সৃষ্টির উপসংহারের ইচ্ছা করিয়া নিদ্রিত হয়েন, তখনই এই জগৎ প্রলয় প্রাপ্ত হয়। ৫২

<<মনুসংহিতায় সৃষ্টিরহস্য-বিজ্ঞানপ্রকরণ : পর্ব দুই ।। মনুসংহিতায় সৃষ্টিরহস্য-বিজ্ঞানপ্রকরণ : পর্ব চার>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

…………….
আরও পড়ুন-
মনুসংহিতায় সৃষ্টিরহস্য-বিজ্ঞানপ্রকরণ : পর্ব এক
মনুসংহিতায় সৃষ্টিরহস্য-বিজ্ঞানপ্রকরণ : পর্ব দুই
মনুসংহিতায় সৃষ্টিরহস্য-বিজ্ঞানপ্রকরণ : পর্ব তিন
মনুসংহিতায় সৃষ্টিরহস্য-বিজ্ঞানপ্রকরণ : পর্ব চার
মনুসংহিতায় সৃষ্টিরহস্য-বিজ্ঞানপ্রকরণ : পর্ব পাঁচ
মনুসংহিতায় সৃষ্টিরহস্য-বিজ্ঞানপ্রকরণ : পর্ব ছয়

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!