মোরাকাবা-মোশাহেদা

মোরাকাবা-মোশাহেদা

-আবুতালেব পলাশ আল্লী

তরিকতপন্থীদের জন্য মোরাকাবা-মোশাহেদা তরিকতের ভাষায় ফরজ বা অবশ্য পালনীয়। কারণ স্রষ্টার দর্শন লাভ ও তার মাঝে নিজেকে ফানা করাই হলো তরিকতের মূল উদ্দেশ্য। শুধু মুর্শিদের হাতে বায়াত হওয়াই শেষ কাজ নয়। মুর্শিদের চরণাশ্রিত হয়ে তাঁর নিদের্শিত পন্থায় সাধককে করতে হয় তপস্যা, সাধন, ভজন। আর স্রষ্টার দর্শন লাভের উৎকৃষ্ট পন্থা হলো এই মোরাকাবা-মোশাহেদা।

নবীজী বলেন, আল্লাহর ধ্যানে তথা মোরাকাবা-মোশাহেদায় নিমগ্ন একটি মুহূর্ত ৭০ বছর ইবাদত বন্দেগী থেকে উত্তম। (সিররুল আসরার, পৃ-১৭)

অপরদিকে বলা আছে, আল্লাহর জাতের ধ্যানের একটি মুহুর্তের মর্যাদা হাজার বছর ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। (বোখারী, ৬৯৭০; মুসলিম, ২৬৭৫)

মুর্শিদের প্রতি মুরিদের ফানা হয়ে যাওয়া অর্থাৎ মুরিদের উদ্দেশ্যে হলো মুর্শিদের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দেয়া। যখন মুরিদ মুর্শিদের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে তখন মুরিদ মোরাকাবা-মোশাহেদায় সফলতা লাভ করে। মুরিদ মুর্শিদের হাত এমন হয়ে যাবে, যেমন মৃতের গোসলকারীর হাত।

তবেই মুর্শিদ তাঁর অন্তর ধৌত করে তাঁর শুদ্ধি সাধন করতে পারবে। মৃত ব্যক্তি গোসলকারীর বিরুদ্ধাচরণ করলে সে যেমন মুর্দা না, সেই প্রকার মুরিদ যদি মুর্শিদের বিরুদ্ধাচরণ করে তবে সে মুর্শিদের মুরিদ না, বরং সে নিজ নফসের মুরিদ। মুর্শিদের প্রতি মুরিদের ‘এরাদা’ বা ‘উদ্দেশ্য’ যদি সঠিক না থাকে তাহলে তাকে মুরিদ বলা হয় না, সে জাহেল।

মুরিদের কাছে মুর্শিদের সুরত হলো কেবলা আর মুর্শিদের বাড়ি হয় কাবা। হজরত হামীদুদ্দীন নাগরী (র) তাঁর নাহাক্কাতুল গ্রন্থে লিখেছেন, কেবলা চার প্রকার- প্রথম কেবলা কাবা, যার দিকে সকল মুসলমান নামাজ আদায় করে।

দ্বিতীয় কেবলা মমিনের নিজের কলব (দেল), যার দিকে তরিকত অবলম্বীদের লক্ষ। তৃতীয় কেবলা মুর্শিদ, যার দিকে মুরিদের সকল এরাদা থাকা উচিৎ আর চতুর্থ কেবলা ওয়াজহুল্লাহ, যা সকল কেবলার বিলীনকার।

প্রেমিক কবি আমীর খসরু গেয়েছেন- ‘যখন প্রণয়নীর রূপ ব্যতীত অন্য কেবলা ছিল না, তখন প্রেম এসে অন্য সকল কেবলাকে বিলীন করে ফেলল।’

কথিত আছে, একবার নিজামুদ্দীন আওলিয়া উপবিষ্ট ছিলেন এবং তাঁর মাথার টুপি তেরছি ভাবে একদিকে হেলান ছিল। তা আমীর খসরুর (নিজামুদ্দীনের মুরিদ) চোখে বড় সুন্দর লাগল। তিনি বলে উঠলেন, ‘সকল জাতির জন্য এক একটি পৃথক পন্থী, ধর্ম ও দিক (কেবলা) নিদিষ্ট আছে। আমি আমার কেবলা তেরছি টুপির দিকে নির্ধারণ করলাম।’

কথিত আছে, যে একবার কোন অপরাধে শেখ আজল তাবরেজীকে কতল করার জন্য জল্লাদের হাতে অর্পণ করা হয়। জল্লাদ তাঁকে কতলের স্থানে নিয়ে কেবলা মুখী করিয়া দাঁড় করায়। তখন শেখ আজল দেখলেন, তাঁর পীরের মাজার তাঁর পিছনে পড়ে। তিনি কেবলার দিক হতে ঘুরে নিজের মুর্শিদের মাজারের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন।

জল্লাদ তাঁকে বলল, তুমি এখন যে অবস্থায় পতিত তোমার কেবলার দিকেই মুখ করা কর্তব্য। শেখ আজল উত্তরে বললেন- ‘তোমার তা দিয়ে কি কাজ, তুমি তরবারি উত্তোলন কর এবং আমার ঘাড়ের উপর মারো। আমি আমার মুখ নিজ কেবলার দিকেই তাকিয়ে আছি।

এ নিয়ে জল্লাদের সঙ্গে তাঁর তর্ক বেধে গেলো। এই তর্ক উপস্থিত থাকতে থাকতেই শাহী ফরমান এসে উপস্থিত হলো। ফরমানে উল্লেখ, ‘দরবেশকে ক্ষমা করা হলো, তাঁকে মুক্ত করে দাও।’

ফাওয়ায়েদুস সালেকীন কিতাবে লিখিত আছে, হজরত বখতিয়ার কাকী (র) যখন এই ঘটনা বিবৃত করেছিলেন তখন তিনি অশ্রুপূর্ণ চোখে বললেন, সেই ফকিরের এই প্রকার নেক আকিদা তাঁকে কতল হতে মুক্ত করেছিল।

তাই মোরাকাবা-মোশাহেদা করতে হলে আপন মুর্শিদকে সদাসর্বদা হৃদয়ে স্থান দিতে হয়। নইলে মোরাকাবা-মোশাহেদায় ফল লাভ করা যায় না।

……………………………
পুনপ্রচারে বিনীত: আবুতালেব পলাশ আল্লী
মা শাহে সেতারার রওজা বা দরবার শরিফ
খুলনা, বাংলাদেশ।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!