গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই মতুয়া

মতুয়াধর্মে জন্মগত গুণ নয়, কর্মগুণই মহত্বপূর্ণ

-জগদীশচন্দ্র রায়

মানুষ সবার শ্রেষ্ঠ ভেদাভেদ ইষ্টানিষ্ঠ
কর্মগুণে মান পায় জন্মগুণে নয়।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-৭৩)

আমরা ‘শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত’-এ তিনটি মুখ্য বাণী দেখতে পাই-

১. জীবে দয়া।
২. নামে রুচি।
৩. মানুষেতে নিষ্ঠা।

আর বাকি সবকিছু ভ্রষ্টা বা মিথ্যা।

এই কথারই প্রতিধ্বনি আমরা দেখতে পাই উল্লিখিত বাণীটির মধ্যে। এখানে মানুষকে সবার উপর স্থান দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন আসে কোন মানুষদের? যে মানুষের অন্তরে কোনো জাতিভেদ, সামাজিক উঁচুনিচু নেই, যিনি সকল মানুষের প্রতি দয়াবান, তাঁদেরই শ্রেষ্ঠতা দেওয়া হয়েছে।

এখানে পরের লাইনে আরও গভীর কথা বলা হয়েছে। তবে সে কথা বলার প্রয়োজন কেন হলো, সে বিষয়ে জেনে নেওয়া যাক। বৈদিক ধর্মব্যবস্থায় দেখা যায় মানুষকে জন্মগত কারণের উপর ভিত্তি করে চারটি বর্ণে বিভক্ত করা হয়েছে।

কারণ ‘বর্ণানাং ব্রাহ্মাণো গুরু:’। মহারাষ্ট্রের ব্রাহ্মণ সন্ত রামদাস তাঁর ‘দাসবোধ’ গ্রন্থে হিন্দুদের সম্বোধন করে প্রশ্ন করেছেন- কোনো অন্ত্যজকে আমরা গুরু হিসাবে মেনে নিতে পারি কি, যদি তিনি পণ্ডিত (বিদ্বান) হন? উত্তরে বলা হয়েছে- ‘না’।

এই বর্ণবিভাজন করেছে ব্রাহ্মণেরা। তাই তারা সবার উপরে। আর ক্রমপর্যায়ে রাখা হয়েছে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের। এই শূদ্রদের আবার ৬৭৪৩টি জাতিতে বিভক্ত করা হয়েছে; তাদেরও আবার বিভক্ত করা হয়েছে স্পৃশ্য শূদ্র ও অস্পৃশ্য শূদ্রে।

নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- এই বর্ণ ও হাজারো জাতিতে বিভক্ত হওয়া লোকেরা যে যেখানে জন্মগ্রহণ করেছে সে সেখানে থাকবে। তারা স্থান পরিবর্তণ করতে পারবে না। যেমন বহুতল বিশিষ্ট অট্টালিকায় একতল থেকে অন্য তলে প্রবেশের জন্য কোনো সিঁড়ি নেই; নেই কোনো অন্য ব্যবস্থা।

অর্থাৎ যে যেস্থানে জন্মগ্রহণ করেছে, সে সেই স্থানেই মৃত্যুবরণ করবে। অস্পৃশ্য হয়ে জন্মগ্রহণ করলে ব্রাহ্মণ হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারবে না। কারণ ব্রাহ্মণ মূর্খ হলেও তাকে পণ্ডিত বলা হবে, আর কোনো অব্রাহ্মণ যতই বিদ্বান হোননা কেন তিনি পণ্ডিত হিসাবে মান্যতা পাবেন না।

কারণ ‘বর্ণানাং ব্রাহ্মাণো গুরু:’। মহারাষ্ট্রের ব্রাহ্মণ সন্ত রামদাস তাঁর ‘দাসবোধ’ গ্রন্থে হিন্দুদের সম্বোধন করে প্রশ্ন করেছেন- কোনো অন্ত্যজকে আমরা গুরু হিসাবে মেনে নিতে পারি কি, যদি তিনি পণ্ডিত (বিদ্বান) হন? উত্তরে বলা হয়েছে- ‘না’।

এক কথায় তিনি এই বাণীর মধ্য দিয়ে বৈদিকতার জন্মগত ঘৃণাভরে থুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি মানুষের গুণের জয়গান করেছেন। পিতা হরিচাঁদের ন্যায় মানুষের প্রতি নিষ্ঠার কথা বলেছেন।

অর্থাৎ কোনো অন্ত্যজ পণ্ডিত বা জ্ঞানী হলেও তাঁকে ব্রাহ্মণ কখনও গুরু হিসাবে মেনে নিতে পারে না। (তথ্য: Annihilation of Caste, By Dr B R Ambedkar)

এই নিয়ম বা বিধানের বিরুদ্ধে তথাগত গৌতম বুদ্ধ প্রতিবাদ করেন। তিনি ঘোষণা করেন মানুষ কখনোই জন্মগত কারণে নয়, গুণগত কারণে সম্মানের অধিকারী হবে। বুদ্ধের এই ঘোষণাকে বৈদিক ব্যবস্থা কিছুতেই খণ্ডন করতে না পেরে বাধ্য হয়ে তর্কের খাতিরে গীতায় কৃষ্ণের মুখ দিয়ে বলিয়েছে- গুণ: কর্ম বিভাগস:।

অর্থাৎ গুণ ও কর্মের উপরই মানুষের বিভাগ করা হবে। যদিও বস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। (এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন গীতা তো বুদ্ধের পূর্বে রচিত। তাঁদের অনুরোধ করবো, রণজিত কুমার শিকদার সম্পাদিত আম্বেদকর রচনাবলীর ৬ষ্ঠ খণ্ড, কৃষ্ণ এবং তাঁর গীতা, পৃ- ১৮ থেকে ২০ দেখার জন্য)।

সেই প্রতিফলন না দেখতে পেয়ে পতিত পাবন হরিচাঁদ ঘোষণা করেছেন- ‘বেদ বিধি শৌচাচার নাহি মানি।’ আর শিক্ষার অগ্রদূত সমাজ সংস্কারের পুরোধা বুদ্ধ ও হরিচাঁদের সুরে সুর মিলিয়ে ঘোষণা করেছেন- প্রতিটি মানুষ তার কর্মগুণেই মান পাবে। জন্মগত কারণে কখনোই তার প্রতিভাকে ছোট করা হবে না।

এক কথায় তিনি এই বাণীর মধ্য দিয়ে বৈদিকতার জন্মগত ঘৃণাভরে থুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি মানুষের গুণের জয়গান করেছেন। পিতা হরিচাঁদের ন্যায় মানুষের প্রতি নিষ্ঠার কথা বলেছেন।

…………………
আরো পড়ুন
গুরুচাঁদ ঠাকুরের রাজনীতি ভাবনা: এক
গুরুচাঁদ ঠাকুরের রাজনীতি ভাবনা: দুই

মতুয়া ধর্ম দর্শনের সারমর্ম
মতুয়া মতাদর্শে বিবাহ ও শ্রদ্ধানুষ্ঠান
মতুয়াদের ভগবান কে?

মতুয়াধর্মে জাতিভেদ নেই
মতুয়া মতাদর্শে দেহতত্ত্ব

মতুয়া মতাদর্শে শিক্ষা বিস্তার
মতুয়াধর্মে জন্মগত গুণ নয়, কর্মগুণই মহত্বপূর্ণ

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!