আজ্ঞা চক্র যোগ আসন ধ্যান

নির্ধারণবাদ

-বার্ট্রান্ড রাসেল

জ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে, বাইবেলে বর্ণিত পবিত্র ইতিহাস এবং প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় গির্জার বিশদ ধর্মতত্ত্বের গুরুত্ব ধর্মমনস্ক পুরুষ এবং নারীদের কাছে আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। বাইবেল সম্পর্কিত সমালোচনা, অধিকন্তু বিজ্ঞান, বাইবেলের প্রতিটি শব্দকে সত্য বলে বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি করেছে।

উদারণস্বরূপ, প্রত্যেকেই এখন জানেন যে, পৃথিবীর সৃজন উপাখ্যানে দু’জন লেখকের দুটো ভিন্ন ও অসঙ্গত সৃষ্টিতত্ত্বের বর্ণনা রয়েছে। এসব বিষয়গুলো এখন অনাবশ্যক বলে মনে করা হয়। কিন্তু তিনটি কেন্দ্রীয় মতবাদ ঈশ্বর, অমরত্ব এবং স্বাধীনতা এগুলো খ্রিস্টধর্মের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ বলে অনুভূত হয়।

যদিও ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে এসব সংশ্লিষ্ট নয়। এই মতবাদগুলো প্রাকৃতিক ধর্মের সঙ্গে যুক্ত। টমাস অ্যাকুইনাস এবং অনেক আধুনিক দার্শনিকদের মতে, উদ্ঘাটন তত্ত্ব ছাড়াই, মানবিক যুক্তিতে এসব সত্য বলে প্রমাণ করা যায়। সুতরাং এই তিনটি মতবাদ নিয়ে বিজ্ঞানের কী বলার আছে এটা অনুসন্ধান করা গুরুত্বপূর্ণ।

আমার নিজের বিশ্বাস এই যে, বিজ্ঞান বর্তমানে এটা প্রমাণ কিংবা অপ্রমাণ করতে পারে না এবং বিজ্ঞানের বাইরে এটা প্রমাণ বা অপ্রমাণের কোনো পদ্ধতি নেই। যাই হোক, আমি ভাবছি যে, এসবের সম্ভাবনা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক যুক্তি রয়েছে। এটা স্বাধীনতা এবং এর বিপরীত নির্ধারণবাদ, এ-দুটোকেই বর্তমান অধ্যায়ে আমরা বিবেচনা করে দেখব।

নির্ধারণবাদ এবং স্বাধীন ইচ্ছার ইতিহাস নিয়ে এর আগেই বলা হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি যে, নির্ধারণবাদ তার মিত্র খুঁজে পেয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে, যে পদার্থবিজ্ঞান সম্ভবত বস্তুর সমুদয় গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের সূত্র আবিষ্কার করেছে এবং এগুলোকে তাত্ত্বিক পূর্বনির্ধারণযোগ্য করেছে।

যথেষ্ট অদ্ভুতভাবে, নির্ধারণবাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সময়ে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী যুক্তিটা পদার্থবিজ্ঞান থেকেই সংগৃহীত হয়েছে। কিন্তু এটা বিবেচনার পূর্বে আসুন আমরা যতটা স্বচ্ছভাবে সম্ভব বিষয়টার সংজ্ঞা নিরূপণ করি।

সাধারণ মতবাদ হিসাবে নির্ধারণবাদ সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, অতীত দ্বারা ভবিষ্যতের নির্ধারণ তাত্ত্বিকভাবে সব সময় সম্ভব, যদি আমার অতীত এবং কার্য-কারণ নিয়ম সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি। তদন্তকারী কতিপয় ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে এই নীতি অনুযায়ী পূর্বতন আবছা কার্য-কারণ বিধি খুঁজে পেতে সমর্থ হবেন।

নির্ধারণবাদের দ্বিবিধ চরিত্র। একদিকে বৈজ্ঞানিক তদন্তকারীদের চালনা করার জন্য এটা একটা বাস্তব সাধারণ নীতি। পক্ষান্তরে, ব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতি বিষয়ে এটা একটা সাধারণ মতবাদ। বাস্তব সাধারণ নীতি যুক্তিযুক্ত হতে পারে, এমন কি যদি সাধারণ মতবাদটা অসত্য অথবা অনিশ্চিত হলেও। আমরা সাধারণ নীতি নিয়ে শুরু করে পরে মতবাদের আলোচনায় যাবো।

সাধারণ নীতি মানুষকে উপদেশ দেয় কার্য-কারণ বিধি খুঁজতে। অর্থাৎ এমন বিধি যা এক সময়ের ঘটনার সঙ্গে অন্য সময়ের ঘটনাকে যুক্ত করে। প্রাত্যহিক জীবনে আমরা এই ধরনের নিয়ম দিয়ে আমাদের আচরণ পরিচালনা করি। কিন্তু যে-নিয়ম আমরা ব্যবহার করি তাতে যথার্থের খরচে সরলতা কিনে নিই।

আমি সুইচটা টিপে দিলে ফিউজ-না-হলে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে উঠবে, একটা ম্যাচের কাঠির মাথাটা উবে না গেলে এটার আঘাতে আগুন জ্বলবে, টেলিফোনে একটা নাম্বার চাইলে, এটি ভুল নাম্বার না হলে, আমি নাম্বারটি পাবো। এই ধরনের নিয়মে বিজ্ঞানের চলবে না, তার চাই অপরিবর্তনীয় নিয়ম।

এর আদর্শ নিউটনীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান দ্বারা স্থিরীকৃত হয়েছিল, যেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির নিয়ম অনির্দিষ্ট বিশালতার সময় ধরে অতীত এবং ভবিষ্যতের গ্রহদের হিসাব করা যায়। কক্ষপথের সঙ্গে গ্রহদের সম্পর্কের চেয়ে ইন্দ্রিয়গোচর বস্তু বা বিষয়ের পরিচালনাজনিত নিয়মের অনুসন্ধান অনেক কঠিন।

এর কারণ অন্যত্র নানা ধরনের কারণের জটিলতা এবং ঘটনার পর্যাবৃত্ত সংঘটনের অল্প পরিমাণ নিয়মনির্দিষ্টতা। তা সত্ত্বেও, রসায়ন বিদ্যা, তড়িৎ-চুম্বক বিজ্ঞান, জীববিদ্যা এমন কি অর্থনীতিতেও কার্য-কারণ নিয়ম আবিষ্কৃত হয়েছে। কার্য-কারণ নিয়মের আবিষ্কার বিজ্ঞানের মর্মবস্তু।

সুতরাং এবিষয়ে কোনো সংশয় থাকতে পারে না যে, বিজ্ঞানবিদরা এদের খুঁজতে গিয়ে সঠিক কাজ করেন। যদি এমন কোনো অঞ্চল থাকে, যেখানে কোনো কার্য-কারণ নেই তাহলে সেই অঞ্চলে বিজ্ঞান অপ্রবেশ্য। কিন্তু তত্ত্বকথা হলো এটাই যে, মাশরুম সগ্রাহকদের মাশরুম সংগ্রহের মতো বিজ্ঞানবিদরা কার্য-কারণের নিয়ম খুঁজে বেড়াবেন।

কার্য-কারণ নিয়মাবলী নিজেদের মধ্যে অতীত দ্বারা ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয়ভাবে সম্পূর্ণ নির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত নয়। এটা একটা কার্য-কারণের নিয়ম যে, শ্বেতকায় মানুষের পুত্ররা শ্বেতকায় হবে। কিন্তু এটাই যদি বংশগতির একমাত্র নিয়ম হয়, তাহলে শ্বেতকায় পিতামাতার সন্তানদের সম্পর্কে আমরা বেশি ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম হবো না।

সাধারণ মতবাদ হিসাবে নির্ধারণবাদ সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, অতীত দ্বারা ভবিষ্যতের নির্ধারণ তাত্ত্বিকভাবে সব সময় সম্ভব, যদি আমার অতীত এবং কার্য-কারণ নিয়ম সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি। তদন্তকারী কতিপয় ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে এই নীতি অনুযায়ী পূর্বতন আবছা কার্য-কারণ বিধি খুঁজে পেতে সমর্থ হবেন।

এই দুটো বিষয় একসাথে ঘটনাটাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। এই নিয়মটি আবিষ্কারের পর যখন তিনি একই ধরনের অবস্থা প্রত্যক্ষ করবেন, তিনি তখন সমর্থ হবেন এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে যে, অনুরূপ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।

গণনার যে-ক্ষমতা প্রয়োজন হবে সেটা বর্তমান ক্ষমতার থেকে বেশি, কিন্তু ভবিষ্যতে যে-ক্ষমতা অর্জিত হবে তার চেয়ে বেশি নয়। এই বিষয়টা খুবই স্পষ্ট কিন্তু আমাদের নীতির প্রয়োগের ক্ষেত্রে অধিকতর অসুবিধাজনক। কারণ আমাদের তথ্যাবলী ব্রহ্মাণ্ডের একটা নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ।

এই ধরণের মতবাদ সংক্ষেপে বর্ণনা করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। আমরা যখন এটা করতে চেষ্টা করি, আমরা তখন এমন ঘোষণা দেই যে, এটা অথবা ওটা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব এবং কেউ-ই জানেন না তাত্ত্বিকভাবে বলতে কী বোঝায়।

এটা বিবৃত করা কোনো পাপের নয় যে, এমন নিয়ম আছে, যা ভবিষ্যতে স্পষ্টতই যা হবার তাই হবে এবং সেই অর্থে এটা ইতোমধ্যে নির্ধারিত। একজন সর্বজ্ঞ ঈশ্বর, যেমনটা গোড়া ধর্মবিশ্বাসীরা বিশ্বাস করেন, তিনি অবশ্যই ভবিষ্যতের সমুদয় গতিবিধি জানবেন।

যদি একজন সর্বজ্ঞ ঈশ্বর থাকেন তাহলে একটি বর্তমান ঘটনা, দৃষ্টান্তস্বরূপ, তাঁর পূর্বজ্ঞান, এটা থেকেই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত করা যায়। যাই হোক, এটা কিন্তু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার বাইরে থাকে।

নির্ধারণবাদের মতবাদকে কোনকিছু ঘোষণা দিতে হলে যা সাক্ষ্য দ্বারা সম্ভাব্য কিংবা অসম্ভাব্য করা যায়, তাহলে সেটা বিবৃত করতে হবে মানবীয় শক্তি সম্পর্কে। অন্যথায় এই ঝুঁকি থেকেই যায় যে আমরা মিল্টনের ‘Paradise Lost’ (‘হৃতস্বর্গ’)-এর শয়তানদের বিমূঢ়তার অংশীদার হয়ে পড়ব, যারা-

“দম্ভে বিচারিল নানা মত-
ঈশ্বরীয় বিধি, ভবিষ্যের জ্ঞান, ইচ্ছাবৃত্তি, নিয়তির পাশ
নিয়ন্ত্রণ নিয়তির বা মুক্ত ইচ্ছা, চরম ও অবাধ জ্ঞান ভবিষ্যের-
কিন্তু হায়, পৌঁছিল না কোনও সমাধানে,
চক্রাবত্রে দিগভ্রান্ত গোলকধাঁধায়-”

আমাদের যদি একটা মতবাদ থাকে যা পরীক্ষা করতে হবে, তাহলে এটা বলা যথেষ্ট নয় যে, প্রকৃতির গোটা ধারাটাই কার্য-কারণ নিয়মে নির্ধারিত হতে হবে। সেটা সত্য হতে পারে, কিন্তু আবিষ্কার করা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ, কাছে যা আছে তার থেকে যা দূরে আছে তার যদি বেশি প্রভাব থাকে, তাহলে এটা বুঝতে, আমাদের পৃথিবীতে এর প্রভাব কেমন, এটা জানার আগে দূরতম নক্ষত্রদের বিশদ জ্ঞান সংগ্রহ করতে হবে।

আমরা যদি আমাদের মতবাদ পরীক্ষা করতে পারি, তাহলে আমরা অবশ্যই সমর্থ হবো ব্রহ্মাণ্ডের একটা নির্দিষ্ট অংশ সম্পর্কে বর্ণনা করতে। এক্ষেত্রে নিয়মগুলো আমাদের জন্য অবশ্যই যথেষ্ট সরল হবে যাতে এগুলোর সাহায্যে নির্ণয় করা সম্ভব হয়।

আমরা গোটা ব্রহ্মাণ্ডটা জানতে পারি না এবং আমরা নিয়মগুলোকে পরীক্ষা করতে পারি না কারণ নিয়মগুলো এত জটিল যে, এমন পরীক্ষার ফলাফল জানার ব্যাপারে আমাদের আশানুরূপ দক্ষতার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতা থাকতে হয়।

গণনার যে-ক্ষমতা প্রয়োজন হবে সেটা বর্তমান ক্ষমতার থেকে বেশি, কিন্তু ভবিষ্যতে যে-ক্ষমতা অর্জিত হবে তার চেয়ে বেশি নয়। এই বিষয়টা খুবই স্পষ্ট কিন্তু আমাদের নীতির প্রয়োগের ক্ষেত্রে অধিকতর অসুবিধাজনক। কারণ আমাদের তথ্যাবলী ব্রহ্মাণ্ডের একটা নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ।

এই অংশের বাইরে থেকে বস্তুসমূহ এখানে ঢুকে পড়তে পারে এবং অপ্রত্যাশিত ফল হতে পারে। কখনও কখনও একটা নতুন নক্ষত্র আকাশে দেখা যায় এবং এই উপস্থিতি সৌরজগৎ সম্পর্কে সীমাবদ্ধ তথ্য থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। যেহেতু কোনো কিছুই আলোর গতি থেকে বেশি গতিতে চলে না, ফলে এমন কোনো পথ নেই যার সাহায্যে আমরা অগ্রিম বার্তা পাবো যে, একটা নতুন নক্ষত্র আকাশে উদিত হতে যাচ্ছে।

ইতিহাসে এই প্রথম বিজ্ঞানবিদদের দ্বারা বৈজ্ঞানিক কারণে নির্ধারণবাদ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নতুন পদ্ধতিতে পরমাণু সম্পর্কে অধ্যয়নের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জটা এসেছে। এই আক্রমণের নেতা ছিলেন স্যার আর্থার এডিংটন।

নিম্নবর্ণিত উপায়ে আমরা এই অসুবিধা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। এটা ধরা যাক যে, কোনো একটা গোলকের মধ্যে ১৯৩৬ সালের শুরু থেকে যা যা ঘটে চলেছে সে- সব কিছুই আমরা জানি এবং আমরা এই গোলকের কেন্দ্রে অবস্থান করছি।

যথার্থতার জন্য আমরা ধরে নেবো, গোলকটা এত বড় যে, এর পরিধি থেকে কেন্দ্রে আসতে আলোকের ঠিক এক বছর লাগে। যেহেতু কোনো কিছুই আলোর থেকে দ্রুত চলে না, তাহলে, ১৯৩৬ সালে গোলকের কেন্দ্রে যা কিছু ঘটেছে তা অবশ্যই, যদি নির্ধারণবাদ সত্য হয়, বছরের শুরুতে গোলকের মধ্যে থাকা সবকিছুর ওপর নির্ভরশীল।

এর কারণ কেন্দ্রে যে-কোনো প্রভাব ফেলতে আরও দূরের জিনিস এক বছরের চেয়ে বেশি সময় নেবে। বছর শেষ না হলে, আমরা সত্যি সত্যি সমস্ত অনুমিত তথ্য পাবো না। কারণ পরিধি থেকে আমাদের কাছে আলো পৌঁছতে ওই সময় দৈর্ঘ্য প্রয়োজন হবে। কিন্তু বছরটি শেষ হলে আমরা অতীত সম্পর্কে চিন্তাশীল হয়ে অনুসন্ধান করতে পারি যে, পরিচিত কার্য-কারণ নিয়মসহ যে-তথ্যাদি আমরা এখন পেলাম এসব ওই-বছরে-ঘটা সব কিছু কি না।

আমরা এখন নির্ধারণবাদের প্রকল্পটা বর্ণনা করতে পারি যদিও এই ঘোষণাটা বেশ জটিল। প্রকল্পটা এইরূপ : আবিষ্কারযোগ্য কার্য-কারণ নিয়ম আছে যেমন, গণনার জন্য যথেষ্ট ক্ষমতা (কিন্তু অতিমানবীয় নয়) দেওয়া হলো একজন মানুষকে যিনি একটি নির্দিষ্ট গোলকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে যা কিছু ঘটছে সে-সব জানেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন যে, ওই সময়ে গোলকের কেন্দ্রে কী ঘটবে, যখন আলো পরিধি থেকে গোলকের কেন্দ্রে পৌঁছয়।

আমি চাই যে, আমার বক্তব্যকে পরিষ্কারভাবে বোঝা হোক। আমি এটা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি না যে, এ নীতিটা সত্য। নির্ধারণবাদ বলতে কী বোঝায়, আমি কেবল এটাই বিবৃত করছি, যদি এর পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো সাক্ষ্য থাকে। আমি জানি না নীতিটা ঠিক কি না, এবং অন্য কেউ এর বেশি জানেন না।

এটাকে একটা আদর্শ হিসাবে ধরা যায় যেটাকে বিজ্ঞান তার সামনে রেখেছে, কিন্তু অবরোহী পদ্ধতির কারণ ছাড়া এটাকে নিশ্চিত সত্য কিংবা নিশ্চিত মিথ্যা বলে বিবেচনা করা যাবে না। সম্ভবত, নির্ধারণবাদের পক্ষে এবং বিপক্ষের যুক্তিগুলো যখন আমরা পরীক্ষা করতে চাই তখন দেখব যে, মানুষের মনে যেটা ছিল সেটা আমরা যে-নীতিতে পৌঁছেছি তা থেকে কিছুটা কম নির্দিষ্ট।

ইতিহাসে এই প্রথম বিজ্ঞানবিদদের দ্বারা বৈজ্ঞানিক কারণে নির্ধারণবাদ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নতুন পদ্ধতিতে পরমাণু সম্পর্কে অধ্যয়নের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জটা এসেছে। এই আক্রমণের নেতা ছিলেন স্যার আর্থার এডিংটন।

যদিও কতিপয় সর্বশ্রেষ্ঠ পদার্থবিদ (যেমন, আইনস্টাইন) এই ব্যাপারে এডিংটনের ধারণার সঙ্গে একমত নন। তবুও বলব তাঁর যুক্তি শক্তিশালী এবং খুঁটিনাটি বাদ দিয়ে এই মতবাদটাকে যতদূর সম্ভব পরীক্ষা করা উচিত।

বর্তমানে আমরা দুটো বিভিন্ন পছন্দের কার্যনির্ণয়াত্মকের প্রাসঙ্গিক পার্থক্য জানি না, কিন্তু একদিন এই ধরনের পার্থক্য জানা যাবে। আমাদের যদি নির্ধারণবাদে বিশ্বাস করার শক্তিশালী কোনো কারণ থাকে তাহলে এই যুক্তির খুবই গুরুত্ব রয়েছে।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একটা পরমাণু কী করবে তা জানা যায় না। এক্ষেত্রে এর কাছে নির্দিষ্ট বিকল্প খোলা রয়েছে এবং এটা কখনও একটা, কখনও অন্যটা পছন্দ করে। আমরা জানি ঘটনার কোন অনুপাতে একটা পছন্দ হবে, কোন্ অনুপাতে দ্বিতীয়টি অথবা তৃতীয়টি প্রভৃতি।

কিন্তু একটা বিশেষ-দৃষ্টান্তে পছন্দ নির্ধারণের কোনো নিয়ম আমরা জানি না। পেডিংটনের একজন বুকিং অফিস ক্লার্কের মতোই আমাদের একই অবস্থা, যিনি চাইলে এটা আবিষ্কার করতে পারেন কত সংখ্যক যাত্রী তার ওই স্টেশন থেকে বারমিংহামে যাবে, কত সংখ্যক একসিটারে যাবে প্রভৃতি।

কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত কারণটা জানেন না যে-কারণে একটা ক্ষেত্রে একটা পছন্দ, অন্য ক্ষেত্রে অন্যটা। এইসব ঘটনাগুলো, যাই হোক, পুরোপুরি সাদৃশ্যমূলক নয়। এর কারণ বুকিং অফিস ক্লার্কের পেশাগত সময়ের বাইরে নিজস্ব সময় রয়েছে।

সে-সময়ে তিনি মানুষ সম্পর্কিত অন্য বিষয় দেখাতে পারেন যাতে কেউ তাকে বলবে না কখন তারা টিকিট সংরক্ষণ করবে। পদার্থবিদের এ-ধরনের কোনো সুযোগ নেই কারণ তাঁর পেশাগত সময়ের বাইরে তাঁর কোনো সুযোগই থাকছে না পরমাণু প্রত্যক্ষ করার।

তিনি যখন তাঁর গবেষণাগারে থাকেন না তখন তিনি কেবল অনেক মিলিয়ন পরমাণু গঠিত বৃহৎ ভর কী কাজ করে এটাই তিনি প্রত্যক্ষ করতে পারেন। এবং তাঁর গবেষণাগারে পরমাণুগুলো ট্রেন ছাড়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে দ্রুত টিকিট কাটা যাত্রীদের তুলনায় আঃলী বেশি উনুখ নয়। বিজ্ঞানীর জ্ঞান বুকিং অফিস ক্লার্কের মতোই হত, যদি ওই ক্লার্ক তার অফিস ডিউটির সময়ের বাইরে শুধু ঘুমিয়ে কাটাতেন।

এ পর্যন্ত এটা দেখা হলো যে, পরমাণুর আচরণ থেকে প্রাপ্ত নির্ধারণবাদের বিরুদ্ধে যুক্তিটা পুরোপুরি আমাদের বর্তমান অজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল এবং একটি নতুন নিয়ম আবিষ্কৃত হলে আগামীকালই এটি বাতিল হতে পারে। একটা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত এটা সত্য। পরমাণু সম্পর্কিত আমাদের জ্ঞান সাম্প্রতিক সময়ের।

এবং এটা ধরে নেবার অবশ্যই কারণ রয়েছে যে, এটা বাড়বে। কেউ এটা অস্বীকার করতে পারে না যে, এমন নিয়ম আবিষ্কৃত হতে পারে সেটা আমাদের বলবে কেন পরমাণু একটা ঘটনায় একটা সম্ভাবনা পছন্দ করে এবং অন্য ঘটনায় অন্যটি।

বর্তমানে আমরা দুটো বিভিন্ন পছন্দের কার্যনির্ণয়াত্মকের প্রাসঙ্গিক পার্থক্য জানি না, কিন্তু একদিন এই ধরনের পার্থক্য জানা যাবে। আমাদের যদি নির্ধারণবাদে বিশ্বাস করার শক্তিশালী কোনো কারণ থাকে তাহলে এই যুক্তির খুবই গুরুত্ব রয়েছে।

সকালে লন্ডনে যাবার ক্ষেত্রে অনিয়মিত ব্যর্থতার এটা যথার্থভাবে এমন একটা অবস্থা, যে-অবস্থায় পরমাণু নিয়েও পদার্থবিজ্ঞান পৌঁছবে। এটা এমন কোনো নিয়ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ জানে না, যেটা পুরোপুরি তাদের আচরণ নির্ধারণ করে এবং পরিসংখ্যানজাত নিয়মসমূহ যেগুলো এটা আবিষ্কার করেছে, সেগুলোই বৃহৎ বস্তুনিচয়ের গতির পর্যবেক্ষণজাত পর্যাবৃত্তের জন্য যথেষ্ট।

পারমাণবিক খেয়ালের আধুনিক মতবাদে দুর্ভাগ্যবশত নির্ধারণবাদীদের জন্য আরও একটি পদক্ষেপ রয়েছে। আমাদের ছিল কিংবা আমরা এমনটা ভেবেছিলাম-সাধারণ পদার্থবিজ্ঞান থেকে সাক্ষ্যের একটা বিশাল ভর যেটা এটা প্রমাণ করতে চায় যে, বস্তু সর্বদা নিয়ম অনুসারে চলতে চায় যে-নিয়মসমূহ সম্পূর্ণভাবে তারা কী করবে সেসব নির্ধারণ করে।

এখন এটা মনে হয় যে, এইসব নিয়মগুলো কেবলমাত্র পরিসংখ্যানগত। সম্ভাবনাসমূহের মধ্য থেকে কতক অনুপাতে পরমাণু পছন্দ করে এবং সেগুলো এত বেশি সংখ্যক যে, পুরোনো পদ্ধতি অনুসারে প্রত্যক্ষ করা বিশাল বস্তুনিচয়ের ফলাফলের পরিপূর্ণ পর্যায়বৃত্তির একটা দৃষ্টিগোচরতা রয়েছে। ধরুন, আপনি একটি দৈত্য ছিলেন, যিনি ব্যক্তিমানুষ হিসাবে এটা দেখতে পেতেন না, এবং কখনও এক মিলিয়ন মানুষের সমষ্টিবদ্ধতার কম হলে আপনি তা বুঝতেন না।

আপনি এটা দেখতে সমর্থ হবেন যে, লন্ডনে রাতের থেকে দিনে বেশি বস্তু থাকে, কিন্তু আপনি এই ঘটনা সম্পর্কে সম্ভবত অবহিত হতে পারবেন না যে, একটা নির্দিষ্ট দিনে, মি. ডিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় ছিলেন এবং তিনি তাঁর প্রাত্যহিক ট্রেনে চাপেননি।

সুতরাং আপনি বিশ্বাস করবেন যে, সকালে বস্তুনিচয়ের লন্ডনে আসা এবং সন্ধ্যায় এসব বেরিয়ে যাওয়া এর থেকে একটা অধিকতর নিয়মিত বিষয় হবে। আপনি নিঃসন্দেহে এটাতে সূর্যের একটা অদ্ভুত শক্তি আরোপ করবেন। এটা এমন একটা প্রকল্প যেটি পর্যবেক্ষণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হবে সে, কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় গতিবিধি ব্যাহত হয়।

পরে আপনি যদি ব্যক্তি মানুষদের পর্যবেক্ষণ করেন, আপনি দেখতে পাবেন আপনি যতটা ধরে নিয়েছিলেন, নিয়মনির্দিষ্টতা তার থেকে কম। একদিন মি. ডিন অসুস্থ, একদিন মি. সিমসন, এতে কিন্তু পরিসংখ্যানগত গড় প্রভাবিত হলো না এবং বড় মাপের পর্যবেক্ষণে কোনো তফাৎ নেই।

আপনি দেখবেন যে, সমুদয় নিয়মনির্দিষ্টতা যেগুলো আপনি আগে পর্যবেক্ষণ করেছেন সেগুলো বৃহৎ সংখ্যার পরিসংখ্যান নিয়মের জন্য দায়ী হতে পারে; এটা না ধরে নিয়েও যে, মি. ডিন এবং মি. সিমসনের খেয়ালের বাইরে অন্য কোনো কারণ রয়েছে।

সকালে লন্ডনে যাবার ক্ষেত্রে অনিয়মিত ব্যর্থতার এটা যথার্থভাবে এমন একটা অবস্থা, যে-অবস্থায় পরমাণু নিয়েও পদার্থবিজ্ঞান পৌঁছবে। এটা এমন কোনো নিয়ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ জানে না, যেটা পুরোপুরি তাদের আচরণ নির্ধারণ করে এবং পরিসংখ্যানজাত নিয়মসমূহ যেগুলো এটা আবিষ্কার করেছে, সেগুলোই বৃহৎ বস্তুনিচয়ের গতির পর্যবেক্ষণজাত পর্যাবৃত্তের জন্য যথেষ্ট।

যেহেতু নির্ধারণবাদের বিষয়টা এসবের উপর নির্ভরশীল, তাই মনে হয় এগুলো ভেঙে পড়েছে। খেয়ালের বাইরে অন্য কোনো কারণ রয়েছে।

এই যুক্তির জন্য নির্ধারণবাদীরা দুটো ভিন্ন উপায়ে এর উত্তর দিতে চেষ্টা করতে পারেন। তিনি এই যুক্তি দিতে পারেন যে, অতীতে যে-সব ঘটনাকে কোনো নিয়মের অধীন বলে মনে হয়নি, পরে দেখা গেছে এরা কতিপয় নিয়ম অনুসরণ করছে।

আমরা মনে করি যে, পরিসংখ্যানগত নিয়ম যা ২১ এবং ২০ অনুপাত জানিয়ে দেয়, এটা অবশ্যই নিয়মের পরিণতি যেটা ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ঠিক এভাবেই, এটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে যে, যেখানে বৃহৎ সংখ্যক পরমাণু সংশ্লিষ্ট, সেখানে এটার অবশ্যই এমন নিয়ম থাকবে যে-নিয়ম প্রতিটি পৃথক পরমাণু কী করবে সেটা নির্ধারণ করবে।

এবং যেখানে এটা এখনও ঘটেনি সেখানে বিষয়বস্তুর জটিলতা একটা পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। যদি, যেমনটা অনেক দার্শনিক বিশ্বাস করেছেন যে, আইনের রাজত্বে বিশ্বাস করার অবরোহী কারণ রয়েছে, এটা একটা ভালো যুক্তি হবে। কিন্তু এমন কোনো কারণ যদি না থাকে, তাহলে যুক্তিটা একটা খুব কার্যকরী পাল্টা জবাবের মুখে পড়বে।

পৃথক পরমাণুর কাজে নিয়মনির্দিষ্টতার প্রয়োজনীয়তা ধরে না নিয়েই বড় ধরনের ঘটনাসমূহের নিয়মনির্দিষ্টতা সম্ভাব্যতার নিয়ম থেকে বেরিয়ে আসে। পৃথক পরমাণু সম্পর্কে কোয়ান্টাম তত্ত্ব যা ধরে নেয়, সেটা হলো সম্ভাবনার নিয়ম। এই সম্ভাবনার নিয়মটা পরমাণুর প্রতি উন্মুক্ত সম্ভাব্য পছন্দ, একটার এক জ্ঞাত সম্ভাবনা, দ্বিতীয় একটার জ্ঞান সম্ভাবনা প্রভৃতি।

সম্ভাবনার এই নিয়ম থেকে এটা সিদ্ধান্ত করা যায় যে, বৃহৎ বস্তুনিচয় ঐতিহ্যগত বলবিদ্যা বিশেষজ্ঞের মতে আচরণে প্রায় নিশ্চিত। সুতরাং বৃহৎ বস্তুনিচয়ের পর্যবেক্ষণজাত পর্যায়বৃত্ত এবং প্রায় সদৃশ, এবং পৃথক পরমাণুর কাজকর্মে যথার্থ পর্যাবৃত্তের প্রত্যাশার জন্য কোনো আরোহ-প্রণালীনির্ভর কারণ প্রদান করে না।

দ্বিতীয় উত্তর যেটা নির্ধারণবাদীরা দেবার চেষ্টা করতে পারেন সেটা আরও কঠিন। এবং এখনও এর বৈধতা নির্ণয় করা কষ্টসাধ্য। তিনি বলতে পারেন, আপনি স্বীকার করছেন যে, আপনি যদি আপাত সদৃশ পরিস্থিতিতে সদৃশ্য পরমাণুর বৃহৎ সংখ্যক পছন্দকে পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে পুনরাবৃত্তির মধ্যে নিয়মনির্দিষ্টতা দেখবেন যার সাহায্যে তারা নানাবিধ সম্ভাব্য পরিবর্তন ঘটায়।

পুরুষ এবং মেয়ে সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা একই রকম। আমরা জানি না যে, একটা নির্দিষ্ট জন্মের ঘটনাটা পুরুষ কিংবা মেয়ে কিন্তু আমরা এটা জানি যে, গ্রেট ব্রিটেনে প্রায় ২১ জন পুরুষ সন্তানের জন্মের সমানুপাতে ২০টি মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করে।

এভাবে গোটা জনগণের মধ্যে যৌনহারের নিয়মনির্দিষ্টতা রয়েছে, যদিও এটা প্রয়োজনীয়ভাবে একটা পরিবারের ক্ষেত্রে নয়। এখন পুরুষ ও মেয়ে জন্মের ক্ষেত্রে প্রত্যেকে বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি পৃথকক্ষেত্রে যৌনগত বিষয়টা নির্ধারণের কারণ হয়েছে।

আমরা মনে করি যে, পরিসংখ্যানগত নিয়ম যা ২১ এবং ২০ অনুপাত জানিয়ে দেয়, এটা অবশ্যই নিয়মের পরিণতি যেটা ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ঠিক এভাবেই, এটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে যে, যেখানে বৃহৎ সংখ্যক পরমাণু সংশ্লিষ্ট, সেখানে এটার অবশ্যই এমন নিয়ম থাকবে যে-নিয়ম প্রতিটি পৃথক পরমাণু কী করবে সেটা নির্ধারণ করবে।

যদি এমন কোনো নিয়ম না থাকে, নির্ধারণবাদীরা যুক্তি দেবেন যে, সেক্ষেত্রে কোনো পরিসংখ্যানগত নিয়মও নেই।

এই যুক্তির দ্বারা যে-প্রশ্ন উত্থাপিত হয় সেটা হলো, পরমাণুর সঙ্গে এর কোনো বিশেষ সংযোগ নেই এবং এটা বিবেচনা করে আমরা আমাদের মন থেকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সমস্ত জটিল বিষয়গুলোকে বাতিল করতে পারি। এর পরিবর্তে আমরা একটা পেনি উৎক্ষেপণের পরিচিত বিষয়টা করে দেখতে পারি।

আমরা সুনিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, এই পেনির ঘূর্ণনটা বলবিদ্যা নিয়ন্ত্রিত। এবং যথাযথ ধারণায় ‘হেড’ পরবে না ‘টেইল’ পরবে সেটা চান্স’ ঠিক করে দেয় না। কিন্তু একটা বিশেষ ক্ষেত্রে কোনটা ঘটবে এই গণনাটা আমাদের পক্ষে খুবই। জটিল। এটা বলা হয় (যদিও আমি কখনও কোনো ভালো পরীক্ষণজাত প্রমাণ দেখিনি) যে, যদি আপনি একটি পেনিকে অনেকবার উৎক্ষেপণ করেন, তাহলে হেড এবং টেইল প্রায় সমসংখ্যকবার দেখা যাবে। অধিকন্তু আরও বলা হয় যে, এটা কিন্তু নিশ্চিত নয়, কেবলমাত্র প্রবলভাবে সম্ভব।

একটা স্নানের ঢাকা-দেওয়া জলাশয়ে যে-কেউ সিঁড়ি খুঁজে পাবেন, যা একজন ডুবুরিকে তার পছন্দের চাইতে পৃথক যে-কোনো উচ্চতা থেকে তাকে ডুব দিতে সক্ষম করবে। সিঁড়ির ধাপগুলো যদি অনেক উচ্চতায় পৌঁছে যায়, সেক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রমী কৃতিত্বের ডুবুরিয়া সর্বোচ্চ ধাপটাই বেছে নেবেন।

আপনি পর পর দশবার পেনিটি উৎক্ষেপণ করতে পারেন এবং প্রত্যেক বারই ‘হেড’ দেখা যেতে পারে। দশটি উৎক্ষেপণের ১,০২৪ পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে মাত্র একবার ঘটলেও এটা কোন বিস্ময়কর ঘটনা নয়। কিন্তু আপনি যদি বৃহত্তর সংখ্যায় পৌঁছন, তাহলে ‘হেড’ এর ক্রমাগত পতনের বিরলতা অনেক বেড়ে যাবে।

আপনি যদি পেনিটাকে ১,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ বার উৎক্ষেপণ করেন, সেক্ষেত্রে আপনি ভাগ্যবান হবেন, যদি আপনি হেডের চলমান ১০০ সিরিজ পান। কিন্তু অভিজ্ঞতালব্ধভাবে এটা পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে জীবনটা বড়োই সংক্ষিপ্ত।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যা আবিষ্কারের বহু পূর্ব থেকে পরিসংখ্যানগত নিয়ম পদার্থবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, একটা গ্যাস অনুগুলোর বিপুল সংখ্যা নিয়ে সমস্ত দিকেই বিভিন্ন গতিসহ যদৃচ্ছভাবে ঘুরছে। গড় গতি বেশি হলে গ্যাসটি গরম হয়, এই গতি কম হলে গ্যাসটি ঠাণ্ডা হয়।

সমস্ত অণুগুলো স্থির দাঁড়িয়ে থাকলে, গ্যাসটির উত্তাপ নিরঙ্কুশ শূন্য। এই ঘটনার কারণে অণুগুলো সর্বক্ষণ একটি অন্যটির মধ্যে লাফিয়ে পড়ছে, যেগুলো ধীরে চলছে যেগুলোর গতি বেড়ে যাচ্ছে। এই কারণে বিভিন্ন উত্তাপের দুটো গ্যাস সংস্পর্শে এলে, ঠাণ্ডা গ্যাসটি গরম হয় এবং গরম গ্যাসটি ঠাণ্ডা হয়, যতক্ষণ না গ্যাসদুটো একই উত্তাপে পৌঁছয়।

কিন্তু এই সবকিছুই কেবলমাত্র সম্ভাব্য। আগে থেকেই এক রকম উত্তাপ-থাকা একটা কক্ষে সমস্ত দ্রুত গতিসম্পন্ন কণা একদিকে জড়ো হয় এবং সমুদয় ধীর গতিসম্পন্ন কণা জড়ো হয় অন্য দিকে। সেক্ষেত্রে, বাহ্যিক কোনো কারণ ছাড়া কক্ষের একটা দিক ঠাণ্ডা হবে এবং অন্য দিকটা গরম হবে।

এমনকি এমনটাও ঘটতে পারে যে, সমস্ত বাতাস কক্ষটির অর্ধাংশে আসবে এবং বাকি অর্ধাংশ বায়ুশূন্য থাকবে। ১০০ ‘হেড’ চলমানতা থেকে এটা প্রবলভাবেই অসম্ভব কারণ অণুগুলির সংখ্যা অনেক বেশি, কিন্তু সঠিকভাবে বলতে গেলে এটা অসম্ভব নয়।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় যেটা নতুন, সেটা পরিসংখ্যানবিষয়ক নিয়মের ঘটনা নয়, পৃথক ঘটনাকে পরিচালিত করার নিয়মের পরিবর্তে তারা চরম। এটা একটা খুবই কঠিন ধারণা। আমার মতে এর সমর্থকরা যা বোঝেন তার চেয়েও কঠিন। এটা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে যে, একটা পরমাণু যে-সব বিভিন্ন কাজ করতে পারে, সেটা প্রত্যেকটা কাজ করে ক্ষেত্রগুলোর একটা নির্দিষ্ট অনুপাতে।

কিন্তু একটা একক পরমাণু যদি নিয়মহীন হয়, তাহলে বিপুল সংখ্যা সম্পর্কে এই নিয়মনির্দিষ্টতা কি থাকবে? কেউ তো ধরে নিতেই পারেন যে, এমন কিছু অবশ্যই থাকবে যা বিরল রূপান্তরকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল করে তোলে। আমরা একটা উপমা দিতে পারি যা সত্যি সত্যি এসবের কাছাকাছি।

একটা স্নানের ঢাকা-দেওয়া জলাশয়ে যে-কেউ সিঁড়ি খুঁজে পাবেন, যা একজন ডুবুরিকে তার পছন্দের চাইতে পৃথক যে-কোনো উচ্চতা থেকে তাকে ডুব দিতে সক্ষম করবে। সিঁড়ির ধাপগুলো যদি অনেক উচ্চতায় পৌঁছে যায়, সেক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রমী কৃতিত্বের ডুবুরিয়া সর্বোচ্চ ধাপটাই বেছে নেবেন।

এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, এটা অবশ্যই সম্ভব কিন্তু সেটাই হলো সর্বোচ্চ যা স্বীকার করা যায়। এটাও একটা সম্ভাবনা এবং আমার কাছে অধিকতর বেশি একটা সম্ভাবনা যে, নতুন নিয়ম আবিষ্কৃত হবে যেটা পরমাণুর ধরে নেওয়া স্বাধীনতা বিলোপ করবে।

আপনি যদি সাঁতারের একটা সেসন থেকে অন্য সেসনের তুলনা করেন তাহলে যারা বিভিন্ন ধাপ পছন্দ করেন, এমন ডুবুরিদের অনুপাতের মধ্যে মাঝারি ধরনের নিয়মনির্দিষ্টতা দেখা যাবে। এবং বিলিয়ন সংখ্যক ডুবুরিদের অনুপাতের মধ্যে মাঝারি ধরনের নিয়মনিষ্টতা দেখা যাবে।

এবং বিলিয়ন সংখ্যক ডুবুরি হলে আমরা এটা ধরে নিতে পারি যে, নিয়মনির্দিষ্টতা বেশি হবে। কিন্তু এটা বোঝা কঠিন, কেন এই নিয়মনির্দিষ্টতা থাকবে যদি প্রত্যেক ডুবুরির পছন্দের অভিপ্রায় না থাকে। এটা মনে হবে, কিছু মানুষ সঠিক অনুপাত বজায় রাখতে উচ্চ ডুব-চেষ্টা পছন্দ করবে। কিন্তু সেটা আর বিশুদ্ধ খেয়াল বলে প্রতিপন্ন হবে না।

যৌক্তিক এবং গাণিতিকভাবে সম্ভাবনা তত্ত্ব খুবই অসন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি না যে, এমন কোনো অ্যালকেমি আছে যার সাহায্যে এটা প্রতিটি পৃথক ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ খেয়াল থেকে বৃহৎ সংখ্যায় নিয়মনির্দিষ্টতা উৎপাদন করতে পারে।

যদি পেনিটা খেয়ালের দ্বারা পছন্দ করে যে, ‘হেড’ হবে ‘টেইল’ হবে, সেক্ষেত্রে এটা বলার কোনো কারণ আছে কি যে, এটা যতবার ‘একটা’ অতপর ‘অন্যটা’ পছন্দ করবে? খেয়ালটা কি সর্বদা একই পছন্দের দিকে ঠেলে দেবে না? এটা মত ছাড়া এটা আর কিছুই নয়, কারণ কর্তৃত্বব্যঞ্জক ঘোষণার পক্ষে এটা খুবই অস্পষ্ট।

কিন্তু এর যদি কোনো বৈধতাও থাকে, তাহলেও আমরা এই ধারণাটা গ্রহণ করতে পারি না যে, পৃথিবীর চরম নিয়মনির্দিষ্টতাকে অনেক সংখ্যক ঘটনা বিবেচনায় রাখতে হবে। এবং আমাদের এটা ধরে নিতেই হবে যে, পারমাণবিক আচরণের পরিসংখ্যানগত নিয়ম এপর্যন্ত অনাবিষ্কৃত ব্যক্তিগত আচরণের নিয়ম থেকে সিদ্ধান্তমূলক।

পরমাণুর স্বাধীনতা থেকে, এটাকে একটা ঘটনা হিসাবে ধরে নিয়ে, আবেগগত ঐকমত্যের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে, এডিংটন বাধ্য হয়েছেন একটা অনুমান করতে, যেটা এই মুহূর্তে কেবল একটা প্রকল্প ছাড়া কিছু নয়। তিনি চাইছেন মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাকে সুরক্ষিত করতে যার, যদি এর কোনো গুরুত্ব থাকে, অবশ্যই থাকতে হবে বড়সড়ো বস্তুগত চলাচল ঘটানোর ক্ষমতা।

এই ক্ষমতা বড়সড়ো বলবিদ্যার নিয়ম থেকে উদ্ভূত হবে না। আমরা যেমনটা দেখেছি, পরমাণুর নতুন তত্ত্বের দ্বারা বড়মাপের বলবিদ্যার নিয়ম অপরিবর্তনীয়। একমাত্র পার্থক্যটা হলো এরা এখন নিশ্চয়তার চেয়ে প্রবল সম্ভাবনার বর্ণনা করে। এটা অনুমান করা সম্ভব, এইসব সম্ভাবনা কতিপয় অদ্ভুত ধরনের অস্থায়িত্ব ছাড়া প্রতিরোধ্য হয়ে, এই কারণে একটা খুবই কম শক্তি একটা খুব বেশি প্রভাব তৈরি করতে পারে।

এডিংটন কল্পনা করেন এই ধরনের অস্থায়িত্ব জীবন্ত বস্তুর মধ্যেও থাকতে পারে এবং বিশেষভাবে থাকতে পারে মস্তিষ্কে। বাছাই করার একটা কাজ একটা পরমাণুকে এমন পছন্দের দিকে চালিত করতে পারে যেটা কতিপয় সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করতে পারে এবং বড়ো ধরনের ফলাফল তৈরি করতে পারে অর্থাৎ অন্যটির পরিবর্তে একটি।

এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, এটা অবশ্যই সম্ভব কিন্তু সেটাই হলো সর্বোচ্চ যা স্বীকার করা যায়। এটাও একটা সম্ভাবনা এবং আমার কাছে অধিকতর বেশি একটা সম্ভাবনা যে, নতুন নিয়ম আবিষ্কৃত হবে যেটা পরমাণুর ধরে নেওয়া স্বাধীনতা বিলোপ করবে।

বাস্তবে, একজনের সঙ্গে অন্যজনের সামগ্রিক আদান-প্রদান এই ধারণার উপর নির্ভরশীল যে, মানুষের কাজ পূর্ববর্তী অবস্থাবিশেষের উপর নির্ভর। রাজনৈতিক প্রচার, ফৌজদারি আইন, এটা-কিংবা-সেটা কাজের ধারা নির্দেশ করে বই লেখা, এ সবকিছুই তাদের যথার্থ উদ্দেশ্য হারাবে যদি মানুষ যা কিছু করে তার উপর এসবের কোনো প্রভাব না থাকে।

ধরা যাক, পরমাণুর স্বাধীনতা মঞ্জুর করা হলো, এমন কোনো পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ নেই যে, মানুষের শরীরের বড়ো ধরনের সচলতা গড় নির্মাণের প্রক্রিয়া থেকে দায়মুক্ত। এটাই ঐতিহ্যগত বলবিদ্যাতে অন্যান্য আকারের বস্তুনিচয়ের চলমানতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এডিংটন মানুষের ইচ্ছাকে। পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে পুনর্মিলিত করতে চান। সুতরাং, যদিও এটা মজাদার এবং (বর্তমানে কঠোরভাবে খণ্ডনযোগ্য। আমর কাছে এটা পর্যাপ্ত পরিমাণে ন্যায়সঙ্গত মনে হয় না, যে-বিষয়টা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার পূর্বে এসেছে সেটার তত্ত্বে একটা পরিবর্তনের দাবি তোলা।

মনস্তত্ত্ব এবং শারীরবিদ্যা, যতদূর এই দুটো স্বাধীন ইচ্ছার প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত, এটাকে অসম্ভব করে তুলতে চায়। অন্ত্রের রসক্ষরণ, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের কার্যাবলী সম্পর্কে বর্ধিত জ্ঞান, পাভলভের শর্তাধীন প্রতিবর্ত ক্রিয়ার অনুসন্ধান এবং অবরুদ্ধ স্মৃতি এবং ইচ্ছার ফলাফলের মনঃসমীক্ষণগত অধ্যায়ন সম্পর্কিত কাজসমূহ মিলিতভাবে মানসিক ব্যাপারসমূহ নিয়ন্ত্রণে কার্য-কারণ নিয়মের আবিষ্কারে অবদান রেখেছে।

এগুলোর কোনোটাই অবশ্য স্বাধীন ইচ্ছার সম্বাবনাকে অপ্রমাণিত করেনি কিন্তু এগুলো এটাকে উচ্চ সম্ভাবনাময় করেছে, যদি অঘটিত ইচ্ছাশক্তি ঘটে যায়, সেগুলো খুবই বিরল।

আবেগগত গুরুত্ব যাকে স্বাধীন ইচ্ছা বলে ধরে নেওয়া হয়, সেটা আমার মতে প্রধানত কতিপয় চিন্তার বিভ্রান্তির উপর নির্ভর করে। মানুষ অনুমান করে যে, যদি ইচ্ছাশক্তির কারণ থাকে, তারা এমন সব কাজ করতে বাধ্য হয় যা তারা করতে চায় না।

এটা অবশ্যই একটি ভুল। ইচ্ছাটা হলো কাজের কারণ, এমনকি যদিও ইচ্ছার নিজস্ব কারণ রয়েছে। আমরা যা করব না তা আমরা করতে পারি না, কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার অভিযোগ জানানো অযৌক্তিক মনে হয়। আমাদের ইচ্ছাগুলোকে ব্যাহত করা অসন্তোষজনক।

কিন্তু এটা ঘটার থেকে ঘটার সম্ভাবনা অধিক। নির্ধারণবাদও এই আবেগ প্রতিপন্ন করে না যে, আমরা ক্ষমতাহীন। ক্ষমতার বাঞ্ছিত ফলাফল থাকতে হয়। এবং আমাদের অভিপ্রায়ের কারণ আবিষ্কারের দ্বারা এটা বাড়ে না কিংবা কমে না।

স্বাধীন ইচ্ছায় বিশ্বাসীরা, অন্য মানসিক স্তরে থেকে, একই সঙ্গে বিশ্বাস করে যে, ইচ্ছাশক্তির কারণ আছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, তাঁরা ভাবেন যে, সদাচার কারোর মধ্যে বদ্ধমূল করে দেওয়া যায় ভালোভাবে প্রতিপালন করে এবং ধর্মীয় শিক্ষা নীতিশিক্ষার ক্ষেত্রে হিতকারী।

এঁদের বিশ্বাস, সুসমাচার কল্যাণ করে, এবং নৈতিক প্রেরণা বা পরামর্শ কল্যাণকর। এখন এটা স্পষ্ট যে, যদি ধর্মাচারীর ইচ্ছাশক্তি স্বয়ংসৃষ্ট হয়, তাহলে এটা বিকাশে আমরা কিছুই করতে পারি না। যে পরিমাণ একটা মানুষ বিশ্বাস করে যে, অন্যের মধ্যে বাঞ্ছিত আচরণ বিকশিত করা তার ক্ষমতার মধ্যে কিংবা যে-কোনো মানুষের ক্ষমতাধীন, ঠিক সেই পরিমাণে তিনি, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিতে নয়, মনস্তাত্ত্বিক কার্যকরণে বিশ্বাস করেন।

বাস্তবে, একজনের সঙ্গে অন্যজনের সামগ্রিক আদান-প্রদান এই ধারণার উপর নির্ভরশীল যে, মানুষের কাজ পূর্ববর্তী অবস্থাবিশেষের উপর নির্ভর। রাজনৈতিক প্রচার, ফৌজদারি আইন, এটা-কিংবা-সেটা কাজের ধারা নির্দেশ করে বই লেখা, এ সবকিছুই তাদের যথার্থ উদ্দেশ্য হারাবে যদি মানুষ যা কিছু করে তার উপর এসবের কোনো প্রভাব না থাকে।

আমরা ভাবনা-চিন্তার পরে যখন সিদ্ধান্ত নেই, তখন দুটো বা তিনটে সম্ভাবনা আমাদের মনে থাকতে পারে, প্রতিটি কম বা বেশি আকর্ষণীয়, এবং সম্ভবত প্রতিটি কম বা বেশি বিরক্তিকর! শেষ পর্যন্ত, অন্যগুলোকে পরাস্ত করে একটি আকর্ষণীয় বলে প্রতিপন্ন হলো।

যারা এইমত পোষণ করেন, তাঁরা স্বাধীন ইচ্ছা মতবাদের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারেন না। আমরা প্রশ্ন করি, আপনি এটা কেন করলেন?’ এবং উত্তর আশা করি যে, উত্তরদাতা যে-কারণে কাজটি করবেন সেটার বিশ্বাস এবং অভিপ্রায়ের কারণ জানাবেন।

যখন একজন নিজেই জানেন, তিনি যা করলেন তা কেন করলেন, তখন আমরা একটা কারণের জন্য তাঁর অচেতনতার কারণ অনুসন্ধান করতে পারি, কিন্তু এটা কখনোই আমাদের মনে হবে না যে, ওখানে কোনো কারণ নেই।

এটা বলা হয় যে, অন্তর্দর্শন তাৎক্ষণিক আমাদের ইচ্ছাশক্তি সম্পর্কে সচেতন করে। যতদূর এটা ধরা হয় এক অর্থে এটা কার্য-কারণকে নিবারিত করে, এটা কেবলমাত্র একটা ভুল। আমরা যেটা জানি সেটা হলো আমরা যখন একটা পছন্দ তৈরি করি, আমরা চাইলে তখন অন্যভাবেও পছন্দটা করতে পারতাম।

কিন্তু আমরা কেবলমাত্র অন্তর্দর্শন দিয়ে জানতে পারি না, আমরা যা করলাম তার জন্য আমাদের চাওয়ার কোনো কারণ আছে কি নেই। যে-সমস্ত কাজ যুক্তিগ্রাহ্য সেক্ষেত্রে আমরা তাদের কারণ জানতে পারি। যখন আমরা আইনগত অথবা চিকিৎসাসংক্রান্ত কিংবা আর্থিক উপদেশ গ্রহণ করি এবং সেইমতো কাজ করি, তখন আমরা কাজের কারণ জানি।

কিন্তু সাধারণভাবে কাজের কারণগুলো অন্তর্দর্শনের সাহায্যে আবিষ্কার করা যায় না। অন্যান্য ঘটনার কারণের মতো এই কারণসমূহ আবিষ্কার করতে হয় এদের পূর্ববর্তী কারণ পর্যবেক্ষণ এবং পারস্পর্যের নিয়ম আবিষ্কারের মাধ্যমে।

অধিকন্তু, এটাও অবশ্যই বলতে হবে যে, ইচ্ছাশক্তির ধারণা খুবই অস্পষ্ট এবং সম্ভবত এমনটাই যা বৈজ্ঞানিক মনস্তত্ত্ব থেকে উধাও হয়ে যায়। আমাদের বেশিরভাগ কাজ ইচ্ছাশক্তির কাজের মতো কোনো কিছুর দ্বারা পূর্ববর্তী নয়। এটা এক ধরনের মানসিক রোগ যার প্রভাবে পূর্বে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সাধারণ কিছুও করা যায় না।

দৃষ্টান্তস্বরূপ, আমরা কোনো এক স্থানে হাঁটতে যাবো ঠিক করলাম, এবং তারপর যদি আমরা পথটা চিনি, একটা পা ফেলার আগে আর একটা পা ফেলে চলতে চলতে গন্তব্যে পৌঁছে যাই। এটা হলো কেবল মূল সিদ্ধান্ত যেটাকে ইচ্ছাশক্তি’বলে অনুভূত হয়।

আমরা ভাবনা-চিন্তার পরে যখন সিদ্ধান্ত নেই, তখন দুটো বা তিনটে সম্ভাবনা আমাদের মনে থাকতে পারে, প্রতিটি কম বা বেশি আকর্ষণীয়, এবং সম্ভবত প্রতিটি কম বা বেশি বিরক্তিকর! শেষ পর্যন্ত, অন্যগুলোকে পরাস্ত করে একটি আকর্ষণীয় বলে প্রতিপন্ন হলো।

এবং প্রায়েগিক, এই কারণে, এমন বিশ্বাস যে, জ্ঞানবিজ্ঞানের কোনো এক শাখায় কার্য-কারণ নিয়ম নেই এমন ঘোষণা অনুসন্ধানকে অনুৎসাহিত করে এবং এই নিয়মের আবিষ্কারে বাধা দিতে পারে। এই দ্বিত্ব বিবেচনাহীনতা, আমার মনে হয়, তাদের মধ্যেই রয়েছে যারা ঘোষণা দেন যে, পরমাণুর পরিবর্তন পুরোপুরি নির্ধারণযোগ্য নয় এবং অন্যেরা যারা যুক্তিপ্ৰমাণ ব্যতিরেকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির বিবৃতি দেন।

কেউ যদি পশ্চাৎচিন্তার দ্বারা ইচ্ছাশক্তিকে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করেন, তিনি দেখবেন মাংসপেশীর একটা উৎকণ্ঠা এবং কখনও কখনও একটা সজোরে বাক্যোচ্চারণ, ‘এটা আমি করবই। কিন্তু আমি, একবারের জন্যেও আমার মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট ধরনের মানসিক ঘটনা টের পাইনি যাকে আমি ইচ্ছাশক্তি’ বলতে পারি।

‘ঐচ্ছিক’ এবং ‘অনৈচ্ছিক’ কাজের মধ্যে পার্থক্য অস্বীকার করা অযৌক্তিক হবে। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন পুরোপুরি অনৈচ্ছিক। এরকম শ্বাস-প্রশ্বাস, হাইতোলা, হাঁচি দেওয়া প্রভৃতি অনৈচ্ছিক কাজ, কিন্তু (সীমার মধ্যে) এসব ঐচ্ছিক কাজের দ্বারা নিয়ন্ত্রণযোগ্য। হাঁটাচলা এবং কথা বলার কাজ পুরোপুরি ঐচ্ছিক।

যে পেশীগুলো হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের মতো বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলো ঐচ্ছিক কাজে সংশ্লিষ্ট পেশীসমূহ থেকে ভিন্ন ধরনের। ঐচ্ছিক কাজকর্ম মানসিক পূর্বগামী ঘটনার দ্বারা সংঘটিত হতে পারে। কিন্তু এর কোনো কারণ নেই, অন্তত আমার মনে হয়, এইসব ‘মানসিক’ পূর্বগামী ঘটনাগুলো ঘটনাসমূহের একটা অদ্ভুত শ্রেণী, যেমন ধরা হয় ইচ্ছাশক্তিকে।

স্বাধীন ইচ্ছার তত্ত্বকে নৈতিকতা সম্পর্কে, গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাবা হয়েছে। এমনটা ভাবা হয়েছে ‘পাপের’ সংজ্ঞা এবং শাস্তির বিশেষ করে ঐশ্বরিক শাস্তির ন্যায্যতা-এই উভয় বিষয় বিবেচনায় রেখে। প্রশ্নটার এই দিকটা নিয়ে পরবর্তী কোনো এক অধ্যায়ে, যেখানে নৈতিকতার উপর বিজ্ঞানের প্রভাবের বিষয়টা তুলব, সেখানে আলোচনা করা হবে।

এমনটা মনে হতে পারে যে, বর্তমান অধ্যায়ে প্রথমে নির্ধারণবাদ এবং পরে স্বাধীন ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিতর্ক তুলে অসংলগ্নতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছি। কিন্তু বস্তুত, দুটোই চরম অধিবিদ্যক মতবাদ এবং উভয়ই বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণযোগ্যতার বাইরে চলে যায়।

কার্য-কারণের অনুসন্ধান হলো যেমনটা আমরা দেখলাম, বিজ্ঞানের সারমর্ম এবং বিশুদ্ধ বাস্তব জ্ঞানে, বিজ্ঞানবিদদের অবশ্যই সর্বদা নির্ধারণবাদকে প্রকল্পের কাজ বলে ধরে নিতে হবে। কিন্তু এমন ঘোষণা দিতে তিনি বাধ্য নন যে, তিনি বাস্তবিকপক্ষে যেখানে কার্য-কারণ নিয়ম দেখেছেন তার বাইরেও কার্য-কারণ নিয়ম রয়েছে। বাস্তবিকই তিনি অবিবেচক হবেন যদি তিনি তাই করেন।

কিন্তু তিনি আরও অধিক অবিবেচক হবেন যদি তিনি নিশ্চিত করে বলেন যে, তিনি এমন একটা অঞ্চল জানেন, যেখানে কার্যকারণ নিয়ম ক্রিয়াশীল নয়। এই ধরনের ঘোষণার তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক বিবেচনাহীনতা রয়েছে। তাত্ত্বিক, এই কারণে যে, আমাদের জ্ঞান কখনোই এই ধরনের ঘোষণা দেবার পক্ষে যথেষ্ট নয়।

এবং প্রায়েগিক, এই কারণে, এমন বিশ্বাস যে, জ্ঞানবিজ্ঞানের কোনো এক শাখায় কার্য-কারণ নিয়ম নেই এমন ঘোষণা অনুসন্ধানকে অনুৎসাহিত করে এবং এই নিয়মের আবিষ্কারে বাধা দিতে পারে। এই দ্বিত্ব বিবেচনাহীনতা, আমার মনে হয়, তাদের মধ্যেই রয়েছে যারা ঘোষণা দেন যে, পরমাণুর পরিবর্তন পুরোপুরি নির্ধারণযোগ্য নয় এবং অন্যেরা যারা যুক্তিপ্ৰমাণ ব্যতিরেকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির বিবৃতি দেন।

বস্তুত, যে-কোনো একটি বিকল্পকে আমাদের গ্রহণ করার কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু এটা ধরে নেবারও কোনো কারণ নেই যে, সত্য, তা যাই হোক না কেন, সেটা এমনই যা উভয়ের সম্মতিমূলক বৈশিষ্ট্যসমূহকে যুক্ত করবে অথবা যে-কোনো পরিমাণে আমাদের অভিলাষের সম্পর্কের দ্বারা নির্ধারণযোগ্য হবে।

এই দুই গোঁড়ামির মুখোমুখি হয়ে বিজ্ঞানকে অবশ্যই পরীক্ষাবাদী থাকতে হবে, যথার্থ সাক্ষ্য যা চাইবে তার বাইরে ঘোষণা কিংবা অস্বীকৃতির বিষয় বহন করবে না।

নির্ধারণবাদ এবং স্বাধীন ইচ্ছার মধ্যে বহুকালব্যাপী বিতর্ক চলতে থাকে দুটো যুযুধান শক্তিশালী কিন্তু যৌক্তিকভাবে পুনর্মিলন সম্ভাবনা রহিত আবেগের থেকে। নির্ধারণবাদের সুবিধাটা হলো এই যে, কার্য-কারণ নিয়মের আবিষ্কারের মাধ্যমে ক্ষমতা আসে। ধর্মতাত্ত্বিক সংস্কারের সঙ্গে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞান গৃহীত হয়েছে কারণ এটা ক্ষমতা প্রদান করেছে।

প্রকৃতির গতি নিয়মিত, এই বিশ্বাস নিরাপত্তার বোধ প্রদান করছে। একটা পর্যায় পর্যন্ত ভবিষ্যৎ আগে থেকে দেখতে এবং অপ্রীতিকর ঘটনা আটকে দিতে আমাদের সক্ষমতা প্রদান করে। যখন রোগ ব্যাধি এবং ঝড়-ঝঞ্ঝার কারণগুলো খেয়ালি পৈশাচিক শক্তির উপর আরোপিত হত তখন তারা আজকের থেকে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর ছিল।

এইসব অভিপ্রায় মানুষকে নির্ধারণবাদের দিকে চালিত করে। কিন্তু যখন তারা প্রকৃতির ওপর ক্ষমতা পেতে চাইল, তখন তারা তাদের উপর প্রকৃতির ক্ষমতা মেনে নিতে চাইল না। তারা যদি এটাই বিশ্বাস করে তাহলে মানবজাতির অস্তিত্বের আগে নিয়মগুলোর কার্যকারিতা ছিল।

এই নিয়ম এক ধরনের অন্ধ প্রয়োজনের দ্বারা সাধারণভাবে পুরুষ ও মহিলা নয়, এমন একজনের সৃষ্টি করল, যে নিজের বিশেষ স্বভাব নিয়ে জন্মাল। এই একজন যা করে ও বলে, অন্যেরা তাই করে ও বলে। পরে মানুষ উপলব্ধি করল যে, তাদের ব্যক্তিত্ব অপহৃত হয়েছে। ব্যর্থ, গুরুত্বহীন, পরিস্থিতির দাস, প্রথম থেকে প্রকৃতি তাদের যে-ভূমিকা প্রদান করেছে তা থেকে সামান্য পরিমাণেও এদিক-ওদিক করা সম্ভব হচ্ছে না।

এই উভয় সংকট থেকে কতিপয় মানুষ পালাতে চাইল, মানুষের মধ্যে স্বাধীনতা এবং সর্বত্র নির্ধারণবাদ, এসব ধরে নিয়ে। অন্যেরা এ অবস্থা থেকে বেরোতে চাইল দক্ষতার সঙ্গে উদ্ভাবিত কুতর্কমূলক প্রচেষ্টার দ্বারা স্বাধীনতার সঙ্গে নির্ধারণবাদের যৌক্তিক পুনর্মিলন ঘটিয়ে।

বস্তুত, যে-কোনো একটি বিকল্পকে আমাদের গ্রহণ করার কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু এটা ধরে নেবারও কোনো কারণ নেই যে, সত্য, তা যাই হোক না কেন, সেটা এমনই যা উভয়ের সম্মতিমূলক বৈশিষ্ট্যসমূহকে যুক্ত করবে অথবা যে-কোনো পরিমাণে আমাদের অভিলাষের সম্পর্কের দ্বারা নির্ধারণযোগ্য হবে।

বিতণ্ডাবাদী>>

……………………..
মূল- বার্ট্রান্ড রাসেল
অনুবাদ – আতা-ই-রাব্বি

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………….
আরও পড়ুন-
দর্শনের ইতিহাস বিচার
আইয়োনীয় দর্শন
টোটেম বিশ্বাস
নির্ধারণবাদ
বিতণ্ডাবাদী
অতীন্দ্রিয় রহস্যবাদ
জনগণের দর্শন ও বস্তুবাদী দর্শন
লোকায়ত ও সাংখ্য
লোকায়ত, বৈষ্ণব, সহজিয়া
প্রকৃতিবাদী দার্শনিকবৃন্দ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!