এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: এক

এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: এক

-মূর্শেদূল মেরাজ

ফিরবোই এমন প্রতিজ্ঞা নিয়েই তো পরমের কাছ থেকে বিচ্যুত হয়েছিলাম সৃষ্টিচক্রের মহাবিস্ফোরনে। মৃত্যু স্বাদ গ্রহণ করবো বলেই তো এই জন্মজন্মান্তরের ঋণের বোঝা বয়ে বেড়ানো। তারপরও আমরা সাধারণেরা কেউই মরতে চাই না। স্বয়ং রবীন্দ্রণাথ ঠাকুর বলেছেন- ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’। আসলে এ কেবল কবির কথা নয়। আমাদের সকলেই মনের বাসনা। তারপরও এই নশ্বর দেহ ছেড়ে চলে যেতেই হয়-হবে। এটাই বাস্তব।

অঞ্জন দত্তের একটা টেলিছবিতে অভিনেতা ভিক্টর ব্যানার্জি পার্শ্ব অভিনেতা বন্ধু বরুণ চন্দকে বলেছিল তা অনেকটা এরকম, শোন! মানুষ তার জন্ম কোথায় হবে তা সে নির্দিষ্ট করতে পারে না। কিন্তু সে চাইলে তার মৃত্যু কোথায় হবে তা সে নির্দিষ্ট করতে পারে। তাই আমি এই এখানে এসেছি… আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে মরতে চাই বুঝলি।”

আমার অসম্ভব ভালো লাগা একটা টেলিছবি এটি। তারপর যখন আধ্যাত্মিকতাকে বুঝতে শুরু করবার চেষ্টা করলাম তখন বুঝতে শুরু করলাম, মানুষ চাইলে শুধু তার মৃত্যু নয় জন্ম কোথায় হবে সেটাও নির্দিষ্ট করতে পারে। তাবে তাকে অবশ্যই মানুষ হতে। জ্বি হ্যা! প্রকৃত মানুষ। আর যে জন মানুষ হয়েছে সেই পেরেছে মুক্তির মর্ম বুঝতে। নইলে আমাদের মতো সাধারণের জীবন যাপন করে চলে যেতে হবে ভয়-সংশয়-অস্থিরতা নিয়ে।

আসলে এতোগুলো কথা বলবার কোনো মানেই ছিল না। বললাম বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে। আমরা প্রায় সকলেই বন্দি সময় কাটাচ্ছি। অস্থির হয়ে উঠছি। আর বন্দিদশা লাগছে না ভালো। কিন্তু মাথা ঠাণ্ডা রেখে-স্থির হয়ে বুঝতে হবে, এখন অস্থিরতার সময় নয়, এখন হচ্ছে ভালোবাসার। এখন সময় হচ্ছে নির্দিষ্ট শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে পরস্পরের পাশে দাঁড়ানোর। এখনই প্রকৃত হয় মানুষ হয়ে উঠবার। মানুষের প্রকৃত স্বরূপ কি তা জানবার।

কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, প্রায় সকলেই সচেতনতার নামে আতঙ্ক ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতি মিনিটে কত জন আক্রান্ত হচ্ছে-প্রতি মিনিটে কতজন মারা যাচ্ছে। কিভাবে সব ধ্বংস হয়ে যাবে। কিভাবে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। আসলে যদি আপনার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা না থাকে তাহলে তাদের মনোবল ভেঙে দেয়ার অধিকারও নেই।

কেউ যদি হলুদ, আদা, কালিজিরা, রসুন খেয়ে মানুষিক সুস্থ্যতা অর্জন করতে সক্ষমতা অর্জন করে। তাহলে আপনার অধিকার নেই সেসব ভুল প্রমাণের জন্য সারাক্ষণ পোস্ট বা ইনবক্স করে যাওয়া। এসব দিয়ে হয়তো করোনা মোকাবেলা করা যাবে না। কিন্তু সাধারণ মানুষ কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারবে। যাতে করে সে ভয় থেকে ঊর্দ্ধে থাকতে পারবে কিছুটা সময় হলেও। যারা নিজেদের সচেতন ভাবছেন তাদের উচিৎ এসব দ্রব্যের মূল্য যাতে বৃদ্ধি না পায় তার দিকে নজর দেয়া। সারাক্ষণ মানুষের ভুল ধরাও একটা রোগ। এই রোগ থেকেও মুক্ত থাকা আবশ্যক।

মানুষের এই দুর্যোগকালে মানুষ হিসেবে আপনাকে অবশ্যই মানুষকে সাহস যোগার করতে হবে। তা অবশ্যই ঘর থেকে বের হয়ে হাঁটাহাঁটি করার জন্য না। মানুষকে স্থির করার জন্য। মানুষকে সুস্থ করার জন্য আপনি কি কি করতে পারেন সেটা ভাবতে হবে। আপনি নিজে কি করে সুস্থ থাকছেন সেটা সকলকে জানাতে হবে। তা অবশ্যই ব্যয়বহুল কোনো পন্থা যাতে না হয়।

ভারতবর্ষের অগুণিত সাধুগুরুপাগলবৈষ্ণব আমাদেরকে যে মানুষিক স্থিরতার শিক্ষা দিয়ে গেছেন তা এই সময় স্মরণ করতে হবে। আপনি বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী যে কেউই হতে পারেন। তাতে কোনো বাঁধা নেই। মানুষিক শক্তি বৃদ্ধি কল্পে আপনাকে অবশ্যই স্থিরতার শিক্ষা নিতে হবে।

নগর সভ্যতা-বিশ্ব সভ্যতা আপনাকে যা কিছুই শিখিয়ে থাকুক না কেনো। এখন আপনাকে গোটা মানবজাতিকে নিয়েই ভাবতে হবে। এই বিপদকালীন সময় মানুষ সবচেয়ে বড় অসহায় প্রাণী। এই অল্পকিছু কাল পূর্বেও মানুষ নিজেকে সর্বময় ভাবতো। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে তার পরিকল্পনা করার সুযোগ কম। প্রকৃতিই তার জন্য পরিকল্পনা করছে এখন।

তাই সকল বিভেদ ভুলে আসুন যতটা সময় আমরা বেঁচে আছি-নি:শ্বাস নিতে পারছি সুস্থভাবে। ততটা সময় সকলকে ভালো রাখবার জন্য বাঁচি। সকলকে সাহসের গল্প বলি-জীবনের গল্প বলি-ভালোবাসার গল্প বলি।

যারা সশরীরে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে মানুষের সেবায় ব্রত আছেন এই সময় তাদের প্রত্যেকের কাছে মানুষ আজন্ম ঋণি থাকবে। আর যারা দূরে থেকে আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা করছে তাদের ঋণও শোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু যারা ক্রমশ হতাশ হয়ে পরছে-অস্থির হয়ে পরছে-বিভ্রান্ত হয়ে পরছে। সময় হলো তাদের সাথে থাকার। তাদের কথা ভাববার। আপনি সচেতনতার নামে যা কিছু ছড়িয়ে যাচ্ছেন তা যেনো কারো রক্তচাপ বাড়িয়ে না দেয়-তাতে করে যেন কারো হার্টবিট-পালস্ অস্থির না হয়ে যায় সেদিকে দৃষ্টি দেয়াও আপনার কাজ।

জীবনে অস্থিরতা আসবেই-ক্লান্তি আসবেই-হতাশা আসবেই কিন্তু তাকে মোকাবেলা করতে হবে স্থিরতার মধ্যে দিয়ে। আর এখনি সেই সময়। যখন আপনি সবচেয়ে বেশি স্থির হতে পারেন। একা হতে পারেন। নিজের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন। নিজের ভেতরের হেরাগুহা-কৈলাশপর্বত-বোধিবৃক্ষ খুঁজে নিতে পারেন।

জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার সাথে-জীবের সাথে পরমের-নিজের সাথে নিজের এই যোগ স্থাপনের এটাই উপযুক্ত সময়। এই অখণ্ড অবসরে আসুন নিজেকে চিনতে শুরু করি-জানতে শুরু করি-বুঝতে শুরু করি। এই যে এতোদিন ধরে এই জীবনটাকে আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি তার কতটা জানি আমরা আমাদের নিজেকে?

এই নিজের সাথে নিজের যোগাযোগের কথা কেবল আর্য নয় আর্য পূর্ব ভারতবর্ষের শিক্ষা। এ অঞ্চলের সকল সাধকই নিজেকে জানার নানা প্রকৃয়া দিয়ে গেছেন। তা এই অঞ্চলের আস্তিক দর্শনই হোক বা নাস্তিক দর্শনই হোক। নিজেকে চেনার বিকল্প নেই। ঐ যে শুরু করেছিলাম- ‘ফিরবোই এমন প্রতিজ্ঞা নিয়েই তো পরমের কাছ থেকে বিচ্যুত হয়েছিলাম সৃষ্টিচক্রের মহাবিস্ফোরনে’। যাতে জন্ম তাতেই মরণ। যে পথে এসেছি সে পথেই ফিরতে হবে তাই বাঁচি আনন্দে।

ফকিরকুলের শিরোমণি ফকির লালন সাঁইজির নিজেকে চিনবার একটা পদ দিয়ে আজ শেষ করছি। সময় সুযোগ হলে আবারো লিখবো। ততক্ষণ সকলে ভালো থাকুন। ঘরে থাকুন। অতীব প্রয়োজন হলে ঘর থেকে বের হলে নির্দিষ্ট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন। ফকির লালন সাঁইজি বলছেন-

বাড়ির কাছে আরশী নগর
সেথা (একঘর) পড়শী বসত করে
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।।

গিরাম বেড়ে অগাধ পানি
নাই কিনারা নাই তরণী পারে,
বাঞ্ছা করি দেখব তারে
(আমি) কেমনে সেথা যাই রে।।

কি বলব পড়শীর কথা
হস্ত পদ স্কন্ধ মাথা নাই-রে,
ক্ষণেক থাকে শূণ্যের উপর
(ওসে) ক্ষণেক ভাসে নীরে।।

পড়শী যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেতো দূরে,
সে আর লালন একখানে রয়
(তবু) লক্ষ যোজন ফাঁক রে।।

(চলবে…)

……………………
আরো পড়ুন:
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: এক
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: দুই
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: তিন
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: চার

এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: পাঁচ
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: ছয়

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!