এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: তিন

এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: তিন

-মূর্শেদূল মেরাজ

আচ্ছা আপনি কখনো আপনার দেহের প্রতিটি রোমকূপ স্পর্শ করে দেখেছেন? দেহের প্রত্যেকটা ইন্দ্রিয়কে আলাদা আলাদাভাবে গভীরভাবে অনুভব করেছেন কখনো?? খোঁজ রেখেছেন দেহের সমস্ত তন্ত্রগুলোর??? বা খেয়াল করেছেন কোথা থেকে নি:শ্বাস উদয় হয় আর কোথায় তা নি:শেষ হয়ে হয়ে যায়?

মাথার তালু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত দেহের সমস্তটা জুড়েই তো আপনি বিরাজ করছেন। বা সহজভাষায় বলতে গেলে, আপনার আত্মা-রূহ বা প্রাণশক্তির বর্তমান বাহ্যিক বা স্থূল সর্বোচ্চ প্রকাশ তো আপনার দেহই। ঠিক কিনা?

যদি তাই হয়, তাহলে যে খাঁচার ভেতরে আমাদের প্রাণ ভোমরার বাস; সেই দেহযন্ত্রটাকে কখনো খুব খেয়াল করে দেখেছি কি আমরা? জানবার চেষ্টা করেছি তার সম্পর্কে? নাকি রূপসজ্জ্বার প্রয়োজনে যতটা দেখবার ততটুকুই দেখেছি মাত্র? একটু ভেবে দেখুন তো। আপনার দেহটাকে কি সত্যিই আপনি চেনেন?

জন্মের পর থেকে যে দেহ যন্ত্রটাকে টেনে নিয়ে চলেছি। যা সদাসর্বদা নিজের সাথেই আছে। যাকে ধরা যায়-ছোঁয়া যায়। তাকেই দেখা হয়নি কখনো ভালোভাবে। জানা হয়নি-বোঝা হয়নি তার মর্ম। অসুখ-বিসুখ না হলে শরীরে যে কি কি অঙ্গ-প্রতঙ্গ আছে তাও মনে থাকে না।

যে দেহকে আমরা তেমনভাবে বুঝিই না, যার সাথে আমাদের সু-সম্পর্কই নেই। সেই দেহ কি আমাদের কথা শুনবে? বা শোনে?? সে তো চলবে তার মতোই; সেটাই স্বাভাবিক। যে ভাই-বন্ধুদের সাথে অন্তরের অন্তরঙ্গ আত্মার সম্পর্ক, তাদের সাথেই দীর্ঘদিন সম্পর্ক না থাকলে তারাই পর হয়ে যায়। আর যার সাথে সম্পর্কই স্থাপন করা হয়নি সে দেহ কেনো কথা শুনবে; সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

যখন দৃশ্যমান দেহই কথা শোনে না আমাদের। তখন তার ভেতরে যে সূক্ষ্ম মন। তাকে নিয়ন্ত্রণ কি চাইলেই করা যাবে? সেতো আরো কঠিন কাজ হবার কথা। তুলনামূলক সহজ কাজ, দেহটাকেই জানা হলো না। আর আমরা মনকে বশে আনবার কতোই না ফন্দি-ফিকির করে চলেছি।

যে দেহের সাথেই তেমন জানা-শোনা হয়নি কখনো। আর সেই দেহ খাঁচার মধ্যে আত্মা বা প্রাণশক্তির সূক্ষ্ম প্রতিকৃয়া ভাব ‘মন’ নামক যে পাখির বাস; তার সাথে তো পরিচয় হয় কি করে? তার সাথে যদি আলাপচারিতাই না হয়। ভাব বিনিময় না হয়। তাহলে তো সেই পাখি অচেনাই থেকে যাবে। ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

কি এক অচিন পাখি পুষলাম খাঁচায়।
জনম ভরে হলো না তার পরিচয়।।

আঁখির কোণে পাখির বাসা
দেখতে নারে কি তামাশা,
আমার এই আঁধলা দশা
কে আর ঘুঁচায়।।

পাখি রাম রহিম বুলি বলে
ধরে সে অনন্ত লীলে,
বল তারে কে চিনিলে
বলো গো নিশ্চয়।।

যারে সঙ্গে লয়ে ফিরি
তারে বা কই চিনিতে পারি,
লালন কয় অধর ধরি
কি রূপ ধ্বজায়।।

এই দেহের সাহায্যেই পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রীয় বোধ নিতে হয়। যেমন ‘শব্দ’ কান দিয়ে, ‘স্পর্শ’ ত্বক দিয়ে, ‘রূপ’ চোখ দিয়ে, ‘রস’ জিহ্বা আর ‘গন্ধ’ নাক দিয়ে। আবার পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়ও এই দেহেতেই। যথা- হস্ত + পদ + বাক্ + পায়ু + উপস্থ উভয়েন্দ্রিয়।

আমরা যা কিছুই গ্রহণ করি তার সবই প্রায় এই দেহ দিয়ে। অর্থাৎ দেহের ইন্দ্রিয় দিয়ে। তারপরই আছে মন-বুদ্ধি-অহঙ্কার। ইন্দ্রিয় দিয়ে যা কিছু আমরা গ্রহণ করি তার প্রতিকৃয়া তৈরি হয় ‘মন-বুদ্ধি-অহঙ্কার’ দ্বারা। আর আমরা জন্ম-জন্মান্তর ধরে যে সকল ‘সংস্কার’ অর্থাৎ বুদ্ধি-বিবেচনা দ্বারা যতসব তথ্য-উপাত্য সংগ্রহ করি। তা নিজের জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে সবই সংস্কাররূপে জমা হতে থাকে।

আর এই সংস্কারের ফলই আমাদের আচার-আচরণ, বিচার-বিবেচনা বোধ। প্রত্যেকেই তার সংস্কার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। এই সংস্কারও পঞ্চসংস্কারের সমন্বয়ে গঠিত- আত্মার মূল সংস্কার, পূর্বজন্মের সংস্কার, পৈত্রিক সংস্কার, পারিপাশ্বির্ক সংস্কার ও নিজের সংস্কার।

আত্মা-রূহ বা প্রাণ শক্তির মূল সংস্কার হলো ‘সদা আনন্দ চিত্ত’। আর তারপর যে সকল সংস্কার সবই নিজের বা পরিবেশ-পরিস্থতির উপর তৈরি সংস্কার। যা আমরা বহন করে চলি। এই সংস্কারের বোঝা যার যতবেশি তার তত পরিভ্রমণ এই ধরাধামে। যতক্ষণ পর্যন্ত না আত্মা বা প্রাণ শক্তি তার নিজের স্বরূপে ফিরে যায় অর্থাৎ ‘সদা আনন্দ চিত্ত’ ধারণ করে ততবার জন্মাতেই হয় জন্মের ঋণ শোধ করতে। সাধুগুরু তাই বলেন।

এই সংস্কারের জমাপুঞ্জির মধ্যেই নির্ভর করে মানুষের দোষ আর গুণের। যে যেমন সংস্কার জমা করে রাখে তার স্বভাবে তেমনি প্রতিফলিত হয়। তাই ‘সংস্কার’ মুক্ত হওয়া জরুরী। যা কিছু অপ্রয়োজনীয় শুধু তাই নয়। যে সাধক সকল সংস্কার মুক্ত হতে পারে। সেই আত্মার বা প্রাণশক্তির মূল শক্তিকে অনুভব করতে পারে।

তাই আমরা- কি দেখবো, কি শুনবো, কিসের গন্ধ নেবো, কি স্পর্শ করবো আর কি আহার গ্রহণ করবো এ বিষয়ে অধিক সচেতন হওয়া আবশ্যক। অপ্রয়োজনীয়-অপ্রাসঙ্গিক-অযাচিত সংস্কার যাতে নিজের অজ্ঞাতেও জমা না হয়; তাই এ সকল বিষয়ে মনোযোগী হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ।

যাই হোক, আমরা কি হতে চাই বা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতেই সংস্কার গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর সংস্কার গ্রহণে পঞ্চ জ্ঞানেন্ত্রীয় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরী। এটাই হলো সাধনা। যে তার জ্ঞান ও কর্ম ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে; তার পক্ষে মন নিয়ন্ত্রণ করা খানিকটা সহজ।

অপ্রয়োজনীয় সংস্কার জমা না থাকলে বুদ্ধি বিবেচনার পর্যায়ে উন্নীত হয়। তাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহজতর হয়। হিনমন্ন্যতা-আলস্য থাকে না, অপরের দোষ খোঁজা থাকে না, পরশ্রীকাতরতা থাকে না, হতাশা-বিষন্নতা থাকে না।

সাধককুল বলে, এই সংস্কার পূর্ণগঠনের জন্যই এই ধরাধামে নতুন নতুন দেহ ধারণ করে বারংবার জন্মাতে হয়। আর যে জন্মে সাধক তার সংস্কার গঠনে মনোযোগী হয়, সে জনমই সার্থক জনম। তারপর থেকে পথ মসৃণ হতে শুরু করে।

দেহ থেকে অতিরিক্ত মেদ ঝড়িয়ে ফেললে যেমন দেহ চনমনে হয়ে উঠে। নতুন কর্মোদ্দীপনা পাওয়া যায়। দেহকে নতুন করে অনুভব করা যায়। তেমনি চিত্ত থেকে অতিরিক্ত-অপ্রয়োজনীয় সংস্কার মুঝে ফেলতে পারলে মনও নতুন করে নেচে উঠে। মন তখন আত্মা বা প্রাণশক্তির সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।

কিন্তু কথা হচ্ছে এই সংস্কারের বোঝা মাথা থেকে নামাবো কি করে? এ বড় কঠিন প্রশ্ন মশাই। এর সাদাসিধে উত্তর দেয়া সহজ নয়। তবে চেষ্টা করার উপায় বাতলে দেয়া যেতেই পারে। এই ধরুন, আজ থেকে… এই মুর্হূত থেকেই… নতুন করে সংস্কার গ্রহণে সচেতন হতে পারি। কি দেখবো, কি শুনবো, কি স্পর্শ করবো, কিসের গন্ধ নেবো এবং কি আহার নিবো তাতে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক অনেক বেশি সচেতনতা হবো।

জাস্ট কোনোকিছু করবার আগে কয়েক সেকেন্ড যদি ভাবতে পারি। ‘এর কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? নাকি কেবলই অপচয়-অবচয় মাত্র।’ -এটুকু ভাবতে পারলেই হবে, আর কিছু লাগবে না। অবশ্য তার আগে নির্দিষ্ট করতে হবে আপনি আসলে কোথায় যেতে চান অর্থাৎ আপনার জীবনের উদ্দেশ্য কি?

যদি কেবল বিলাশ আর ভোগ আপনার জীবনের লক্ষ্য হয়। বা নৈরাশ্যবাদীতা-হতাশাচ্ছন্নতা আপনার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয় তাহলে এসব বিদ্যা-বুদ্ধি কোনো কাজে লাগবে বলে মনে হয় না। আপনাকে টলায় এমন সাধ্য কার??

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিততে আমাদের বন্দি জীবনের কাব্য অনেকদূর এগিয়েছে। আমরা অনেকে অস্থির হয়ে উঠছি ঘরে থাকতে থাকতে। অনেকে এর মাঝেই হয়তো বেড়িয়ে পরেছেন। অনেকে হয়তো দাঁত কামড়ে রয়ে গেছি ঘরেই। খালি চোখে দেখতে না পারা ক্ষুদ্র একটা কীট আমাদের জীবনযাত্রা কিভাবে পাল্টে দিলো তাই না?

তাবৎ তাবৎ মারণাস্ত্র আমরা বানিয়ে থড়েথড়ে সাজিয়ে রেখেছি বিশ্বজুড়ে। বিলাশের জন্য কতশত বিনোদন কেন্দ্র বানিয়েছি। কিন্তু সেসব কোনোই কাজে আসছে না। কাজে আসছে না বিদেশে পাচার করা লক্ষ-কোটি টাকা। কাজে আসছে না সম্পদ-সম্পত্তি পরিবার-পরিজন।

এবারের পর্বে ভূমিকাটা একটু বিশাল হয়ে গেলো, তাই না? হুমম একটু বিশাল ভূমিকাই লিখতে হলো। চারপাশে সকলে কেবল অন্যে কে কি করছে তা নিয়ে মহাব্যস্ত। সুযোগ পেলেই ইনবক্সে অপ্রয়োজনীয় সব বিষয় শেয়ার করেই যাচ্ছে-করেই যাচ্ছে। তারা নিজেরা তো সেসব অখাদ্য পড়ে-জেনে-শুনে অস্থির হচ্ছেই। পাশাপাশি সকলকে অস্থির করে এক পৈচাশিক আনন্দে বিগলিত হচ্ছে।

এখন সময় সেই সব মানুষজনকে এড়িয়ে চলা। তারা যত গুরুত্বপূর্ণ বা কাছের মানুষই হোক এই ক্রান্তিকালে মনোবল ঠিক রাখতে বিন্দুমাত্র নেতিবাচক চিন্তাধারা যাদের আছে তাদের থেকে দূরে থাকুন। এতে যদি একাকী সময় কাটাতে হয় তাও তাদের সাথে সঙ্গ করার চেয়ে সেটা হবে অনেক উত্তম।

আর এই একাকী সময় হলো সেই সর্বোত্তম সময়, যখন আপনি চাইলে নিজেকে জানার পথে এগিয়ে যেতে পারেন অনেকটা পথ। আর চারপাশের অসুস্থ মানুষিকতার মানুষদের থেকে দূরে থাকতে নিজের মধ্যে ডুব দেয়ার জন্যই এতো আলোচনা। এই নিজেকে জানার জন্য নিজ দেহকে জানা জরুরী। সাধু মতে, দেহ গড়া পঞ্চতত্ত্বে- মাটি, জল, আগুন, বায়ু ও আকাশ।

তাই দেহকে জানতে গেলে এই পঞ্চতত্ত্বকে জানা জরুরী। আবার এই পঞ্চতত্ত্ব দেহে কিরূপে বিরাজ করে তাও জানা জরুরী। তবে এসব গভীর জলের কথা সেসব কথা এখন থাক। আপাতত নিজ দেহকে একটু ছুঁয়ে দেখবার চেষ্টা করি বরং। কি বলেন?

এই কাজটি দুইভাবে আমরা করতে পারি। এক হচ্ছে ‘স্পর্শ’ দিয়ে আর দুই হচ্ছে ‘মন’ দিয়ে। তাহলে চলুন সংক্ষিপ্তভাবে এবারের অনুশীলটা একটু বুঝিয়ে বলা যাক। এমনিতেই বেশ বড় হয়ে গেলো এবারের লেখাটা। তার জন্য ক্ষমা করবেন।

আপনি দিনের যে কোনো সময়ই এটি করতে পারেন। তবে ভালো হয় যদি একান্ত-নিরিবিলি-অন্ধকার পরিবেশ হয় তবে। বরাবরের মতো ঢিলেঢালা পোশাক পরে আরাম ভঙ্গিতে বসে পরুন। চোখ আতলো করে বন্ধ করুন। এরপর দুই হাতের তালু ও আঙ্গুল দিয়ে মাথার উপরিভাগ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সমস্ত দেহ স্পর্শ করে করে নিচের দিকে নামতে থাকুন।

মনে রাখতে হবে, হাতের তালু দিয়ে দেহের যে জায়গাটিকে স্পর্শ করছেন তাতে যাতে পূর্ণ মনোযোগ থাকে। সেসময় অন্য কিছুর ভাবনা যাতে মনে উদয় না হয় তা লক্ষ্য রাখতে হবে। মন অন্য জায়গায় চলে গেলেও, মনে পরা মাত্র তা আবার দেহের স্পর্শের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

এ সময় নি:শ্বাস স্বাভাবিক থাকবে। তবে শুরুর আগে কয়েকবার ধীরে ধীরে দীর্ঘ নি:শ্বাস নেয়া এবং দ্বিগুণ সময় নিয়ে তা ছাড়া যেতে পারে। এতে মনোযোগ বৃদ্ধি পাবে।

মাথা থেকে পায়ের পাতা-পায়ের পাতা থেকে মাথার তালু এভাবে পরপর কয়েকবার করুন। প্রত্যেকবার যাতে আগেরবারের চেয়ে ধীরে হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। এভাবে কয়েকবার হয়ে গেলে মেরুদণ্ড সোজা করে পা ভাঁজ করে করে আরাম করে বসুন। সুখাশন, পদ্মাশন, অর্ধাপদ্মাশন বা যে কোনো আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসুন।

পা ভাঁজ করে বসতে না পারলে সোফা বা চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে পা যাতে সরাসরি মাটি বা মেঝে স্পর্শ না করে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। পায়ের নিচে রবার ম্যাট বা উলেন ম্যাটেস দিতে পারেন।

দুই হাত দুই হাঁটুর উপর রাখুন। সবকিছুই করুন আরাম ভঙ্গিতে। জোর করে কিছুই করবেন না। মেরুদণ্ড যতটা সম্ভব সোজা, দুই কাঁধ দুই দিকে টানটান, মুখমণ্ডল সামনের দিকে বা একটু উপরের দিকে থাকবে। এইবার আবারো আগের ভঙ্গিতে বেশ কয়েকবার দীর্ঘনি:শ্বাস নিন।

তারপর নি:শ্বাসের দিকে মনোযোগ দিয়ে কিছু সময় পার করুন। মন কিছুটা স্থির হলে। এবার ‘মন’ দিয়ে সেই একই ভঙ্গিতে মাথার তালু থেকে খুবই ধীরে ধীরে দেহ অনুভব করার চেষ্টা করুন। সেই একইভাবে মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত।

এভাবে ভাবতে এবং অনুভব করতে থাকুন- মাথার তালু… তালু থেকে নামতে নামতে কপাল, কপাল থেকে ভ্রূ, ভ্রূ থেকে চোখ, চোখ থেকে নাক এভাবে নামতে থাকুন। চিন্তা এবং অনুভব দুটিই একসাথে করে যেতে হবে। এভাবে বেশ কয়েকবার করুন। তারপর আবার নি:শ্বাসের দিকে খেয়াল রেখে কিছু সময় পার করুন। জগতের সকল মানুষের… সকল জীবের… কল্যাণ কামনা করার পর, ধীরে ধীরে চোখ খুলুন।

অবশ্য এ অনুশীলনটি গোসল করার সময়ও করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে চোখ বন্ধ করে বা খুলে পানি ঢালতে ঢালতে একই পদ্ধতিতে মাথার তালু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখতে হবে। তবে এক্ষেত্রে স্পর্শ একটু গভীর হবে। এর জন্য যতটা ঝুঁকতে হবে তা ঝুঁকে করতে হবে। তবে অবশ্যই তা আরামদায়ক ভঙ্গিতে।

বসে বা দাঁড়িয়ে যেভাবে স্বচ্ছন্দ হয় সেভাবেই করতে পারেন। কয়েকবার এভাবে করবার পর। অতি ধীরে ধীরে দেহে পানি ঢালতে হবে। চোখ বন্ধ করে পানির প্রতিটি বিন্দু দেহের কোথায় কোথায় স্পর্শ করছে। কোথা দিয়ে গড়িয়ে পরছে তা খেয়াল করতে হবে। তবে বিশেষ সর্তক থাকতে হবে। এই অনুশীলন করতে যেয়ে প্রতিদিন আপনি যে পরিমাণ পানি দিয়ে গোসল করেন তারচেয়ে তা জেনো অধিক না হয়ে যায়। প্রতিদিন যে পরিমাণ পানিতে গোসল করেন পরিমাণ তাই রাখবেন।

মনে রাখবেন, দেহকে বোঝা সহজ নয়। দীর্ঘ সাধনার ব্যাপার। আমরা সে কাজটি করছিও না। আমরা স্রেফ মনকে দেহের মাঝে স্থির করার চেষ্টা করছি মাত্র। যাতে এই ক্রান্তিকালে নিজেকে ধরে রাখতে পারি শত বিপর্যয়ের মাঝেও।

কতজন রাস্তায় বের হলো, কতজন ঈদ-পূজার কেনাকাটা শুরু করে দিলো, কতজন মদের দোকানের সামনে লাইন দিলো, কতজন ফাঁকা রাস্তার ছবি তুলতে গিয়ে মানুষকে বাইরে যাবার জন্য অনুপ্রাণিত করলো; সেসব হিসেবে রেখে কি হবে বলেন।

যদি সত্যি সত্যি সামর্থ থাকে, যোগ্যতা থাকে, মনোবল থাকে তাহলে যাদের খাবার নেই, পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নিয়ে যাদের দায়িত্ব পালনে রাস্তায় থাকতে হচ্ছে, যারা মানুষকে এই ক্রান্তিকালে সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছে তাদের পাশে দাঁড়ান। আর যদি সেসব করবার ক্ষমতা না থাকে, তাহলে আর সেসব ভেবে আপনি কি করবেন। তারচেয়ে আপনি ঘরে থাকুন। আপনার পরিবার-পরিজনকে ঘরে রাখার চেষ্টা করুন। আর নিজেকে জানুন।

যাতে ক্রান্তিকাল কেটে গেলে যখন আপনি রাস্তায় নামবেন, তখন আপনি অনেক বেশি মানবিক মানুষ হিসেবে নিজেকে দেখেতে পান। আর যদি আপনি একটা মানবিক পৃথিবীতেই পা রাখতে চান তাহলে আশপাশের সকলকেই অনুপ্রাণিত করুণ এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানতে। কারণ এটাই উপযুক্ত সময়। প্রকৃতি নিজেই তার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। হেলায় যাতে এই সুযোগ না হারায় কেউ সেদিকে খেয়াল রাখুন।

অনলাইনে দামী দামী পোশাক-পরিচ্ছেদ বিক্রি-মেকাপ বিক্রির চেয়েও দুনিয়ায় আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে এটা মানুষকে বোঝাতে হবে। তবে সবার আগে আপনার নিজেকে বুঝতে হবে।

দেহকে বুঝতে দেহের অপরূপ বর্ণনা দিয়ে আবদুর রহমান বয়াতীর রচিত গান দিয়ে এবারের লেখা শেষ করলাম। সুযোগ পেলে হয়তো আবারো লিখবো। আপনারা লেখার অনুশীলনগুলো চালিয়ে যেতে পারেন, নিজেকে জানতে চাইলে-বুঝতে চাইলে-নিজের মধ্যে ডুবতে চাইলে। জয় গুরু। আবদুর রহমান বয়াতী বলেছেন-

একটা চাবি মাইরা দিলা ছাইড়া, জনম ধরে চলিতে আছে,
মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি, কোন মিস্ত্ররী বানাইয়াছে।।

মাটির একটা কেস বানাইয়া মেশিন দিলো তার ভিতর
ওরে, রং বেরংয়ের বার্নিশ করা দেখতে ঘড়ি কি সুন্দর,
ওরে তিন পাটেতে গড়ন সারা, বয়লারের মেশিনের গড়া
তিনশ সাইত্রিশ ইশকুররম মারা ষোলজন পাহারা আছে।।

ঘড়ি, হাই স্প্রিং ফ্যাপসা কেচিং লিভার হইলো কলিজায়
ছয়টি বলে আজব কলে দিবানিশি প্রেম খেলায়,
ঘড়ি, তিন কাটা বার জুয়েলে, মিনিট কাটা হইলো দিলে
ঘণ্টার কাটা হয় আক্কেলে মনটারে সেকেন্ডে দিসে।।

ঘড়ির, কেসটা বত্রিশ চাকের, কলে কব্জা বেসুমার
দুইশো ছয়টা হাড়ের জোড়া, বাহাত্তর হাজারও তার,
ও মন, দেহঘড়ি চৌদ্দতলা, তার ভিতরে দশটি নালা
একটা বন্ধ নয়টা খোলা গোপনে এক তালা আছে।।

ঘড়ি, দেখতে যদি হয় বাসনা চলে যান ঘড়ির কাছে
যার ঘড়ি সে তৈয়ার কইরা, ঘড়ির ভিতর লুকাইছে,
পর্দারও সত্তর হাজারে, তার ভিতলে নড়ে-চড়ে
জ্ঞান নয়ন ফুটলে পরে দেখতে পারবেন চোখের কাছে।।

ওস্তাদ, আলাউদ্দিনে ভেবে বলছেন, ওরে আমার মনবোকা
বাউল, রহমান মিয়ার কর্মদোষে হইল না ঘড়ির দেখা,
আমি, যদি ঘড়ি চিনতে পারতাম, ঘড়ির জুয়েল বদলাইতাম
ঘড়ির জুয়েল বদলাইবো কেমন যাই মিস্ত্ররীর কাছে।।

(চলবে…)

……………………
আরো পড়ুন:
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: এক
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: দুই
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: তিন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!