এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: চার

এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: চার

-মূর্শেদূল মেরাজ

সময় যাচ্ছে কিন্তু এই ক্রান্তিকাল কাটছে না। যদিও ধীরে ধীরে লকডাউন শিথিল হচ্ছে। মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে। অনেকে নিতান্ত বাধ্য হয়ে পথে নামছেন। অন্ন সংস্থানের জন্য, সেবা-নিরাপত্তার জন্য যারা পথে নামছেন তাদের তো নামতেই হবে। কামনা করছি তারা নিজের সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পথে নামছে। নিজ পরিবার এমনকি যাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হবে তাদের সকলের সাথেও সুরক্ষা বিধি মেনেই চলবেন।

পরিতাপের বিষয় হলো, এই দুর্যোগেও অনেকে আনন্দ উল্লাস করতে, লোক দেখাতে পথে নামছেন। রেস্টুরেন্ট খুলে যাওয়ায় অনেকে প্রয়োজন না হলেও সেখানে ভিড় করছেন। বিনা প্রয়োজনে মার্কেটে ঘুরছেন। আড্ডা জমাচ্ছেন। শুধু তাই নয়। সেই সব বীর গাঁথা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে অন্যদেরও ঘর থেকে বের হতে উৎসাহ জোগান দিয়ে দিচ্ছেন।

যারা নিতান্ত আনন্দ করতে পথে নামছেন তাদের সত্যিই কিছু বলার নেই। আর যারা শত প্রতিকুলতার মাঝেও জীবের সেবায় নিয়োজিত তাদের কুর্ণিশ। তবে যারা হতাশায় ডুবছেন, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন, বারবার মৃত্যুর পরিসংখ্যানে চোখ বুলাচ্ছেন ; তারপরও এই ক্রান্তিকালে স্থির থেকে নিজ কাজ করে যেতে চাইছেন তাদের জন্যই এই লেখা।

এই লেখা পড়ে কারো জীবন পাল্টাবে না। মনও পাল্টাবে না। তবে এই লেখা থেকে চাইলে নিজেকে জানবার পথের যাত্রাটা শুরু করতে পারেন, সহজ কিছু প্রাথমিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে। আর তাও যদি না হয় তাহলেও হতাশার কিচ্ছুটি নেই। মনকে স্থির করার প্রাথমিক কিছু কৌশল আপনার জানা থাকবে। নিয়মিত করে গেলে মনকে একীভূত করাও কঠিন হবে না।

মন স্থির করার ব্যাপারে নানা মুনির নানা মত। দিয়েছেন নানা ক্রিয়া-উপাচার। আমাদের মতো সাধারণের জন্য দেহকে বুঝে তা থেকে মনে যাওয়াই সহজ পথ। তবে তার জন্য দেহকে বোঝা জরুরী। আর দেহকে বুঝতে গেলে এর দোষ-গুণ সম্পর্কে জেনে রাখা ভালো। যদিও এ এক বিশাল জগৎ। সেই বিশালত্বে না গিয়ে প্রাথমিক কিছু তথ্য জেনে নেই এই যাত্রায়।

পঞ্চতত্ত্বে গড়া আমাদের দেহের গুণ ও দোষ উভয়ই তিনটি করে। আয়ুর্বেদ ভাষায় দেহের ত্রিদোষ হলো- বাত-পীত-কাফ। আর ত্রিগুণ হলো- রজ-তম-সত্ত্ব। অর্থাৎ রাজসিক-তামসিক-সত্ত্বিক। দেহের সাথে এই ত্রিগুণ যেমন থাকে তেমনি ত্রিদোষও থাকে। তবে এর অনুপাতে গড়মিল হলেই বাঁধে গণ্ডগোল।

একদিকে ত্রিদোষকে যেমন দেহের গঠন-প্রকৃতি সাথে পারিপার্শ্বিক জলবায়ু-পরিবেশের উপর ভিত্তি করে তার ভারসাম্য ঠিক রাখতে হয়। অন্যদিকে ত্রিগুণকেও কর্ম-বয়স-চরিত্র অনুযায়ী সমতায় রাখতে হয়।

সাধু মতে বলে, মানুষ নবজন্মে যে দেহ-চৈতন্য লাভ করে তা পূর্বজন্মের সংস্কার-কর্মফলের ভিত্তিতেই প্রাপ্ত হয়। আর তার সাথে যে পঞ্চসংস্কার যুক্ত থাকে তার ভিত্তিতেই এই ত্রিগুণের বিকাশ ঘটে। আর এই ত্রিগুণের বিকাশের ফলে মানুষের স্বভাব মূর্ত হয়ে উঠে।

যার স্বভাবে রাজসিক গুণ বেশি প্রকাশ হয় তার গতি হয় চঞ্চল, উদ্দ্যামী, ক্ষিপ্র, সবসময় কিছু করার প্রতি উত্তেজনা থাকে। বেশিভাগ সময় তারা বিচার বিবেচনা না করেই কাজে ঝাঁপিয়ে পরে। কোনো কিছুতে স্থির থাকতে পারে না। সদা চঞ্চল। আর এতে মন উত্তেজনা, স্নায়বিক দুর্বলতা প্রাপ্ত হয়।

তামসিক গুণের অধিকারীরা হয় এর ঠিক উল্টো। তাদের স্বভাবে থাকে নিষ্প্রভতা, সকল কিছুতেই নিষ্প্রাণ থাকে। কোনো কিছুতেই উৎসাহ পায় না। কিছু করার আগেই ভেবে বসে থাকে, আমাকে দিয়ে হবে না। হতাশাই তাদের চূড়ান্ত অর্জন। কর্মে নয় চিন্তাতেও তাদের অলসতা থাকে। সবসময়ই ঘুম ঘুম ভাব। অনাগ্রহ।

আর সাত্ত্বিক গুণের মানুষ হলো নির্মল চরিত্রের স্থির স্বভাবের মানুষ। যাদের গুণে ভালোবাসা, সজীবতা, শান্তি, সচেতনতা, পবিত্রতা ও আনন্দ প্রকাশ পায়। সকলের ভালোবাসায় তারা সিক্ত থাকে। প্রাপ্তির মধ্যে শান্তি-প্রশান্তি।

তবে সকলের মাঝেই কিন্তু শতভাগ সাত্ত্বিকতা, শতভাগ রাজসিকতা বা শতভাগ তামসিকতা থাকে না। বেশিভাগ মানুষ হয় এসব গুণের সম্মিলিত জগাখিচুড়ি। যদি কারো স্বভাবে কোনো একটি গুণ ষাট ভাগের চেয়ে বেশি হয় তাহলে তাকে সেই গুণের অধিকারী বলা যায়।

সমাজের বেশিভাগ লোকই হয় রাজসিক নয় তামসিক বা রাজসিক-তামসিকের মিলিত চরিত্রের অধিকারী। আবার কারো কারো চরিত্রে কখনো রাজসিক কখনো তামসিক গুণের বিকাশ ঘটে। মনে রাখতে হবে, এই গুণ সকল সময়ই একই মাত্রায় দেহে-মনে বিরাজ করে না। দিন-পক্ষ-ঋতু-জলবায়ু-স্থান ভেদে পরিবর্তিত হতেই থাকে।

রাজসিক-তামসিক গুণ প্রকট হলে দেহ-মনে নানাবিধ রোগবালাই আক্রমণের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে সাত্ত্বিকগুণ আয়ত্ব করা বহু সাধ্যসাধনার ব্যাপার। কপাল গুণে কেউ কেউ জন্মগতভাবে এই গুণ নিয়েই জন্মায়। কিন্তু যারা এই গুণে নিজেকে গুণান্বিত করতে চায়, তাদের করতে হয় কঠিন তপস্যা।

একটা বিষয় বলা রাখা ভালো, এই ত্রিগুণের কোনটাই কেউ শতভাগ আয়ত্ত করতে পারে না। নব্বই শতাংশ পর্যন্ত নিতে পারলেই সর্বোচ্চ বিবেচিত হয়। বাকি দুটি গুণ ৫ ভাগ করে থাকতে হয়। কারণ এর তিন গুণ মিলেই দেহের প্রকাশ। এর কোনোটাকে অস্বীকার করা যায় না। যারা অস্বীকার করতে পারে তারা মানুষের চেয়ে ঊর্দ্ধে উঠে যায়।

শতভাগ সাত্ত্বিক স্বভাব হলে যেমন মানুষ মহাসাধক হয়ে নির্বাণ লাভ করে। তেমনি শতভাগ রাজসিক হলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। তার স্বভাব আর মানুষের সাথে মিলে না। অন্যদিকে শতভাগ তামসিক স্বভাব হলে তাকেও জীবিত বলা যায় না।

শুধু এই গুণ যে দেহ মানে থাকে তাই নয়। প্রকৃতির মাঝেও এই তিনগুণ বিরাজ করে। আহারের মাঝেও এই তিন গুণ লক্ষ্য করা যায়। আর সেসব ভোজনের মাধ্যমে আমাদের দেহে প্রবেশ করে সেই সেই গুণের বিকাশ ঘটায়। মজার বিষয় হলো, যার যে স্বভাব সে সেই গুণের আহারই ভজন করতে অধিক উৎসাহী থাকে সব সময়। এর বিচারেও নিজের গুণ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়।

সাত্ত্বিক আহার আয়ু, উৎসাহ, বল, শক্তি, আরোগ্য, চিত্ত প্রসন্নতা ও রুচি এ সব বৃদ্ধি করে। সতেজ, সজীব, তাজা, স্বল্পাহার সাত্ত্বিক ব্যক্তির আহার। সাত্ত্বিক আহার ভোজনে মনে প্রফুল্লতা, পবিত্রতা ও উদ্দাম কাজ করে।

অধিক মাত্রায় অতিরিক্ত কটু, অম্ল, লবণাক্ত, উষ্ণ আহার রাজসিক ব্যক্তিদের প্রিয়। এসব আহার ভোজনে দুঃখ, রোগ ও শোক বৃদ্ধি পায়।

বাসি, শুষ্ক, উচ্ছিষ্ট, দুর্গন্ধযুক্ত ও অপবিত্র খাবার তামসিক ব্যক্তির প্রিয়। এসব খাবারে আলস্য ও হতাশা বৃদ্ধি পায়।

সকলে যেমন সাধক হবে না, সকলে তেমন সৈনিকও হবে না। যে কঠোর পরিশ্রম করে তার আর যে কোনো কায়িক পরিশ্রমই করে না তাদের দু’জনের আহার এক হতে পারে না। সেই বিবেচনায় ভারতবর্ষের মুনি-ঋষি-সাধকরা প্রত্যেকের খাদ্যবিধিই আলাদা করেছেন। কারা কোন খাবার খাবে তাও নির্দিষ্ট করা আছে চতুরাশ্রমের ভিত্তিতে।

সকল খুঁটিনাটী ভেবে আহারের তালিকা করা হয়েছে। যা যুগ যুগ ধরে আমাদের মা-মাসী-বোন-নানী-দাদী বিনা প্রশ্নে পালন করে আসছিলেন। কিন্তু এই বিনা প্রশ্নে পালনে ছোট্ট একটা সমস্যা থেকে গেছে। তারা কোন কোন ঋতুকে কোন খাবারে কোন মসলা দিচ্ছে। দুপুরের আহার আর রাতের আহারে কি থাকবে কি থাকবে না।

একই রান্না বৃষ্টির দিনে কিভাবে আর প্রচণ্ড গরমে কি প্রকৃয়ায় করা হবে, এ রকম যে লক্ষ-কোটি বিধিবিধান প্রচলিত ছিল তার পেছনের কারণগুলো জেনে রাখেন নি পূর্ববর্তীদের কাছ থেকে। তাই কালক্রমে পাশ্চাত্য খাদ্য সংস্কৃতির সাথে মিল রাখতে গিয়ে সেগুলো আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। বা আমরা কু-সংস্কার ভেবে সেগুলোকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছি।

পাশাপাশি আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। একসময় আমাদের পরিবারের প্রধান ব্যক্তিটি ছিলেন বয়সে পৌঢ়। যার কথা মাথায় রেখে বাজারসদাই রান্না-বান্না সব হতো। যদিও অনেক পরিবারে সকল বয়সীদের জন্য ভিন্ন পদ হতো। তারপরও বাড়ির পৌঢ় বা বয়স্ক মানুষটির রুচির উপর নির্ভর করতো পুরো পরিবারের খাবারের প্রধান মেনু।

কালক্রমে যৌথ পরিবার ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে যখন একক পরিবার হয়েছে তখন পরিবারের প্রধান ব্যক্তিটি বেশিভাগ ক্ষেত্রেই হয়েছে যুবা বয়সের। অনেকক্ষেত্রে যৌথ পরিবার কিছুটা টিকে থাকলেও প্রধান আর পৌঢ় কেউ নেই। পরিবারের প্রধানের কর্তৃত্ব চলে গেছে যুবাদের কাছে।

আর চিরায়ত বিধান মতে মানুক আর না মানুক পরিবারের প্রধানের রুচির উপরই বাজারসদাই রান্না-বান্না হয়ে থাকে বাঙালী পরিবারগুলোতে। আর যুবাদের হাতে কর্তৃত্ব চলে যাওয়ায় তারা পুরানো বিধিবিধানকে দূর করে রসনাকে প্রাধান্য দিয়ে নব্য এক খাদ্য মেনু তৈরি করেছে।

অনেকে সচেতন হয়ে বিভিন্ন মানসম্পন্ন খাবারকে প্রতিদিনের তালিকায় যুক্ত করলেও; তার বেশিভাগই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানীকৃত রেসেপি মাত্র। যা আমাদের পরিবেশে কতটা মাননসই তার একটা প্রশ্ন যেমন থেকে যাচ্ছে। কোন বয়সের মানুষের জন্য তা প্রযোজ্য এবং এই পরিবেশে তা হজম হতে কত সময় লাগবে বা তার প্রতিকৃয়া কি হবে তা খুব একটা আমরা কেহই ভেবে দেখিনি।

যা হয়েছে তা হলো বিদেশী বিভিন্ন পরিসংখ্যান বা রিপোর্ট বা আর্টিকেলের ভিত্তিতে এক ধারনের মানুষিক অবস্থা আমরা তৈরি করে নিয়েছি। সেসব খারাপ তা বলার উদ্দেশ্য নয় মোটেও; বলার উদ্দেশ্য একটাই তা আমাদের পরিবেশে মানসই কিনা সেটা।

সেসব স্বাদ বদলের জন্য মাঝে মধ্যে খাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু প্রতিদিনের মেনুতে তারা স্থান করে নিয়ে বা আমাদের প্রচলিত রান্না পদ্ধতিতে পরিবর্তনে ভূমিকা রাখায় কিছুটা সমস্যা তো তৈরি করেছেই তা অস্বীকার করি কি করে। কোনো একটা আর্টিকেলে হয়তো দেখলাম জাপানীরা এই বিশেষ পদ খায় বলে তারা অনেক বেশি বাঁচে। আমরা কোনো বিচার বিবেচনা না করেই তা খেতে শুরু করে দিলাম।

হয়তো কোনো সেলিব্রেটি রান্নার অনুষ্ঠানে বিশেষ কোনো মসলার বাজারজাত করতে সেই মসলা ব্যবহারের পরামর্শ দিলো। আমরা তা কিনতে হুমরি খেয়ে পরলাম। এসব সকল ক্ষেত্রেই নেতিবাচক তা নয়। তবে এসব নিয়ে কোন প্রকার গবেষণা না থাকায় পরিবর্তিত এই খ্যাদ্যাভ্যাস আমদেরকে কি দিচ্ছে, আর আমরা কি হারাচ্ছি, সে বিষয়েও সন্দেহের তালিকাটা খাটো করে দেখবার উপায় নেই।

আর তার সাথে তো খাবারে ভেজাল, অধিক মাত্রায় প্রিজারভেটিভ যুক্ত খাবার অর্থাৎ প্যাকেটজাত খাবার এবং অপচনশীল বা যে খাবার আমাদের জল-আবহাওয়ায় হজম হতে অধিক সময় লাগে সেসব খাবার যথেচ্ছাচার ব্যবহার তো আছেই।

ক্রমশ বাড়তে থাকা আমাদের মানুষিক ও শারীরিক অসুস্থ্যর ইতিহাসে এসব কারণও বিশাল ভূমিকা রাখছে কিনা, সেটা এই অখণ্ড অবসরে পুনরায় ভেবে দেখতে পারি। যদিও রাতারাতি আমাদের দেহে এই পরিবর্তন আসেনি। একটু খেয়াল করে দেখলে নিজেই বুঝতে পারবেন, বিগত কয়েক যুগের ফল আমরা এখন হাড়ে হাড়ে পেতে শুরু করেছি। তবে এসব কথা বিশ্বাস না হলে গত এক দশকের বাড়তে থাকা ঔষুদের দোকানের সংখ্যা আর তার বিক্রির একটা হিসেব দেখলেই বুঝতে পারবেন। কারণ মানুষ যা খায় তাই হয়।

পরিবারের প্রধান যুবারা হওয়ায় তাদের রুচির উপর নির্ভর করেই মূলত রান্না হয়। আর এ সবই প্রায় মুখরোচক। যৌবনের খাবার বেশিভাগই হয় রাজসিক। যৌবনের উদ্দাম ও কর্মক্ষমের জন্য রাজসিক খাবারের কিছুটা প্রয়োজনও আছে বটে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সেই একই খাবার বেশিভাগ ক্ষেত্রে পুরো পরিবার খাচ্ছে।

সে খাবার খাচ্ছে পরিবারের বয়স্ক ও শিশু সকলেই। আর সেই রাজসিক বা উত্তেজক খাবার খেয়ে শিশু থেকে বয়স্ক সকলেই দেহে মনে যৌবনের বিকার নিয়ে ঘুরছে নিজেরা না জেনেই।

এতে শিশুরা শৈশবের পরিবর্তে দ্রুত যৌবনে পৌঁছে যাচ্ছে। বয়স্করা কঠিন কঠিন সকল মানুষিক ও শারীরিক ব্যধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বিধিবিধানের তোয়াক্কা নেই বলে বেশিভাগ পরিবারে প্রতিদিনের মেনু বিশেষ পরিবর্তন হচ্ছে না। শাক-সবজিতে নতুন প্রজন্মের রুচি নেই তেমন। আমিষেই সকলের আগ্রহ। আর ডায়াটিশিয়ানের করা মেনু যারা অনুসরণ করেন। তাও বেশিভাগ ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য ধারণার ডায়াট।

রোগবালাই চিরকালই ছিল। কিন্তু একটা সমাজে সকলেই অসুস্থ এমনটা ছিল কিনা সন্দেহ। যাক এসব ভারি ভারি কথা। মূল কথাই আসি। সাধুরা বলে, যোগী হতে হলে আগে রোগী থেকে নিরোগী হতে হবে। তাই মন স্থিরের জন্যও আগে সুস্থ হতে হবে। আর এই অস্থির সময়ে তামসিক আর রাজসিক খাবারের চেয়ে সাত্ত্বিক খাবারকে বেশি গুরুত্ব দেয়াই ভালো।

কর্মোদ্যোগী ও কায়িক পরিশ্রমীদের খাদ্য তালিকায় কিছুটা রাজসিক খাবার রাখা গেলেও তামসিক খাবার কদাচ নয়। ফার্স্টফুড, ফ্রিজের ঠাণ্ডা, প্রিজারভেটিভ যুক্ত ও প্যাকেটজাত খাবার না খাওয়াই উত্তম। সাত্ত্বিক খাবার মনকে প্রফুল্ল রাখে। আর প্রফুল্ল মনেই তো হয় আনন্দ ভ্রমণ। মনে মনে বনে বনে ঘুরে বেড়াবার আনন্দ। মানে প্রশান্তি।

গত লেখায় গোসলের সময় দেহ-মন ছুঁয়ে দেখার যে কথা বলা হয়েছিল সে বিষয়ে অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে জানতে চেয়েছেন। তাদের সকলের জন্যই এখানে সে বিষয়ে আরো দুই-একটা বিষয় তুলে ধরছি-

আমরা অনেকেই বাথরুমে ঢুকেই ঝর্ণা ছেড়ে তার নিচে দাঁড়িয়ে পরি। এভাবে হুট করে মাথায় জল ঢেলে দেয়ায় সময়ে সময়ে বিপদ ডেকে আনতে পারে। জলের আর দেহের তাপমাত্রার সমতা না হলে দুর্ঘটনা ঘটে যেতেই পারে।

তাই আগেই সাবধান হওয়া উত্তম। গোসলের আগে কিছুটা পানি পান করে নেয়া ভালো। সেটা আধঘণ্টা আগে পান করলে সবচেয়ে ভালো। বাথরুমে প্রবেশ করে প্রথমে পায়ে, বুকে, হাতে তারপর মাথায় পানি ঢালা উত্তম। এতে দেহ পানির তাপমাত্রার সাথে সমতা তৈরি করে নিতে পারে।

প্রথমেই ঝর্ণার নিচে না দাঁড়িয়ে পা থেকে পর্যায়ক্রমে মাথায় পানি ঢালার পাশাপাশি দেহকে একটু মর্দন করে নিতে পারেন। এতে দেহ কোষগুলো জেগে উঠবে। এরপর চাইলে ঝর্ণার নিচে দাঁড়ান বা বসে পড়ুন। এবার ধীরে ধীরে দেহকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখুন। তারপর স্থির হয়ে যান মন দিয়ে অনুভব করতে থাকুন পা থেকে মাথা আবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত।

সবশেষে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে গায়ে জল পড়া অনুভব করতে থাকুন কিছুটা সময়। তবে সর্তক থাকতে হবে আপনি প্রতিদিন যতটা পানিতে গোসল সারেন ততটা পানিতেই গোসল করুন। অতিরিক্ত করবেন না। প্রয়োজনে ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে তার রেসিও বাড়াতে পারেন। কখনোই প্রথম দিনই অনেকটা বেশি পানিতে গোসল করবেন না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

আসুন এবারের অনুশীলনের কথা বলি। সাধন পথে স-অধ্যায় বলে একটা কথা আছে। মানে নিজেকে পাঠ করা। এর অনেক প্রকৃয়া আছে। সেসব উচ্চস্তরের প্রকৃয়ায় না গিয়ে সহজ একটা প্রকৃয়ার কথা বলি। প্রতিদিন একটা সময় বের করুণ। যে সময়টায় আপনি সারাদিন কি কি করেছেন তা একবার খতিয়ে দেখতে পারেন।

কাজটা ঘুমাবার ঠিক আগে হলে সবচেয়ে ভালো। ধরুণ সমস্ত কাজ শেষে বিছানায় গেলেন। বালিশ ছাড়া সোজা চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ুন। মেরুদণ্ড সোজা রাখুন। হাত দেহের বরাবর রাখুন তালু আকাশের দিকে থাকবে। দুই পায়ের মাঝে আনুমানিক এক থেকে দুই ফুট দূরত্ব রাখুন। চোখ বন্ধ করুন।

দেহ ঢিল ছেড়ে দিন যতটা সম্ভব। তিন থেকে পাঁচ বার ধীরে ধীরে নাক দিয়ে গভীর নি:শ্বাস নিন। আরো ধীরে ধীরে নাক দিয়েই তা ছাড়ুন। দেহ স্থির হলে প্রথমে ডান পায়ের আঙ্গুলগুলো একটু নাড়িয়ে নিন। এবার সেখানে থেকে মনে মনে ধীরে ধীরে পায়ের বিভিন্ন অংশ অনুভব করার চেষ্টা করতে করতে উপরের দিকে উঠতে থাকুন।

তারপর বা পা, নিতম্ব থেকে গলা, ডান হাত, বা হাত, গলা থেকে মাথা। অর্থাৎ দেহের নিচ থেকে অনুভব করতে করতে উপরের দিকে উঠবেন। অনুভূতি আর দূরত্ব বুঝতে কেবল যখন যে হাত বা যে পা মন দিয়ে অনুভব করতে শুরু করবেন তার আঙ্গুলগুলো সামান্য নাড়িয়ে নেবেন।

এভাবে মুখ, মুখের বিভিন্ন অঙ্গ হয়ে মাথার তালু পর্যন্ত গেলে গোটা দেহটাকে একসাথে অনুভবের চেষ্টা করুন। একান্ত প্রয়োজন না হলে নড়াচড়া করবেন না। প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হলেও দুই/তিন দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে আশা করি।

এভাবে মন সমগ্র দেহে ছড়িয়ে পরলে দেখবেন আপনি অনেকটাই স্থির হয়েছেন। এবার আপনি সেদিন ঘুম থেকে উঠা থেকে শুরু করে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত সমস্ত কাজ ধারাবাহিক ভাবে মনে করবার চেষ্টা করুন। মনের উপর জোর করবেন না। প্রথমদিকে ক্রম অনুযায়ী মনে না পরলে যা যা মনে পরে তাই মনে করার চেষ্টা করুন।

প্রথমদিকে চাইলে প্রধান কাজগুলো ভাবতে পারে। পরের দিকে একটু তলানিতেও ডুবতে পারেন। ঘুম থেকে উঠা থেকে শুরু করে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত সমস্ত দিনের দিনলিপি স্মরণের পর, একটু ভাবুন কোনো কাজগুলো করা মোটেও প্রয়োজন ছিল না, কোন কাজগুলো অপচয় হয়েছে, কোন কাজগুলোতে অপর কেউ বা আপনি নিজেই কষ্ট পেয়েছেন।

এই টুকটাক হিসেব হয়ে গেলে নিজে নিজে প্রতিজ্ঞা করুণ এরপরে এরূপ এবং কোনোরূপ নেতিবাচক কাজ যাতে আপনার দ্বারা না হয় তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। আপনি পারবেন এই বলে সাহস দিন নিজেকে। আর সারাদিনের ভালো কাজগুলো জন্য মনে মনে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিন।

কিন্তু এরজন্য গর্ববোধ করা যাবে না। মনে রাখবেন এটাই স্বাভাবিক মানুষের জন্য। নেতিবাচকগুলো অন্যায়। আর অন্যের জন্য সর্বোচ্চ কল্যাণকর কাজগুলো আপনার দেয়া উপহার সকলের তরে। এর জন্য সুখ বোধ করতে পারেন কখনোই গর্ব বা অহঙ্কার নয়।

মন প্রশান্ত হলে। আপনি যেভাবে ঘুমান সেভাবে ঘুমিয়ে পরুন। দেখবেন সুন্দর একটা সকাল আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আজ শেষ করবো কুষ্টিয়া শিলাইদহের ডাকপিয়ন গগন হরকরার অনবদ্য এক গান দিয়ে।

যে দেহ-মনকে নিয়ে আমরা ঘুরছি। অবহেলায় তাকেই হারিয়ে ফেলেছি কত জনম ধরে। সেই দেহকে… সেই মনকে… সেই মনের মানুষকে খুঁজতেই তো এতো কাণ্ডর্কীতি। নিজের মাঝে রেখে তাকে আমরা কোথায় কোথায় না খুজে বেড়াই।

আর সেই খুঁজে বেড়ানোর গান দিয়েই শেষ করছি এই যাত্রার লেখা। আরো অনেককিছু বলবার থাকলেও বলা হলো না। আবার সুযোগ পেলে হয়তো লিখবো। সকলে ভালো থাকবেন-কুশলে থাকবেন। জয়গুরু।। গগন হরকরা গাইছেন-

আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যেরে।।
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে,
আমি দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।

লাগি সেই হৃদয়শশী সদা প্রাণ হয় উদাসী,
পেলে মন হত খুশী, দিবা নিশি দেখিতাম নয়ন ভরে।
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে, নিভাই কেমন করে,
মরি হায়, হায় রে-
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে, নিভাই কেমন করে,
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে, বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
দেখ না তোরা হৃদয়ে চিরে, দেখ না তোরা হৃদয় চিরে।
কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।

দিব তার তুলনা কি যার প্রেমে জগত্‍ খুশি,
হেরিলে জুড়ায় আঁখি, সামান্যে কি দেখতে পারে তারে?
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে,
মরি হায়, হায় রে-
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে,
ও সে না জানি কি কুহক জানে, না জানি কি কুহক জানে
অলক্ষে মন চুরি করে, ওরে অলক্ষে মন চুরি করে
কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।

কুল মান সব গেল রে তবু না পেলাম তারে
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে-
তাইতো মোরে দেয় না দেখা সে রে।
ও তার বসত কোথা না জেনে তায় গগন ভেবে মরে
মরি হায়, হায় রে-
ও তার বসত কোথা না জেনে তায় গগন ভেবে মরে।
ও সে মানুষের উদ্দিশ যদি জানিস, মানুষের উদ্দিশ যদি জানিস
কৃপা করি বলে দে রে, আমার সুহৃদ হয়ে বলে দে রে,
ব্যথার ব্যথিত হয়ে বলে দে রে,
কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে,
আমি দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে।

(চলবে…)

……………………
আরো পড়ুন:
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: এক
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: দুই
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: তিন
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: চার

এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: পাঁচ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!